স্বাধীনতার
৫০ বছরে
বাংলাদেশের কৃষিতে
যে অভূতপূর্ব
অগ্রগতি সাধিত
হয়েছে তার
মূলে রয়েছে
ফসলের বীজ
ও প্রাণীর
জাত উন্নয়ন,
প্রযুক্তি উদ্ভাবন
ও সম্প্রসারণ
এবং কৃষি
যন্ত্রায়ন। কৃষি
যন্ত্রায়ন কেবল
কায়িক শ্রমই
লাঘব করে
না, তা
শিক্ষিত তরুণদের
কাছে কৃষিকে
আকর্ষণীয় ও
লাভজনক করতেও
সাহায্য করে।
চৌকস কৃষিতে
রূপান্তরের লক্ষ্যে
যথাযথ কৃষি
যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য।
মনীষীরা আগেই
এ কথা
বলে গেছেন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর রাশিয়া
থেকে ফিরেই
বাংলার কৃষি
ও কৃষকের
উন্নতির কথা
আরো গভীরভাবে
ভাবতে শুরু
করেন। গরুর
কাঁধে লাঙল-জোয়াল
দিয়ে কঠোর
পরিশ্রমসাধ্য চাষবাসের
পরিবর্তে তিনি
কৃষিতে যন্ত্রসমৃদ্ধ
আইলবিহীন সমবায়
ব্যবস্থা কামনা
করেছিলেন। তিনি
লিখেছেন, ‘শিলাইদহে
আমি যে
বাড়িতে থাকতুম
তার বারান্দা
থেকে দেখা
যায় ক্ষেতের
পর ক্ষেত
নিরন্তর চলে
গেছে দিগন্ত
পেরিয়ে। ভোর
বেলা থেকে
লাঙ্গল আর
গরু নিয়ে
এক একটি
করে চাষী
আসে, আপন
টুকরো ক্ষেতটুকু
ঘুরে ঘুরে
চাষ করে
চলে যায়।
এই রকম
ভাগ করায়
(তিনি খণ্ড
খণ্ড জমির
কথা বুঝিয়েছেন)
শক্তির যে
কতটা অপচয়
ঘটে সে
আমি স্বচক্ষে
দেখেছি।’
রবীন্দ্রনাথের দেখা
সে জমি
আরো ক্ষণ্ডায়িত
হয়েছে জনসংখ্যার
চাপে। মোট
আবাদযোগ্য জমিও
কমে গেছে
উল্লেখযোগ্যভাবে এবং
বছরে গড়ে
দশমিক ৫
শতাংশ হারে
কৃষিজমি হ্রাস
পাওয়ার প্রবণতা
চলতেই থাকবে
বাড়িঘর ও
অবকাঠামো নির্মাণের
জন্যে। কিন্তু
কবিগুরুর দেখা
লাঙল-গরু
এখন আর
দেখা যায়
না বললেই
চলে। এখন
প্রায় সাত
লাখ ট্রাক্টর
ও ৫০-৬০
হাজার দুই
চাকার পাওয়ার
টিলার আমাদের
জমিগুলো চাষ
করে দিচ্ছে।
প্রতি বছর
প্রায় আট-নয়
হাজার চার
চাকার ট্রাক্টর
ও ৫০-৬০
হাজার দুই
চাকার পাওয়ার
টিলার আমদানি
হচ্ছে। জমিগুলো
সমান্তরালভাবে চাষ
হয়ে ফসল
বোনার জন্য
একই সাথে
প্রস্তুত হয়ে
যাচ্ছে এবং
অল্প সময়েই
পাওয়ার টিলার
সংযুক্ত বপন
যন্ত্র দ্বারা
ফসলের বীজ
রোপণ করা
সম্ভব হচ্ছে।
এর সঙ্গে
আগে থেকেই
রয়েছে প্রায়
৩৫ হাজার
গভীর নলকূপ,
১৫ লাখ
অগভীর নলকূপ
ও লক্ষাধিক
লো-লিফট
পাম্প, যেগুলোর
দ্বারা ক্ষেতে
সেচ দেয়া
হচ্ছে, ফলছে
উফশী জাতের
হরেক রকমের
ধান। সেচ
যন্ত্রায়নকে যথার্থই
বলা হয়
‘নেতৃস্থানীয়
উপকরণ’, যা
প্রধান চালিকাশক্তি
হিসেবে বাংলাদেশে
সবুজ বিপ্লবকে
সম্ভব করে
তুলেছে। এখন
আগের মতো
দোন, সেঁউতি
দিয়ে খাল-বিলের
পানি উঠিয়ে
ক্ষেতে সেচ
দিতে কৃষককে
কায়িক শ্রম
দিতে হয়
না। কিছু
সেচযন্ত্র বিদ্যুতের
সাহয্যে চললেও
প্রায় ৮০
শতাংশ সেচযন্ত্র,
বিশেষ করে
অগভীর নলকূপ
প্রধানত ডিজেল
দ্বারা চালিত।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের
অন্যান্য যন্ত্রের
মধ্যে রয়েছে
পাঁচ শতাধিক
ধান রোপণযন্ত্র,
পাঁচ সহস্রাধিক
ধান-গম
কাটার যন্ত্র
(রিপার) ও
দুই সহস্রাধিক
কম্বাইন হারভেস্টার।
রিপার কেবল
ধান-গম
কেটে দিয়ে
খালাস। ক্ষেত
থেকে এগুলো
আঁটি বেঁধে
তুলে এনে
মাড়াই করার
জন্য আবার
শ্রমিকের প্রয়োজন
পড়ে।
বলা বাহুল্য,
শ্রমের সংকট
এখন সর্বজনবিদিত।
কম্বাইন হারভেস্টার
অপেক্ষাকৃত নতুন,
জটিল যন্ত্র,
একই সঙ্গে
অনেকগুলো কাজ
করতে হয়
বলে এর
শক্তি বেশি
হলে ভালো
হয়। বাজারে
২০-২৫
অশ্বশক্তিসম্পন্ন মিনি
চাইনিজ কম্বাইন
হারভেস্টার ৮-১০
লাখ টাকায়
পাওয়া যায়।
আরেকটু বেশি
দামে ৬০-৭০
অশ্বশক্তির মধ্যম
আকারের কম্বাইন
হারভেস্টারও ১৮-২০
লাখ টাকায়
কেনা যায়।
এসিআই মোটরস
ও মেটাল
নামের কোম্পানিগুলো
এ যন্ত্রগুলো
আমদানি করে
বিতরণ করছে।
কৃষকরা যাতে
এগুলো সাশ্রয়ী
মূল্যে কিনতে
পারেন, সেজন্যে
সরকার এগুলো
সাধারণত ৫০
শতাংশ হারে
এবং হাওর,
সমুদ্র উপকূল
ও পাহাড়ি
অঞ্চলের জন্যে
৭০ শতাংশ
হারে ভর্তুকি
দিয়ে যাচ্ছে।
কম্বাইন হারভেস্টারের
সবচেয়ে বড়
সুবিধা হলো
এ যন্ত্রগুলো
অল্প সময়ের
মধ্যে একই
সঙ্গে ধান
কাটা, মাড়াই
ও বস্তাবন্দি
করে ক্ষেত
থেকেই সব
কাজ শেষ
করে দিচ্ছে।
সেজন্য এগুলোর
জনপ্রিয়তা ও
চাহিদা দুটোই
বাড়ছে। এসিআই
কোম্পানি সম্প্রতি
সুলভ চাইনিজ
যন্ত্রের পাশাপাশি
কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ
কিন্তু অধিকতর
টেকসই ও
উন্নত মানের
ইয়ানমার কোম্পানির
কম্বাইন হারভেস্টার
নিয়ে আসছে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে
বড় যন্ত্রপাতিগুলোর
পাশাপাশি অসংখ্য
ছোট ছোট
যন্ত্রপাতি চালু
রয়েছে। এগুলোর
মধ্যে রয়েছে
মাড়াই যন্ত্র,
ওষুধ ছিটানো
ও সার
প্রয়োগ যন্ত্র,
নিড়ানি যন্ত্র,
জমি সমান
করা যন্ত্র,
ভুট্টার দানা
ছড়ানো যন্ত্র,
আলু তোলা
যন্ত্র ইত্যাদি।
এগুলোর বেশির
ভাগই দেশের
২০ সহস্রাধিক
ছোটবড় কারখানায়
তৈরি হচ্ছে।
বগুড়া, যশোর,
সিলেট, কুষ্টিয়া,
জামালপুর ও
কুমিল্লায় ছোটবড়
অনেক ‘মেশিন
হাব’ গড়ে
উঠেছে এবং
কৃষি যন্ত্রপাতি
প্রস্তুত ছাড়াও
এসব কারখানায়
দেশী-বিদেশী
যন্ত্রের জন্য
খুচরা যন্ত্রাংশ
তৈরি হচ্ছে।
কিছু কিছু
কারখানায় উত্পন্ন
যন্ত্রাংশ রফতানিও
হচ্ছে।
এত দ্রুত
যন্ত্রায়নের পেছনে
প্রধান লক্ষ্য
হচ্ছে কৃষিতে
শ্রম সংকট
লাঘব করে
উৎপাদন খরচ
কমিয়ে আনা
ও অল্প
সময়ে ফসল
উৎপাদনের কাজ
সম্পন্ন করে
কৃষিতে দক্ষতা
বৃদ্ধি করা।
কৃষিকাজের জন্য
এখন গ্রামে
শ্রমিক পাওয়া
যায় না
এবং যদিও
বা পাওয়া
যায় অত্যধিক
মজুরি দিয়ে
খরচ পোষানো
যায় না।
মূলত এ
কারণেই কৃষিকাজে
যন্ত্রের প্রয়োজন
ও চাহিদা
দ্রুত বাড়ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
বোরো ধান
কাটার মৌসুমে
তো রীতিমতো
এক বিপর্যয়
ঘটে যাওয়ার
উপক্রম। একদিকে
ধান কাটার
শ্রমিক পাওয়া
যাচ্ছিল না।
অন্যদিকে শ্রমিকের
অত্যধিক দৈনিক
মজুরি। কোনো
কোনো অঞ্চলে
দৈনিক ৬০০-৭০০
টাকা মজুরি
দিয়েও শ্রমিক
পাওয়া যায়নি।
সে সময়
আবার ধানের
দাম গেল
পড়ে মণপ্রতি
৪০০-৫০০
টাকায়। কৃষকের
এ উভয়সংকট
থেকে রেহাই
পাওয়ার জন্য
দ্রুত যান্ত্রিকীকরণের
ওপর সবচেয়ে
বেশি গুরুত্বরোপ
করেছে। বিশেষ
করে সেচ,
জমি কর্ষণ
ও ফসল
মাড়াই কাজে
এরই মধ্যে
প্রায় শতভাগ
যান্ত্রিকীকরণ হয়ে
গেলেও ধান
রোপণ, অন্যান্য
ফসল বপন
ও ধানসহ
অন্যান্য ফসল
কর্তন এখনো
বহুলাংশে শ্রমনির্ভর
রয়েছে বিধায়
এদিকেই বেশি
নজর দেয়ার
তাগিদ রয়েছে।
সফলভাবে কৃষি
যন্ত্রায়নের কাজ
এগিয়ে নিয়ে
যাওয়ার জন্যে
কৃষি মন্ত্রণালয়
এরই মধ্যে
একটি কৃষি
যন্ত্রায়ন নীতিমালা
করেছে। কৃষি
যন্ত্রায়ন নীতিমালার
প্রধান লক্ষ্য
হচ্ছে কৃষিকাজে
শ্রম সংকট
হ্রাস করে
কৃষিকে রূপান্তর
করা, কৃষকদের
জন্য সহজলভ্য
ব্যয় সাশ্রয়ী
সহজে ব্যবহারযোগ্য
ও টেকসই
কৃষি যন্ত্রপাতির
জোগান দেয়া,
যন্ত্র ব্যবহারের
মাধ্যমে কৃষিকাজের
কঠোর পরিশ্রম
লাঘব করে
যন্ত্রায়িত লাভজনক
কৃষির প্রতি
গ্রামীণ যুবসমাজকে
আগ্রহী করে
তোলা এবং
সর্বোপরি জলবায়ু
পরিবর্তনজনিত কারণে
কৃষিকাজের ঝুঁকি
ও ক্ষতি
কমিয়ে আনা।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ
কর্মসূচিকে আরো
প্রণোদনা দেয়ার
লক্ষ্যে সরকার
এরই মধ্যে
৩ হাজার
কোটি টাকার
প্রকল্প নিয়েছে
এবং এ
প্রকল্পের সফল
বাস্তবায়ন সাপেক্ষে
আরো বরাদ্দ
বৃদ্ধির আশ্বাস
দেয়া হয়েছে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ
হলে কৃষকের
উৎপাদন খরচ
কমে আসবে
এবং আরো
দক্ষতার সাথে
সময়মতো কৃষিকাজ
সম্পন্ন করতে
পারায় কৃষি
ও কৃষকের
লাভও বাড়বে,
এটা আশা
করা যায়।
এশিয়ার অন্যান্য
দেশ যেমন—থাইল্যান্ড,
ভিয়েতনাম, কোরিয়া
এসব দেশেও
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ
দ্রুতগতিতে এগিয়ে
গেছে। কিন্তু
এ কথাও
মনে রাখা
প্রয়োজন যে
কেবল উৎপাদন
ব্যয় কমলে
বা উৎপাদনদক্ষতা
বাড়লেই কৃষকের
লাভ হবে
তা সবসময়
সত্যি নয়।
কৃষকের উৎপাদিত
পণ্যসামগ্রীর ভালো
দাম পেতে
হবে। এজন্য
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের
সঙ্গে সঙ্গে
কৃষিপণ্যের বাজার,
কার্যকর সাপ্লাই
ও ভ্যালু
চেইন, কৃষি
হাব, কৃষি
বিপণন ও
কৃষি ব্যবসার
ব্যাপক উন্নয়ন
ঘটাতে হবে।
সেই সঙ্গে
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
খণ্ডায়িত জমিবিশিষ্ট
ছোট ছোট
খামারের কার্যকর
আকার বাড়িয়ে
আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি
যেমন—গ্রিনহাউজ,
টিস্যু কালচার,
ভার্টিক্যাল ফার্মিং
এসব দিকে
নিয়ে যেতে
হবে। এ
লক্ষ্যে কৃষি
যন্ত্রপাতির সেবা
প্রদানকারী গ্রামীণ
উদ্যোক্তারা এরই
মধ্যে চুক্তি
ভিত্তিতে ভাড়ায়
যন্ত্রপাতি সেবা
দিচ্ছেন এবং
যন্ত্রের ব্যবহার
ও লাভ
বাড়ানোর লক্ষ্যে
বেশি বেশি
কৃষকের জমি
মেশিনের আওতায়
নিয়ে আসছেন।
এভাবে প্রকারান্তরে
তারা সমন্বিত
খামার ব্যবস্থার
ধারণাকে এগিয়ে
নিয়ে যাচ্ছেন।
এখানে কবিগুরুর
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
জমির আইল
বিরাট কোনো
বাধা হয়ে
দাঁড়ায়নি। সবাই
একই সময়ে
একই জাতের
ধান রোপণ
করলে তা
একই সঙ্গে
কাটা যায়
এবং এসব
কাজে কৃষির
আধুনিক যন্ত্র
ব্যবহার সুবিধাজনক
হয়, এ
ধারণাটি ক্রমেই
প্রসার লাভ
করছে। এভাবেই
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ
ও খামারের
কার্যকর আয়তন
দুটোই সমতালে
বাড়বে এবং
খোরপোষ কৃষি
চৌকস বাণিজ্যিক
কৃষিতে রূপান্তর
হবে।
(প্রবন্ধটি
সংশোধিতাকারে লেখকের
গ্রন্থ কুটির
প্রকাশিত ‘উন্নয়নের
গল্প: কৃষি
খাদ্য গ্রামোন্নয়ন’
বই থেকে
নেয়া)
ড. এমএ সাত্তার মণ্ডল: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক





