মাছ বাঙালি
জাতির সংস্কৃতি
ও কৃষ্টির
অংশ। দেশের
ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর
পুষ্টি চাহিদা
পূরণ, কর্মসংস্থান,
দারিদ্র্য বিমোচন
ও রফতানি
আয়ে মত্স্য
খাতের অবদান
আজ সর্বজনস্বীকৃত।
মোট দেশজ
উৎপাদন বা
জিডিপিতে মত্স্য
খাতের অবদান
৩ দশমিক
৫০ ও
কৃষিজ জিডিপিতে
২৫ দশমিক
৭২ শতাংশ।
আমাদের দৈনন্দিন
খাদ্যে প্রাণিজ
আমিষের প্রায়
৬০ শতাংশ
আসে মাছ
থেকে। দেশের
প্রায় ১৪
লাখ নারীসহ
মোট জনসংখ্যার
১২ শতাংশেরও
বেশি অর্থাৎ
প্রায় দুই
কোটি মানুষ
প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে মত্স্য
খাতের ওপর
নির্ভর করে
জীবিকা নির্বাহ
করছে। দেশের
মানুষ গড়ে
জনপ্রতি প্রতিদিন
৬০ গ্রাম
চাহিদার বিপরীতে
৬২ দশমিক
৫৮ গ্রাম
মাছ বর্তমানে
গ্রহণ করছে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক উন্নয়নে
মত্স্য উপখাতের
অবদান অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ ও
সম্ভাবনাময়। ২০০৮
সালে মত্স্য
উপখাতে গড়
প্রবৃদ্ধির হার
ছিল ৫
শতাংশ। বর্তমানে
প্রবৃদ্ধির হার
শতকরা ৬
শতাংশ। দেশের
রফতানি আয়ের
প্রায় ৪
দশমিক শূন্য
৪ শতাংশ
আসে মত্স্য
উপখাত থেকে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন
লক্ষ্যমাত্রায় ২০১৫
সালের মধ্যে
অর্জিত নির্দিষ্ট
আটটি লক্ষ্যমাত্রা
অর্জনে বাংলাদেশ
সরকার প্রণীত
দারিদ্র্য বিমোচন
কৌশলপত্রে মত্স্য
উপখাতকে দারিদ্র্য
বিমোচন, কর্মসংস্থান
সৃষ্টি, দরিদ্রবান্ধব
অর্থনৈতিক উন্নয়নে
অন্যতম প্রধান
ক্ষেত্র হিসেবে
চিহ্নিত করা
হয়েছে। দারিদ্র্য
বিমোচনে মত্স্য
উপখাতের, বিশেষ
করে মাছ
চাষ সম্প্রসারণ
ও মুক্ত
জলাশয়ে মত্স্য
সম্পদের জৈবিক
ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত
করার মাধ্যমে
দরিদ্রবান্ধব অর্থনৈতিক
উন্নয়নের বিপুল
সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশে বর্তমান
বেকার সংখ্যা
২০২১ সালের
মধ্যে ১
দশমিক ৫
কোটিতে নামিয়ে
আনার লক্ষ্যে
ব্যাপক কর্মসংস্থান
সৃষ্টি এবং
বর্তমান দারিদ্র্যসীমার
হার ২০
শতাংশ ও
চরম দারিদ্র্যের
হার ১০
শতাংশে কমিয়ে
আনার ক্ষেত্রে
মত্স্য উপখাত
সহায়ক ভূমিকা
পালন করছে।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালে
মত্স্য উৎপাদনে
বাংলাদেশের সাফল্য
আজ বিশ্ব
পরিমণ্ডলে স্বীকৃত
ও সমাদৃত।
গত ২০১৮-১৯
অর্থবছরে দেশে
উৎপাদিত মোট
মাছের পরিমাণ
৪৩ দশমিক
৮৪ লাখ
টন, যা
২০০৮-০৯
সালের মোট
উৎপাদনের চেয়ে
৬২ দশমিক
৩১ শতাংশের
বেশি। জাতিসংঘের
খাদ্য ও
কৃষি সংস্থার
তথ্যমতে, (২০২০)
মিঠাপানির মাছের
উৎপাদন বৃদ্ধির
হারে বাংলাদেশের
অবস্থান দ্বিতীয়,
অভ্যন্তরীণ মুক্ত
জলাশয়ে মাছ
উৎপাদনে বিশ্বে
তৃতীয় এবং
বদ্ধ জলাশয়ে
চাষকৃত মাছ
উৎপাদনে পঞ্চম।
ইলিশ উৎপাদনে
বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বে প্রথম
ও তেলাপিয়া
উৎপাদনে চতুর্থ।
দেশ এখন
মাছে শুধু
স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়,
উদ্বৃত্তও বটে।
এ অর্জন
জাতির জন্য
গৌরব ও
অহংকারের।
জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান
১৯৭৩ সালে
গণভবন থেকে
আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের
পোনা অবমুক্ত
করে মত্স্য
চাষকে সামাজিক
আন্দোলনে রূপ
দেয়ার শুভ
সূচনা করেছিলেন।
তত্কালীন সময়ে
বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যদ্বাণী
করেছিলেন, ‘মাছ
হবে এ
দেশের দ্বিতীয়
প্রধান বৈদেশিক
মুদ্রা অর্জনকারী
সম্পদ।’ জাতির
পিতার সুযোগ্য
কন্যা মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার দূরদর্শী
ও প্রাজ্ঞ
নেতৃত্বে মত্স্যবান্ধব
বিভিন্ন কর্মসূচি
গ্রহণের ফলে
বঙ্গবন্ধুর সেই
স্বপ্ন আজ
সফল হয়েছে।
দেশ মাছে
স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায়
গ্রামের সাধারণ
মানুষ স্বল্পমূল্যে
মাছ ও
পুষ্টি পাচ্ছে।
গত এক
দশকে মত্স্য
খাতে জিডিপির
প্রবৃদ্ধি অর্জিত
হয়েছে ৬
দশমিক ২৮
শতাংশ। মত্স্য
উৎপাদনের ক্ষেত্রে
বর্তমান প্রবৃদ্ধির
ধারা অব্যাহত
থাকলে ২০৪১
সালে দেশে
মাছের উৎপাদন
দাঁড়াবে ৯০
লাখ টনে।
আমাদের জলাশয়ে
প্রায় ৮০০
প্রজাতির মাছ
ও চিংড়ি
রয়েছে। এর
মধ্যে ২৬০
প্রজাতির মিঠাপানির
মাছ এবং
৪৭৫ প্রজাতির
সামুদ্রিক মাছ।
আইইউসিএনের (২০১৫)
তথ্যমতে, আমাদের
দেশে ২৬০
প্রজাতির মিঠাপানির
মাছের মধ্যে
৬৪ প্রজাতির
মাছ বিলুপ্তপ্রায়।
আমাদের ঐতিহ্যের
অংশ মিঠাপানির
এসব সুস্বাদু
মাছকে বিলুপ্তির
হাত থেকে
রক্ষার্থে বাংলাদেশ
মত্স্য গবেষণা
ইনস্টিটিউট গবেষণা
পরিচালনা করে
এ-যাবৎ
২৪টি বিপন্ন
প্রজাতির মাছের
পোনা উৎপাদন
ও চাষাবাদ
প্রযুক্তি উদ্ভাবন
করতে সক্ষম
হয়েছে। বাংলাদেশ
মত্স্য গবেষণা
ইনস্টিটিউট বর্তমানে
কাকিলা, কাজলী,
বাতাসী, রানী,
ঢেলা ইত্যাদি
আরো ১০
প্রজাতির দেশীয়
মাছের প্রজনন
ও চাষাবাদ
নিয়ে গবেষণা
পরিচালনা করছে।
এসব মাছও
অদূর-ভবিষ্যতে
চাষের আওতায়
আনা সম্ভব
হবে। অন্যদিকে
দেশে প্রথমবারের
মতো ময়মনসিংহে
বাংলাদেশ মত্স্য
গবেষণা ইনস্টিটিউটে
প্রতিষ্ঠা করা
হয়েছে ‘দেশীয়
মাছের লাইভ
জিন ব্যাংক’।
লাইভ জিন
ব্যাংকে এরই
মধ্যে ৮৫
প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায়
মাছ সংরক্ষণ
করা হয়েছে।
দেশীয় মাছ
সুরক্ষা এবং
গবেষণায় উল্লেখযোগ্য
অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ
বাংলাদেশ মত্স্য
গবেষণা ইনস্টিটিউট
কেআইবি কৃষি
পদক, মার্কেন্টাইল
ব্যাংক সম্মাননা
পদকসহ একুশে
পদক ২০২০
অর্জন করেছে।
নদ-নদী
ও হাওর-বিলে
দেশীয় মাছের
পোনা অবমুক্তি
ও অভয়াশ্রম
(৪২৬টি) প্রতিষ্ঠার
মাধ্যমেও বিপন্ন
প্রজাতির মাছ
সুরক্ষায় মত্স্য
অধিদপ্তর কাজ
করছে।
বাংলাদেশ পানিসম্পদে
অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
এ দেশের
আনাচে-কানাচে
ছড়িয়ে আছে
অসংখ্য পুকুর-দীঘি,
ডোবা-নালা,
নদ-নদী,
খাল-বিল
ও বাঁওড়।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে
রয়েছে বিশাল
হাওর এলাকা,
যা আমাদের
মত্স্যসম্পদের সূতিকাগার
হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশে ৩
দশমিক শূন্য
৫ লাখ
হেক্টর আয়তনের
প্রায় ১৩
লাখ পুকুর-দীঘি
রয়েছে। দেশের
২৪ হাজার
কিলোমিটার দীর্ঘ
নদ-নদীর
আয়তন প্রায়
১০ দশমিক
৩২ লাখ
হেক্টর। এছাড়া
রয়েছে ১
দশমিক ১৪
লাখ হেক্টর
জলায়তনের প্রায়
১১ হাজার
বিল, ৫
হাজার ৪৮৮
হেক্টর আয়তনের
বাঁওড়, ৬৮
হাজার ৮০০
হেক্টর কাপ্তাই
হ্রদ, প্রায়
দুই লাখ
হেক্টর সুন্দরবন
খাড়ি অঞ্চল
এবং ২৮
দশমিক ৩০
লাখ হেক্টরের
বিশাল প্লাবনভূমি।
গত তিন
দশকে বাংলাদেশে
মাছের উৎপাদন
বেড়ে হয়েছে
প্রায় ২৫
গুণ। জাতিসংঘের
খাদ্য ও
কৃষি সংস্থা
মাছ নিয়ে
তাদের ‘দ্য
স্টেট অব
ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ
অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার
২০২০’ শিরোনামে
প্রকাশিত বৈশ্বিক
প্রতিবেদনে বলেছে,
স্বাদু পানির
উন্মুক্ত জলাশয়
থেকে মাছ
আহরণে বাংলাদেশের
অবস্থান বিশ্বে
তৃতীয়। দেশে
উৎপাদিত মাছের
৭৫ শতাংশ
এখন বাজারজাত
করছেন মত্স্যচাষীরা।
এছাড়া কৃত্রিম
প্রজননের মাধ্যমে
পোনা উৎপাদন
ও চাষাবাদ
পদ্ধতি উদ্ভাবন
করে ফিরিয়ে
আনা হয়েছে
২৪ প্রজাতির
বিলুপ্তপ্রায় দেশী
মাছ। সব
মিলিয়ে স্বাধীনতার
৫০ বছরে
মাছ উৎপাদনে
রেকর্ড সৃষ্টি
করছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ এখন
মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
বর্তমান বিশ্বে
মাছ উৎপাদনে
বাংলাদেশের অবস্থান
চতুর্থ। বিশ্ব
খাদ্য সংস্থা
পূর্বাভাস দিয়েছে,
২০২২ সাল
নাগাদ বিশ্বের
যে চারটি
দেশ মাছ
চাষে বিপুল
সাফল্য অর্জন
করবে এর
মধ্যে বাংলাদেশ
অন্যতম। তাছাড়া
গবেষণার মাধ্যমে
হারিয়ে যাওয়া
অনেক প্রজাতির
মাছ এখন
চাষ করা
হচ্ছে। হারিয়ে
যাওয়া মাছ
চাষ হচ্ছে
সরকারি-বেসরকারিভাবেও।
এছাড়া মা-ইলিশ
ও জাটকা
রক্ষায় সরকার
ব্যাপক কর্মসূচি
গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ এখন
ইলিশ উৎপাদনে
বিশ্বে রোল
মডেল। বিশ্বে
ইলিশ উৎপাদনকারী
১১টি দেশের
মধ্যে একমাত্র
বাংলাদেশেই ইলিশ
উৎপাদন বেড়েছে;
বর্তমানে ১২৫টি
উপজেলার নদ-নদীতে
ইলিশ পাওয়া
যাচ্ছে। বাংলাদেশ
মত্স্য গবেষণা
ইনস্টিটিউটের গবেষণালব্ধ
তথ্যের ভিত্তিতে
২০০৮-২০০৯
সালে দেশে
ইলিশের উৎপাদন
ছিল ২
লাখ ৯২
হাজার টন,
যা বৃদ্ধি
পেয়ে ২০১৮-১৯
সালে ৫
লাখ ৩৩
হাজার টনে
উন্নীত হয়েছে।
অর্থাৎ গত
১২ বছরে
ইলিশের উৎপাদন
বেড়েছে প্রায়
৮৩ শতাংশ।
এছাড়া গত
২০১৬ সালে
ইলিশ বাংলাদেশের
ভৌগোলিক নির্দেশক
(জিআই) পণ্য
হিসেবে স্বীকৃতি
পেয়েছে। ইলিশের
স্বত্ব এখন
শুধুই বাংলাদেশের।
এটা জাতির
জন্য গৌরবের।
বর্তমান সরকারের
নানামুখী কর্মকাণ্ড
ও বেকারত্ব
নিরসনে মত্স্য
খাত বড়
ধরনের ভূমিকা
রাখবে। বর্তমানে
মাছ চাষ
ও ব্যবসায়
দুই কোটির
কাছাকাছি মানুষ
যুক্ত।
বিশ্বজুড়ে মানুষের
মাছ খাওয়া
বেড়েছে ১২২
শতাংশ। বর্তমানে
বিশ্বের সাতটি
দেশের মানুষের
প্রাণিজ আমিষের
অর্ধেকের বেশি
আসে মাছ
থেকে। বাংলাদেশে
প্রাণিজ আমিষের
শতকরা ৫৮
শতাংশ আসে
মাছ থেকে।
আর বিশ্বে
গড়ে প্রাণিজ
আমিষের শতকরা
২০ শতাংশ
আসে কেবল
মাছ থেকে।
এদিকে গত
১০ বছরে
দেশে মাথাপিছু
মাছ খাওয়ার
পরিমাণ প্রায়
শতভাগ বেড়েছে।
২০১০ সালের
সর্বশেষ খানা
জরিপে উঠে
এসেছে—বছরে
বাংলাদেশে একেকজন
মানুষ প্রায়
১২ কেজি
মাছ খেত।
এখন সেটা
৩০ কেজিতে
পৌঁছেছে। দেশের
জিডিপিতে কৃষির
অবদান ১৩
দশমিক ৩৫
শতাংশ। জিডিপিতে
কৃষির অবদান
কমলেও মত্স্য
উপখাতের অবদান
কিছুটা বেড়েছে।
মোট জিডিপিতে
মত্স্য উপখাতের
অবদান ২০১৬-১৭
সালে ছিল
৩ দশমিক
৬১ শতাংশ।
তা কিছুটা
কমে ২০১৭-১৮
অর্থবছরে ৩
দশমিক ৫৬
শতাংশ এবং
২০১৮-১৯
অর্থবছরে ৩
দশমিক ৪৯
শতাংশে দাঁড়ায়।
তবে গত
অর্থবছরে মত্স্য
উপখাতের অবদান
কিছুটা বেড়ে
৩ দশমিক
৫২ শতাংশে
উন্নীত হয়েছে।
২০১৯-২০
অর্থবছরে টাকার
অংকে মত্স্য
উপখাত থেকে
জিডিপিতে যুক্ত
হয়েছে ৮২
হাজার ৪৫৬
কোটি টাকা,
যা ২০১৮-১৯
অর্থবছরে ছিল
৭৪ হাজার
২৭৪ কোটি
টাকা। এই
খাতের প্রবৃদ্ধি
ছিল ৬
দশমিক ১০
শতাংশ।
বাংলাদেশে সামুদ্রিক
মত্স্য উৎপাদন
মূলত আহরণনির্ভর।
উপকূলব্যাপী ৭১০
কিলোমিটার দীর্ঘ
তটরেখা থেকে
২০০ নটিক্যাল
মাইল পর্যন্ত
১ দশমিক
৬৬ লাখ
বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত
বিশাল সামুদ্রিক
মত্স্যসম্পদ উন্নয়নের
সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক
জলসম্পদে ৩৬
প্রজাতির চিংড়ি
এবং ৪৭৫
প্রজাতির মাছ
রয়েছে। বর্তমানে
বঙ্গোপসাগর থেকে
ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রল
ফিশিং ও
আর্টিসেনাল মত্স্য
আহরণের মাধ্যমে
মোট ৪
দশমিক ৩৯
লাখ টন
মত্স্য আহরণ
করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ মত্স্যসম্পদের
মতো সামুদ্রিক
মত্স্যসম্পদের ক্ষেত্রেও
উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মত্স্যজীবীর
কর্মসংস্থানের সুযোগ
সৃষ্টি হয়েছে।
যান্ত্রিক ও
অযান্ত্রিক নৌযানে
মত্স্য আহরণে
নিয়োজিত প্রায়
২ দশমিক
৭০ লাখ
মত্স্যজীবীর পরিবারের
ন্যূনতম ১৩
দশমিক ৫০
লাখ মানুষের
জীবিকা নির্বাহ
হচ্ছে উপকূলীয়
সামুদ্রিক মত্স্যসম্পদের
মাধ্যমে।
আমাদের মাছের
মোট উৎপাদনের
শতকরা ১৬
ভাগ (৬
দশমিক ৫৯
লাখ টন)
সামুদ্রিক মাছের
অবদান। বর্তমান
সরকারের মাননীয়
প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী
ও প্রাজ্ঞ
নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক
আদালতের মাধ্যমে
বঙ্গোপসাগরে ১
লাখ ১৮
হাজার ৮১৩
বর্গকিলোমিটার এলাকায়
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব
প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়
সমুদ্রে স্থায়িত্বশীল
মত্স্য আহরণের
নতুন সুযোগ
তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সামুদ্রিক
মাছের অবাধ
প্রজনন, সংরক্ষণ
ও উৎপাদন
বৃদ্ধির জন্য
২০১৫ সাল
থেকে সমুদ্রে
বছরে ২০
মে থেকে
২৩ জুলাই
পর্যন্ত সব
ধরনের মাছ
ধরা নিষিদ্ধ
করা হয়েছে।
ফলে সমুদ্রে
মাছের উৎপাদন
বৃদ্ধি পেয়েছে
১২-১৫
শতাংশ। সমুদ্রের
মত্স্যসম্পদের মজুদ
নিরূপণ ও
উন্নয়নের লক্ষ্যে
মত্স্য অধিদপ্তরের
আওতায় বিভিন্ন
প্রকল্প গ্রহণ
করা হয়েছে।
ফলে সামগ্রিকভাবে
দেশে মাছের
উৎপাদন বৃদ্ধিসহ
সামুদ্রিক মাছের
জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত
হবে।
ইলিশ উৎপাদনে
বাংলাদেশ এখন
বিশ্বে রোল
মডেল। বিশ্বে
ইলিশ উৎপাদনকারী
১১টি দেশের
মধ্যে একমাত্র
বাংলাদেশেই ইলিশ
উৎপাদন বেড়েছে,
বর্তমানে ১২৫টি
উপজেলার নদ-নদীতে
ইলিশ পাওয়া
যাচ্ছে। বাংলাদেশ
মত্স্য গবেষণা
ইনস্টিটিউটের গবেষণালব্ধ
তথ্যের ভিত্তিতে
ইলিশ ব্যবস্থাপনা
কৌশল মত্স্য
ও প্রাণিসম্পদ
মন্ত্রণালয়ের সরাসরি
তত্ত্বাবধানে মত্স্য
অধিদপ্তর, প্রশাসন,
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ
ও বিভিন্ন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী এবং
প্রতিরক্ষা বাহিনী
কর্তৃক সঠিকভাবে
বাস্তবায়ন করায়
সাম্প্রতিক কালে
দেশে ইলিশের
বিস্তৃতি ও
উৎপাদন বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী
২০০৮-২০০৯
সালে দেশে
ইলিশের উৎপাদন
ছিল ২
লাখ ৯২
হাজার টন,
যা বেড়ে
২০১৮-১৯
সালে ৫
লাখ ৩৩
হাজার টনে
উন্নীত হয়েছে।
অর্থাৎ গত
১২ বছরে
ইলিশের উৎপাদন
বেড়েছে প্রায়
৮৩ শতাংশ।
গত ২০১৬
সালে ইলিশ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক
নির্দেশক (জিআই)
পণ্য হিসেবে
স্বীকৃতি পেয়েছে।
ইলিশের স্বত্ব
এখন শুধুই
বাংলাদেশের। এটা
জাতির জন্য
গৌরবের।
প্রচলিত মত্স্য প্রজাতির পাশাপাশি বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন অপ্রচলিত মত্স্যসম্পদ যেমন কুঁচিয়া, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, সি-উইড, ওয়েস্টার ইত্যাদি সংরক্ষণ ও চাষাবাদ কৌশল উন্নয়নে বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। আমাদের খাদ্যতালিকায় এসব অপ্রচলিত প্রজাতি না থাকলেও বিদেশে এদের প্রচুর চাহিদা ও বাজারমূল্য রয়েছে। এসব পণ্য বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। গবেষণায় কক্সবাজার উপকূলে এ পর্যন্ত ১৩৮ প্রজাতির সি-উইডের সন্ধান পাওয়া গেছে; এর মধ্যে ১৮ প্রজাতির সি-উইড বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন। অতঃপর, বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন তিন প্রজাতির (Sargassum oligocystum, Caularpa racemosa I Hypnea spp.) সি-উইডের চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত সি-উইড চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য এরই মধ্যে মত্স্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সি-উইড অদূর-ভবিষ্যতে একটি অন্যতম রফতানিপণ্য হিসেবে সুনীল অর্থনীতিতে অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে ভেটকি, চিত্রা ও দাতিনা মাছ এবং হরিণা ও চাকা চিংড়ির প্রজনন ও চাষাবাদের ওপর গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে এসপিএফ পোনা উৎপাদন জোরদার করা হয়েছে। চাষীদের উত্তম চাষ ব্যবস্থাপনার আওতায় চিংড়ির ক্লাস্টার ফার্মিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান
জনগোষ্ঠীর পুষ্টি
চাহিদা পূরণের
লক্ষ্যে মাছের
উৎপাদন বৃদ্ধির
বর্তমান ধারা
অব্যাহত রাখতে
৩৯ লাখ
হেক্টরের অভ্যন্তরীণ
উন্মুক্ত জলাশয়
যেমন নদ-নদী,
প্লাবনভূমি, হাওর-বাঁওড়
ও বিলকে
বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ
ব্যবস্থাপনার আওতায়
আনতে হবে।
মত্স্য অধিদপ্তরের
আওতায় হাওরের
মত্স্যসম্পদ উন্নয়নে
সম্প্রতি একটি
উন্নয়ন প্রকল্প
একনেক কর্তৃক
অনুমোদিত হয়েছে।
প্রকৃত মত্স্যজীবী/জেলেদের
প্রাপ্য অধিকার
নিশ্চিতের লক্ষ্যে
মত্স্য অধিদপ্তর
কর্তৃক এরই
মধ্যে ১৬
লাখ ২০
হাজার মত্স্যজীবী/জেলেদের
নিবন্ধন সম্পন্ন
করা হয়েছে
এবং ১৪
লাখ ২০
হাজার জেলের
মাঝে পরিচয়পত্র
বিতরণ করা
হয়েছে। জেলেদের
জীবনমান উন্নয়নে
সরকারের তরফ
থেকে বিভিন্ন
সামাজিক নিরাপত্তা
কর্মসূচি গ্রহণ
করা হয়েছে।
এ বছর
ইলিশসহ সব
ধরনের মাছ
ধরা নিষিদ্ধকালীন
ভিজিএফ সহায়তার
আওতায় দেশের
মোট ৩৬টি
জেলার ১৫২
উপজেলার ৫
লাখ ২৮
হাজার ৩৪২টি
পরিবারকে ২০
কেজি হারে
মোট ১০,৫৬৬.৮৪
টন চাল
দেয়া হয়েছে।
তাছাড়া করোনাকালে
চাষীদের জন্য
বিশেষ প্রণোদনা
দেয়া হচ্ছে।
মাছের উৎপাদন
বৃদ্ধির পাশাপাশি
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা
এবং প্রতিযোগিতামূলক
আন্তর্জাতিক বাজারে
টিকে থাকার
লক্ষ্যে বাংলাদেশ
বর্তমানে ৫০টি
দেশে চিংড়ি
ও মত্স্যপণ্য
রফতানি করছে।
বৈশ্বিক আর্থিক
মন্দা থাকা
সত্ত্বেও ২০১৯-২০
অর্থবছরে প্রায়
৭১ হাজার
টন মত্স্য
ও মত্স্যজাত
পণ্য রফতানি
করে দেশে
৩ হাজার
৯৮৫ কোটি
টাকার বৈদেশিক
মুদ্রা অর্জিত
হয়েছে। মানসম্মত
মত্স্য ও
মত্স্যপণ্য রফতানির
জন্য মত্স্য
অধিদপ্তরের আওতায়
ঢাকা, চট্টগ্রাম
ও খুলনায়
আন্তর্জাতিক মানের
তিনটি মান
নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার
প্রতিষ্ঠা করা
হয়েছে।
দৈনন্দিন জীবনে
মানুষের ব্যস্ততা
বাড়ায় এবং
নারী কর্মজীবীদের
সংখ্যা বৃদ্ধি
পাওয়ায় সরাসরি
খাওয়ার উপযোগী
কিংবা স্বল্প
পরিশ্রমে খাবার
উপযোগী মানসম্মত
মূল্য সংযোজিত
মত্স্যপণ্য উৎপাদন
এখন সময়ের
দাবি। অন্যদিকে
চাষীরা সাম্প্রতিক
কালে প্রায়ই
বলেন, তারা
মাছের ভালো
মূল্য পাচ্ছেন
না। এ
অবস্থা থেকে
উত্তরণের লক্ষ্যেও
আমাদের মাছ
থেকে মূল্য
সংযোজিত তৈরি
করতে হবে।
এতে চাষীরা
আর্থিকভাবে অধিক
লাভবান হবেন।
মাছের উৎপাদন
বৃদ্ধির ক্ষেত্রে
আমাদের যেমন
আত্মতৃপ্তির সুযোগ
আছে, ঠিক
তেমনি আমাদের
সামনে রয়েছে
বড় কয়েকটি
চ্যালেঞ্জ। এর
অন্যতম প্রধান
চ্যালেঞ্জ হচ্ছে
জলবায়ু পরিবর্তন
ও মাছের
আবাসস্থলের অবক্ষয়।
তাছাড়া দেশে
মাছের চাষাবাদ
বৃদ্ধি পাওয়ায়
আমাদের আরেকটি
প্রধান চ্যালেঞ্জ
হচ্ছে চাষাবাদে
মানসম্পন্ন উন্নত
জাতের মাছের
পোনা এবং
স্বল্পমূল্যের মত্স্য
খাবার সরবরাহ
নিশ্চিত করা।
এজন্য দেশের
৯ শতাধিক
হ্যাচারিতে ভালো
মানের পোনা
উৎপাদনের জন্য
উন্নত জাতের
ব্রুড মাছের
ব্যবহার নিশ্চিত
করতে হবে।
বাঁচাতে হবে
আমাদের হালদা
নদীকে, যেখানে
রুইজাতীয় মাছ
প্রাকৃতিকভাবে ডিম
ছাড়ে। আনন্দের
বিষয়, বাংলাদেশ
মত্স্য গবেষণা
ইনস্টিটিউটের প্রস্তাবের
পরিপ্রেক্ষিতে মুজিব
বর্ষ উপলক্ষে
জাতীয় উদযাপন
কমিটি কর্তৃক
হালদা নদীকে
‘বঙ্গবন্ধু
মত্স্য হ্যারিটেজ’
ঘোষণা করা
হয়েছে। এতে
হালদা নদী
জাতীয়ভাবে বিশেষ
গুরুত্ব ও
মর্যাদা পাবে,
সুরক্ষিত হবে
হালদা নদীর
পরিবেশ ও
নিষিক্ত ডিম।
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট





