সবুজ বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নতুন ধরনের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবাদে একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বেড়েছে, অন্যদিকে নতুন উৎপাদন কৌশল ব্যয়ও বাড়িয়েছে। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের পুঁজিনির্ভরতাও তাই সনাতন কৃষি ব্যবস্থার তুলনায় বহুলাংশে বেড়েছে। কৃষি উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখতে সে কারণেই কৃষি খাতে ঋণের গুর’ত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ঋণ উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখলেও কৃষকের বোঝা হালকা করেনি।

ঋণ পরিশোধের জন্য নীতিমালায় যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিতান্তই কঠোর ও  কৃষকবান্ধব নয়। বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনে গৃহীত ঋণ পরিশোধের সময়কাল অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফসল সংগ্রহ পরবর্তী দুই থেকে চার মাস ধার্য করা হয়েছে।  যেমন স্থানীয় বোনা আমনের সংগ্রহকাল ৯ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর। অথচ এ ধান উৎপাদনের জন্য ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণ পরিশোধের স্বাভাবিক সময়সীমা ধরা হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ ফসল কাটার পর পরই তার উৎপাদিত ধান বিক্রি করে দিতে হয়। অথচ এ সময়ে ধানের সরবরাহধ্যিক্যের কারণে বাজারে ধানের দাম থাকে কম। প্রত্যাশিত দামের চেয়ে কম পেলেও ঋণ পরিশোধজনিত চাপের কারণে কৃষককে তাড়াহুড়ার করে ধান বিক্রি করতে হয়। এতে কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। এখন থেকে মুক্তি পেতে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলে কৃষক পণ্যের যৌক্তিক দাম পেতে কিছুদিন পণ্য ধরেও রাখতে পারবে।

মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১৪ শতাংশ (প্রায়) হলেও এটি আজও গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলে স্বীকৃত। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এবং ৮৫ শতাংশ মানুষ জীবন-জীবিকা ও কর্মসংস্থান বিবেচনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত। দেশীয় জনগোষ্ঠীর বিশালসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের স্বার্থে তাই কৃষি খাত বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

উৎপাদন পরিস্থিতি ও কৃষকের চাহিদার তুলনায় কৃষি ঋণ বিতরণের পরিমাণও কম। কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, যথা বাংলাদেশে কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাবে) এবং ছয়টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এছাড়া আটটি বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ৩৮টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এ খাতে ঋণ বিতরণ করছে। এছাড়া  বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেড নিজস্ব অর্থায়নে কৃষিঋণ বিতরণ করে থাকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা (২২৭.৫০ বিলিয়ন টাকা)। একই সময়ে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অভ্যন্তরীণ ঋণ সরবরাহের মোট পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৯৪৩ দশমিক ১ বিলিয়ন টাকা। সুতরাং ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ হয়েছে, যা নিতান্তই অপ্রতুল।

কৃষিঋণ বিতরণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্ব বাড়াতে গ্রামীণ যেসব এলাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা নেই, সেখানে ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্বের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন এনজিও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষে কৃষিঋণ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পারছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে  এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও কৃষিঋণ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব ব্যবস্থা কৃষি ঋণের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে বটে, তবে তা খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

গত পাঁচ বছরের কৃষিঋণ বিতরণের সাম্প্রতিক ধারা লক্ষ করলে দেখা যায়, ২০২০ সাল ব্যতীত প্রতি অর্থবছরে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত বিতরণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ঋণ বিতরণের প্রকৃত অংকের বৃদ্ধি যৎসামান্য বলতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিল রেখে কৃষি খাতে ঋণের সরবরাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় হওয়া উচিত। কৃষির উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে ঋণের প্রবৃদ্ধিও হতে হবে উচ্চ হারে।                           

কৃষকে জোগানো ঋণের বেশিরভাগই স্বল্পমেয়াদী। জমির উন্নয়ন বা আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার মতো দীর্ঘমেয়াদে ঋণ প্রদানের গতি সন্তোষজনক নয়। মেয়াদভিত্তিক ঋণ বিতরণের ধারাটি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে কৃষি খাতে বিতরণকৃত ঋণের সিংহভাগই স্বল্পমেয়াদি। গত পাঁচ বছরের মোট বিতরণকৃত কৃষিঋণে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের হার কখনই ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি হয়নি। আবার দীর্ঘমেয়াদি কৃষিঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি কখনো কখনো হয়েছে ঋণাত্মক। মূলধনি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ও উদ্ভাবনী নতুন কৃষি উদ্যোগগুলো অর্থায়নে দীর্ঘমেযাদি ঋণের সংস্থান অতি প্রয়োজনীয় এবং বিষয়টি লক্ষ্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি কৃষিঋণের সরবরাহ বাড়ানো উচিত।

কৃষি ঋণের জন্য কৃষক বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপরই নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে মোট বিতরণকৃত কৃষিঋণের ৫০ শতাংশেরও বেশি ঋণের জোগান দিচ্ছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। তবে একক উৎস হিসেবে বাংলাদেশ কৃষিব্যাংক (বিকেবি) অনেক বছর ধরেই সর্বাধিক পরিমাণ কৃষিঋণ বিতরণ করে আসছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট বিতরণকৃত কৃষিঋণের ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশই বিকেবি  থেকে এসেছে। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণে অবদান মোটামুটিভাবে একই পর্যায়ে স্থির রয়েছে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেহেতু ঋণের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করে, কৃষিঋণ বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে তাদের আরো ব্যাপক আকারে ও ফলপ্রসূভাবে অবদান রাখার সুযোগ আছে।

কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচির (২০১৯-২০) উল্লেখযোগ্য দিক

কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালার মাধ্যমে শস্য, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের পাশাপাশি কৃষি সহায়ক খাতগুলোর ঋণের  প্রবাহের মাধ্যমে উৎপাদনে গতিশীলতা অব্যাহত রাখার পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তাতে কতটা সুফল মিলছে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণার দাবি রাখে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রণীত কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিম্নরূপ:

১. করোনোকালীন সংকট বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি খাতের ঋণে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদহার ধার্য করে। ত্বরিতভাবে গৃহীত এ উদ্যোগ যথেষ্ট প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে। ২. সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ব্যাংকের নিজস্ব শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে কমিয়ে আনা গেলে কৃষক পর্যায়ে স্বল্প খরচে কৃষিঋণ বিতরণ করা যাবে। ৩. আমদানিনির্ভরতা কমাতে ডাল, তৈলবীজ, ভুট্টা ও মসলাজাতীয় ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদ হারে কৃষিঋণ বিতরণের উদ্যোগ বেশ প্রশংসনীয়। একইভাবে কৃষি খাতে অন্যান্য নতুন উদ্যোগ উৎসাহিতকরণে এ ধরনের প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ খাদ্যনিরাপত্তা বিধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ৪. পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতি কৃষকদের জন্য ৫ শতাংশ সুদহারে কৃষিঋণ বিতরণের উদ্যোগটিও প্রশংসার দাবি রাখে। তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাবে ২১ হাজার ৭১৭ জন উপজাতি কৃষকের মধ্যে গড়ে বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৩৩ হাজার ৫৬৪ টাকা, যা জাতীয় পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিতরণকৃত গড় ঋণের (৬০৮১৩ টাকা) তুলনায় কম। পার্বত্য অঞ্চলে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য নিরসনে মনোযোগী হওয়া উচিত। ৫. কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও তফসিলি ব্যাংকগুলোয় মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ সম্পর্কিত বিধানটি বেশ অভিনব ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ। ঋণ বিতরণে এ ধরনের সুবিধা কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সহজ ও ত্বরান্বিত করেছে।

কৃষিঋণ: সমস্যার স্বরূপ

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৪ জনের মধ্যে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৬১৬ দশমিক ২৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাথাপিছু হারে বিতরণকৃত কৃষিঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ৬০ হাজার ৮১৩ টাকা। মাথাপিছু ২ হাজার ২২৭ ডলার অর্জন করা মধ্যম আয়ের দেশে কৃষিঋণের এ হার যথেষ্ট কম, বিশেষত যেখানে খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত। চাহিদার তুলনায় কৃষিঋণের অপ্রতুলতার বিষয়টি ২০০৬ সালে সরকার ও অন্যদের পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে। কৃষিঋণের এ স্বল্প হার একই সঙ্গে বড় ধরনের কৃষি উদ্যোগে পর্যাপ্ত ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে জটিলতার খানিকটা স্পষ্ট করে তোলে বৈকি।

বর্তমানে বেসরকারি ও বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট ও অগ্রিমের ন্যূনতম ২ দশমিক ৫ শতাংশ কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয়। কৃষি খাতে ঋণের বরাদ্দের এ হার আরো বৃদ্ধি করলে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপ্রাপ্তি আরো সহজ হবে। কৃষির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ধাপে ধাপে কৃষি ঋণ বিতরণের হার আরো বাড়াতে হবে।

ঋণগ্রহীতা কৃষকদের একটা বড় অংশই ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকের দীর্ঘসূত্রতাকে সমস্যা বলে মনে করেন। ২০০৬ সালে রহুল আমীন সরকার পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৯০ শতাংশ কৃষকই ব্যাংকের দীর্ঘসূত্রতাকে ঋণপ্রাপ্তিতে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখেন। এক্ষেত্রে কৃষিকাজ ঋতুনির্ভর হওয়ায় যথাসময়ে ঋণ ছাড়করণের বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনোযোগী হতে হবে। এছাড়া ব্যাংকের পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবও ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে ৭৪ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক উল্লেখ করেন। কিছু ক্ষেত্রে ঋণগ্রহণের শর্তাবলি ও অন্যান্য কাগজের আনুষ্ঠানিকতা নিরক্ষর ও অর্ধশিক্ষিত কৃষকদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়। জটিলতা কমিয়ে কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ আরো সহজপ্রাপ্য করে তোলা যায়, তার পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম শহরে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা সহজে ও সুলভে ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ পেতে বঞ্চিত হন। এর সমাধান প্রয়োজন। আনুষ্ঠানিক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রহীতা কৃষককে জামানত প্রদর্শন করতে হয়। গ্রহণযোগ্য জামানত হিসেবে কৃষকের জমি বা আর্থসামাজিক অবস্থান বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রান্তিক ও ছোট কৃষকের জন্য কৃষিঋণ প্রাপ্তি কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা বেশি সুদে অনানুষ্ঠানিক ঋণ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এনজিওগুলোর বিষয়ে কৃষিঋণ বিতরণে অতিরিক্ত সুদ চার্জ করার অভিযোগ রয়েছে, যা নিরসনে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া তাদের সপ্তাহান্তে কিস্তি পরিশোধের নিয়ম বাস্তবতা বিবর্জিত, কেননা ঋণ গ্রহণের পর পরই প্রতি সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের থাকে না।

কৃষি ও পল্লীঋণ নীতি ও কর্মসূচির আওতায় বিতরণকৃত ঋণে ধার্যকৃত সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ। ভোক্তা ঋণ বা শিল্প অথবা ব্যবসায় আরো কম সুদে ঋণ মিলছে এখন। কৃষি উৎপাদনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিশ্চয়তা ইত্যাদি বিষয় আমলে নিয়ে সুদহার পুনর্বিবেচনার করা প্রয়োজন। কৃষি ও পল্লীঋণের কিছু খাত-উপখাতে ঋণের সুদ নির্ধারণের স্বাধীনতা ব্যাংকগুলোর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এ স্বাধীনতার সুবাদে ব্যাংকগুলো এ খাতে অতিরিক্ত সুদহার যেন আরোপ না করতে পারে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরো বাড়ানো দরকার।

সমস্যা সমাধানে করণীয়

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখনো কৃষি খাতের ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। খাদ্যনিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের বিশাল উৎস হিসেবে এ খাতের উন্নয়নে দায়ীত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে যত্নবান ও মনোযোগী হতে হবে। বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম শহরকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে গ্রামাঞ্চলে কৃষিঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংক (ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান) এমএফআই পার্টনারশিপের সুযোগ রাখা হয়েছে। তৃতীয় পক্ষের অন্তর্ভুক্তির কারণে কৃষক পর্যায়ে এ ধরনের ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার বেড়ে যায় অনেকাংশেই। বিষয়টি লক্ষ রেখে কম খরচে ঋণ বিতরণের স্বার্থে কৃষক ও ব্যাংকের মধ্যে সরাসরি লেনদেন উৎসাহিত করা উচিত। গ্রামাঞ্চলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শাখা খোলার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংক ব্যবস্থা এ সমস্যা নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষি খাতে মেয়াদি ঋণের বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। মেয়াদি ঋণ নতুন ধরনের কৃষি উদ্যোগ ও পুঁজিনির্ভর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিঋণের সীমা যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা উচিত। কৃষিঋণের মাধ্যমে খামার ও সমবায়ের মতো উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। কৃষিঋণ সম্পর্কে কৃষকদের জানাতে পর্যাপ্ত প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিঋণের কিস্তির সংখ্যা ও পরিশোধের সময় নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অর্পণ করা হয়েছে (কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা ও কর্মসূত্র, ২১৯-২০)। এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী মহলের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও শিথিল নজরদারির সুযোগে কৃষিঋণ গ্রহীতাদের অনেকেই অকৃষি খাতে ঋণের ব্যবহার করে থাকেন । কৃষিঋণের এ ধরনের অননুমোদিত ব্যবহার ঠেকাতে সুষ্ঠু কৃষিঋণের কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সে সম্পর্কিত নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কৃষিতে নতুন উদ্যোগ উৎসাহিত করতে নতুন ধরনের ফল বা ফসল চাষে ঋণদানের প্রতিবিধান রাখা উচিত। বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কৃষি অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিত প্রোগ্রামের মাধ্যমে এ ধরনের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব।

কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের উল্লিখিত খাত-উপখাতে ফসল সংগ্রহ, প্রক্রয়াজাত, সংরক্ষণ ও বাজারজাতে কোনো ঋণ বিতরণের সুযোগ রাখা হয়নি। ফসলের উৎপাদনের পর পরই ঋণ আদায়ে অতিরিক্ত জোর না দিয়ে কৃষক যাতে গ্রহণযোগ্য/সন্তোষজনক হারে মুনাফা অর্জন করতে পারেন এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড পরবর্তী বছরগুলোয়ও চালিয়ে যেতে পারেন, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। 

 

মো. আলাউদ্দিন: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়