গত এক দশকে দেশের ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজারে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রতি বছরই গড়ে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে এ শিল্পে। মাঝে কভিড, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের প্রভাবে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের কারণে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে যায় খাতটি। তবে সেখান থেকে বর্তমানে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজার। এক সময় আমদানিনির্ভর এ খাত ভবিষ্যতে সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যে পরিণত হওয়ার স্বপ্নও দেখাচ্ছে। বাজার অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হটিয়ে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য বাড়ছে।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারে গত ১০ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালে এর আকার ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান, মাথাপিছু আয় ও শহরে মানুষের বসবাসের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারের ওপ প্রবৃদ্ধি নির্ভরশীল। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ, যা ২০২৫ সালে গিয়ে ৩ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। প্রতি বছর এ শ্রেণীতে গড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যোগ হচ্ছে। মূলত এ সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনায় করেই স্থানীয় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো ইলেকট্রনিকস খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি বাজার ধরে রাখতে বেশকিছু বিদেশী ব্র্যান্ডও বাংলাদেশে তাদের কারখানা স্থাপন করেছে। কভিডের অভিঘাতের কারণে দুই বছর কনজিউমার ডিউরেবলসের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, ডলার সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন ও ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার প্রভাব পড়েছে এ খাতের ব্যবসায়। এতে করে খাতটির প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ কিছুটা পিছিয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারেও প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেশ কয়েকটি নির্দেশকের ওপর দেশের কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজার নির্ভর করছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে এবং ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ২০২৩ সালে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৮ সালে এটি ৪ হাজার ১১১ ডলারে উন্নীত হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। মাথাপিছু আয় বাড়লে সেটি কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের ভোগ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের বড় জনসংখ্যার কারণেও এখানে একটি বড় বাজার তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশের প্রায় শতভাগ এলাকা বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে। ফলে গ্রামীণ অঞ্চলে ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। সরকারের দিক থেকে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা দেশে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে এসেছেন এবং আমদানিনির্ভরতা কমছে। ইলেকট্রো মার্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফসার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক দশক ধরেই ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পে উল্লেখযোগ্য হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মাঝে কভিড, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও ডলার সংকটের কারণে বাজার কিছুটা স্থবির হয়েছিল। তবে বর্তমানে এটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দেশে বর্তমানে ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজারের আকার ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী ১০ বছরে এটি ৭০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা মাথায় রেখে এ খাতের উদ্যোক্তারা তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করছেন। এতে করে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে। ইলেকট্রনিকস খাতের জন্য কর অব্যাহতির সুবিধা ২০২৪ সাল পর্যন্ত রয়েছে। এটিকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করা হোক।’ দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইলেকট্রনিকস খাতের কোম্পানি ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে ২০২২-২৩ হিসাব বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা থেকে আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফ্রিজার, রেফ্রিজারেটর ও কমপ্রেসারে ৪ হাজার ৩৩২ কোটি, এয়ার কন্ডিশনার ৬১৮ কোটি, টেলিভিশন ৬০৭ কোটি, ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্স ৯২৭ কোটি এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্স থেকে ৩৪৯ কোটি টাকা আয় হয়েছে কোম্পানিটির।
ওয়ালটনের চিফ মার্কেটিং অফিসার দিদারুল আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে প্রযুক্তি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নতুন নতুন যে অটোমেশন প্রযুক্তি আছে সেগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে, এগুলোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও ফিচারের পণ্য উদ্ভাবন করতে হবে; সেজন্য গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাই অটোমেশন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে ওয়ালটন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বাধিক ফিচারসমৃদ্ধ নতুন নতুন উদ্ভাবনী পণ্য গ্রাহকের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হচ্ছে ওয়ালটন।
সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০২৩ হিসাব বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে হোম অ্যাপ্লায়েন্স ১ হাজার ২০১ কোটি ও কনজিউমার ইলেকট্রনিকস থেকে ৩৫৮ কোটি টাকা আয় হয়েছে কোম্পানিটির।
সিঙ্গার বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচালক মাসুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কভিডের সময় অন্যান্য খাতের মতো কনজিউমার ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কভিডের পরের বছর বাজার কিছুটা ঘুরেও দাঁড়িয়েছিল। তার পরের বছর রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পরে মূল্যস্ফীতি হঠাৎ করে বেড়ে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় করাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এতে কনজিউমার ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজারে কিছুটা ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াবে তখন এ শিল্পের প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। তাছাড়া দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এটিও ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের বিক্রি বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারে সবচেয়ে বিক্রীত পণ্যের তালিকায় রয়েছে রেফ্রিজারেটর। একটা সময় পর্যন্ত এ বাজারে বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে তা দেশী ব্র্যান্ডগুলোর দখলে চলে গেছে। দেশীয় কোম্পানিগুলোর কারণে বেশকিছু বিদেশী ব্র্যান্ড পণ্যের দাম কমিয়ে বাজার ধরে রাখতে বাংলাদেশে উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছে। বর্তমানে দেশের রেফ্রিজারেটর বাজারের আকার ১০ হাজার কোটি টাকার। এ বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। এছাড়া যমুনা, মাইওয়ান, কনকা ও মিনিস্টারের মতো দেশী ব্র্যান্ডগুলোও এ বাজারে জনপ্রিয়। পাশাপাশি শার্প, স্যামসাং, ওয়ার্লপুল, কেলভিনেটর, এলজি, হিটাচি ও হাইয়ারের মতো বিদেশী ব্র্যান্ডের রেফ্রিজারেটরও রয়েছে।
দেশের টেলিভিশনের বাজারের আকার বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। এছাড়া রÅvংগস, ভিশন, কনকা, মাইওয়ানের মতো স্থানীয় ব্র্যান্ডও জনপ্রিয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে সনি, স্যামসাং, সিঙ্গার, প্যানাসনিক, তোশিবা, ফিলিপস, এলজি ও স্যানিয়োর মতো বিদেশী ব্র্যান্ডের টেলিভিশনও বিক্রি হয়ে থাকে।
দেশে এয়ারকন্ডিশনারের বর্তমান বাজারের আকার ৭ হাজার কোটি টাকা। দেশের এসির বাজারে ওয়ালটন, বাটারফ্লাই, ভিশন, ট্রান্সটেক ও মিডিয়া উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনারেল, গ্রি, সিঙ্গার, প্যানাসনিক, দাইকিন, এলজি, স্যামসাং, শার্প, তোশিবা ও ওয়ার্লপুল উল্লেখযোগ্য।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যানুসারে দেশে বর্তমানে ২ হাজার কোটি টাকার হোম ও কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সের বাজার রয়েছে। সামনে এ বাজার আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়ালটন, যমুনা, কনকা, ভিশন, ইলেকট্রা ও ইকো প্লাস। বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে সিঙ্গার, স্যামসাং, ওয়ার্লপুল, শার্প, এলজি, হায়ার, মিয়াকো, সিবেক, প্যানাসনিক ও স্টিম ফাস্ট উল্লেখযোগ্য। দেশে বর্তমানে ফ্যান, এলইডি লাইট ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যাকসেসরিজের ১৫ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। এ খাতে ওয়ালটন, এনার্জিপ্যাক, ট্রান্সকমসহ আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদন করছে। এছাড়া আমদানির মাধ্যমেও এসব পণ্যের চাহিদা মেটানো হয়।
ঈদ উৎসব এলেই দেশজুড়ে ইলেকট্রনিকস হোম অ্যাপ্লায়েন্সের চাহিদা বাড়ে বিপুলভাবে। রোজার সময় এবং ঈদে গ্রাইন্ডার, জুসার, ব্লেন্ডার, মাইক্রোওয়েভ ওভেনসহ বিভিন্ন হোম অ্যাপ্লায়েন্সের প্রয়োজন বাড়ে। ঈদের কেনাকাটাতে যুক্ত হয়ে যায় এসব পণ্য। তাছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে ফ্রিজ, টিভি, এসিসহ ইলেকট্রনিকস পণ্যের চাহিদাও বাড়ে। এখন দেশী পণ্যই ঈদ উৎসবে এ চাহিদা পূরণ করছে।





