আসছে ঈদুল ফিতর। এ উপলক্ষে হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের চাহিদা বাড়বে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, এলইডি টিভি, ব্লেন্ডারসহ নানা ধরনের পণ্য। রেফ্রিজারেটরের বাজারে দেশের ক্রেতাদের পছন্দের ব্র্যান্ড ওয়ালটন। ক্রেতাদের পছন্দ, কোম্পানির প্রদানকৃত সুযোগ-সুবিধাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের চিফ বিজনেস আফিসার তোফায়েল আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম
যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনা দেখা যাচ্ছে। ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে এসবের প্রভাব পড়েছে কি?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে করোনা মহামারী থেকেই সারা বিশ্বের সরবরাহ চেইনে একটি পরিবর্তন আসে। একটি বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এর পরই আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সব মিলিয়ে ২০২২ সালটা আমাদের খারাপ যায়। যেসব কাঁচামাল আমরা আমদানি করি সেগুলো ঠিক সময়ে আসা নিয়ে এবং যে কোম্পানিগুলো থেকে আমরা পণ্য ক্রয় করি সেগুলো যে সঠিক সময়ে পাব এতেও একটি অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ২০২২ সালের শেষের দিকে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে আসে এবং ২০২৩ সালের শুরুতে অনেকটাই রিকভার হতে শুরু করে। তারপর ডলার সংকট, সরবরাহ চেইনে ঘাটতি দীর্ঘ সময় ধরে ছিল। কিছুটা সংকট তো ছিলই। ২০২৪ সালে এগুলো অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। এখন এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি না।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধি দেশের কোম্পানিগুলোকে কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যায় ফেলছে কি?
ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুইভাবে আমাদের ওপর প্রভাব পড়েছে। একটি হলো বেশি দামে পণ্যের কাঁচামাল ক্রয় করলে পণ্যের দামও বৃদ্ধি করতে হয়। এটি একটি বড় প্রভাব ফেলছে। পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। তার পরও লাভ কমিয়ে কীভাবে পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়, আমরা সেই চেষ্টাই করেছি। পণ্যের যেসব কাঁচামাল আমরা বিদেশ থেকে নিয়ে আসি সেগুলোর জন্য এলসি খুলতে হয়। এটা নিয়েও সমস্যা হয়েছিল। রিজার্ভ সংকট থাকায় ব্যাংকগুলোয়ও পর্যাপ্ত ডলার ছিল না। এসব কারণে অতীতে আমরা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের বর্তমান ম্যানেজমেন্ট ও ফাইন্যান্স বিভাগের কর্মপরিকল্পনার কারণে কখন কোন ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে আসতে হবে তার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বিষয়টি ওভারকাম করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি এখন ভালোভাবেই ম্যানেজ করতে পারছি।
দেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার মানি ভ্যালুতে কত হবে?
ইলেকট্রনিক পণ্য একসময় আমদানিনির্ভরই ছিল। সবকিছু মিলিয়ে এ পণ্যগুলোর অনেক দাম ছিল। মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। পরবর্তী সময়ে ওয়ালটনের উত্থান ও সরকারের নীতিসহায়তায় যখন বাংলাদেশী কিছু কোম্পানি এগিয়ে আসে তখন পণ্যের দামও কমে যায়। বর্তমানে দেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে বার্ষিক ১০ হাজার কোটি টাকার বাজার শুধু রেফ্রিজারেটরের। আর রেফ্রিজারেটরের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশের ওপরে মার্কেট শেয়ার ওয়ালটনের দখলে রয়েছে।
ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার বিকাশে সরকারি নীতিসহায়তা কেমন পাওয়া গেছে? বর্তমান পরিস্থিতিতে এ খাতের জন্য নতুন কোনো সহায়তা প্রয়োজন দেখছেন কি?
বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক শিল্পের দ্রুত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সরকারের নীতিসহায়তা। ওয়ালটনের শিল্পোদ্যোক্তারা সরকারের কাছ থেকে পাওয়া নীতিসহায়তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে বলেই দেশে ইলেকট্রনিক শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। ওয়ালটনসহ যেসব কোম্পানি এগিয়ে এসেছে, তাদের প্রচেষ্টার ফলে এ খাত একটি ভালো অবস্থানে যায়। এখন ৯০ ভাগের ওপরে দেশীয় পণ্য দিয়ে চলছে। আমদানিনির্ভরতা কম। তার পরও বৈশ্বিক যে চ্যালেঞ্জ সেটি প্রতিনিয়ত তার রূপ পরিবর্তন করে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নতুন নতুন যে অটোমেশন প্রযুক্তি আছে সেগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে, এগুলোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও ফিচারের পণ্য উদ্ভাবন করতে হবে, সেজন্য গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিসহায়তার পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে আমাদের আরো কিছু নীতিসহায়তার কথা জানানো হয়েছে। আশা করি, দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্পের টেকসই বিকাশে আগের মতোই সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা পাবে বিশাল সম্ভাবনাময় দেশীয় এ শিল্প খাত।
গত বছর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদায় বিরাট উল্লম্ফন দেখা গিয়েছিল। এ বছর পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? এসির বাজারে দেশী কোম্পানিগুলো কেমন করছে?
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশেও এ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। গত বছর গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কিনতে শুরু করে। একটা সময় দেখা গেছে তারা বাজারে এগুলো চাহিদামতো পায়নি। এসি তো শুধু কিনলেই হয় না, ইনস্টল করতে হয়, সেখানেও সংকট দেখা দিয়েছিল। এ বছরের আবহাওয়ার ফোরকাস্টে বোঝা যাচ্ছে গত বছরের মতোই চাহিদা থাকবে। আমাদের টিম সেভাবে একটি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আশা করছি, এ বছরও একটি ভালো প্রফিট আসবে।
ঈদ উপলক্ষে আপনারা এবার কী ধরনের ছাড় বা অফার রাখছেন ক্রেতাদের জন্য?
আমরা সবসময়ই অফার দিয়ে থাকি। এ বছরও ব্যতিক্রম নয়। ১ মার্চ ২০২৪ থেকে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছি ‘ডিজিটাল ক্যাম্পেইন সিজন ২০’। এখানে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে যারা আমাদের পণ্য কিনবে তাদের ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে সৌভাগ্যবানদের ১০ লাখ টাকা অফার করেছি। মিলিয়নেয়ার অফার। এটাতে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এ অফারের মাধ্যমে ৩০ জন মিলিয়নেয়ার হয়েছে। গত সপ্তাহে দুজন নতুন মিলিয়নেয়ার পেয়েছি। আমাদের এ ক্যাম্পেইনে ভালো সাড়া পাচ্ছি। পাশাপাশি ক্যাশ ব্যাক অফার, একটি কিনলে আরেকটি ফ্রি—এ রকম অনেক অফার প্রতি বছরই থাকে। এ বছরও রয়েছে।
আপনি বলেছেন রেফ্রিজারেটর বাজার ৭০ শতাংশের ওপরে ওয়ালটনের দখলে। একটি দেশীয় কোম্পানি হয়ে এত বড় বাজার এককভাবে ওয়ালটনের দখলে থাকার রহস্য কী? কোন কোন দিক থেকে এক্ষেত্রে ওয়ালটন অন্যদের থেকে আলাদা?
আমাদের নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্য আছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট টিম রয়েছে আমাদের। আমরা সবসময়ই চেষ্টা করি সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে। তাদের খাদ্যাভ্যাস, রুচি, স্থানীয় বাজারসহ অনেক কিছু বিবেচনায় নিয়ে আমরা পণ্য উৎপাদন করি। কত শতাংশ ভেজিটারিয়ান, তারা কী ধরনের পণ্য চায় সেসব গবেষণা করে আমরা প্রডাক্ট তৈরি করে বাজারে আনি। আমাদের সমুদ্রের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যেসব মানুষের বসবাস সেখানের আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে অন্যান্য দেশের জন্য যেসব পণ্য তৈরি হয় সেগুলো বেশিদিন টেকে না। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমরা কাজ করি। এছাড়া বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলেও ইলেকট্রিক পণ্যে নানা সমস্যা দেখা দেয়। সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে ডিজাইন ও ম্যাটেরিয়ালস সিলেকশনে পরিবর্তন নিয়ে আসি। এ জায়গায়ই আমাদের সফলতা। আমরা গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম। এছাড়া বর্তমানে কাস্টমাইজড ডিজাইনেও গ্রাহকদের পছন্দমতো পণ্য অর্ডার করতে পারে।





