প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস আসার আগেই শুরু হয়ে যায় বাহান্ন সালের ভাশা আন্দোলন নিয়ে স্রিতিচারন। চৌশট্টি বছর যাবত একই পৌনপুনিক অংক। আমরা শুনে আসছি একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে কি ঘটেছিলো? কে কোথায় ছিলেন, কার গায়ে লাঠি বা গুলি লেগেছিলো, কখন কেমন ভাবে শহিদ মিনারের কাজ শুরু হয়েছিলো, কারা গলার সোনা খুলে দিয়েছিলেন শহিদ মিনারের কাজের জন্য, কোথায় সর্বপ্রথম শহিদ মিনারের সুচনা হয়েছিলো, কে কে জেলে গিয়েছিলেন, এই সব কথা। এই কথাগুলো ইতিহাস সন্দেহ নেই। কিন্তু একটা বিশয় আমি বুঝতে পারিনা যে, ভাশা আন্দোলনে যাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের পরিচিতি সম্বন্ধে প্রজন্ম তেমন কিছুই জানে না কেনো? এই ইতিহাস তো তাদের জানতে হবে। বুঝতে হবে, সেই ভাশা চেতনা নিছক ভাশার মধ্যেই সিমাবদ্ধ ছিলো না। তার মধ্যে ছিলো বাঙলাভাশির অহংকারি অস্তিত্বের পরিচয়। ভাশিক সাতন্ত্রের উদ্ধত এবং শানিত চেতনা। ছিলো রাজনৈতিক সমতার প্ররাক্রম প্রকাশ। বাক সাধিনতার অনমনিয় দাবি। মাটি মায়ের প্রতি ভালোবাসার নিখাঁদ আনুগত্য। যার পবিত্র পরিনাম আজকের এই সাধিন সার্বভৌম বাঙলাদেশ এবং আরও পরে আন্তর্জাতিক মাত্রিভাশা দিবস।
প্রতি বছর আমরা শরন করি দেশের হিরক সন্তান বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার, মতিউরের নাম। ওঁদের আত্মত্যাগ আমাদের দেশের ইতিহাসে অনির্বান দিপশিখা। ওঁদের প্রানের বিনিময়ে বাঙলা ভাশাকে আমরা নতুন দ্রিশটিতে দেখতে শিখেছিলাম। মা, মাত্রিভাশা আর জন্মভুমিকে সমার্থক অর্থে ধারন করতে হয়, জেনেছিলাম। এসব ইতিহাস চিরস্মরনিয়। বার বার তা আলোচনার প্রয়োজন আছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রজন্মের অনেকেই জানে না যে, ১৯৪৮ সালেই এই ভাশা আন্দোলনের সুচনা হয়েছিলো। জিন্না সাহেবের এক ঘোশনা, ‘উর্দু, এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাশট্রভাশা’ আগুন জালিয়ে দিয়েছিলো বাঙলাভাশিদের অন্তরে। অচিরেই সেই আগুন দাউ দাউ করে জলে উঠেছিলো লক্ষ লক্ষ সচেতন বাঙলাভাশি মানুশের জাতিসত্তাগতো চেতনায়। প্রজন্মের কিছু অংশ এসব কথা জানেও না, বোঝেও না। তাদেরকে বোঝানোর দায় ছিলো বয়সিদের, মানে যাঁরা ভাশা আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা রেখেছিলেন তাঁদের। এই আমাদেরও। কেনো পারিনি সেটা করতে, সেই আত্মপ্রশ্নের কোনো জবাব নেই আমাদের সামনে।
বয়সিদের মুখে বার বার শুনি, ‘একুশের চেতনা’ শব্দটা। বাহান্ন শব্দটাই তো এখনও একাধিকভাবে উচ্চারন করি আমরা। কেউ বলেন, বায়ান্ন, কেউ বা বাউন্নো। যাক সে কথা। কি চেতনায় আমরা উদবুদ্ধ হয়েছিলাম বাহান্ন সালে, সেটাই কি কেউ বলতে বা বোঝাতে পেরেছি প্রজন্মের কাছে? এই চেতনা যে আমাদের আগামি সংগ্রামের বিপুল শক্তির বাতিঘর হয়ে উঠেছিলো, যার আলোতে আমারা সাধিকারের মশাল জালানোর সাহস এবং প্রেরনা পেয়েছিলাম, এসব গৌরবের কথা কি প্রজন্মের কাছে বার বার বলেছি আমরা? শুধু বয়সিরা জানলেই তো হবে না। জানাতে হবে প্রজন্মকে। জানানোর পদ্ধতিও বের করতে হবে। এমন কি, ভাশা আন্দোলন যে শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক ছিলো না, তা ছড়িয়ে পড়েছিলো ততকালিন সারা পুর্ব- বাঙলায়, এ বিশয়েও প্রজন্মের অনেকে জানে না ভালো করে। অনেকেরই ধারনা, আন্দোলনটা ছিলো একেবারেই ঢাকা কেন্দ্রিক।
তাছাড়া, বিশেশ করে ভাশা আন্দোলনে কতো মহিলা জড়িত ছিলেন, তাদের কি কি অবদান ছিলো এবং তাঁদের সংখ্যা কতো, সেটারও তথ্য পরিসংখ্যান নেই আমাদের কাছে। অন্তত আমি জানি না। পরে সচেতন ভাবে কিছু কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম।
তাও গবেশনার জন্য নয়, শুধুই নিজে জানার জন্য। আমার ধারনা ছিলো, গবেশকরাই তো সে কাজ করবেন। দিন অনেক পার হয়েছে, আমার সেই আশা পুরন হয়নি। গবেশক বলে যাঁরা খ্যাত, তাঁরা কাজটা না করে অপারগতার বিলাপে দায়মুক্তি নিয়েছেন। একটা কথা মানতে হবে, সবাই গবেশক হতে পারেন না। যেমন পারেন না সবাই বিজ্ঞানি হতে। তবু আমার দায় কিছু তো ছিলো, যেহেতু আমিও একদিন ভাশা সৈনিক পদক (বঙ্গমাতা পরিশদ থেকে) পেয়েছিলাম। তবে আমি বাঙলা ভাশা নিয়ে গবেশনা করি। ভাশা বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে ভালো করেই জানি, বাঙলা ভাশা নিয়ে কোনো অর্থপুর্ন গবেশনাই বলতে গেলে হয়নি এযাবত। গবেশনা লব্ধ নতুন কথা বলিও আমি নিরন্তর।
ভাশা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাঙলাদেশে যে রাজনৈতিক সচেতনতার উন্মেশ ঘটেছিলো, তার ফলে ক্রমে বদলে গিয়েছিলো আন্দোলনের শ্লোগান, সেটাও ইতিহাস অবশ্যই। প্রথমে যে শ্লোগান ছিলো ‘রাশট্র ভাশা বাঙলা চাই’, তা বদলে হলো ‘শিক্ষার মাধ্যম বাঙলা চাই, তারপর ‘সর্বস্তরে বাঙলা চাই’, এবং এখন ‘জিবনের সর্বস্তরে বাঙলা চাই’ হয়েছে। কিন্তু এই সাধিন বাঙলাদেশে কি দেখছি আমরা? রাশট্র ভাশার দাবি কেতাবি ভাবে মিটেছিলো ১৯৫৬ সালে। কিন্তু সেই দাবি প্রতিশঠিত হয়েছিলো কি? শিক্ষার মাধ্যম কি আজ পর্যন্ত বাঙলা হয়েছে? জিবনের সর্বস্তরে কি বাঙলা ভাশার ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে আজও? কেনো হয় নি? এই সব কথার উত্তর খুঁজতে হবে গবেশকদেরকে। তবে তো কাজের প্রশ্ন? বিশেশ করে ভাশা সৈনিকদের কাছে এই কাজটা আমানত রক্ষার দায়িত্বের মতো। কাজটা করতে বা করাতে হবে তাদেরকেই, নইলে একুশের চেতনা শব্দটা বলার কোনো মানে হয় না। আত্মপ্রবঞ্চনার মতো শোনায়। ভালো লাগে না আর সে বিলাপ শুনতে।
সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, ভাশা আন্দোলনের পেছনে ছিলো একটা অলিখিত রাজনৈতিক দর্শন। মনের গহনে মানচিত্রে পাওয়া নতুন ভৌগলিক পরিচয়ের বাঙলাদেশ নিয়ে একটা মনোরম সপ্ন। ভাশিক
সম্প্রিতি দিয়ে সাম্প্রদায়িক হিনমন্যতাকে উড়িয়ে দেয়ার একটা অঙ্গিকারও কাজ করেছে। দিজাতি তত্বের গ্লানিকে আন্তরিকভাবে নাকচ করার প্রয়াস তো ছিলোই মনে মনে। যদিও সফল হইনি আমরা। মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে অসাম্প্রদায়িক সৌহার্দ বজায় ছিলো ভাশিক আত্মিয় বন্ধনের জন্য, তা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাও আমরা দেখছি। মানে, সত্যিকার অর্থে বাঙলা ভাশাকে ভালোবাসার অভাবে আমাদের ভাশিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতি খুন্ন হয়েছে। বিপন্ন হয়েছে সম্পর্ক। দুই বাঙলার বাঙলাভাশা এখন জাতিতত্বের (এথনিক) ভিত্তিতে আলাদা বৈশিশটের স্পশটতা নিয়ে মন কশাকশি করে। অথচ বাঙলা ভাশায় হাজার হাজার আরবি ফারসি শব্দের ব্যাবহার প্রচলিত ছিলোই সেই কবে থেকে। এই প্রক্রিয়াটা যে একটা জিবন্ত ভাশার দারুন শক্তি, সেটা নিয়েও আমরা তেমন করে কথা বলি না। এমনই একুশের চেতনা আমাদের! কিন্তু বিশয়গুলো কি জানা প্রয়োজন না প্রজন্মের?
ভাশা আন্দোলন ছিলো মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল একটা ঘটনা। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় পর্বের ছাত্রছাত্রিদের প্রতিবাদ দিয়ে শুরু হলেও পরে তা ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষকসহ আমজনতার মধ্যে। বাঙলাভাশি- দের পুর্ন নৈতিক সমর্থন ছিলো এই আন্দোলনে। সেই সময় ঢাকায় যে সব মিছিল বের হতো, সমাবেশ হতো, সে সব ছবিতে দেখেছি অনেক মহিলার মুখ। কিন্তু বাস্তবে তাদের সাথে আমার কোনো পরিচয় হয় নি, দু একজন ছাড়া। আমি মফস্বলের মেয়ে, সেটাও কারন একটা। তো সেই দু একজনের কাছে জানতে চেয়ছি আর সব সাহসি সংগ্রামি মহিলাদের পরিচয়। জানতে চেয়েছি, আপনারা কেনো ভাশা আন্দোলনে অংশ গ্রহনকারি ঐ সব মহিলাদের নামের তালিকা তৈরি করেন নি? সন্তোশজনক উত্তর পাই নি কারও কাছ থেকে।
এক সময় ‘প্রমিত বাঙলা’ নামে একটা অনুশঠান করতাম এটিএন বাঙলায়। তখন আমি রওশন আরা বাচ্চু আপাকে এবং পরে আরো দুজনকে ডেকেছিলাম ফেব্রুয়ারি মাসের অনুশঠানে।। সেই প্রথম আমার প্রত্যক্ষভাবে কিছু কথা শোনা তাঁদের মুখ থেকে। তাঁদেরকেও বলেছি, এখনও সময় আছে, আপনারা কিছু কাজ করে যান আমাদের প্রজন্মের জন্য। কথাটা বলেছি পুরুশ ভাশা সৈনিকদেরও। একই কথা বলেছিলাম, ভাশা সৈনিক মতিন ভাই, যাঁকে পরে আমরা নাম দিয়েছিলাম ‘ভাশা মতিন’, তাঁকে। তিনি হয়তো চেয়েছিলেনও। কিন্তু আমরা তো মানুশকে পুজোর আসনে বসাতে পছন্দ করি। তখন শুধু ভক্তি, শ্রদ্ধা আর বন্দনায় তাঁকে বিহবল করে রাখি। বেচায়েন করে রাখি বলা যায়। উতসবে অনুশঠানে বসিয়ে রাখি মধ্যমনি করে। তাঁকে কাজের কথা বলি না। মতিন ভাইও মামুলি কথা ছাড়া বাঙলা ভাশার কাজ নিয়ে জোর দিয়ে কোনো কথা বলেন নি। বাঙলা ভাশা নিয়ে আমার কাজ পছন্দ করতেন। কিন্তু এগিয়ে দেন নি। লেখেছেন প্রত্যাশার চেয়ে কম। এমন কি ভাশা সৈনিকদের নামের তালিকা প্রনয়নের কাজটাও করার জন্য উদ্যোগ নেন নি অর্থবহ ভাবে।
এখন ভাশা সৈনিকদের বলা হয়, ভাশা সংগ্রামি। আমি কিন্তু পার্থক্যটাই বুঝতে পারি না। ভাশা আন্দোলনে একদার ভুমিকার কথা মনে করে যাঁরা ‘ভাশা সংগ্রামি’ শব্দটা পছন্দ করেছেন, তাঁরা নিশ্চয় শব্দটা নিয়ে ভেবেছেনও। আমার প্রশ্ন সেটা নয়। বলতে চাই, ভাশা আন্দোলনের সাথে ক্রিয়াশিলভাবে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাদের নাম তালিকা নিয়ে কোনো গবেশনা কাজের কথা। এই কাজ তো ভাশা সৈনিক বা ভাশা সংগ্রামিদের জন্যই তোলা আছে এখনও, সে কথা আগেও বলেছি। প্রশ্ন জাগে, নতুন কি সংগ্রাম আবার করা হয়েছে যে, নাম পদবি বদলের প্রয়োজন হলো? সৈনিকরাই তো সংগ্রাম করে। সংগ্রামিরা সৈনিক নাও হতে পারে।
ভালো করেই মনে আছে, আমি তখন সবে স্কুল শেশ করে রাজসাহি কলেজে ভর্তি হয়েছি। রাজসাহিতে ভাশা আন্দোলনের সাথে জড়িত হলাম পোস্টার লেখার মাধ্যমে। সত্যি বলতে কি, তখন আমরা কেমন যেনো হাঁদা গোছের ছিলাম। ভাশা আন্দোলনের বিশয়টা ঠিক বুঝতে পারতাম না। আমাদের বড়ো ভাইয়েরা কাজ দিতেন, আমরা করে দিতাম। মানে, পোস্টার লেখা ছাড়াও স্কুলে পিকেটিং করার, মিছিলের জন্য স্কুলে গিয়ে ছাত্রি সংগ্রহ করার কাজগুলো করতাম রিতিমতো পারিবারিক শাসন বারন অমান্য করেই। তখনকার সমাজ ব্যাবস্থায় সেটাই ছিল সাভাবিক। মিছিল শেশে ভুবন মোহন পার্কে সমবেত হয়ে মিটিং-এ যোগদান করার কথা থাকলেও সেটা পারিনি সব সময়। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে মিছিল শেশে সেই পার্কে সমবেত জনতার সামনে বক্ত্রিতা দিয়েছিলাম আমি একাই। ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা’ গানটাও গেয়েছিলাম দুর্দান্ত উচ্চকিত কণ্ঠে। কটা মুসলমান মেয়ে আর তখন কলেজে পড়তো? তার মধ্যে কজনের ভাগ্য হয়েছে ছেলেদের সাথে মিছিলে যাওয়ার? তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি সেদিনের পরিস্থিতি। নিজেকে ধন্য মনে হয়।
রাজসাহিতে আমরা ছিলাম বেশ কয়েক জন। সবাই সম্ভ্রান্ত রক্ষনশিল শিক্ষিত এবং আলোকিত পরিবারের শিক্ষারত মেয়ে। ক্রমে ক্রমে বড়ো ভাইদের কাছ থেকে জেনেছিলাম, কেনো ভাশা আন্দোলন করছি এবং কেনো মিটিং মিছিল করে প্রতিবাদ করছি। ওঁরা বলেছিলেন, পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের মা-কে মাত্রিয় ডাকতে দেবে না। মায়ের য় কথা বলতে দেবে না। দেশের কাজকর্ম হবে বিভাশায়। সেটা যে কি ভয়ংকর বিশয়, তা পুরোপুরি না বুঝলেও এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে, এই অন্যায় শাসন মানা যাবে না কিছুতেই। অতএব, মিছিল মিটিং করে প্রতিবাদ জানাতেই হবে। কথা বলার বাকসাধিনতা ছিলো না তখন, তবু বলতে হবে কথা প্রকাশ্য রাজপথে। জানাতে হবে পাকিস্তানি শাশকদের যে, বাঙলা ভাশাকে রাশট্রভাশার মর্যাদা দিতেই হবে। সেজন্য জান দেবো, মান দেবো না। এসব কথায় কি যে উন্মাদনা কাজ করতো, তা বলার নয়।
ভাইয়েরা শ্লোগানের কথা লেখে দিতেন। আমরা রাত জেগে সেই কাজ করতাম। সকালে কেউ এসে সেগুলো নিয়ে যেতো। কিছু কর্মি সেই পোস্টারগুলো নানা জায়গায় লাগাতো। কাজগুলো সাবধানে এবং বেশ গোপনেই হতো। মিছিলে শ্লোগান দেয়ার জন্য দরকার হতো উচ্চকণ্ঠ মেয়ে। আমি তো ছিলামই। ছিলো মনোয়ারা (স্থানিয় মান্যজন জনাব মাদারবক্স-এর মেয়ে, পরে বামপন্থি নেতা আতাউর রহমানের স্ত্রি), আমাদের স্কুলের সহপাঠি নুরজাহান কোটি, ফজিলাতুন্নেসা টুকু এবং আরো দুএকজন, এখন নাম মনে নেই। তবে স্কুলের বহু মেয়ে মিছিলে আসতো বেশ সতস্ফুর্তভাবে। আন্দোলনের শরিকানা ওদেরও কিছু আছে। মিছিলের সামনে থাকতো মেয়েরা, পেছনে ছেলেরা। মিছিলের সময় আমাদের হাতে থাকতো শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। সেও কাগজের কি ছিরি? খবরের কাগজে আলতা দিয়ে বা ট্যাবলেট গোলা কালি দিয়ে কাঠির আগায় তুলো পেঁচিয়ে মোটা মোটা করে লেখা।
আমাদের, মানে মেয়েদের সাহস যোগাতেন কুলসুম আপা(রাজসাহি মেডিকেল স্কুলে ডাক্তারি পড়তেন)। সিনিয়র ছিলেন। ছোটো খাটো মানুশ হলে কি হবে, খুব স্মার্ট ছিলেন। তাঁকে মিছিলের সামনে দাঁড়াতে দেখলে মনোবল বেড়ে যেতো আমাদের। আমাদের সাথে থাকতো, মহসেনা খাতুন(রাজসাহির বাইরে থেকে আসা মেয়ে, ডাক্তারি পড়তো রাজসাহিতে), আমার সহপাঠি ডলি, ইরানি, আরো কেউ কেউ। পিকেটিং করতাম দল বেঁধে, পরিকল্পনা করে। আমাদের বাড়ির কাছে ছিলো মেয়েদের মিশন স্কুল। সেখানে আমি আর মনোয়ারা যেতাম। পিএন গার্লস স্কুলেও যেতাম মাঝে মাঝে অন্যদের সাথে। মেয়েরা একটা কিছু অর্থবহ কাজ প্রকাশ্যে করতে পারার আনন্দে প্রানটা যেনো দিয়ে দিতে চাইতো। পাকিস্তান স্রিশটির পরে হয়তো নারিমুক্তির প্রথম সোপান নির্মান করেছিলো আন্দোলনের মুক্ত প্রতিবাদি জিবন। এর আগে এতো মহিলা ঝাঁক বেঁধে রাজপথে আর কখনও বের হয়ে আসেনি। সেটাও কিন্তু ইতিহাস।
আলাপ হয়েছিলো যশোরের মহিলা হামিদা আপার সাথে একুশের বই মেলায়। তিনি ছিলেন যশোরের সাহসি এক মানুশ। সৈনিক পদক পেয়েছেন তিনিও। আপা ১৯৪৮ সাল থেকেই আন্দোলনের সব রকম কাজে নিজেকে সম্প্রিক্ত করেছেন। অনেক বইয়ে তাঁর নাম আমি দেখেছি। রাজনিতি সচেতন মহিলা ছিলেন। সেই তাঁকেও বলেছি, কিছু একটা লেখে যান। লেখক ছিলেন। সাহিত্যকর্মে ব্যাপ্রিত থাকতেন। ভাবতেন, সেটাই হলো ভাশাকে ভালোবাসার কাজ। আমার সাথে যখন পরিচয় হয়, তখন আপার শরির ভালো থাকতো না। কিন্তু ফেব্রুয়ারির মেলায় একদিনও ঘরে বসে থাকতে পারতেন না। চলে আসতেন মেলায়। বসতেন ‘লেখিকা সংঘে’র স্টলে। যশোরের আন্দোলনের অনেক গল্প করতেন। এখন আমারই আফসোস হয়, কিছু সংগ্রহ করে না রাখার জন্য।
ঢাকায় যে মহিলারা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন, তাঁরা সবাই ঢাকার মানুশ ছিলেন না। আমি যাঁদের দেখা পেয়েছি ক্রমে ক্রমে তাঁদের সাথে ভালো করে পরিচয়ও হয়েছে এক সময়। তাঁরা হলেন, ডঃ সাফিয়া খাতুন(পরে মন্ত্রি হন), ডঃ হালিমা খাতুন (ঢা বি-র প্রফেসর),তাহমিদা সাঈদা(শহিদ জননি জাহানারা ইমামের বোন), প্রতিভা মুতসুদ্দি, জওশন আরা আপা, এবং রওশন আরা বাচ্চু আপা(যার নাম আগেই উল্লেখ করেছি)। আর যাদের নাম শুনেছি, আলাপ পরিচয় হয় নি, তারা হলেন, প্রফেসর সুফিয়া আহমেদ(প্রফ্রসর, ঢাবি, জাস্টিস মোহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেবের ময়ে, ব্যারিস্টার ইশতিয়াক সাহেবের স্ত্রি), ডঃ সানজীদা আপা(প্রফ্রসর, ধাবি, দেশে রবীন্দ্র সঙ্গিতের আইকন), এবং মমতাজ বেগম।
মমতাজ বেগমের নামটা বেশি জানা যায় তাঁর ত্যাগের জন্য। নারায়নগঞ্জের মরগান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহনের জন্য ২৯শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর নারায়নগঞ্জের জনতা ক্রোধে ফুঁসে ওঠে। এতেই বোঝা যায় মমতাজ ছিলেন এলাকায় খুব জনপ্রিয়। ছাত্রি ও জনতাকে একত্রিত করে তিনি মিছিলে আসতেন। তাঁকে ঢাকা জেলে নিয়ে যাওয়ার পথে বাধার সামনে পড়ে পুলিশ। আন্দোলনের প্ররাক্রমতা দেখে নারায়নগঞ্জে ১৪৪ ধারা এবং সান্ধআইন জারি থাকে ৭ই মার্চ পর্যন্ত। প্রায় দেড়বছর ছিলেন তিনি জেলে।
একে তো মমতাজ ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলমান মহিলা, তার ওপর পরিবার ও সমাজের রিতির বাইরে গিয়ে আন্দোলনে পুরুশদের সাথে সমান তালে কাজ করা, মেনে নিলেন না তাঁর সামি। মেনে নিলো না পরিবার। আপস করে মুচলেখা দিয়ে জেল থেকে বের হয়ে আসতেও চাননি তিনি। ফলে সংসার ভেঙে যায় মমতাজ বেগমের। এসব স্ফুলিঙ্গের মতো মহিলাদের কথা বার বার জানাতে হবে প্রজন্মদের। আন্দোলন তো দু একজনের কর্মের ফসল নয়। বহু মানুশের বহু কর্মের যৌগিক ফসল।
ভাশা আন্দোলনে অংশগ্রহঙ্কারি মহিলাদের অনেকেই জেল খেটেছেন। ১৯৫৫ সালে আন্দোলনে সংগ্রামি মহিলাদের সংখ্যা বেড়ে যায় বহুগুন। জেলে নিয়ে যায় বহু মহিলাকে। কিন্তু জেলে মহিলাদের রাখার জায়গা না থাকাতে লালবাগ দুর্গে তাঁবু টাঙিয়ে সংগ্রামি মহিলাদেরকে রাখা হয়েছিলো। এগুলো কথা ঘুমিয়ে থাকে অতিতের আঁধারে। তাই আলোচনাতেও তেমন করে আসে না। আন্দোলনে নারিদের ভুমিকা নিয়ে সামান্য যেটুকু কাজ করেছে জামিল আখতার বীনু, তার বরাতে কিছু নাম পেয়েছি আমি। ক্রিতজ্ঞতা জানাই বীনুকে। ওকে বলেছিলাম, কাজটা চালিয়ে যাও। কারন এই কাজে হাত দিলে এগোতেই হবে। কিন্তু হয় নি। ও যুক্ত হয়েছিলো ‘একুশের চেতনা পরিশদ’-এ, তার ফলেই এই কাজটা করার উতসাহ পায় বলে নিজেই জানিয়েছে। ওর বইয়ে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এমন ২১জন মহিলার নাম পাওয়া যায়। তাঁদের নাম তুলে দিতে চাই প্রজন্মের জন্য(কিছু নাম আগেই বলা হয়েছে)। যেমন; হালিমা খাতুন, প্রতিভা মুতসুদ্দি, মমতাজ বেগম, বেগম জাহান আরা, রওশন আরা বাচ্চু, শরিফা খাতুন, সানজীদা খাতুন, নিলুফার আহমেদ ডলি, নার্গিস আখতার, ডা কুলসুম বেগম, সুফিয়া আহমেদ, রওশন জাহান হোসেন, তাহমিদা সাঈদা, রওশন আরা চৌধুরী, নাদেরা বেগম, শাফিয়া খাতুন, জওশন আরা রহমান, সোফিয়া রহমান, শামসুন্নাহার আহসান, সুফিয়া করিম, এবং ডা হালিমা খাতুন। সানজীদা আপার তথ্যে আরও তিনটে নাম পাই, নুরজাহান মুর্শিদ, দৌলতুন্নেসা খাতুন, রোকাইয়া আনোয়ার এবং আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় সুফিয়া কামালের কথা। আগেই বলেছি, ঢাকাতে যাড়া আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই ঢাকার বাইরের মানুশ। নানা জেলা থেকে পড়তে আসা মহিলা।
এবার মুখ ফেরানো যাক র কাজের প্রতি। বাঙলা র জন্য আমরা কি কি কাজ করেছি প্রায় সত্তর বছরের মধ্যে? আমি প্রমিত বাঙলা র কথাই বলতে চাইছি। না কোনো কাজ হয়েছে প্রমিত বাঙলা উচ্চারনের ওপর, না কোনো কাজ হয়েছে প্রমিত বাঙলা বানানের ওপর। বিশেশ করে সেই দুশো বছরের বেশি সময়ব্যাপি সংস্ক্রিতঘেঁশা তথা সংস্ক্রিতানুকারি যে বানান দিয়ে বাঙলা গদ্যের পত্তন হয়েছিলো, তাই লেখে যাচ্ছি আমরা আজও। আমরা এখনও বুঝতেই পারিনা যে, বাঙলা র বাঙলা বানান আজো কেনো লেখা হয় না? এমন কি এটা নিয়ে মাথাও ঘামাই না যে, বাঙলা য় বাঙলা বানানই লেখা হয় নি কোনোদিন। কথাটা শুনতে ধাক্কা লাগলেও এটাই সত্যি। আমরা তো বাঙলা হরফে সংস্ক্রিত বানানে লেখি।
দু চারটে শব্দের উদাহরন দেয়া যাক। আমরা লেখি ‘স্বাস্থ্য, স্মরন, শ্মশান, দ্বার’, কিন্তু কি তার উচ্চারন করি? কি তার প্রতিবর্নিকরন করি? শব্দগুলো আমরা উচ্চারন করি, ‘শাস্থ, শরন, শশান, দার’। এটা বাঙলা ধনিমুলক বর্নমালায় লেখা বাঙলা উচ্চারন। রোমান হরফে তার প্রতিবর্নিকরন করি, ‘swasthya, smAron, smAshan, dwar’(অ =অ)। এই উচ্চারনকে বাঙলা ধনিমুলক বর্নমালায় লেখলে দাঁড়ায়, ‘সোয়াস্থিয়, স্মরন, স্মশান
(দন্ত স এবং ম উচ্চারন করতে হবে), দওয়ার’। এই যে এলেবেলে বিশয়, এটা এখনও আমাদের চোখে পড়ে না। লেখি একটা, আর উচ্চারন করি অন্যটা। আবার প্রতিবর্নিকরনের বেলায় অন্য একটা। আর বিভাশি যদি প্রতিবর্ন দেখে বাঙলায় তা লেখতে চান, তাহলে কেমন হবে, সেটা পাঠক নিজেই লেখে পরখ করতে পারেন।
যে শব্দগুলোর আমরা বাঙলা উচ্চারন করিনি কোনোদিন, বানানে তা লেখে যাচ্ছি। কিন্তু কেনো? কার ভয়ে? রবীন্দ্রনাথ প্রাক্রিত বাঙলার বাঙলা উচ্চারন অনুসারে লেখার কথা বলেছেন স্পশট করে। মানে, বাঙলামন্ত বানান তিনি পছন্দ করতেন। মুশকিল হলো, তিনি নিজে সেই দ্রিশটান্ত রেখে যান নি। বলেছেন যে, ‘কেমাল পাশা’ হলে এই রকম বৈপ্লবিক কাজ করে যেতেন। ভবিশ্যতে যদি কেউ এমন কাজ করে তবে তার জন্য সাধুবাদ জানিয়ে গেছেন। তাঁর ভয়টা ছিলো কোথায়? সংস্ক্রিতমন্য পন্ডিতদের রক্ত চক্ষু? ভাশার বিজ্ঞানটা না জানার অজ্ঞতা? হতেই পারে। তখন ভাশাবিজ্ঞান বিশয়টা দেশে গড়ে ওঠেনি। বড়ো কবি বলে বা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে না, বাঙলাভাশার ওপর অনেক কাজ তিনি করেছেন। বুঝেই করেছেন। সেটা তাঁর বিজ্ঞান মনস্কতা। আজও সেগুলো বিজ্ঞানের ধোপে টিকে আছে। তাই তিনি যদি কিছু উদাহরন রেখে যেতেন প্রমিত বাঙলা বানানের জন্য, তাহলে আমাদের জন্য খুব ভালো হতো। এখন পাথর কেটে পথ তৈরি করতে হতোনা। এসব কথার মধ্যে জেন্ডার ভেদ নেই। সবার জন্যই বলছি।
কয়েকদিন আগে বিশিশট ব্যাক্তি জনাব জামিলুর রেজা চৌধুরী এক সেমিনারে বলেছেন, ‘রোমান হরফে নয়, বাঙলা অক্ষরে বাঙলা লেখতে হবে’। এই ছোটো বাক্যের অন্তর্গত অর্থটা কিন্তু লঘু নয়। প্রজন্মেরা মেইল বা কম্পিউটারে ফেসবুকে রোমার হরফে বাঙলা লেখলেও আমরা তো বাঙলা অক্ষরেই বাঙলা লেখি। কিন্তু বাঙলা বানান লেখি না। বানান রিতি থেকে গেছে সংস্ক্রিতের। সেটাই আমাদের প্রবল সমস্যা। এই বাক্যের সেই গুঢ় অর্থকে বিশ্লেশন করলে খাঁটি বাঙলা বানানের কথাই মনে হয়েছে আমার। মনে হয় তিনিও সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন। শিশুদের জন্য সংস্ক্রিতমন্ত বানান মুখস্ত করে লেখাও কশটকর। কারন তারা যা উচ্চারন করে, তা লেখতে গিয়ে ভুল করে বার বার। প্রজন্ম চায়, উচ্চারনানুগ বানান লেখতে। সেটাই সাভাবিক। কিন্তু তা লেখা যাবে না। কিছু সংস্ক্রিতমন্য পন্ডিতের দারুন আপত্তি তাতে। এই সংস্ক্রিতমন্য পন্ডিতদের সংখ্যা কতো তা আমি বলতে পারিনা, তবে তাঁদের ভার বড্ড বেশি। সমাজে উঁচু তলার মানুশ তাঁরা। উচ্চারনানুগ বানান লেখলেই ‘জাত গেলো জাত গেলো, বাঙলা গেলো বাঙলা গেলো’ ধরনের রব তোলেন তাঁরা। স্কুলের খাতায় বানান কেটে নম্বর কমিয়ে একাকার কান্ড হয়ে যায়। বাঙলাভাশি ছেলেমেয়েরা তখন বলে, বাঙলা খুব কঠিন বিশয়। কি পরিতাপের কথা!
এই সব কথার আলোচনা হওয়া দরকার একুশের মাসের বহু আলোচনায়। বিশেশ করে বাঙলা একাডেমির মাসব্যাপি আলোচনা অনুশঠানে প্রমিত বাঙলা বানান এবং উচ্চারনের ওপর বিশয় নির্ধারনে বিশেশ জোর দেয়া উচিত বলে মনে করি আমি। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বাঙলা ভাশা আর বাঙলা সাহিত্য যে এক বিশয় নয় সেটাও অনেকে বোঝেন না। মনে করেন, সাহিত্যিক মাত্রেই ভাশার গুরু। তাঁরা সব জানেন। হাস্যকর না?
তাই বাঙলা একাডেমি ‘প্রমিত বাঙলা বানান পুস্তিকা’য় বানানের নিয়ম রিতি প্রনয়নের জন্য কয়েকজন সাহিত্যিক কাজ করেন সেখানে। কোনও ভাশা বিজ্ঞানিকে ডাকা হয় না। বিজ্ঞানলগ্ন বানানের কথা যারা নিজেরাই জানেন না। যা বলেন তার ব্যাখ্যা জানেন না। যা ব্যাখ্যা দেন তা দুর্বোধ্য। বোঝা যায় না, মানাও যায় না। ফলে বাঙলা বানানের রিতিই ঠিক করা যাচ্ছে না। মানে রোগ সারছে না বাঙলা বানানের। যে রোগের নিরাময় পেতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জানা ডাক্তার প্রয়োজন, তা কি হাতুড়ে ডাক্তারের ওশুধে সারে? সারছেও না। উচ্চশিক্ষিত বাঙলাভাশি এবং খ্যাতনামা সাহিত্যিকরা দিব্যি আছেন সংস্ক্রিত বানানে বাঙলা লেখে। ছোটোবেলা থেকে ওটাই তো শিখেছেন। জিবন এবং জিবনাচারে কতো আধুনিকতা এলো, পড়ে রইলো শুধু বাঙলা বানান। এই পরিবর্তনশিল প্রথিবিতে জড় জিবনও স্থবির হয়ে থাকে না। শুধু জিবনলগ্ন ভাশাকেই থাকে হবে জড় হয়ে? অথচ তাঁরাই প্রজন্মের রোমান হরফে বাঙলা লেখা দেখে কি বিরক্তই না হন। আমার মতে, বাঙলা বানানের শুধু দিচারন নয়, বহুচারন দেখে প্রজন্মেরা বিভ্রান্ত হয়ে বাঙলা মায়ের আঁচল ছেড়ে রোমান হরফের কোলে চলে গেছে। সেখানে বাঙলা লেখার সময় হ্রস্ব- বা দির্ঘ-ঈ, কিংবা মুর্ধা-ন বা মুর্ধা-শ লেখার কোনো বালাই নেই। খুব শান্তিতে তারা লেখে যাচ্ছে রোমান হরফে বাঙলা। তখন কিন্তু কেউ কিছুই বলছেন না। কিন্তু বাঙলাকে বাঙলা উচ্চারনানুগ বানানে লেখলেই বুদ্ধিব্রিত্তিক সাম্প্রদায়িক গোশঠি গলা টিপে ধরেন তাদের। প্রানশক্তির এমনই জোর, তবু তারা লেখে যায় রোমান হরফে বাঙলা। এটা থেকে রেহাই পেতে হলে বাঙলা ভাশার বাঙলা বানান লেখার চলন করতেই হবে। বিকল্প নেই।
এই কথাগুলো আমি ভাশা আন্দোলনের সাথে যুক্ত এবং ভাশা সৈনিকদেরই বলছি। কারন তখন যাঁরা ভাশা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই আলোকিত পরিবারের সন্তান ছিলেন। অনেকের পরিবারে বাম রাজনিতি কিংবা ব্রিটিশ বিরোধি দর্শনের সাথে একাত্ম ছিলেন। বাড়িতে ছিলো লেখাপড়ার চর্চা। ভাশা আন্দোলনে সম্প্রিক্ত মহিলাদের জন্যও কথাটা প্রযোজ্য। প্রায় প্রত্যেকেই পরবর্তিকালে নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন। প্রতিশঠিত হয়েছিলেন জিবনে। বিয়ে হয়ে গেলেও সমাজে ছিলেন তাঁরা আলোকিত পরিবারের সদস্য। তাই মনে করি, বাঙলা ভাশার বানান উচ্চারন নিয়ে তাঁদেরও ভাবতে হবে। লেখালেখি করা বা কোনো গবেশনালব্ধ লেখা দেখলে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। আজ পর্যন্ত বাঙলা বর্নের সংখ্যা কতো তাই জানি না আমরা। ডিজিটাল প্রযুক্তিও এই ঘাটতি মেটাতে পারবে না। বিসমিল্লায় গলদ রেখে কি বহুতল ভবন নির্মান করা যায়?
বিশ্বাস করতে হবে, বাঙলা ভাশাকে না চেনার জন্য, বাঙলা ভাশার শক্তিকে না বোঝার জন্য, বাঙলাকে জিবনের সর্বস্তরে কাজে লাগাতে পারিনি আমরা। আমি আরো বিশ্বাস করি, আমাদের ভাশিক ব্যাক্তিত্বের সুস্থ সরল বিকাশ হচ্ছে না সেই কারনে। মাত্রিভাশার প্রতিবন্ধিত্ব আমাদের মুক্ত চিন্তাসহ সকল অগ্রগমনের অন্তরায় হয়ে থাকছে। রুদ্ধ হয়ে থাকছে আমাদের প্রদত্ত বুদ্ধিব্রিত্তি। শুধু ‘একুশের চেতনা’র ঝান্ডা দেখিয়ে মিছিল সংগঠিত করা যায় না আর। তাজা প্রানগুলো বিদ্ধস্ত, দিকভ্রান্ত বিপন্ন এবং অবসন্ন। ওরা সবাই বাঙলাতেই তো কথা বলে। সেটা আঞ্চলিক বাঙলা। সজ্জিত আসরে ঐ ভুমিজ বাঙলা নিয়ে ওরা যেতে পারে না অসংকোচে। তাই চায় সজ্জিত বাঙলা, মানে প্রমিত বাঙলা। আসেন, সংস্কার ছেড়ে কাজে লেগে যাই বিজ্ঞানলগ্ন বাসতবতা মেনে। মানুশ তো আছেই, কাজে লাগানো হোক তাদের। এই কাজে চাই রাশট্রিয় সহযোগিতা। যেনো তেনো ভাবে যাকে তাকে দিয়ে কাজ করালে পন্ডশ্রমই সার হবে। কেউ কি ভুলে গেছি যে, এক প্রেসিডেন্টের নির্দেশে এক দিনের মধ্যে ‘Dacca’ বানান হয়েছিলো ‘Dhaka’? যেমন উচ্চারন্ করা হয়, তেমন বানান লেখার এই দ্রিশটান্ত স্রিশটি করতে চাই আমরা আবার। চাই বাঙলা ভাশার মধ্যে বাঙলা প্রানের সুর বাজাতে।
ডক্টর বেগম জাহান আরা
১৩. ২. ১৭
[বানান রীতির দায়বদ্ধতা লেখকের]






