সুফিয়া আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষ সংগ্রামী

ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা...
সে সময় সমাজ কিংবা বাড়িতে নারীদের কোনো ধরনের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল না। সে সময় নারীদের লেখাপড়া শেখাটা একটি কঠিন ব্যাপার ছিল। মেয়েরা বাড়িতে পড়াশোনা করবে, বেশির ভাগই এটি পছন্দ করতেন। যেসব মেয়ে স্কুল-কলেজে যেত, তাদের খুব অসুবিধা হতো। ঘোড়ার গাড়িতে দরজা বন্ধ করে অথবা রিকশায় পর্দা টেনে যাওয়া-আসা করতে হতো তাদের। তবে যেসব নারীর লেখাপড়ার প্রতি অদম্য উত্সাহ ছিল এবং যাদের পরিবার উত্সাহ দিয়েছে তারাই যেত। এ রকম একটি সময়ে নারীদের ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়াটা ছিল একটি অভিনব ব্যাপার। আমি বলব, এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক ব্যাপার। এখন নারীরা শিক্ষা থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক খাতে পর্যন্ত যেভাবে এগিয়ে আসছেন, সে সময় তা কল্পনাও করা যেত না। ওইদিন (২১ শে ফেব্রুয়ারি) আমরা (নারীরা) ভাষার দাবিতে বেরিয়ে পড়েছিলাম, ছেলেমেয়ে ভেদাভেদ ছিল না। আমাদের গন্তব্য স্থল ছিল পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাসেম্বলি হল। সেখানে তখন বাজেট সেশন চলছিল এবং আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার সদস্যদের উপস্থাপন করা, আমরা উর্দুকে বাদ দিতে বলছি না, তবে এর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। সংখ্যার দিক থেকে বাংলাভাষীরা ছিল সংখ্যাগুরু। তাই উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষা থাকবে না কেন? আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি তো আমাদের রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না, তাই উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক।

আপনি কীভাবে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন?
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছাত্রীদের জন্য তখন কোনো আলাদা হোস্টেল ছিল না। কাছেই একটি বাড়িতে ছাত্রীদের রাখা হতো, যেটিকে বলা হতো মহিলা হোস্টেল। ঢাকার বাইরে থেকে আসা মেয়েরা এখানে থাকত। অন্যদিকে আমরা যারা ডে স্কলার ছিলাম, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসতাম। মহিলা হোস্টেলে থাকা ছাত্রীর সংখ্যা বেশি ছিল। এবং সঙ্গত কারণেই মহিলা হোস্টেলে থাকা ছাত্রীদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বেশি ছিল। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা কাজ না থাকলে মহিলা হোস্টেলে যেতাম, আড্ডা দিতাম। সেখানে যাতায়াত করতে করতে মনের অজান্তে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি। বাড়ির পরিবেশও ওই রকম ছিল। আমার বাবা হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। অবসর নেয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হন। এছাড়া তিনি আইয়ুব খানের ক্যাবিনেটের আইনমন্ত্রী ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আমার বাবা আইনমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী মানসিকতার মানুষ। তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে বন্ধুবান্ধবকে চিঠি লিখেছেন। এ চিঠিগুলোর খসড়া করতে গিয়ে বাবার আদর্শের কথা জানতে পারি।

ভাষা আন্দোলনে আপনি কী কী কাজ করেছিলেন?
আমরা পিকেটিং করেছি, পোস্টারিং করছি এবং কয়েকটি স্কুলেও গেছি, যেমন কামরুন্নেসা গার্লস স্কুল, আনন্দময়ী গার্লস স্কুল, বাংলাবাজার গার্লস স্কুল ও ইডেন কলেজ ইত্যাদি। সেখানকার ছাত্রীদের বলি অংশগ্রহণ করার জন্য। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি নির্দলীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। এ কমিটি ২১ ফেব্রুয়ারি মিটিং ঠিক করেছিল। কিন্তু হঠাৎ রাতে সরকার জেলা প্রশাসককে বদলি করে ২১ তারিখ ১৪৪ ধারা জারি করে। আমরা সেটা উপেক্ষা করেই বের হয়েছিলাম। আমতলায় সমবেত ছাত্রীদের অধিকাংশই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের, যদিও স্কুল-কলেজ থেকেও কিছু সংখ্যক ছাত্রী যোগদান করেছিল। সেখানে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমে ছাত্ররা মিছিল বের করে। কিন্তু পুলিশ তাদের ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তখন চিন্তা করা শুরু হলো, কী করা যায়। সিদ্ধান্ত হলো মেয়েরা মিছিল বের করবে। মেয়েদের প্রথম যে মিছিলটি বের হয়, তার মধ্যে আমি ছিলাম। সবাই মনে করেছিল মেয়েদের পুলিশ কিছু বলবে না। কিন্তু পুলিশের বাঁশের বেস্টনীর তলা দিয়ে নিচু হয়ে পার হওয়ার সময় আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়, সঙ্গে টিয়ার গ্যাস। তখন আমরা সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। এর মধ্যেও আমি, ড. শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন নাহার (যিনি বোরখা পরতেন)-সহ আরো কয়েকজন অ্যাসেম্বলির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আমরা কয়েকজন আহত হয়েছিলাম। একদিকে পুলিশের লাঠিচার্জ আর টিয়ার গ্যাস, অন্যদিকে ছেলেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়ছিল। সব মিলে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। মেয়েদের জন্য আলাদা হল না থাকায় ছাত্রীদের বিভিন্ন আবাসিক হলের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। আমি যেমন সলিমুল্লাহ হলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ওখানে আমি নির্বাচনও করেছি। ওই হলের প্রভোস্টের বাড়িতে আমরা তারকাঁটা ডিঙিয়ে প্রবেশ করি। এটা করতে গিয়ে শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটে গিয়ে রক্ত ঝরছিল। আমরা প্রভোস্টের বাসার লনের একটা গাছের নিচে আশ্রয় নিই। বাগানের গাছে পানি দেয়া কল থেকে পানি নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে সেখানে গাছের ছায়ায় বসে অপেক্ষা করতে থাকি। এর পর আড়াইটা-তিনটার দিকে আমরা মহিলা হোস্টেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এদিকে এরই মধ্যে ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে জনতাও মিশে গেছে। সবার এক দাবি রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ছাত্র-জনতার যৌথ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ভীত হয়ে ওঠে। বেলা ৩টার দিকে প্রাথমিক চিকিত্সা নেয়ার জন্য মেডিকেল কলেজের দিকে বের হব, এমন সময় একজন বর্ষীয়ান ভদ্রলোক আমাদের বলেন, তোমরা গুলির শব্দ শোননি? মিছিলে গুলি চালানো হয়েছে, কয়েকজন মারা গেছে। তোমরা যেখানে আছ, সেখানেই থাকো, তা না হলে ওরা তোমাদেরও মেরে ফেলবে। সন্ধ্যার দিকে যখন পরিস্থিতি একটু শান্ত হলো, তখন আমরা মেডিকেল কলেজে যাই। সেখানে কয়েকজনের মরদেহ দেখি। প্রচুর আহত। এর মধ্যে চিকিত্সকরা আমাদের প্রাথমিক চিকিত্সা দেন। এর পর আমরা চলে যাই মহিলা হোস্টেলে। পরে ওখান থেকে সন্ধ্যায় মা এসে আমাকে বাড়ি নিয়ে যান।

ওই সময় যেসব নারী ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের পরিবার থেকে বাধা আসেনি?
অন্যদের কথা আমি জানি না। তবে আমি যখন সকালে ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও মিটিংয়ে যোগ দিতে যাচ্ছি, তখন আমার মা-বাবা আমাকে বাধা দেননি। গোলাগুলির খবর শুনে আমার মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন খুব অস্থির ছিলেন। তবে সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরলাম, তখন তারা কিন্তু জিজ্ঞাসা করেনি আমি কেন গিয়েছিলাম। এর অর্থ তাদের সম্মতি ছিল এবং এতে তারা খুব গর্বিত হয়েছেন।

সে সময় তো মেয়েদের জন্য অনেক বাধা ছিল। এসব উপেক্ষা করে কীভাবে এগোলেন...
ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়ে একসঙ্গে পড়লেও, যে বিধি-নিষেধ ছিল তা হাস্যকর। যেমন— মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে হলে ছেলে সহপাঠীদের প্রক্টরের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হতো। কোন বিষয়ে কথা বলতে চায় তা-ও জানাতে হতো। কেউ না থাকলেও বেয়ারা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। এখন ছেলেমেয়েরা যেভাবে মেলামেশা করে, তা সে সময় ছিল অচিন্তনীয়। বর্তমানে নারীদের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, আমি মনে করি তার অগ্রদূত ছিলেন ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীরা। আমরা যে ছেলেমেয়ের ভেদাভেদ ভুলে ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, তা পরে নারী মুক্তিতে বড় অবদান রেখেছে। ভাষা আন্দোলেনর পর নারীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পেরেছিল, কারণ ভাষা আন্দোলনেই পুরুষদের সঙ্গে নারীরা যৌথভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, আমি মনে করি তা ছিল বৈপ্লবিক। এবং এ দৃষ্টান্তই ভবিষ্যতে নারীদের প্রভাবিত করে এবং সমাজও তা স্বীকৃতি দেয়।

বর্তমানে বাংলা ভাষা নিয়ে আপনার অভিমত কী?
যে বাংলা ভাষার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি, তার তেমন উন্নতি হয়নি। যে ভাষা এখনকার ছেলেমেয়েরা বলে বা লেখে, তা বেশির ভাগই আঞ্চলিক। ভাষার উত্কর্ষ সেভাবে হয়নি। ইতিহাস পরিষদ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে জড়িত। ১৯৬৬ সালে উপমহাদেশের স্বনামধন্য ঐতিহাসিক অধ্যাপক এবিএম হাবিবুল্লাহর উদ্যোগে ও সভাপতিত্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি বর্তমানে এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমরা বছরে অন্তত দুটি ‘ইতিহাস’ নামের পত্রিকা বের করি, যার মূল উদ্দেশ্য বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চা করা। ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থাকলে একজন গৃহিণীও এ পরিষদের সদস্য হতে পারেন। বাংলাদেশজুড়ে আমাদের প্রায় ১ হাজার ২০০ সদস্য রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রেফারেন্স বইগুলো বাংলায় ভাষান্তর হওয়া প্রয়োজন। এটা শুধু বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে সম্ভব না। আমরা ইতিহাস পরিষদের মাধ্যমে ৫০ বছর ধরে বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চার চেষ্টা করছি। আমরা অনেক প্রবন্ধ পাই। ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমরা প্রায় ১০০টি প্রবন্ধ পেয়েছি। প্রবন্ধগুলো যাচাই-বাছাই করে ‘ইতিহাস’ পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে। এ ধরনের একটি প্রচেষ্টা আমরা চালাচ্ছি।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
বাংলা ভাষার উত্কর্ষ বিধানের ক্ষেত্রে যে ঘাটতিগুলো রয়েছে, তা পূরণ করুণ। বাংলা ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করুন। এটি সর্বস্তরে চর্চার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। যেসব মা-বোন ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন, তাদের সবার নাম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে যুক্ত হবে— এটি আমার একটি বড় প্রত্যাশা।