বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের জনগণের জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনা। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি মূলত সৃষ্টি হয় ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৪৭-এর আগস্ট ভারত ভাগের ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। পাকিস্তানের প্রদেশগুলোর মধ্যে পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর হার সর্বাধিক ছিল।  ভাষার মান হিসেবেও বাংলা ভাষাই ছিল সর্বাপেক্ষা উন্নত। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর স্বভাবতই পূর্ব বাংলার অধিবাসীরা ভেবেছিল, বাংলা ভাষাই রাষ্ট্রীয় সর্বপ্রকারের কাজে প্রাধান্য পাবে এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু অল্প দিনেই দেখা গেল, প্রশাসনসহ বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রে উর্দুভাষীসহ অন্য পাকিস্তানিদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাষাগত সংঘাতের এটিই ছিল প্রত্যক্ষ এবং সবচেয়ে বড় কারণ।

বাংলা ভাষা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের ভাষা। সে হিসেবে এ ভাষাই সাধারণ নিয়মে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার উর্দু ভাষা ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি পক্ষপাত করেছে। এ নীতি প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির অনুরূপ। উর্দু ভাষা যদি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হয় এবং বাংলা ভাষার দাবি উপেক্ষিত হয়, তাহলে পূর্ববঙ্গের অধিবাসীরা পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনে থাকবে। ফলে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে যে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভের কথা, তা কার্যত হবে না। এসব বিষয়ই পূর্ব বাংলার বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পটভূমি সৃষ্টি করে। এ পটভূমি সৃষ্টিকালে আমি স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। তত্কালীন পরিবেশে স্কুল আর বাড়ির আঙিনা ছাড়া  মেয়েদের বের হওয়ার আর কোনো সুযোগ ছিল না। সংবাদপত্র বা স্কুলের এবং সিনিয়র ক্লাসের ছাত্রীদের কাছ থেকে ভাষা-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা শুনতে পেতাম। তখন থেকেই অর্থাৎ স্কুল থেকেই পরস্পরের আলোচনায় একটি কথা সুস্পষ্ট হয়েছিল যে, পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষার দাবিকে স্বীকার না করে উর্দু ভাষাকেই রাষ্ট্রের সর্বপ্রকার কাজে প্রাধান্য দিচ্ছে। ১৯৫০ সালে নোয়াখালী উমা গার্লস হাই ইংলিশ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে এসে ইডেন কলেজে আইএ ভর্তি হই। মফস্বল শহর থেকে বৃহত্তর পরিবেশে এসে কলেজ হোস্টেলে নানা ধরনের ছাত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা এবং অনেক ধরনের সংবাদপত্র পড়ার সুযোগ পেয়ে রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন মতামত এবং পাকিস্তান সরকারের ও পূর্ববাংলা সরকারের নীতি বা বক্তব্যের সঙ্গে পরিচিত হই।

তত্কালে ইডেন গার্লস কলেজ মেয়েদের জন্য একমাত্র সরকারি কলেজ, যেখানে পূর্ববাংলার দূর-দূরান্ত থেকে মেয়েরা পড়তে আসত। মফস্বল এলাকার ছাত্রীরা অরফানেজ রোডে অবস্থিত হোস্টেলে থাকত। আমিও ভর্তি হয়ে এ হোস্টেলে আবাসিক ছাত্রী হিসেবে থাকার অনুমতি পাই। প্রথম বর্ষের ছাত্রী হিসেবে এ হোস্টেল সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা দ্বিতীয় বাড়ির পরিবেশের মতো। সিনিয়র ছাত্রীরা নবাগত ছাত্রীদের ছোট বোনের মতো দেখতেন। হোস্টেলে আমাদের সিনিয়র ছাত্রীদের আলোচনা ও বক্তব্য থেকে তত্কালীন অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হতাম। আবার কলেজেও কোনো গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেখানে নেতৃস্থানীয় ছাত্রীরা ছাত্রীদের সমাবেশে আলোচনা করতেন। আমরা সাধারণ ছাত্রীরা এভাবে কলেজ ও হোস্টেল থেকে সাম্প্রতিক সব ঘটনা শুনতে পারতাম। আমাদের কলেজের কমনরুম ও লাইব্রেরিতে নানা ধরনের পত্রপত্রিকা রাখা হতো। ক্লাসের ফাঁকে অফ পিরিয়ডে সেগুলো পড়তাম। এভাবেই দেশের পরিস্থিতি, রাষ্ট্রভাষার বিষয়ে সরকারি মনোভাব-নীতি, ছাত্রসমাজের দাবি ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হই।

যত দূর মনে পড়ে, সে সময় দুলু আপা, রওশন আরা বেগম ইডেনের ছাত্রীসংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিএ ক্লাসে পড়তেন এবং আকর্ষণীয় গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। মনু আপাও মনে হয় তার সহপাঠী ছিলেন। এছাড়া আরো কিছু সংখ্যক প্রগতিশীল চিন্তাধারার অধিকারী ছাত্রী ছিলেন। এদের মধ্যে লুত্ফুন্নেসা বেগম (লুত্ফা আপা) ও আমিরুন্নেসা বেগমের (আমির আপা) নাম মনে পড়ছে। তারাও আমার সিনিয়র ক্লাসের ছাত্রী এবং হোস্টেলে থাকতেন। তারাও তত্কালীন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছুসংখ্যক ছাত্রী কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে ইডেন কলেজ ও হোস্টেলে আসতেন। তারা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমাদের অবহিত করতেন। প্রচারপত্র বিলি করে যেতেন। কলেজের ছাত্রী নেত্রীরা সেসব বিষয় সাধারণ ছাত্রীদের সভায় আমাদের অবহিত করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মধ্যে হালিমা আপার কথা মনে পড়ে (তিনি শিক্ষা ও  গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও সাবেক পরিচালক)। তাদের সাহায্যে কথাবার্তা ও ছাত্রীদের সভায় আলোচনা হতো এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবির প্রতি পাকিস্তান সরকার ও পূর্ববর্তী সরকারের বিরূপ ও বিরোধী নীতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করি। আমাদের তরুণ মনে বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা বিষয়ের পটভূমি সে সময় সৃষ্টি হয়, যা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বাস্তবতা লাভ করে।

১৯৫২ সালে আমি আইএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সে সময় হোস্টেলে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা-বিষয়ক বক্তৃতা আমাদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তিনি পল্টনের জনসভায় ঘোষণা করেন— ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্রদের সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করা হয়। সেখানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। পুনরায় সভায় প্রধানমন্ত্রী যেন তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেন, তার দাবি জানানো হয় এবং এর প্রতিবাদস্বরূপ ৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডাকা হয়। এসব খবর আমরা হেনার মাধ্যমে পেতাম। ওর ভাই এমএএস জাহাঙ্গীর সে সময়ে মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। হেনা তার ভাইয়ের কাছ থেকে খবর পেয়ে আমাদের কাছে বলত (শহীদ ড. জাহাঙ্গীর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিলেন এবং পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হন)। এসব খবরাখবর জেনে আমরা উত্তেজিত হয়ে উঠতাম। মাঝে মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স হোস্টেল থেকে কতিপয় ছাত্রী নেত্রী আমাদের কলেজ ও হোস্টেলে আসতেন। ৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র ধর্মঘটে কলেজের ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও প্রচারপত্র বিলি করার জন্যও কয়েকজন এসেছেন। এ ধর্মঘট সফল হওয়ার জন্য আমাদের কলেজের মেয়েরা যেন ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রীদের কাছে প্রচারকাজ চালায় এবং আমাদের কলেজের ছাত্রীরা যেন এ ধর্মঘটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, এসব বিষয়ে তারা আমাদের সহযোগিতা চেয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনের জন্য মেয়েরা উত্তেজিত। দিনে কলেজে উত্তপ্ত পরিবেশ। আমাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছাত্রী ঢাকার মেয়েদের স্কুলে গিয়ে প্রচারকাজ চালিয়ে এসেছে। এসব কাজের জন্য কলেজ থেকে হোস্টেলে মেয়েরাই যেত। কারণ হোস্টেলে একবার ঢুকলে বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সময় নিয়ম ছিল— ক্লাস আরম্ভের পূর্বে ছাত্রীরা দলবদ্ধভাবে কলেজে যাবে এবং ক্লাস শেষে পুনরায় একসঙ্গে ফিরে আসবে। ভিজিটর আওয়ারে ভিজিটরদের সঙ্গে দেখা করা যেত। স্থানীয় অভিভাবকের অনুমতি থাকলে অনুমতিপ্রাপ্ত ভিজিটরের সঙ্গে বাইরে যাওয়া সম্ভব ছিল। দারোয়ানরা সবসময় গেটেই নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষায় সচেষ্ট ছিল। আবার ডে স্কুলারদের ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন। দরজা-জানালা বন্ধ ঘোড়ার গাড়ি চড়ে তারা কলেজে আসত। এবং ক্লাস শেষে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হতো। জানালার খড়খড়ি দিয়ে ঘোড়ার গাড়ির ভেতরে যা ভেন্টিলেশন হতো। প্রতিটি গাড়ির পেছনে একজন আয়া বসত। তারা বোরকা পরত এবং দুই চোখের জায়গা শুধু খোলা থাকত। এসব ছাত্রীর পক্ষে রুটিনের বাইরে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা সম্ভব ছিল না। পোস্টার বিলি, স্কুলে গিয়ে ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করা, পিকেটিং করা তাদের পক্ষে বিপজ্জনক ছিল। তাই তত্কালে এ-জাতীয় আন্দোলন ও ধর্মঘটের কাজে হেস্টেলের ছাত্রীরাই প্রধানত অংশগ্রহণ করেছিল। আইএ প্রথম বর্ষের ছাত্রীদের মধ্যে হেনা, রহিমা ও আমি ছিলাম। দ্বিতীয় বর্ষের সিনিয়র ছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন লুত্ফা আপা ও আমির আপা। বিএ ক্লাসের ছাত্রীদের মধ্যে দুলু আপা, মনু আপা ছিলেন। আরো কয়েকজন ছাত্রী সক্রিয়ভাবে কলেজ ও হোস্টেলে ভাষা আন্দোলনের কাজে জড়িত ছিল, তাদের নাম মনে নেই।

কলেজ ও হোস্টেলের প্রশাসন নিয়ম-শৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর ছিল। মাঝে মাঝে তারা নমনীয়তাও দেখাতেন। আমাদের হোস্টেল সুপার ছিলেন আরবির অধ্যাপক হালিমা খাতুন। তার সঙ্গে আমাদের ইংরেজির অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুনও হোস্টেলে মাঝে মাঝে থাকতেন। জনাব শামছুল হক (সে সময়ের আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা) ছিলেন আফিয়া আপার স্বামী। তিনিও মাঝে মাঝে হোস্টেল সুপার আপার  বাসায় আসতেন। এ পরিবেশে ভাষা আন্দোলনের কার্যক্রমে হোস্টেল প্রশাসন কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করেছিল।

আমার মনে পড়ে, ৪ ফেব্রুয়ারি আমরা বেশ কয়েকজন ছাত্রী হোস্টেল থেকে পালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে যাই। আমরা মিছিল করে যাই। আমাদের হাতে কয়েকটি পোস্টারও ছিল। বিভিন্ন স্কুলের মেয়েরা ও ইডেনের মেয়েরা আমরা নির্ধারিত জায়গায় বসি। মনে হয় ৩ ফেব্রুয়ারি হেনার ভাই জাহাঙ্গীর সাহেব বিকালে হোস্টেলে এসেছেন এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত থাকবেন জানিয়েছেন। আমরা কলেজ থেকে বাইরে যাওয়ায় অভ্যস্ত ছিলাম না। তাই সিনিয়র ছাত্রীরা আগেই আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, যাতে সবাই একসঙ্গে থাকি এবং লাইন করে মিছিলে যাই। আমরা সেখানে বিরাট ছাত্রজনতার সমাবেশ দেখি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতি ছিলেন জনাব গাজীউল হক (তিনি পরবর্তীকালে লব্ধ প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আমার স্বামীর বন্ধু। ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি ডেলিগেশনে গাজী ভাইও আমাদের সঙ্গে সদস্য ছিলেন)।

সভায় অনেক ছাত্রনেতা বক্তব্য রাখেন। তাদের দুটি মূল কথা ছিল— সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি দেয়া এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষা প্রবর্তন না করা। সভা শেষে ছাত্ররা মিছিল শুরু করে। মেয়েদের একটি আলাদা মিছিল হয়। সে মিছিলে আমরা কিছুদূর গিয়ে হোস্টেলে ফিরে আসি।

৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে ধর্মঘট হবে। বেশ অস্থিরতার মাঝে আমাদের সময় কাটছে। সেই ২০ ফেব্রুয়ারি বিকালে হেনা আমাদের জানাল যে, তার ভাই কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। জেলখানা থেকে গোপনীয় চিঠি এসেছে। চিঠির বিষয় হেনা বলেছে কিনা মনে নেই। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা হলো যে, ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এতে কোনো সভা-সমিতি করা নিষিদ্ধ। তিনি আরো জানিয়েছেনে, পরদিনের ঘর্মঘট ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সভা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ছাত্রসমাজের সরকারি নির্দেশ না মানারই কথা। আমাদেরও ভয় আগামীকাল কী হয়। সুপার আপা রাতে খাওয়ার সময় ডাইনিং হলে জানিয়ে গেলেন যে, ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। আমরা যেন সতর্ক থাকি, কারণ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে বিপদ হতে পারে।

হোস্টেলের ছাত্রীরা বুঝতে পেরেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সভায় যেতে হলে দেয়াল টপকিয়ে যেতে হবে। সেভাবেই আমরা ২১ তারিখ সকালে কয়েকজন কয়েকজন করে দেয়াল টপকিয়ে বেরিয়ে যাই। হেনা সঙ্গে ছিল। বড় সতর্কতার সঙ্গে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যাই। সেখানেও পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। কলাভবনের বাইরে রাস্তায় পুলিশ টহলরত। এর মাঝেও হাজার হাজার ছাত্রজনতা উপস্থিত। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ঘন ঘন এ স্লোগান দেয়া হচ্ছে। সব এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। আমরা জানতে পারলাম, ছোট ছোট দলে কয়েকজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবে। এতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হবে না কিন্তু মিছিল হবে। আমাদের সামনেই ছোট ছোট দলে ছাত্ররা বেরিয়ে পড়ল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। আমাদের ভয়ও করছিল। আমাদেরকে বলা হলো— তোমাদের এখন বেরুনোর দরকার নেই, অপেক্ষা করো। পরিস্থিতি কী হয় দেখা যাক। হঠাৎ হইচই ছোটাছুটি। পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল বর্ষণ। আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম। একজন নেতা টিয়ার শেলে আহত হয়েছেন জানতে পারলাম। পরে জানতে পেরেছি, তিনি গাজীউল হক। আমরা কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। এরই মধ্যে কলাভবন ও মেডিকেল কলেজের দেয়াল ভেঙে একটি পথ হয়েছে। হেনাসহ আমরা ইডেনের ছাত্রীরা সেই পথ দিয়ে মেডিকেল কলেজ চত্বর পেরিয়ে হোস্টেলে ফিরে আসি। ফেরার পথে দারোয়ান আমাদের গেট খুলে দেয়। যেসব ছাত্রী মিছিলে ও সভায় যায়নি, তারা আমাদের ঘিরে ধরল। কী হলো জানতে চাইল। এর মধ্যে গোলাগুলির শব্দ আরো তীব্র হলো। এর পরই সংবাদ এল, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর হাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সন্ধ্যার পর জানা গেল, আরো দুজন নিহত হয়েছেন। অনেকে আহত হয়েছেন এবং অনেক ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা মর্গে নিহতদের পাহারা দিচ্ছেন। আহতদের চিকিত্সা করছেন। হেনাই তার ভাইয়ের কাছ থেকে এসব জেনেছে। পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে— সবাই আশঙ্কা করছে। সত্যি সত্যিই সন্ধ্যায় ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হলো (সময় ও তারিখ ঠিক মনে নেই)। আমরা এবার রেডিও সংবাদ শোনার জন্য বসলাম। রেডিও শোনার জন্য সবাই উদগ্রীব। পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার জন্য ছাত্রসমাজকে দায়ী করে আপত্তিকর বক্তৃতা দেন।

পরদিন সকালে জানা যায়, ২১শে ফেব্রুয়ারির গভীর রাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের লোকেরা মেডিকেল কলেজ থেকে জোর করে মরদেহ ছিনিয়ে নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, গোপনে এ মরদেহগুলো কবর দেয়া, যাতে তাদের কবরস্থান কোথায় কেউ জানতে না পারে। কিন্তু এত সতর্কতা সত্ত্বেও কিছু অসীম সাহসী তরুণ সৈন্য ও পুলিশের চোখের আড়ালে কবরগুলো শনাক্ত করে এসেছে। এদের জন্যই এখনো আমরা ২১শে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাত ফেরি করে আজিমপুর গোরস্তানে ভাষা শহীদদের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে পারছি।

আমরা হোস্টেল থেকেই শুনতে পেলাম, ২২ তারিখ সকালে মেডিকেল কলেজে জানাজা ও শোক মিছিল হবে এবং ২২ তারিখ থেকে পরবর্তী ঘোষণা দেয়া পর্যন্ত পূর্ণ হরতাল হবে। এরই মধ্যে রাতের অন্ধকারে মেডিকেল কলেজে গুলিবর্ষণের স্থানে একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। এ সংবাদ হোস্টেলেও পৌঁছে যায়। হোস্টেলে সিদ্ধান্ত হয়, ভোরে উঠে খালি পায়ে সাদা কাপড় পরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে যাব। আমাদের প্রত্যেকের হাতে ফুল। লাল কাপড়ে ঘেরা শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে অভিভূত হয়ে পড়ি। জীবনে এই প্রথম শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেয়া। এর আগেই নানা রঙের ফুলে শহীদ মিনার ভরে উঠেছে। ক্রমাগত লোক শহীদ মিনারে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসছে। ভাবগম্ভীর পরিবেশ। সবাই শোকবিহ্বল। সে সময় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সেই ঐতিহাসিক গানটি ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ রচিত হয়েছিল কিনা জানি না। তবে কয়েক দিনের মধ্যে এ গান সবার মুখে মুখে। বেদনায় ভরপুর এ গান আজো আমাদের প্রাণে জড়িয়ে আছে।

শহীদ মিনার থেকে জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের কয়েকজনকে পুলিশের গুলিতে আহত ও লাঠিচার্জে আহত রোগীদের দেখাতে হাসপাতালের ওয়ার্ডে নিয়ে যান। ভাষা শহীদদের বরকত, জব্বার, রফিক, সালামকে যে স্থানে গুলি করা হয়েছিল, তাও তিনি দেখিয়ে দেন। কিছু রক্তাক্ত কাপড়-চোপড়ও দেখতে পাই। জাহাঙ্গীর ভাই না থাকলে এসব আমাদের দেখা সম্ভব হতো না। এরপর আমরা হোস্টেলে ফিরে আসি। প্রথম শহীদ মিনারটি একদিন পরে পুলিশ ভেঙে দিয়েছিল।

এরপর সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পেরে ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। সেই রাতে আমাদের হোস্টেল ত্যাগ করতে হয়।