অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। তবুও মনে হয় এই তো সেদিন। আবার ঘটনার খুঁটিনাটি খুঁজতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলি। সব যেন ঠিকমতো খুঁজে পাই না। পুরনো মডেলের কম্পিউটারমন সবকিছু স্মৃতিতে ধরে রাখতে বুঝি পারেনি। তবুও সে স্মৃতি অমলিন, চিরজাগ্রত, চিরভাস্বর।
মফস্বল শহর থেকে রাজধানী ঢাকায় এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য। তখন বাড়িতে থেকে আবেদনপত্র পাঠিয়ে ভর্তি হওয়া যেত। এখনকার মতো এত ঘোরাফেরা, ভর্তি পরীক্ষা, যোগাড়যন্ত্রর কিছুই করা লাগত না। যাহোক, এসেই দেখি ক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ। বাংলার মাটিতে চলছে বাংলা ভাষা নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র। পূর্ব ও পশ্চিম এ দুই পাকিস্তানের শাসনকার্য সুসমন্বিত করার জন্য তত্কালীন উর্বর মস্তিষ্ক শাসকবর্গ একটা সহজ ফর্মুলার কথা ভাবছিলেন। তা হলো রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য দুই প্রদেশে একই ভাষার ব্যবহার, অর্থাৎ উর্দুর প্রচলন। পশ্চিমাদের সবার ভাষা যদিও এক নয়, তবুও যা হয় হোক। কিন্তু বাংলাভাষী বাঙালিরা তো এ কুপ্রস্তাব মেনে নেবে না কখনই। তাই একটা চাপা আক্রোশের আগুন সবার মনের মধ্যে ধূমায়িত হয়ে উঠছিল।
ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদের মাস, প্রতিরোধের মাস। সেদিনও ছিল প্রতিবাদ, প্রতিশোধ আক্রোশের সংগ্রামের। ২০ তারিখ রাতের দুশ্চিন্তা আর উত্তেজনায় ঘুমাতে পারিনি। পরদিন ভোরে, হলের ছাত্রীদের নিয়ে আমতলায় যেতে হবে। যেতে হবে অন্য স্কুল থেকে মেয়েদের নিয়ে আসতে। স্কুল থেকে মেয়েদের বের করে আনা খুব কঠিন। আগে অবশ্য তাদের বুঝিয়ে রাখা হয়েছে। তবুও হেড মিস্ট্রেস যদি তালা বন্ধ করে রাখেন, তাহলে তো বিপদ। মুসলিম গার্লস স্কুল, আর বাংলা বাজার গার্লস স্কুল, এ দুটো স্কুল থেকে ছাত্রীদের নিয়ে আসার দায়িত্ব ছিল।
হোস্টেলের মেয়েদের সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা ছিল। মফস্বল শহর থেকে সদ্য এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার অনুরোধ হোস্টেলের ছাত্রীরা শোনে কিনা, তারা সমাবেশ ও মিছিলে যাবে কিনা, সে ব্যাপারে খুব আশঙ্কা ছিল। সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে নাদেরা বেগমের কথা মনে হলো। নাদেরা বেগম তখন আমাদের সঙ্গে ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী। রাত্রে লোকাল গার্ডিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে হাতিরপুলে নাদেরা বেগমদের বাসায় গেলাম। তাকে গিয়ে অনুরোধ করলাম হোস্টেলের মেয়েদের পরদিন আমতলায় মিটিংয়ে সমবেত হওয়ার জন্য একটা চিঠি লিখে দিতে। নাদেরা চিঠি লিখে দিল। চিঠি নিয়ে এলাম, তবে বিশেষ কাজ হলো না। চিঠি দেখানো সত্ত্বেও পরদিন ভোরে তিন-চারজন ছাড়া আর কেউ পথে বের হলো না। তাদের সবার নাম আজ আর মনে নেই। সাফিয়া খাতুন ও সুফিয়া খানের নাম মনে আছে।
আমাদের প্রথম কাজ ছিল স্কুল ও কলেজ থেকে মেয়েদের পিকেট করে আমতলায় সমবেত করা। আগেই বলেছি, আমার বিশেষ দায়িত্ব ছিল বাংলাবাজার গার্লস স্কুল ও মুসলিম গার্লস স্কুলের মেয়েদের নিয়ে আসা। আমার সঙ্গে আর কে ছিল মনে নেই— হেঁটে না রিকশায় গিয়েছিলাম, তাও মনে নেই। বাংলাবাজার খুব সম্ভব প্রথমে যাই। ওখানকার ছাত্রীদের রওনা করে দিয়ে তারপর মুসলিম গার্লস স্কুলে যাই। মুসলিম গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে আমতলায় এসে সমবেত হই। এসে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা আমতলায় এসে জড়ো হয়েছে।
আমতলায় সভা শুরু হলো। গাজী ভাই (গাজীউল হক) সভার সভাপতি ছিলেন। সভায় প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, সরকারের জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। এতে সমবেত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিল। বেশির ভাগই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ১৪৪ ধারা ভাঙার সপক্ষে সোচ্চার হলো। ছাত্রীরা, বিশেষ করে স্কুলের ছাত্রীরা সভার সিদ্ধান্ত মানতেই চাইল না। তারা উত্তেজিত হয়ে উঠল। গেটে প্রতিরোধকারী পুলিশ বাহিনীকে তারা বুড়ো আঙুল দেখাতে লাগল। সমবেত প্রতিবাদে সভার সিদ্ধান্ত বদল হলো।
তখন ঠিক হলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হবে এবং চারজন করে পুলিশ ব্যারিকেড পার হবে। সিদ্ধান্তমতো মেয়েরা প্রথমে বের হলো। প্রথম দলে তিনজন স্কুলছাত্রী ও আমি ছিলাম। সেই তিনজনের চেহারা মনে পড়ছে না। তিনটি নাম পারুল, সেতারা ও নুরী স্মৃতির ফুলবাগানে গুঞ্জন করছে। ওরা সেই বিশেষক্ষণে বিশেষ দিনে আমার সঙ্গে ছিল। অন্য সময় মিটিংয়ে-মিছিলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গী কারা ছিল, তা বলতে পারছি না। পুতুলও খুব সম্ভব আমাদের সঙ্গে ছিল। পুতুল এখন অধ্যাপিকা জুলেখা।
আইন অমান্যকারী মেয়েদের প্রথম ও দ্বিতীয় দলকে পুলিশ বাধা দেয়নি। তৃতীয় দলকে বাধা দেয় ও তাদের অ্যারেস্ট করে গাড়িতে তুলে নিয়ে অনেক দূরে ছেড়ে দেয়। মেয়েদের অ্যারেস্ট করতে দেখে ছেলেরা বন্যার পানির মতো পুলিশের ব্যূহ ভেদে করে বের হয়ে পড়ে। পুলিশ তখন প্রচণ্ড রকম টিয়ার গ্যাস ছুড়তে থাকে। চোখ-মুখ জ্বালা করতে থাকে, কাঁদতে কাঁদতে আর স্লোগান দিতে দিতে আমরা এগিয়ে চলি অ্যাসেম্বিলির দিকে। এখনকার জগন্নাথ হল, তখন ছিল অ্যাসেম্বিলির ভবন। টিয়ার গ্যাসে অপারগ হয়ে পুলিশ তখন টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ একসঙ্গে চালাতে থাকে। তবু আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। সামনে দেখি, ক’জন ভলান্টিয়ার বালতি ভরে পানি নিয়ে এসেছে। রুমাল ও শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে চোখে দিতে লাগলাম। বালতিভরা পানি দেখলে এখনো সেদিনের কথা মনে পড়ে। টিয়ার গ্যাসের বড় বড় শেল এসে পড়তে লাগল সামনে। চোখের পানিতে আর পথ দেখতে না পেয়ে ফার্স্ট এইডের জন্য মেডিকেল কলেজে ঢুকে পড়লাম।
মেডিকেল কলেজের মধ্যে তখন কনস্ট্রাকশনের জন্য প্রচুর ইট জমা করা হয়েছে। হাসপাতাল চত্বরে তখন প্রচুর লোক জমা হয়ে গেছে। তার মধ্যে ছাত্রই বেশি। রাস্তায় তখন পুলিশের লাঠি আর টিয়ার গ্যাস চলছে প্রবল আকারে। মারমুখী পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে মেডিকেলের ভেতর থেকে ছাত্ররা ইট ছুড়তে শুরু করে দিল। সুলতানউজ্জামান ও আরো অনেক পরিচিত ছাত্রকে আমি সেখানে দেখলাম। আমি তাদের সরে যেতে বললাম।
তখন গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে। ইমার্জেন্সির দিক থেকে আহতদের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমরা কয়েকজন সেদিকে গেলাম। দেখলাম স্ট্রেচারে করে অনেকে ছাত্রদের নিয়ে আসছে। শরীর থেকে তাদের রক্ত ঝরছে। রক্তের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি ওয়ার্ড ভরে গেছে। আহত মানুষের সেদিনের সেই আর্তনাদ এখনো যেন কানে লেগে আছে।
সারা দিন প্রায় মেডিকেলে ছিলাম। আহতদের দেখে নিজেদের যন্ত্রণার কথা, ক্ষুধা, তৃষ্ণার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। রাস্তায় কী হচ্ছে, কে মারা গেছে, কে বেঁচে আছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। গোলাগুলি থামলে কোনোমতে সন্ধ্যার দিকে হোস্টেলে ফিরেছিলাম। পথে একটা স্কুলের ছেলের মৃতদহ দেখেছিলাম। তার বই-কেতাব পাশে পড়েছিল। আজ যেখানে শহীদ মিনার, ওখানে গিয়ে যা দেখি তা কোনো দিনই ভুলবার নয়। অত রক্ত এক জায়গায় কখনো দেখিনি। আমাদের পতাকা দেখলে কেন জানি ওই রক্তের কথা মনে পড়ে যায়। ওখানে আরো দেখেছিলাম, বরকত বা সালাহউদ্দিনের চূর্ণ হয়ে যাওয়া মাথার খুলি থেকে ছড়িয়ে পড়া মগজ। একরাশ বকুল ফুলের মতো সেই মগজ সেখানে বকুল ফুলের আলপনা রচনা করেছিল। সেখানেই শহীদ মিনার সগর্বে দাঁড়িয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ভাষা বাঁচাবার দুঃসাহসী অভিযানের কাহিনী বলছে। শহীদ মিনার তাই আমার কাছে এক অন্য রকম বকুলতলা।
[ নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা থেকে প্রকাশিত ভাষাকন্যা বই থেকে সংকলিত ]
লেখক: ভাষাসংগ্রামী






