নগর উদ্ভব ও বিকাশের ধারণায় নগর হচ্ছে এক অপারসম্ভাবনার জায়গা, ঠিক তেমনি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সম্মিলনে নগর এলাকা হচ্ছে বৈচিত্র্যের আধার। হরেক রকম মানুষের এ বৈচিত্র্যই নগরকে প্রকৃত অর্থে নান্দনিক করে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ভাবনাতে, নগর হবে সবচেয়ে উন্নত চিন্তার মানুষের জনবসতি। প্লেটোর ভাষ্যমতে, নগর মানুষের অমিত সম্ভাবনার বিকাশের জায়গা; সব নাগরিককে সেবা প্রদানের সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি এবং ন্যায় ও সর্বজনীন সাম্য প্রতিষ্ঠার জায়গাও এ নগর। নগরের এ সর্বজনীন ও উন্নত ধারণার বিপরীতে আধুনিক নগরগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট বোধ হয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে ধারণ করতে নগরের সামগ্রিক ব্যর্থতা; বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নগর এলাকাগুলোর জন্য এ বাস্তবতা আরো বেশি মাত্রায় প্রাসঙ্গিক।

২. বিশ শতকের নগরায়ণের বৈশ্বিক যাত্রায় নগর এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের আবাসন, মৌলিক পরিষেবা এবং জীবনমানের যে উল্লেখযোগ্যপূর্ণ বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছে, তাকে উপলব্ধি করেই ২০০০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক আমাদের বৈশ্বিক অঙ্গীকার সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এসডিজি) তৈরি করা হয়েছে। ২০০০ সালের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্য-৭-এ টেকসই নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে গিয়ে ২০১৫ সালের মধ্যে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ২০২০ সালের মধ্যে বস্তিবাসীদের জীবনমানের তাত্পর্যপূর্ণ উন্নতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে মানসম্মত আবাসন লক্ষ্যটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন (লক্ষ্য ৬), টেকসই নগর ও জনবসতি (লক্ষ্য ১১ বা নগর লক্ষ্যমাত্রা) নির্ধারণ করার পাশাপাশি লক্ষ্য ১০-এ আমাদের উন্নয়ন বৈষম্য কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ বাস্তবতায়, এমনকি করোনা-উত্তর পৃথিবীর নগর পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে নাগরিক সুবিধাদি ও মৌলিক পরিষেবার পরিমাণগত ও গুণগত মানের বৈষম্য দূর করাটাই নীতিনির্ধারক এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও কর্তৃপক্ষগুলোর সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেয়া উচিত—বৈশ্বিক লক্ষ্যগুলো আমাদের সেই দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের জায়গাটাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

এসডিজির নগর লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে, আমাদের শহর ও জনবসতিগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাত সহনশীল ও টেকসই হতে হবে। টেকসই নগর গড়তে ২০৩০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রগুলোকে সবার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন এবং মৌলিক পরিষেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বস্তিগুলোর তাত্পর্যপূর্ণ মানোন্নয়ন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়ুমানের উন্নতি ঘটানোর মাধ্যমে নগরায়ণের বিরূপ প্রভাব কমানোর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা, সবুজ এলাকা ও গণপরিসরে সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে নগরে সর্বজনীন সাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত হয়েছে এসডিজিতে। এ লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের জন্য অংশগ্রহণমূলক, সমন্বিত ও টেকসই নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনাকেই মূল প্রভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

৩. আগামী দিনের জন্য বসবাসযোগ্য বিশ্ব গড়তে মানব সম্প্রদায়ের মূল চ্যালেঞ্জ তাই কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা নয়, বরং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে কতটা ভারসাম্যপূর্ণভাবে বণ্টন করা যায় সেটাই মূল বিবেচ্য হওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে নগর এলাকার মানুষের কাছে পরিকল্পিত উপায়ে নাগরিক সুবিধা ও পরিষেবাগুলো পৌঁছে দেয়ার চ্যালেঞ্জটা উন্নয়নশীল দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্বের দাবি রাখে। ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের যে ছবি আমরা আঁকার চেষ্টা করছি, তা কখনো এ উন্নয়ন বৈষম্যের বিদ্যমান বাস্তবতাকে অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না।

উন্নয়নের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে, যেই প্যারাডক্স এ উন্নয়নের সফলতাকে একই সঙ্গে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় যে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তলাবিহীন ঝুঁড়ি বলে অভিহিত করেছিল, সেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে অনেকের কাছে এখন গর্ব করে বলার মতো উদাহরণ। এ দেশে দারিদ্র্যের হার তাত্পর্যপূর্ণভাবে কমেছে, অর্থনীতির বিকাশ হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, এখন আমরা অনেক মেগা প্রজেক্টে—বিশেষত যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছি বিশাল অংকের অর্থায়ন। আবার একই বাস্তবতায় এ দেশের কিছু অঞ্চলে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দারিদ্র্য বিদ্যমান, আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতি দুর্বল ও ভঙ্গুর, নগর এলাকায় দরিদ্র জনগণের বিশালসংখ্যক অংশ এখনো থাকে বস্তি এলাকায়; আবার বস্তি এলাকার পরিসীমার বাইরেও আমাদের নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষেরা যে ধরনের বসতি এলাকায় থাকেন, সেখানে নাগরিক সুবিধাদি ও পরিষেবার গুণগত ও পরিমাণগত মান আশঙ্কাজনভাবে দুর্বল।

৪. আমাদের নগর এলাকাগুলোয় উন্নয়ন বৈষম্য দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান, যা পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ভাবনার দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে ভাবনার দাবি রাখে। রাজধানী শহর ঢাকায় অভিজাত গুলশানের একদম পাশাপাশি কড়াইল বস্তির ছবি আমাদের উন্নয়ন প্যারাডক্সের এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। মেগা সিটি ঢাকায় গুলশান, বনানী, বারিধারা কিংবা ধানমন্ডির মতো উন্নত ও পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলো রয়েছে; যেখানে মানসম্মত আবাসন, ফুটপাথ, বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধাদি গড়ে উঠেছে। আবার কড়াইল, হাজারীবাগ, ভাসানটেকের মতো বস্তিও এ শহরেই রয়েছে। এখন নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দর্শনে এ বস্তির পাশে আমাদের আধুনিক জনবসতির সহাবস্থানকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব এবং এ থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনের পরিকল্পনায় কীভাবে এ বসতিগুলোর ভবিষ্যৎ নিরূপণ করব সেটা আমাদের নির্মোহ বিশ্লেষণের বিষয়। একই সঙ্গে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন এবং মৌলিক পরিষেবা নিশ্চিত করতে নীতি-নির্ধারকদের উন্নয়ন ভাবনায় টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনার গুরুত্ব সুনির্দিষ্ট করতে মানবিক উপলব্ধি সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৫. বিগত শতকে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও অর্থনীতিবিদরা ট্রিকল ডাউন ইকোনমি বা চুইয়ে পড়া অর্থনীতির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন ব্যাপকভাবে, যার মূল নীতিতে ছিল সমাজে বৈষম্য বাড়লেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে ধনীদের কাছ থেকে অর্থের স্বল্প প্রবাহ গরিবদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সময়ের আবর্তে এ চুইয়ে পড়া অর্থনীতির তত্ত্ব মানব সম্প্রদায়কে পৃথিবীব্যাপী বৈষম্য বাড়ানো ছাড়া তেমন কিছুই দিতে পারেনি, ফলে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এ নীতিতত্ত্ব যে বিশ্ব মানবতার জন্য ফলপ্রসূ ও কার্যকর নয়, তা ইদানীংকালে স্বীকার করে নিয়েছে। ঠিক একইভাবে আমাদের নগরগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনায় অনেক ক্ষেত্রে এ চুইয়ে পড়া অর্থনীতির উদাহরণ দেখা যায়। নগরগুলোর বিকাশ ও বেড়ে ওঠায় নগরের নান্দনিকতা-সৌকর্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর নাগরিকদের জন্য নাগরিক সুবিধাদির বিকাশ ঘটায়; বিপরীতে নগর এলাকায় বস্তি ও নিম্ন আয়ের লোকদের অবাসযোগ্য বসতির জন্ম ও বেড়ে উঠতে দেয় এবং চুইয়ে পড়া অর্থনীতির মতোই এ নিম্ন আয়ের লোকেরা সৃষ্টির সেরা মানুষ না হয়ে ইতর প্রকৃতির জীবন নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকে এ ধরনের জনবসতিতে; যাদের আয়ের মূল উৎস প্রধানত উন্নত এলাকার মানুষদের সেবা দেয়ার অনানুষ্ঠানিক কাজের মধ্যে ব্যাপ্ত। এসব বস্তি এলাকায় পানি, স্যানিটেশন, গ্যাস-বিদ্যুৎ, মৌলিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি পরিষেবা ও নাগরিক সেবার কোনোটাই নগর এলাকায় যে আধুনিক জীবনযাপনের কথা বলা হয়, তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

৬. এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ টানা যেতে পারে। আমাদের ঢাকা শহরের বস্তিবাসীদের জন্য নাগরিক পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখ করার মতো উদাহরণ হচ্ছে ২০১০ সাল থেকে ঢাকা শহরের নির্দিষ্ট কিছু বস্তি এলাকায় ওয়াসার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পানি সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বস্তিবাসীরা তুলনামূলকভাবে কম খরচে ওয়াসার পাইপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পানি পেতে পারেন।

বস্তি এলাকায় বৈধ প্রক্রিয়ায় পানি সরবরাহ করার উদাহরণটি আশাব্যঞ্জক একটি ঘটনা, কেননা অনেক ধরনের আইনি জটিলতা থাকার পর ও সরকারি সংস্থা হিসেবে ওয়াসা পানিপ্রাপ্তিকে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকার করে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে, যা বস্তিবাসীদের পানির সংকট নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রতিজন মানুষের দৈনিক পানির চাহিদা ১৫০ লিটার হলেও বিআইজিডির এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ওয়াসার পানি সরবরাহের আওতাধীন কড়াইল বস্তিবাসীর গড় পানি ব্যবহার ৮৫ লিটার, যেখানে গুলশানবাসীর গড় ব্যবহার ৩১০ লিটার। চুইয়ে পড়া অর্থনীতির তত্ত্বের মতোই আমাদের নাগরিক পরিসেবাগুলোও নির্দিষ্ট মানের সেবা নিশ্চিত না করে আপত্কালীন ব্যবস্থা বা বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম কিছু জোগানের ব্যবস্থা করছে। এখন বস্তিবাসীদের জন্য ওয়াসার প্রয়াস নিশ্চিতভাবেই প্রশংসনীয় হলেও মৌলিক যে প্রশ্নটি পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, তা হচ্ছে এমন নগর কি আমাদের প্রত্যাশিত ছিল, যেখানে মৌলিক পরিসেবার মধ্যে ও ন্যূনতম মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার পাশাপাশি চরম বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। নগর বলতে টেকসই ও উন্নত যে নগর জীবনের আমরা ছবি দেখি, আমাদের নগরায়ণের বিদ্যমান ধারা কি আমাদের সর্বজনীন নগরের সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে?

৭. করোনাকালে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের ওপর জনগণের কাঙ্ক্ষিত দাবির বিষয়টি সব দেশেই প্রকাশ্যেই এসেছে। একই সঙ্গে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তাসহ মৌলিক মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিশ্চিত করার ব্যাপারে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়েছে। এ বাস্তবতায় সামনের দিনগুলোতে নগর এলাকার মানুষের বাসস্থানসহ মৌলিক পরিষেবা ও নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সরাসরি ভূমিকার বিষয়টি আরো জোরালো স্বরে বিশ্বব্যাপী উচ্চারিত হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নগর এলাকার বাসস্থান, পরিবহন, মৌলিক সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে শিক্ষা-চিকিৎসা সুবিধা, পানি-স্যানিটেশন, গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রভৃতি নাগরিক সুবিধাদি বেসরকারি সংস্থা বা উদ্যোগ কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতির হাতে পুরোপুরি না ছেড়ে দিয়ে কীভাবে সবার জন্য মানসম্মতভাবে নিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারে নীতি-পরিকল্পনা-কার্যপন্থা নির্ধারণ করা একান্ত প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আমাদের সেদিকেই ধাবিত করে। এক্ষেত্রে বিশ্বে কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রশংসিত সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, নরওয়ে প্রভৃতি দেশের উদাহরণ আমাদের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সেটা নিশ্চিত করাটা তাদের প্রাধিকারের অংশও বটে।

৮. নগরের পিছিয়ে পড়া জনগণের জীবনমানের মানবিক মান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা ও পরিষেবার পরিমাণগত ও গুণগত মানের ভিত্তিতে পরিকল্পনাগত সূচক-মান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরে বিভিন্ন আয়ের মানুষের মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির সংস্থান করতে রাষ্ট্রকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আবাসনের মতো মৌলিক অধিকারের বিষয়টি শুধু বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিলে সবার জন্য মানসম্মত আবাসন যে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না, এটা এখন ধ্রুব সত্য। আশার বিষয় হচ্ছে, সরকারের সাম্প্রতিক কিছু নগর ও গ্রামীণ এলাকার আবাসন উদ্যোগে সবার জন্য আবাসন নিশ্চিতে সরকারি সংস্থাগুলোর আগ্রহের বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতি-কৌশল নির্ধারণের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কেবল পরিকল্পিত ও মানসম্মত আবাসন এলাকা তৈরির মাধ্যমেই নাগরিক সুবিধাদি মানবিক মানে নিশ্চিত করা সম্ভব; নিম্নআয়ের এলাকায় কোনোরকমে কিছু পরিষেবা জুড়ে দিয়ে টেকসই জনবসতি গড়ে তোলা সম্ভবপর হবে না কখনই।

৯. নগরের বিশালসংখ্যক মানুষকে অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য করে কোনো রাষ্ট্রই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান নাগরিক সুবিধা ও পরিষেবার বৈষম্য বাড়তে দেয়ার লাগাম টানাটাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র ও নগর সৃষ্টির মহৎ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কাছাকাছি পৌঁছার নির্মোহ চেষ্টা তো অন্তত আমাদের করতে হবে। টেকসই নগর ও জনবসতি নিশ্চিত করার উন্নয়ন অভীষ্টে পৌঁছতে এখনো আমাদের অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।

 

ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ সম্পাদক; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।

অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়