মুহাম্মদ আজিজ খান। সামিট গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। বিদ্যুৎ-জ্বালানি, বন্দর, লজিস্টিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও আতিথেয়তা খাতে বিনিয়োগ রয়েছে সামিট গ্রুপের। পাশাপাশি তিনি ফিনল্যান্ডের অনারারি কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ভূষিত হয়েছেন এশিয়ার অন্যতম আউটস্ট্যান্ডিং লিডার উপাধিতে। পাঁচ দশকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সফলতা, ব্যর্থতা ও চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তায় সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম

বাংলাদেশের ৫০ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সফলতা ও চ্যালেঞ্জগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন? 

আমাদের সভ্যতার পথ কৃষকরা খাদ্য জোগানের মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর শিল্পায়নের যুগ এসেছে। এই যুগ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার বড় উপায় ছিল বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ শিল্পায়নের অবকাঠামো। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো মাত্র ৪০০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ ছিল কৃষিনির্ভর, যা মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে শুধু খাদ্যের প্রয়োজনটাই নিশ্চিত করত। খাদ্য ছাড়াও মানুষের অনেক রকমের প্রয়োজন থাকে। বিশ্ব এগিয়েছে শিল্পায়নের মাধ্যমে। আর শিল্পায়নে গতি বাড়িয়েছে বিদ্যুৎ। কাজেই বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের সরকার উভয়ই অনুধাবন করেছে। যার ফলে আজ বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে প্রায় ৪০টি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি তৈরি হয়েছে। এটা অনেক বড় ঘটনা। বিষয়টি সব দিক থেকে আনন্দের। এ কারণেই আমরা আজ কৃষির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়নেও আসতে পেরেছি। আর দেশের উদ্যোক্তারাই শিল্পায়নে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দেশীয় কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এটা বড় সফলতা।

বর্তমানে বিশ্ব বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রথমটি হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বা পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। এখন এ চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার জন্য বলা হচ্ছে ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। এর সঙ্গে নতুন যুক্ত হয়েছে কভিড। এই দুটি মিলে চ্যালেঞ্জ বহুগুণ বেড়েছে। কভিডের জন্য ফসিল ফুয়েলের সরবরাহ কমে গেছে। কভিডের কারণে কাতার, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া কোন দেশই জ্বালানি তেল ও গ্যাসসম্পর্কীত পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে পারেনি। কিন্তু যখন খুলেছে তখন সবাই দারুণভাবে উৎপাদনে গেছে। একদিকে চাহিদা বৃদ্ধি অন্যদিকে সরবরাহ ক্ষমতার ঘাটতি—এ দুই চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে জ্বালানির দাম অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশ যার মাথাপিছু আয় ২ হাজার ১০০ ডলার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তার জন্য সমস্যার বটে। কারণ প্রতি ব্যারেল তেল এখন ৭০ থেকে ৮০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। সরকার প্রতি ঘনফুট গ্যাস ২৯ ডলারে কিনছে। কিন্তু বিক্রি করছে ২ থেকে ৩ ডলারে। বিদ্যুৎও বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করছে। এক্ষেত্রে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এ অস্থিরতা সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে। যার প্রতিফলন এখন গোটা বিশ্বে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে পৃথিবী একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। ফসিল ফুয়েলে কে কত টাকা বিনিয়োগ করবে তা নিয়ে সবাই দ্বিধাগ্রস্ত। সারা পৃথিবীতেই এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে না। যদিও মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশ নিচের সারিতে অবস্থান করছে। কার্বন নিঃসরণ করতে করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলো শিল্পায়ন করে ফেলেছে। বাংলাদেশ কেবল শিল্পায়নের যুগে প্রবেশ করছে। এ সময়ে এত প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়া সত্যই কঠিন। আমি আবারো বলছি, পৃথিবীর মানুষের জন্য বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। এক্ষেত্রে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে সেটা ভাবনার বিষয়।

একসময় বিদ্যুৎ খাত ছিল সরকারি নিয়ন্ত্রণে, এখন বেসরকারি খাতনির্ভর। বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি খাতের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে আপনার মতামত কি? 

এক্ষেত্রে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ও অন্যটি আইনি চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশ এখনো কিছুটা ক্যাপিটালিজম ও কিছুটা সোশ্যালিজম মিক্সড করে চলছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেসরকারি খাতে ছাড়া হয়েছে, সেটাকেও আবার বলা হচ্ছে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ। কারণ গ্যাস সরকার দিচ্ছে কিংবা গ্যাসের মূল্য সরকারই নির্ধারণ করে দিচ্ছে। আবার বিদ্যুৎও বিক্রি করতে হচ্ছে সরকারের নির্ধারিত মূল্যে। ফলে আমরা গ্যাসেরও ঝুঁকি কমিয়ে নিচ্ছি আবার বিক্রির ঝুঁকিও কমিয়ে নিচ্ছি। আবার এ ঝুঁকি নেয়ার ক্ষমতাও আমাদের নেই। গ্যাসের আমদানি ও উৎপাদন দুটিই সরকারের হাতে। মানুষের ঘরের বিদ্যুৎ বাংলাদেশ সরকারের হাতে। বেসরকারি খাত ঝুঁকি নিচ্ছে না কারণ তাদের সে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। মানুষের বাসায় গিয়ে বিল করার অধিকার ব্যক্তি খাতের নেই কিংবা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করার বা গ্যাস এনে ব্যবহার উপযোগী করার অধিকার তাদের নেই। গ্যাসের অধিকার সম্পূর্ণ পেট্রোবাংলার। আর বিদ্যুতের ট্রান্সমিশন এবং ডিস্ট্রিবিউশন সরকারি কোম্পানিরই হাতে। ফলে ব্যক্তি খাত আইসোলেটেড হয়ে আছে। এগুলো হলো রেগুলেটরি ও লিগ্যাল চ্যালেঞ্জ। এটা বেসরকারি খাত সমাধান করতে পারবে না। এটা সরকারকেই চিন্তা করতে হবে যে আগামী দিনগুলোর জন্য কী নীতি গ্রহণ করা হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা থেকে বিশ্ব সরে যাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ মিশ্র জ্বালানির ব্যবস্থা করতে পারেনি। এখন জ্বালানি সংকট দেখা যাচ্ছে। সমাধানের পথ কি?

প্রাথমিক জ্বালানিটা গোটা পৃথিবীতেই রাজনীতিবিদ, বৈশ্বিক রাজনীতি, বৈশ্বিক আয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত। জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বলা হয়। বিশ্বের অনেক যুদ্ধ হয়েছে প্রাথমিক জ্বালানির জন্য। পেট্রোল নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে, আমেরিকানরা এটাকে পেট্রোডলার বলেছে। নামই হলো পেট্রোডলার। তেলকে ডলারাইজ করা হয়েছে। সেজন্যই পেট্রোডলার। সৌদি অ্যারামকো আমেরিকান কোম্পানিই শুরু করেছে। এখন আছে চীন। জনসংখ্যা ও অর্থনীতি বিবেচনায় সবচেয়ে বড় দেশ চীন। এখন আমেরিকা চাচ্ছে তাদের নতুন প্রযুক্তি বিক্রি হোক। হাইড্রোজেন, অ্যাটোমিক পাওয়ার, সোলার, ব্যাটারি—প্রভৃতি আবিস্কার হচ্ছে আমেরিকা থেকে। দেশটি চায় এ আবিষ্কারগুলো থাকুক। এ আবিষ্কারগুলোকে প্রণোদনা দিতে গিয়ে তারা প্রাথমিক জ্বালানি থেকে সরে আসছে। এ কারণে বাংলাদেশের গ্যাস আবিস্কারের প্রতি তাদের ততখানি আকর্ষণ আর নেই। তাদের কৌশলগত পর্যালোচনা অন্য জায়গায় চলে গেছে যে—আমরা নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করব। সারা পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ওই প্রযুক্তি ব্যবহারে সম্মত হয়েছি। 

পৃথিবীর বড় বড় কোম্পানিগুলো আফ্রিকা, আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনিসহ সব জায়গায় বড় বড় গ্যাসফিল্ড পেয়েছে। সেগুলো ফসিল ফুয়েল। কিন্তু প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী ২০৪০ সালের পর তারা আর ফসিল ফুয়েল ব্যবহার করতে চায় না। অর্থাৎ তাদের কাছে ২০ বছর সময় আছে। ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বড় বড় যে গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবিস্কার করা হয়েছে সেগুলো এ সময়ের মধ্যেই বিক্রি করতে হবে। সেগুলো কিনবে কে? বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, জাপান, চীন—যাদের সম্পদ নেই কিন্তু বড় জনগোষ্ঠী আছে।

কিছুদিন আগেও আমরা ভাবতাম বাংলাদেশ গ্যাসে ভাসছে। এ গ্যাস গেল কোথায়? ১০-১৫ বছর আগে ভাবা হতো এত গ্যাস যে তা রফতানি করা যাবে। বলা হতো ৭০ টিসিএফ গ্যাসের মজুদ রয়েছে। এখন ৩০ টিসিএফের মতো গ্যাস আছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখানে এসেছে, তারা বলছে ৭০ টিসিএফ গ্যাস আছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনস্টিটিউট বলছে, বাংলাদেশে ৭০ টিসিএফ গ্যাস রয়েছে, এখন সবাই বলে ৩০ টিসিএফও নেই। বলা সহজ প্রাথমিক জ্বালানি কেন ওঠানো হচ্ছে না, কিন্তু প্রযুক্তি তো নেই। গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনে যে প্রযুক্তি লাগে আর যে ঝুঁকি নিতে হয়, তা নেয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের এখনো হয়নি। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতেরও হয়নি। যারা বিনিয়োগ করবে তাদেরও বিবেচনায় বিশ্ব অর্থনীতি, বৈশ্বিক উষ্ণতা আর গ্যাসের রিজার্ভ। প্রশ্ন হলো, আমি কি নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার ও তা উত্তোলন করতে চাই? যেটা ২০৪০-এর পর আর বিক্রি করা যাবে না।

আমরা কত তাড়াতাড়ি উন্নত দেশ হতে পারব, আমাদের জিডিপি কত তাড়াতাড়ি বাড়বে, সেটার ওপর নির্ভর করবে আমাদের ক্রয়ক্ষমতা। আমরা বলছি, আমাদের ক্রয়ক্ষমতা অনেক বেশি। বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্রিজ নির্মাণ করছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অনেকের সঙ্গে এ নিয়ে তর্ক হয়েছে আমার। অনেকে বলেছিল পদ্মা সেতু করলে রিজার্ভে কোনো অর্থ থাকবে না। কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারব। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ বাংলাদেশ কিছুটা হলেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস দিতে পেরেছে। ফলে শিল্পায়ন হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করেছে যে তারা কাজ করতে পারে। তারা প্রমাণ করতে পেরেছে যে তারা উদ্যোক্তা। এ জন্য দেশ এগিয়ে গেছে। এ ধারাবাহিকতা যদি আমরা রাখতে পারি এবং ৭ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যদি বজায় রাখা যায়, তাহলে বেশি দামে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ কেনাও সম্ভব হবে। বাংলাদেশে তেল-গ্যাস বিদ্যুতের চাহিদা এখন অনেক বেড়েছে। চাহিদা ও মূল্য পরস্পর সম্পর্কিত। বর্তমানে বাংলাদেশের যে জনসংখ্যা সেখানে গ্যাসের দৈনিক ন্যূনতম চাহিদা ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। যে দামেই হোক আমাদের গ্যাস আনতেই হবে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ তেল-গ্যাসের চাহিদা সেটি কমানো সম্ভব নয়। তারপর প্রশ্ন আসতে পারে, বাংলাদেশ সরকার কি দেউলিয়া হয়ে যাবে নাকি। বাংলাদেশের তর’ণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক পণ্য রফতানির উর্ধ্বগতি আমাদের অর্থের চাহিদা মেটাবে। এই কভিডের মধ্যেও কারখানা চলেছে। পদ্মা সেতু তৈরি হয়েছে। মানুষ কিন্তু বসে নেই, কাজ করে যাচ্ছে। অনেক সময় সরকার ঘরে বসে থাকতে বললেও মানুষ কাজ করতে চাইছে।

২০১৬ সালে বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। সেটি এখন পুনরায় পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

বিদ্যুতের যে চাহিদা সরকার পরিকল্পনা করেছিল সেটি বাড়েনি। বাড়েনি এটা আরো ভালো হয়েছে। এ সময়ে বিশ্ব অ্যানালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত হয়েছে। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে বিদ্যুৎ কম লাগে। প্রত্যেকটি বাল্ব এখন এলইডি। একই আলো পেতে এখন ১০ ভাগ বিদ্যুৎ কম ব্যবহার হয়। মোটরের বদলে এখন ইলেকট্রনিক চিপস ব্যবহার হচ্ছে। এটা খুব খুশির বিষয় যে এখন আগের মতো বেশি বিদ্যুৎ লাগছে না। এত তাড়াতাড়ি যে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এসে যাবে, এত তাড়াতাড়ি যে অ্যানালগ ওয়ার্ল্ড পিছিয়ে যাবে সেটা কেউ আগে বুঝতে পারেনি। আমাদের এখানে শিল্পায়ন এখনো সেভাবে হয়নি। শিল্পায়ন যখন শুরু হবে তখন আবার বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। 

বাংলাদেশ সরকার শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনকে মুক্তবাজার অর্থনীতির উদ্যোক্তাদের হাতে দিয়েছেন। সামিটও তাদের ভেতরে একটি কোম্পানি। সময়মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। কিন্তু ট্রান্সমিশন লাইন, ডিস্ট্রিবিউশন লাইন, গ্যাস কানেকশন লাইন—এগুলো সরকারের হাতে। তারা সেভাবে এগোতে পারেনি। দুর্বল ট্রান্সমিশন লাইনের জন্য ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা এখন গ্যাসের কারণে পুরোদমে চলতে পারছে না। এই চ্যালেঞ্জগুলো আমরা কাটিয়েও উঠব কিছুদিন আগে আর পরে। এই ওঠানামা অবাস্তব কিছু না। কিন্তু আমরা যে ডিজিটাল প্রযুক্তি আত্মস্থ করতে পেরেছি সেটার জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। যারা করতে পেরেছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ কেমন মনে করছেন?

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিষয়ে পৃথিবীর মানুষ এখন চিন্তা করছে। এমনভাবে চিন্তা করছে যে সমাধান আসবেই। আমার মতে একটা বিষয়ই অনির্দিষ্ট সেটা হলো মানুষের মন। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, মহাবিশ্ব, বিগব্যাং থিওরি, আরএনএ, ডিএনএ—সবকিছু নিয়েই মানুষ এখন চিন্তা করতে পারছে। এই যে চিন্তা করার ক্ষমতা, সেটা এখন নবায়নযোগ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুনির্দিষ্ট এবং সুচিন্তিত হয়েছে।  এ ক্ষেত্রগুলো অনেক দ্রুতই এখন উন্নত হবে। এতে যোগ দেয়ার জন্য খুব চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এখন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের চেয়ারম্যান হয়েছেন। তার সুযোগ্য সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশের লিডার। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে খুবই ওয়াকিবহাল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল যদি একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তবে সাফল্য আসতে সময় লাগবে না। আমাদের এখানে জমির স্বল্পতা রয়েছে। তাছাড়া আমাদের সৌরশক্তিও কম পাওয়া যায়। কিন্তু ভারতে রাজস্থানসহ অনেক জায়গায় সোলার পাওয়ার অনেক শক্তিশালী। ভারতে অনেক জায়গা আছে যেখানে বাতাস অনেক শক্তিশালী। এ জন্য তারা এখন অনেক কম মূল্যে সোলার ও উইন্ড বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জোগান দিতে পারছে। সেখান থেকে আমরা বিদ্যুৎ আনতে পারি। আমাদের এ উপমহাদেশের হিমালয় পর্বত, সেখানে পানি বিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে, সেটা এ উপমহাদেশের সব দেশেরই পাওয়া উচিত। সেটা যদি আমরা একসঙ্গে করতে পারি তাহলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি দূর হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদসহ দেশগুলোর মানুষের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সহযোগিতাপূর্ণ চিন্তাভাবনা গুরুত্বপূর্ণ।

গ্যাস উত্তোলনে আমরা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠাননির্ভর। ভবিষ্যতে প্রাথমিক জ্বালানি বা গ্যাস উত্তোলনে সামিট ভূমিকা রাখবে কি?

এখন ফসিল ফুয়েলের যুগ শেষ হয়ে আসছে, এমনটাই বলা হচ্ছে। আমি সামিটের হয়ে বলতে পারি, আমরা এখন ক্রস বর্ডার ইলেকট্রিসিটির দিকে খুব মনোযোগী হব। যাতে করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করা যায়। যে দেশে নবায়নযোগ্য সম্ভাবনা বেশি আছে, সেটা ভুটান বা নেপালের জলবিদ্যুৎ হোক, ভারতের বায়ুবিদ্যুৎ হোক কিংবা সোলার পাওয়ার হোক, এগুলো বাংলাদেশে আনার বিষয়ে আমরা খুব আগ্রহী। কারণ বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সেখানে প্রায় অর্ধেকই পানিতে ডুবে থাকে। সেখানে আমরা মাছ চাষ করে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করছি। ভূমিতে ধান চাষ করছি। অন্য জায়গাগুলো সব শহর হয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার আমাদের সূর্যের বিকিরণ খুব কম। এখানে বর্ষার দিনে বৃষ্টি হয়, শীতের দিনে কুয়াশা থাকে। গতিশীল বাতাসও আমাদের বেশি নেই। আমাদের যেটা বেশি আছে সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে। দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থান বাংলাদেশই করে। এটা বড় সাফল্য। এর মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।