২০১০ সালে মূলত পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়ন করার কথা। সে হিসেবে সব কার্যক্রম চলেছে। এর ডিজাইন, মানদণ্ড সবই বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় হয়েছে। পদ্মায় কী ধরনের সেতু করা হবে, তা প্রথম থেকে নির্ধারিত ছিল। এখানে রেল যাতায়াতের সুযোগ থাকতে হবে। কোন ধরনের উপকরণ নিয়ে নির্মিত হবে, সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এটি ইস্পাত নির্মিত সেতু হবে। এটা মাথায় রেখে এর সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়। সম্ভাব্যতায় কেবল কোন উপকরণ দিয়ে তৈরি হবে তা নয়, এটা নির্মাণ করতে কত খরচ হবে, তাও যাচাই করা হয়। তারপর ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক একটা অভিযোগ  তোলে, এখানে একটা দুর্নীতির সম্ভাবনা রয়েছে কিংবা দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে। সরকার খুব বেকায়দায় পড়ে। পরে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ডাকেন। তারা বলেন, আমরা কোনো ধরনের দুর্নীতি করিনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরাই চিঠি  দিই, তোমাদের সাহায্য নেব না। প্রধানমন্ত্রী সাহস করে সিদ্ধান্ত নিলেন, পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে হবে।

মনে পড়ে ২০১৩ সালের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘ছয় মাসের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারবেন না।’ সেখানে ড. গিয়াস চৌধুরীও ছিলেন। আমরা দুজনই বলেছি, ইনশাআল্লাহ পারব। তিনি উৎসাহ দিতেন, খোঁজখবর নিতেন। বলে রাখা ভালো, পদ্মা সেতুর পুরো খরচ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক শুধু একটি অংশের কারচুপির অভিযোগ এনেছিল। এর পাঁচটা ভাগ আছে। এক. মেইন ব্রিজ, দুই. রিভার ট্রেনিং ওয়ার্কস, তিন. জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড অ্যান্ড সিলেক্টেড ব্রিজ ইন্ড ফ্যাসিলিটিজ, চার. মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড অ্যান্ড সিলেক্টেড ইন্ড ফ্যাসিলিটিজ এবং পাঁচ. সার্ভিস এরিয়া ১ ও ২। পাঁচটি কাজের ঠিকাদারি চুক্তি। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে প্রথমেই তিনটি চুক্তির কাজ দেয়া হয়ে গেছে। দুই পাশের অ্যাপ্রোচ রোড ও সার্ভিস এরিয়া। এ কাজগুলো আমাদের বাংলাদেশী আবদুল মোমেন লিমিটডে করেছে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ট্যাগ করা ছিল। তাদের সঙ্গে মিলে দেশীয় নির্মাণ কোম্পানি কাজ শুরু করে দেয়। এরই মধ্যে আমরা মূল সেতুর ব্রিজের কাজের দরপত্র আহ্বান করি। অনেক টেন্ডার পড়ল। সেখান থেকে আমরা  প্রি-কোয়ালিফাই করলাম চারটি কোম্পানিকে। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে তিনজন বিড করল। এর মধ্যে আমরা (বিবিএ) যাচাই-বাছাই করে চীনা মেজর ব্রিজ কোম্পানিকে মূল সেতুর কাজ দিলাম।

ইস্পাতের কাঠামোগুলো চীন থেকে আনা হয়। পরবর্তী সময়ে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করল চীনারা। এভাবে মূল সেতুর কাজ শুরু হলো। পদ্মা সেতু করতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল পিয়ারের নিচে পাইল বসাতে গিয়ে। পানির নিচে কোথাও ১১৪ মিটার, কোথাও ১১৬ মিটার, কোথাও ১১৮ মিটার পর্যন্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পানির গভীরতা ছিল মাওয়া অংশে। তাই সেখানে পিয়ারের নিচে পাইল বসাতে সমস্যা হয়েছে। দুনিয়ায় এত গভীরে পিয়ারের নিচে পাইল বসানোর ঘটনা ছিল না। এটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ছিল।

এরই মধ্যে আমরা চিহ্নিত করলাম, এখানে একটা সমস্যা আছে। এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করলাম। অন্যদের পরামর্শ নিলাম, কী করা যায়। পরে ব্রিজ অথরিটি, সুপারভিশন কনসালটেন্ট সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, মাঝখানে একটা স্ট্রেইট পাইলিং হবে। মূল নকশায় ছয়টি পাইল ছিল। এজন্য দেখা যাবে ২৪টি পিয়ারে সাতটা করে পাইল হয়েছে। অরিজিনালি ৩৪০টি পাইল ছিল। শেষে ২৬৪টি পাইল হয়েছে। ৪২টি পিলার আছে। ১ আর ৪১-এ দুটি পিলার পাড়ে। হ্যামারগুলো ভেঙে যায়, আবার নতুন করে আসে। নদী শাসনেও একই অবস্থা। এ কাজ করতে গিয়ে দেখা গেল,  যে স্লোপে দেয়া হয়েছিল, সেটি অন্য স্লোপে দিতে হবে। এক জায়গায় ফেইল করল, স্লিপ করে গেল। মাওয়ার দিকটায় পানিটা সাংঘাতিক খরস্রোতা। কাজেই ছোট ছোট ট্রায়াল করে  করে দেখা হচ্ছে। ফলে সময় লাগছে বেশি। বর্ষাকাল এলেই নদীর চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। দেখা গেল, একবারই পাঁচ-ছয় মিটার পলি পড়ে গেছে। ফলে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর এখন একটা সহনশীল পর্যায়ে এসেছে। কভিডের একটা অভিঘাত পড়েছে। চীনা শ্রমিক যারা বাড়ি গিয়েছিল, তারা আর ফেরত আসেনি। নতুন চীনা শ্রমিক এনে শুরু করা কঠিন। ক্ষেত্রবিশেষে। তবুুও আমরা চেষ্টা করেছি। স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য চিকিৎসক রাখা হয়েছে। বিদেশি সিনিয়ররাও কভিডে আক্রান্ত হয়েছে। তারা সাহসী আছে। বিশেষ কোনো অসুবিধা হয়নি। এভাবে চলছে।

এরই মধ্যে গত বছর কোরবানি ঈদের সময় একটা অঘটন ঘটে। ঈদের আগের রাতে পদ্মা নদীর একটি অংশে ভাঙন শুরু হয়। যেখানে ভাঙন শুরু হয়, সেখানে (স্ট্রাইক ইয়ার্ড) পদ্মা সেতু তৈরির অনেক উপকরণ রাখা ছিল। সেতু তৈরির অনেক উপকরণ নদীগর্ভে চলে গেছে। ওই ভাঙনে ১৯২টি স্ট্রিনজার (গার্ডার) ভেসে গেছে। এগুলো লুক্সেমবার্গে তৈরি। যদিও আমরা খুব কম সময়ে সে ভাঙন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছি। স্ল্যাবগুলো নতুন করে আনার চেষ্টা হয়েছে। সম্প্রতি আরেকটা নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। একটা লাইটারেজ জাহাজ ডুবে গেছে। সবমিলিয়ে চ্যালেঞ্জ অনেক।

পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন যাবে। এর জন্য ইস্পাতের কাঠামোর ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসিয়ে সড়ক পথ নির্মাণ করতে হয়। সড়কের একেকটা স্ল্যাবের প্রস্থ হচ্ছে দুই মিটার। তিন হাজারের কাছাকাছি স্ল্যাব হয়েছে। এর জন্য আলাদা ক্রেন লাগে। সেই ক্রেন একদিনে সাত-আটটির বেশি স্ল্যাব নিতে পারে না। সেগুলো এখন নিয়ে যাওয়া ও বসানো প্রায় শেষ। এরপর পিচঢালাই, বিভাজক, প্রতিরক্ষা দেয়াল, সড়কবাতিসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে হবে। দুই পাড়ে ভায়াডাক্টের কিছু কাজও বাকি আছে। এসব কাজ শেষ হলেই যানবাহন চলতে পারবে। এখানেও একটা চ্যালেঞ্জ, রেলওয়ে আগে শেষ না করে উপরেরটা করা যায় না। সেতুর ওপরে রেলের স্লিপার বসানো হয়েছে। লাইন এখনো বসানো হয়নি। সব মিলিয়ে এখন অধিকাংশ ভারী কাজই শেষ। ছোটখাটো কিছু কাজ বাকি আছে।

এবার সুপারভিশন প্রসঙ্গে আসা যাক। জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড, মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড ও সার্ভিস এরিয়া— এ তিনটি প্রজেক্টের জন্য একটি সুপারভিশন টিম করা হয়েছে। আর ব্রিজ এবং নদী শাসনের জন্য একটি সুপারিভশন টিম থাকবে। সেভাবে তদারকি হচ্ছে। এখন সেতুর ওপর দিয়ে ট্রান্সমিশন টাওয়ার যাচ্ছে। তার জন্য আলাদা অবকাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে।

একটি কথা উল্লেখ করা দরকার, পদ্মা সেতুতে যেসব ভারী যন্ত্রপাতি চীন, সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে, সেগুলো তত্ত্বাবধান করেছেন আমাদের প্রকৌশলীরাই। অন্তত ৫০ জন প্রকৌশলী যন্ত্রপাতির মান নিশ্চিত করার কাজ করেছেন। এছাড়া সরাসরি পদ্মা সেতুতে কাজ করেছেন আরো ২০ প্রকৌশলী। সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন দেশীয় প্রকৌশলী পদ্মা সেতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছেন প্রকৌশলীরা। পদ্মা সেতুতে কাজ করতে গিয়ে আমাদের একটা বিরাট অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভবিষ্যতে এর চেয়ে ছোট ছোট অবকাঠামো অবশ্যই বাংলাদেশী প্রকৌশলীরা নির্মাণ করতে পারবেন।

আরেকটি দিক হলো, পদ্মা সেতু তৈরি হয়েছে মূলত দেশীয় উপকরণ দিয়ে। সেতু তৈরিতে সবচেয়ে বেশি লাগে দুটি উপকরণ। একটি হলো স্টিল, অন্যটি সিমেন্ট। আমি বলব, আমাদের দেশে যথেষ্ট ভালো মানের সিমেন্ট ও স্টিল তৈরি হয়। শুধু স্টিল আর সিমেন্টই নয়, রড, বালু, পাথরসহ অন্য যেসব উপকরণ পদ্মা সেতুতে ব্যবহূত হয়েছে, সব উপকরণই ছিল সর্বোচ্চ মানের। যারা এসব উপকরণ সরবরাহ করেছে, তারা সবাই ছিল সতর্ক। তাই পদ্মা সেতুতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কোনো সুযোগ ছিল না।

আমাদের নিজের টাকায় পদ্মা সেতু হচ্ছে, এটা জাতির জন্য বিরাট গৌরবের, আত্মমর্যাদার। সম্মানেরও বটে। বলার অপেক্ষা রাখে না, পদ্মা সেতুর বদান্যে একসঙ্গে রেল সেতুটাও হয়ে যাচ্ছে। এটা অবশ্যই বড় পাওয়া। দক্ষিণাঞ্চলে রেললাইন নেই। পদ্মা সেতুর কারণে একসঙ্গে যশোর পর্যন্ত রেললাইনও হয়ে যাওয়া বিশাল অর্জন।

পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলাসহ দেশের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। এতে ওই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে, শিল্পায়ন হবে ও কর্মসংস্থান বাড়বে। পদ্মা সেতু চালু হলে একসময়ের অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চল রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। এ সেতু দিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে ও মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর দিয়ে নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। এক হিসাবে পদ্মা সেতু চালু হলে ১ থেকে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়বে। অসংখ্য মানুষের জীবনে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। আমরাও পারি—এ আত্মবিশ্বাস একটি জাতির জন্য বিরাট ব্যাপার।

 

ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া: পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান