বাজার শুধু পণ্য আদান-প্রদান ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের স্থান নয়;  গ্রামীণ বাজারের সঙ্গে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, প্রথা, রাজনীতি ও শ্রেণীর ধারণাসম্পর্কিত। গ্রামীণ বাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তন গ্রামীণ সামাজিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে। একটি সময় গ্রামের হাটবাজারের কথা শুনলেই এমন দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠত যেখানে খোলা মাঠে বা কাঁচা রাস্তার পাশে কৃষক কিছু পণ্য বিক্রি করছেন। গ্রামের মানুষ হাতে বস্তা বা ব্যাগ নিয়ে বাজার করে বাড়িতে ফিরছেন। রাতের অন্ধকারে কুপি জ্বালিয়ে বাজারে মাছ বিক্রির জন্য বসে আছেন বা সাপ্তাহিক হাটের দিনে অধিকসংখ্যক মানুষের সমাগম ও নানা ধরনের পণ্য বিক্রি হচ্ছে সেখানে। বিগত গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থার এ চিরায়ত দৃশ্যের অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। এ পরিবর্তনের অনেক প্রেক্ষাপট রয়েছে—যার সঙ্গে গ্রামীণ জনজীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। গ্রামের বাজারের যেমন অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি পরিবর্তন হয়েছে পণ্য ও পণ্য ব্যবস্থাপনায়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটের বহুবিধ কারণের মধ্যে গ্রামীণ সমাজে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির বিস্তার, অভিবাসন, গ্রাম-শহরের যোগাযোগ বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের মতো বিষয়াবলি অন্যতম। নতুন নতুন পণ্য ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়াবলির সংযোজন গ্রামীণ বাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তন সাধন করে।

গ্রামীণ হাটবাজারের রূপান্তরের চিত্র সমগ্র বাংলাদেশে এক রকম নয়। রাজধানীর কাছের জেলাগুলোর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার আলোকে এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়, স্বাধীনতার পর কৃষিতে যান্ত্রিক ও রাসায়নিক প্রযুক্তির বিস্তার কৃষি উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহের জন্য কৃষককে বাজারের ওপর অধিক নির্ভরশীল করে তোলে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে কৃষিকাজে ব্যবহূত সামগ্রী যেমন—লাঙল দিয়ে হাল চাষের উপকরণ, সার, বীজ, কীটনাশক কৃষক নিজ গৃহ থেকে সরবরাহ করতেন। আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার শুধু কৃষি পদ্ধতিরই পরিবর্তন আনে না, পারিবারিক কাঠামো, সমাজকাঠামো এমনকি গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থারও পরিবর্তন সাধন করে। আগে মানবশ্রম বিশেষত গৃহের নারীশ্রম থেকে শুরু করে মাঠে পুরুষশ্রম কৃষি উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা পালন করত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব কৃষি ক্ষেত্রে মানবশ্রমের গুরুত্বকে অনেকাংশেই হ্রাস করে।  ইরি ও নানা ধরনের হাইব্রিড জাতের ধান চাষের প্রচলন শুরু হওয়ার সময় থেকে রাসায়নিক সার ও যান্ত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। কৃষক উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহের জন্য গৃহের পরিবর্তে বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

কৃষি সম্পর্কিত রাসায়নিক প্রযুক্তি বিশেষত সার, বীজ ও কীটনাশক উৎপাদনকারী এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বা তাদের এজেন্ট/ডিলার গ্রামে দোকান প্রতিষ্ঠা করে, যা গ্রামীণ বাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনে প্রভাব ফেলে। আশির দশকে গ্রামের বাজারে টিনের তৈরি দোকানপাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে ইটের দালানে রূপান্তর হয়। আধুনিক প্রযুক্তি বিকাশের শুরুর দিকে গ্রামে রাসায়নিক প্রযুক্তি বিক্রয় হলেও যান্ত্রিক প্রযুক্তি যেমন ট্রাক্টর, পাম্প জাতীয় প্রযুক্তি ক্রয়ের জন্য শহরে যেতে হতো। নব্বইয়ের দশকের দিকে কৃষিতে যান্ত্রিক প্রযুক্তি ও রাসায়নিক প্রযুক্তির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে গ্রামের বাজারে সেগুলো বিক্রি হতে থাকে। মূল্যবান এ প্রযুক্তিগুলো দোকানে রাখতে গিয়ে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দোকান মালিক বা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামের বাজারে ইটের দালানে পণ্য সংরক্ষণ ও বিক্রয় সম্পাদন শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে সাটুরিয়া বাজারে সার দোকান স্থাপন করেন এ রকম একজন ব্যবসায়ী কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আগে তো বাজারে খোলা জায়গাতেই বেশির ভাগ পণ্য বিক্রি হতো, বাড়ি হতে দৈনিক বা হাটের দিনগুলোতে অনেক দূর থেকেও বিক্রেতা তার মালপত্র এনে বিক্রি করত, এর জন্য একটা সময় কোন ভাড়াও দিতে হতো না। কিন্ত কৃষিতে সার-কীটনাশক ব্যবহার হওয়ার পর থেকে  ব্যক্তিমালিকানায় এমনকি ভাড়ায়ও দোকান দেবার প্রচলন ঘটে, যা গ্রামের বাজারে অবকাঠামোগত পরিবর্তন ঘটায়।’ আগে বিক্রয়কৃত পণ্যগুলোর উৎপাদনের সঙ্গে গৃহস্থালির সম্পর্ক ছিল, তাই বাড়ি থেকেই এগুলো বাজারে নিয়ে আসা হতো। আধুনিক প্রযুক্তিগুলো আসে শহর থেকে, যা আবার মজুত ও সংরক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্রেতা আকর্ষণের জন্য ডেকোরেশন করার প্রবণতাও দেখতে পাওয়া যায়। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়।

সার-কীটনাশকের মতো প্রাত্যহিক কৃষি উপকরণ বিক্রির জন্য গ্রামেও নতুন বাজার ও বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার প্রসার ঘটছে, যা কয়েক দশক আগেও ছিল অনুপস্থিত। ট্রাক্টর ও অন্যান্য মেশিনারিজ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য যে ডিজেল প্রয়োজন হয়, ক্ষুদ্র পরিসরে তারও বিক্রয়কেন্দ্র বা দোকান তৈরি হয়েছে। ট্রাক্টর, পাম্পের মতো মেশিনারিজ মেরামতের জন্য ছোট পরিসরে মেরামত কেন্দ্রের আবির্ভাব গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে।

বিগত কয়েক দশকে ক্ষুদ্র্র ঋণের কার্যালয় ব্যতীত গ্রামীণ জনপদকে চিন্তা করা যায় না। এ ধরনের কার্যালয় স্থাপন গ্রামীণ অবকাঠামোর পরিবর্তন সাধন করে। আবার প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে ক্ষুদ্র ঋণ চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি সম্পর্কিত। যান্ত্রিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের প্রচলন ঘটতে শুরু করেছে, যদিও গ্রামের সীমিতসংখ্যক মানুষ ব্যাংকঋণ গ্রহণ করে। ক্ষুদ্র জমির মালিকরা চারা রোপণ বা চাষাবাদের সময় সার, কীটনাশক বা ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরি প্রদানের জন্য এনজিও থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে থাকেন। নব্বইয়ের দশক থেকে এ ধরনের ক্ষুদ্র ঋণের ধারণা গ্রামে খুব জনপ্রিয় হয়। কৃষি প্রযুক্তি ছাড়াও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নানাবিধ কাজে ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করে থাকেন। অপরদিকে কৃষিতে ব্যবহূত রাসায়নিক প্রযুক্তি বিক্রয়ের এক্টরগুলো যেমন জাতীয় বা বহুজাতিক কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি থেকে শুরু করে দোকান মালিক, বিক্রয়কর্মীর ধারণা বা গ্রামের বাজারে শো-রুম স্থাপনের মতো বিষয়াবলি গ্রামীণ কৃষিকাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করে। অনেক এনজিও কৃষিতে ব্যবহূত রাসায়নিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রসার ও বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, যা গ্রামে বাজারের ধারণাকেও সম্প্রসারিত করে।

কৃষিবহির্ভূত খাতে অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপারটি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গ্রামীণ সমাজকাঠামো তথা বাজার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে নগদ অর্থের সংস্থান করতে পারা অনেক মানুষই গ্রামে ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করেছে। গ্রামের বাজারে টিন বিক্রয়ের দোকান, সারের ডিলারের বা দোকানের মতো প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় টিভি, ফ্রিজ বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান বা শো-রুম প্রতিষ্ঠাও পরবর্তী সময়ে গ্রামের বাজারের চিরায়ত চরিত্রকে পরিবর্তিত করছে। কিস্তিতে টিভি, ফ্রিজ বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান বা শো-রুমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ স্বল্প আয়ের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কোনো কোনো গ্রামের বাজারে তৈরি পোশাকের দোকানের উপস্থিতি মেলে। যারা ব্যবসায় অর্থ বিনিয়েগের সামর্থ্য রাখেন না তাদের অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে চাকরি নিয়েছেন। আবার সরকারি-বেসরকারি ভোকেশনাল ট্রেনিংপ্রাপ্ত যুবকরা গ্রামেই প্রযুক্তি মেরামতের জন্য বাজারে দোকান স্থাপন করছেন।

বাজারে চা-স্টলকে কেন্দ্র করে আড্ডা দেয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে টিভি ও ডিস অ্যানটেনার সংযোজন আড্ডার চিরায়ত রূপকেও পাল্টে দেয়। চায়ের দোকানে ডিস অ্যানটেনার প্রচারিত খেলা, নাটক, সিনেমা দেখতে আসা মানুষজন গ্রামের বাজারের আড্ডা-অবসরের ধারণাকেও পাল্টে দেয়। চা-স্টলের টিভি বা ফ্রিজকে সুরক্ষিত করতে গিয়ে মালিক তার দোকানের অবকাঠামোতেও পরিবর্তন আনেন।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজার সম্প্রসারণে অভিবাসন ও রেমিট্যান্সের প্রবাহের যোগসূত্র রয়েছে। সিলেট জেলার বিভিন্ন গ্রামে দেখা গেছে, বিদেশে অভিবাসন ও তাদের পাঠানো অর্থ গ্রামে বসবাসকারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। বিদেশে অভিবাসিতদের রেমিট্যান্সের প্রবাহ গ্রামের বাজার কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে। গ্রামে বাসস্থানের জন্য যেমন দালানকোঠা তৈরি হচ্ছে, ঠিক তেমনি সুপার মার্কেটের মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে, যেখানে কর্মরত থাকেন অভিবাসিতের ভাই বা অন্য কোনো আত্মীয়। এ ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য গ্রামের অর্থনীতি তথা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তন আনছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগের ব্যাপারটিও লক্ষ্য করা গেছে। শুধু বিদেশ অভিবাসনকারীরাই নয়; অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকারীদেরও কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ করতে দেখা যায়। ট্রাক্টর বা পাম্প ক্রয় করে তা ভাড়া খাটানোর ব্যাপারটিও গ্রামীণ জনপদে অনেকটাই প্রচলিত।

গ্রামের বাজারে যুক্ত হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিক্রয়কেন্দ্র, মেরামতকেন্দ্র, যার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামের যুবক জনগোষ্ঠীর অনেকেই মোটরযান শ্রমিক, মেকানিক কাজে বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোর কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন। নগদ অর্থের মালিকরা এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা ক্রয় করে বেতনভুক্ত চালক দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আবার অনেকে কিস্তিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ক্রয় করে নিজেই চালাচ্ছেন। শুধু অটোরিকশার স্ট্যান্ড গ্রামের বাজারের পরিধিকে বৃদ্ধি করছে না, কোনো কোনো বাজারে অধিক সংখ্যক অটোরিকশার চলাচল বাজারের কেন্দ্রস্থলে ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি করছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা গ্রামীণ চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের রূপান্তর ঘটায়। 

গ্রাম্য বাজারের আশপাশে যেসব খালি জায়গা ছিল সেই জমির মালিক ইটের তৈরি বা টিনের তৈরি ঘর নির্মাণ করে তা দোকান হিসেবে ভাড়া দিচ্ছেন। কৃষি জমিতে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও ইটভাটার মতো স্থাপনা বা গ্রামে এনজিওর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শহর থেকে শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষকে গ্রামে এসে চাকরি করতে হচ্ছে, যার প্রভাবে গ্রামে ক্লিনিক, ব্যাংক, সন্তানদের পড়াশোনার জন্য কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টারসহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বৃহৎ মুদি দোকানসহ নানা ধরনের বাজার গড়ে উঠেছে, পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যাংক-বীমার মতো প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক, বীমা, এনজিও এবং কিন্ডারগার্টেনের মতো প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মেটানোর জন্য কম্পিউটার কম্পোজ ও প্রিন্টার, ফটোকপির দোকান গ্রামের বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শহর ও গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। যোগাযোগের এ উভয়মুখী কারণকে কেন্দ্র করে গ্রামেও নাগরিক জীবনের ভোগবাদী আচরণের সম্প্রসারণ ঘটছে। বাজারের অভ্যন্তরে বা আশপাশে বিউটি পার্লার, কফি শপ, ফাস্ট ফুড শপ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও কোচিং সেন্টার স্থাপিত হয়েছে।

মেলাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহকারীরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে খাপ খাওয়াচ্ছেন বা মেলার পরিবর্তনটাই বা কী?  উল্লেখ্য, কভিড-১৯  প্রেক্ষাপটে দুই বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মেলা জমে ওঠেনি। মেলাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহকারী এ শ্রেণীর মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পত্রপত্রিকায় খবর এসেছে, এ ধরণের পেশার মানুষজনকে কেন্দ্র করে কোনো প্রণোদনায় দেয়া হয়নি। তাদের জীবিকাও হুমকির মুখে। শুধু কভিডই নয়, সাম্প্রতিক দশকে গ্রামীণ বা মফস্বলের মেলায় আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। মেলায় অবকাঠামোগত দিক থেকে শুরু করে পণ্যের ধরন, বিক্রেতা, বিক্রয়ের ধরন পর্যন্ত অনেক বিষয়েরই পরিবর্তন ঘটছে। ভাববার সময় এসেছে সনাতনী পেশায় নিয়োজিত এসব জনমানুষ কীভাবে আধুনিকতার সঙ্গে নিজেদের অভিযোজিত করছে।

এটা দৃশ্যমান, নব্বইয়ের দশক থেকে মেলার অবকাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে, মাঠে খোলা জায়গার পরিবর্তে স্টল স্থাপনা, গেট-পাস, নানাবিধ অনুমতি, স্থান পাওয়ার জন্য টেন্ডার আবেদন, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি প্রদান—এ বিষয়গুলোর সূত্রপাত ঢাকা বা বড় শহর দিয়ে হলেও বর্তমানে তা দেশের বিভিন্ন মফস্বল বা গ্রামেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। মেলার পণ্য সরবরাহকারীরা মেলার আগের দিন বা মেলার দিন ভোরবেলায় নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে মালপত্র নিয়ে বসে যেতেন। মেলাকালীন সময়ে মালপত্র বিক্রি করে বাসায় ফিরে আসতেন। ক্ষেত্রবিশেষে মেলার সময় শেষ হলেও মেলার পরদিনও সেখানে মালপত্র বিক্রি হতো। এভাবে ঘুরে ঘুরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলায় অংশগ্রহব ছিল তাদের জীবিকার অংশ। কিন্তু মেলার আধুনিক সংস্কৃতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য মেলার আগেই স্টল বরাদ্দের আবেদনপত্র জমা, ক্ষেত্রবিশেষে স্টল বরাদ্দের জন্য ব্যাংকে জামানতের টাকা জমা দেয়া বা এগুলো করার জন্য যে ধরনের নেটওয়ার্ক, ‘শিক্ষা’ বা অভ্যস্ততার প্রয়োজন হয় তা তাদের না থাকায় মেলায় চিরায়ত পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ছে। স্টলভিত্তিক মেলাতেও মাটির তৈরি তৈজসপত্র বা খেলনাসমাগ্রী পাওয়া যায়। স্টলে বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নিজে উৎপাদক বা প্রস্তুতকারী নন। স্টল সংস্কৃতির সঙ্গে শহুরে, ‘শিক্ষিত’ বা অধিক তথ্য-যোগাযোগ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সম্পর্ক। এ বিক্রেতা শ্রেণীর মানুষজন উৎপাদক বা প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে মোড়কজাত করে মেলায় বিক্রি করেন। মেলায় ক্রেতার সংখ্যার চেয়ে দর্শক বেশি হয়, স্টল ভাড়া ও পণ্য আধুনিক করতে গিয়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। উৎপাদক বা প্রস্তুতকারীদের লাভ কম হয়। আবার কিছু গ্রামীণ মেলার সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় সংস্কৃতির যোগসূত্র রয়েছে। মাজার ও মন্দিরকেন্দ্রিক মেলাগুলোতেও আধুনিকতার ছোঁয়া মেলার স্থানকে সংকুচিত করেছে। উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কোথাও কোথাও মাজারের খোলা জায়গায় কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। মন্দিরের খোলা জায়গাতেও মন্দিরের কার্যালয়, মন্দিরের সম্প্রসারিত ভবন বা নাটমন্দির তৈরি হয়েছে। আবার এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানের ‘নিরাপত্তা’র কথা বিবেচনায় মেলার স্থানকেও বিশেষায়িত করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত হতে আগত খাদ্যবিক্রেতা, কুমার পাল বা রেশমি চুড়ি বিক্রেতাকে নানাবিধ পরিচয় প্রদানের মাধ্যমে মেলায় অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে। একদিকে স্থান সংকট আর অন্যদিকে পরিচয় প্রদানের প্রক্রিয়ায় মেলার পণ্য বিক্রেতাকে নানা সমস্যার সন্মুখীন করছে।

সাপ্তাহিক হাট প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, অবকাঠামোগত পরিবর্তন হলেও গ্রামীণ হাটের গুরুত্ব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। গ্রাম গবেষণায় দেখা যায়, কিছু গ্রামে সবজি উৎপাদন আগের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সবজি উৎপাদন ধানের থেকে লাভজনক। সবজির বাণিজ্যভিত্তিক উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক গ্রামেই সাপ্তাহিক হাটের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে কাছের অনেক শহুরে মানুষ স্বল্পমূল্যে সবজি ক্রয়ের জন্য গ্রামের হাটে আসছে। অনেক সময় শহুরে ক্রেতারা সবজি ছাড়াও গ্রামের হাট থেকে  ‘স্বল্প মূল্যে পাওয়া যায়’ এ বিবেচনায় গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। শহুরে বাজারের পাইকাররা গ্রামে এসে সবজি ক্রয় করে পিক-আপ ভ্যানে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে শহরের সুপারশপগুলোর মালিকরাও গ্রামে জমি ক্রয় বা ভাড়া নিয়ে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সবজি উৎপাদন করছেন বা সরাসরি গ্রামের কৃষক থেকে পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। ‘পাইকার’ শ্রেণীর আবির্ভাব গ্রামের হাটবাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনে প্রভাব না ফেললেও বাজার ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন করছে । 

কৃষিপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃতি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নতুন নতুন পণ্যের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটাচ্ছে, যা গ্রামীণ বাজারকে সম্প্রসারণ করছে। বাজার ব্যবস্থার এ ধরনের রূপান্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। হাটবাজারের রূপান্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ও ভোগবাদী আচরণকেও প্রভাবিত করে। কৃষিবহির্ভূত পেশার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো, পণ্য ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনার ধরনগুলো গ্রামীণ হাটবাজার ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে।

তবে হাটবাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের অর্থ সব গ্রামীণ মানুষের কাছে সমরূপ নয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উৎপাদক শ্রেণীর অবস্থান আরো প্রান্তিক হয়ে পড়ে। যোগাযোগ দক্ষতা, শহরের বাজারে সরাসরি প্রবেশের অধিকার বা সুযোগ না থাকার কারণে ক্ষুদ্র উৎপাদক তাদের পণ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। পাইকার বা মধ্যস্বত্বভোগীরা গ্রাম থেকে স্বল্পমূল্যে পণ্য ক্রয় করে শহরের বাজারে অধিক মূল্যে বিক্রি করে। এক্ষেত্রে বাজার সম্প্রসারিত হলেও ক্ষুদ্র উৎপাদকের আর্থসামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হয় না। তাই গ্রামীণ বাজারের রূপান্তরকে শুধু পরিধিগত সম্প্রসারণ বা অবকাঠামোগত বিষয় দিয়ে বিবেচনা করলে প্রান্তিক উৎপাদক শ্রেণীর অভিজ্ঞতা যথাযথ প্রকাশ পায় না। হাটবাজারের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রামীণ উৎপাদক যাতে পণ্য বিক্রয়ের জন্য বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

নিবন্ধে উল্লেখিত কিছু তথ্য লেখকের ‘গ্রামীণ সমাজ ও কৃষি কাঠামো: সাম্প্রতিক পরিবর্তন’ নামক গ্রন্থ এবং বণিক বার্তায় “গ্রাম বৃত্তান্ত” শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত প্রবন্ধ হতে সংগৃহীত হয়েছে।

 

ড. রঞ্জন সাহা পার্থ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক