সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে বেশকিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। তার মধ্যে ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১’ ও ১০০ বছর মেয়াদি ‘ডেল্টা প্ল্যান’ অন্যতম। পাশাপাশি ২০৩০-এর মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রেক্ষিত পরিকল্পনার লক্ষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩১-এর মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১-এর মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে, যেখানে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার ও দারিদ্র্যকে বিদায় জানাবে। সে সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে উন্নত জীবন ব্যবস্থা, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সময়কালের মধ্যে মোট চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণীত হবে, যেখানে ধাপে ধাপে সব খাতের লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। সেজন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু প্রস্তুত আছে? অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে কোন দপ্তরের কী কাজ, সে বিষয় কতটা পরিষ্কার? আবার খেয়াল রাখতে হবে, উচ্চপ্রবৃদ্ধি তাড়া করতে গিয়ে যেন পরিবেশ ও প্রকৃতিকে কোনোভাবে বিসর্জন দিয়ে না ফেলি বরং চেষ্টা থাকতে হবে পরিবেশকে টেকসইভাবে সংরক্ষণ করার মধ্য দিয়েই দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। 

বাংলাদেশ আয়তনের দিক থেকে ছোট্ট একটি দেশ। সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে সারা দেশকে নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সময়মতো তার যথাযথ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয়—তিনটি স্তরেই পরস্পরের সঙ্গে মিল রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ ও সময়মতো তার বাস্তবায়ন করতে হবে।

জাতীয় ভৌত/ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা

গত দুই দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার ভৌত অবকাঠামো, বাড়িঘরসহ সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ ল্যান্ডস্ক্যাপ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে। এ সময় মানুষের আর্থিক সামর্থ্য বেড়েছে। একই সঙ্গে বড় শহর কিংবা পৌর এলাকার বাইরে গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার, উপজেলা সদর ইত্যাদি এলাকায় যত্রতত্র পাকা বাড়িঘর-অবকাঠামো গড়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, প্রতিনিয়ত অপরিকল্পিত বাড়িঘর ও বসতি এলাকা সম্প্রসারিত হচ্ছে। যেখানে-সেখানে শিল্প-কলকারখানা স্থাপন অথবা রাস্তাঘাট নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত ভূমির প্রকৃতি ও শ্রেণীগত পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে বছরে বছরে মূল্যবান কৃষিভূমি, জলাশয়, বনভূমি, পাহাড়সহ প্রাকৃতিক সংবেদনশীল এলাকা হারাচ্ছে। কোথাও কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বিবিএসের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক শতাংশ কৃষিজমি অকৃষিজ খাতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। ক্রমে জনপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণও কমছে। দেশে বর্তমানে জনপ্রতি ভূমির গড় পরিমাণ মাত্র দশমিক ছয় হেক্টর, যা পৃথিবীর মধ্যে প্রায় ন্যূনতম। এ ধারা আমাদের দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য হুমকিস্বরূপ। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৬’ নামে একটি আইন খসড়া করা হয়েছে, যেখানে সারা দেশের কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষাসহ ভূমির পরিকল্পিত এবং সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এ আইন তৈরি করা হয়েছে। এ আইন বাস্তবায়ন করতে গেলেও দেশব্যাপী একটি ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে। 

তাই সবকিছু বিচারে সময়ক্ষেপণ না করে অতিসত্বর কৃষিজমি, নদী-জলাশয়, বনভূমি, পাহাড় সংরক্ষণের স্বার্থে দেশব্যাপী জাতীয় ভৌত/ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রয়োজন। সে সঙ্গে প্রয়োজন হবে জাতীয় নগরায়ণ নীতিমালা প্রণয়ন। কয়েক বছর আগে এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালা খসড়া তৈরি করা হয়েছিল, যা এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়।   

নগরায়ণের এ ক্রমধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪০-এর আগেই বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ নগর এলাকায় বসবাস করবে। এ আলোচনার দুটি দিক আছে। প্রথমত, শহরমুখী এ জনস্রোতকে গ্রহণ করার জন্য আমাদের নগরগুলো প্রস্তুত আছে কিনা। এ উত্তর আমাদের প্রায় সবার জানা। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ এলাকা নীরবে শহুরে আদলে রূপান্তরের যে প্রক্রিয়া চলছে সেখানে মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলাধুলা, কমিউনিটি স্পেস ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ঘটতি বা অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে গ্রামীণ এলাকাও বসবাসের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে আমাদের কী করণীয় আছে?  সারা দেশে জাতীয় ভৌত পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে তার গৃহীত কৌশলের আলোকে গ্রাম ও শহর এলাকার জন্য আঞ্চলিক ও স্থানীয় পরিকল্পনা তৈরি করা।     

নগরগুলো হবে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি

এটা অনস্বীকার্য, পৃথিবীর অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নগরায়ণ একটি অনিবার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনার অনুচ্ছেদ ১১ দশমিক ২-এ বলা হয়েছে, উন্নত দেশে রূপান্তরের এ যাত্রায় নগরগুলোই হবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। কারণ ততদিনে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ নগরে বাস করবে ও ৮০ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নগরেই ঘটবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ক্রমাগতভাবে এক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে শহর বেড়ে ওঠে। একদিকে পূর্বাপর ঐতিহ্য ও পরম্পরা রক্ষার আকুতি, অন্যদিকে দ্রুতগামী জীবনকে ধারণ করার অনুষঙ্গ তৈরির তাড়না। এসবের মধ্য দিয়ে আমাদের গ্রামগুলো নগরের চরিত্র ধারণ করছে।

বড় শহরে গাড়িকে জায়গা দিতে গিয়ে সড়ক সম্প্রসারণে মানুষ ক্রমশ উত্খাত হয়েছে গণতান্ত্রিক পরিসর থেকে। মানুষের জায়গা হয় দেয়ালের পাশে সরু জীর্ণ ফুটপাতে। পথে চলতে চলতে অনুভব করি শহরে আকাশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এত দিন উঁচু দালান আকাশ দখল করেছে, এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফ্লাইওভার। মাথার ওপর সর্পিল ফ্লাইওভারগুলো আকাশটাকে আরো বেশি করে দখল করে নিচ্ছে।

করোনা মহামারী আসার পর থেকে আমাদের মধ্যে ঝকঝকে রোদ আর পরিষ্কার আকাশ দেখার আকুতি বেড়েছে অনেক গুণ। পাশের দেশের কলকাতা যখন দোতলা বাড়ি ভেঙে ‘জি প্লাস ফোর’ তৈরি করছে, তখন আমরা ঢাকায় মুনাফার আশায় ‘জি প্লাস সেভেন’কে কম মনে করে দেন-দরবার করছি। কাচে ঘেরা উঁচু দালানে শহরের চাকচিক্য বেড়েছে বটে কিন্তু বাসযোগ্যতার বিচারে শহর পিছিয়ে পড়ছে। সুতরাং শহর কতটা মানবিক চাহিদা নিরিখে তৈরি করা হবে, সে দর্শন ঠিক করে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কাজে হাত দিতে হবে। 

নগরগুলোকে যদি পরিকল্পিতভাবে না সাজানো যায় তাহলে লক্ষ্য অর্জনের পথ ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তাই দেশের নগরগুলোতে উন্নত জীবন ব্যবস্থা প্রদান করতে স্থানীয় নগর সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি ও সক্ষমতায় ঘটতি থাকলে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য সফল হবে না। তাই দেশের নগর এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো উপযুক্ত লোকবল, কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আগামী দিনে স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে।  

প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় খুব সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশের নগরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে (১২টি সিটি করপোরেশন, ৩২৯টি পৌরসভা ও ৪৯৫টি উপজেলা) কীভাবে প্রস্তুত করতে হবে। ১. রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দেশে সব নগর এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করতে হবে। যাতে সারা দেশে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয় ও বড় শহরমুখী মানুষের অভিগমনের ধারা কমে আসবে। ২. মহানগরী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ সব নগর এলাকার স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান তৈরি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। ৩. স্থানীয় এসব পরিকল্পনার সঙ্গে আঞ্চলিক ও জাতীয় পরিকল্পনার মিল থাকতে হবে। ৪. উন্নত নাগরিক সুবিধা সরবরাহের মাধ্যমে মানসম্পন্ন নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতে নগরের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এবং সর্বোপরি ৫. জনগণের অংশগ্রহণে উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালন নিশ্চিত এবং জবাবদিহিমূলক স্থানীয় নগর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।   

উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত করা

মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অবদান ক্রমেই কমে গিয়ে সেখানে সেবা ও শিল্প খাত প্রধান হয়ে উঠেছে। বর্তমানে কৃষি খাতের অবদান মোট দেশজ উৎপাদনের এক-পঞ্চমাংশের কম হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়নে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষি ক্ষেত্রে নিয়োজিত। খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি ক্ষেত্রের অবদান অপরিহার্য। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য কারণে মানুষ শহরে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে কেন উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করা হবে না? এ বিষয়ে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনায় দেখা যায়, ‘সারা দেশে ভূমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধে উপজেলাভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। জনগণের অর্থ সাশ্রয় ও কৃষিজমি রক্ষায় উপজেলাগুলোয় অপরিকল্পিত উন্নয়ন অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাস্তা ও চলাচলের জন্য পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। মাস্টারপ্ল্যানের লে-আউটে আবাসন, হাসপাতাল, মার্কেট, স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠ, কৃষি-খামার, শিল্প কারখানা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। আমরা যদি সঠিকভাবে এটি করতে পারি, তাহলে জনগণ এটি গ্রহণ করবে। আজ  বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা।’

আমার গ্রাম-আমার শহর: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণে সরকারের এ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজটি ব্যাপক ও বিস্তৃত। উন্নত যোগাযোগ, কাজের সুযোগ সৃষ্টি, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, ইন্টারনেট সুবিধা, গ্রামীণ গ্রোথসেন্টার ও হাটবাজার ইত্যাদি কাজ বাস্তবায়ন একক কোনো মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই এ বিস্তৃত কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর বিশেষত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভূমিরূপ, স্থানীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে গ্রামীণ ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতিতে এ উন্নয়ন পরিচালিত করতে হবে।

উপজেলার মহাপরিকল্পনা বা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রয়োজন বহুমাত্রিক জ্ঞান, দক্ষতা, কৌশল ও গবেষণা। সে সঙ্গে দরকার প্রণীত পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ। এর মধ্যে থাকতে হবে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, আবাসন, গ্রামীণ অর্থনীতি, নিষ্কাশন ও পরিবেশগত পরিকল্পনা, পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রভৃতি।

এলজিইডির জরিপে দেখা যায়, দেশে ৮৭ হাজার ২১০টি গ্রামের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার গ্রামে এরই মধ্যে পাকা সড়ক যোগাযোগ থাকলেও এখনো প্রায় ১৬ হাজার গ্রামে পাকা সড়ক যোগাযোগ নেই। যার অধিকাংশ গ্রামই বিল, হাওর, চর কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। এসব এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন কিন্তু এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই বিশেষ সংবেদনশীল এলাকা। এখানকার ভূ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিল আছে এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না, যা সেখানে পরিবেশ বিপর্যয় বয়ে আনবে। বর্তমানে দেখা যায়, রাস্তাঘাট নানা কারণে অল্প সময়ের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বন্যা ও জলাবদ্ধতা, নিম্নমানের কাজ ও নির্মাণ উপকরণ, অদক্ষ ঠিকাদার, অনিয়ন-দুর্নীতি, সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নকশায় ত্রুটি ও অপ্রতুল বরাদ্দ। আগে অনেক সময় প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনেক রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও ব্রিজ তৈরি হয়েছে, যা খুব একটা পরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেছে। কোথাও কোথাও খাল অথবা বিলের ওপর সংযোগ সড়ক ছাড়া ‘অনাথ সেতু, ভূতুড়ে ব্রিজ’ তৈরি হয়েছে এমন নজিরও আছে।  এ অবস্থায় সুযোগ তৈরি হয়েছে পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির উপযোগী জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ও অভিঘাত সহনশীল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করার। একে কাজে লাগাতে হবে।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে উন্নত করতে গ্রামীণ এলাকায় গ্রোথ সেন্টার ও হাটবাজারগুলোর সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পণ্য সংরক্ষণ ও বিপণনের আধুনিক ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি উপজেলায় অবকাঠামো, কারিকুলাম ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন

লক্ষ করলে দেখা যাবে, সারা দেশে অবকাঠামো উন্নয়নসংক্রান্ত অনেক খাতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। সে লক্ষ্যে বিগত এক দশকে দেশের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও গুরুত্ব সহকারে কৌশল গ্রহণ এবং অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। সরকার এমন সব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যা সারা দেশের উন্নয়নকে প্রভাবিত করবে। প্রকল্পের গুরুত্ব অনুযায়ী বেশকিছু প্রকল্প সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে এসেছে। এমন প্রকল্পের মধ্যে আছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতু ও রেল সংযোগ, এলএনজি টার্মিনাল, ঘুমধুমে ডুয়াল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ, কর্ণফুলী টানেল ইত্যাদি। যদিও কিছু কিছু মেগা প্রকল্প নিয়ে দেশের বেশকিছু পরিবেশবাদী সংগঠন তাদের উদ্বেগের কথা দীর্ঘদিন বলে আসছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে কিছু বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা গেছে। সেগুলো হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে না পারা। এ কথা ঠিক, বাংলাদেশের জন্য মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন নতুন বিষয় কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রতা, দক্ষ জনবলের অভাব ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়নকে মন্থর করে দিয়েছে। ফলে প্রতিটি প্রকল্পে সংগত কারণেই প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। প্রকল্পের ব্যয় বৈশ্বিক যেকোনো মানদণ্ডে অনেক বেশি।  

ঢাকা শহরের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক করিডোরগুলোকে সচল ও নিরাপদ করতে অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যার ভেতর আছে চার লেনের জাতীয় মহাসড়ক ও প্রয়োজনীয় ওভারব্রিজ ও ফ্লাইওভার। তার মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ইত্যাদি। এসব বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় জনগণ দুর্ভোগ সহ্য করেছে ভালো কিছুর আশায়। জাতীয় এসব মহাসড়ককে তার চরিত্র ধরে রাখতে মহাসড়কের যথাযথ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে এসব মহাসড়কেও বাজারহাট বসবে ও মহাসড়কের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে। সারা দেশে ১০০টি ইকোনমিক জোন তৈরি উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণে সাহায্য করবে।

উপসংহার

জাতীয় ভৌত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ে নগর ও গ্রামীণ এলাকা উন্নয়নে দক্ষ কারিগরি লোকবল প্রয়োজন হবে। ২০৪১ সালের লক্ষ্য অর্জনে একদিকে যেমন প্রয়োজন হবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সহায়ক অবকাঠামো, আর্থসামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সহায়ক অবকাঠামো, আত্মনির্ভরশীল কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি; ঠিক তেমনি প্রয়োজন হবে কৃষিজমি, বনভূমি, জলাশয়, নদী সুরক্ষায় বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা। এ ধরনের টেকসই উন্নয়নে উপজেলাগুলোতে দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদসহ অভিজ্ঞ লোকবলের সমন্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। 

 

ড. আকতার মাহমুদ: নগর পরিকল্পনাবিদ; অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)