নব্বইয়ের দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন বাবদ ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে—যা ছিল তাদের জিডিপির ৪ শতাংশ ও মোট বিনিয়োগের ৫ ভাগ। ফলে যাতায়াত, বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটাইজেশন, টেলিযোগাযোগ ও কৃষির সেচ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত নানা তথ্য উপাদান। ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটর ও এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের তথ্যানুযায়ী, ১৯৯০ সালে এ দেশগুলোতে মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল শূন্য দশমিক শূন্য শতাংশ, ২০১০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩৮ শতাংশ। একই সময়কালে গ্রামীণ অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানিপ্রাপ্তির সুবিধার পরিমাণ ৫৫ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে উচ্চ ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মধ্যকার পার্থক্য কমে আসতে শুরু করে। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত অবকাঠামো পরিষেবাও রাতারাতি বদলে যায়। নিম্ন আয়ের দেশগুলো তাদের সক্ষমতার বেশির ভাগই কৃষিতে ব্যয় করতে শুরু করে। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের দেশগুলো মনোযোগ দেয় বিদ্যুৎ উন্নয়নে (বিশ্বব্যাংক ১৯৯৪)। তবে সব দেশের জন্য সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও উচ্চ আয়ের দেশগুলো অন্যদের তুলনায় এ খাতে কিছুটা বেশি ব্যয় করতে শুরু করে। আগেই উল্লেখ করেছি, নিম্ন আয়ের দেশগুলো পানি উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ায় সুপেয় পানির সংকট অনেকটাই দূর করতে সক্ষম হয়। মূলত নিম্ন আয়ের দেশগুলো জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দেয়, যেমন খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা। বিপরীতে উচ্চ আয়ের দেশগুলো গুরুত্ব দেয় গুণগত জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলোয়।

আশির দশকের আগে অবকাঠামো ঘিরে সরকারি বিনিয়োগের বিষয়টি অর্থনীতিবিদদের খুব একটা আকর্ষিত করতে পারেনি। তবে আমেরিকায় অবকাঠামো খাতে কম বিনিয়োগের কারণে উৎপাদনশীলতার চরম অবনতি ঘটলে এ-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসে, চাহিদামাফিক উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সড়ক, সুয়ারেজসহ অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাষ্ট্র যদি তার সাধারণ জনগণের জন্য এ বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেয় তবে তা স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ইভানস অ্যান্ড ক্যারেস ১৯৯৪ কিংবা অন্যান্য গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তগুলোও অবকাঠামো ও উৎপাদনের মধ্যকার সংযোগের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা মতে, নব্বইয়ের দশকে দেশগুলোতে অবকাঠামো শেয়ারের ১ শতাংশ বৃদ্ধি ছিল জিডিপির ১ শতাংশ বৃদ্ধির সমতুল্য। ১৯৯৩ সালে পরিচালিত ইস্টারলি ও রেবেলোর গবেষণায় উঠে আসে, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে প্রবৃদ্ধির বিষয়টি দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত। অর্থাৎ কাঠামোগত রূপান্তরে অবকাঠামোর ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অবকাঠামোর অবস্থা ছিল অনেকাংশেই নাজুক। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী দেশজুড়ে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তাতে ধ্বংস হয়েছিল বহু সড়ক ও রেলপথসহ বহু অবকাঠামো। ফলে  যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। এগুলো সচল করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজন পড়ে সার্বিকভাবে পুরো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যাপারে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রহণ করা হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী উন্নয়ন অবকাঠামোয় সড়ক, জনপথ ও পরিবহন খাতের উন্নয়ন বিশেষ অগ্রাধিকার পেয়েছিল।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে দেশে বিদ্যমান চার হাজার ৬৫৬টি সেতু ও কালভার্টের মধ্যে প্রায় ২৭৪টি সেতু ও কালভার্ট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংস করা হয় চার হাজার ২৪৪টি ট্রাক, এক হাজার ৯৫২টি বাস ও অসংখ্য নৌযান। এ অবস্থা মোকাবেলা করার লক্ষ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চলমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্নকরণ, প্রয়োজনীয়সংখ্যক সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, পরিবহন যানের মানোন্নয়ন এবং নতুন অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে বিশেষ জোর দেয়া হয়। এছাড়া কম খরচে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর ব্যাপারেও প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। সড়ক ও পরিবহন খাতের উন্নয়নে ওই পরিকল্পনায় মোট ১০৪ দশমিক ৬৮ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়। কৌশলগত পরিকল্পনা হিসেবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, সড়ক ও পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট উপাত্তের সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বিদ্যমান ডকইয়ার্ড ও পোর্ট, নৌযান, বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন, বিমানবন্দর স্থাপন এবং সমুদ্রবন্দর মাইন মুক্ত করা প্রভৃতি বিষয়েও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দেশের বৈদ্যুতিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭১-এ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। দেশের প্রায় সব বৈদ্যুতিক গ্রিড লাইন, ১২৫-এর অধিক ট্রান্সমিশন লাইন, গ্রিড স্টেশন, ডিস্ট্রিবিউশন লাইন ও সাবস্টেশন ধ্বংস হয়। যুদ্ধের পরপরই এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ গ্রহণ করা হয় শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। বৈদ্যুতিক অবকাঠামো বিনির্মাণে ওই পরিকল্পনায় দেশের সব স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি দূর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা হ্রাস, গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের আওতা বৃদ্ধি, দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বৈদ্যুতিক উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন ও বৈদ্যুতিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের পথচলাগুলো মসৃণ ছিল না। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বাঁকবদল সবকিছু সামলে বাংলাদেশ অনন্য অর্জনের দাবিদার। বিশ্বব্যাংকের ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের গ্রামীণ জনসংখ্যার ৮৩ শতাংশের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়, ৫৫ শতাংশের কাছে উন্নত স্যানিটেশন ও ৪৭ শতাংশের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে সফল হয় দেশটি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তির হার ছিল ৯২ শতাংশ, যা অসাধারণ এক অর্জন। একই সময়ে ৪৫ শতাংশ মানুষের কাছে মোবাইল ফোন আর ৬৫ শতংশ মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সফল হয় বাংলাদেশ। আরো উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে ১৯৮১ সালে মাথাপিছু জিডিপি আয় ছিল মাত্র ২০৯ ডলার, ২০১০ সালে এটি হয় ৬৯০ ডলার। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে আরো যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সেটি হচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ। ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামের ওইসব দরিদ্র মানুষের হাতে নগদ অর্থ তুলে দিয়েছে, যাদের কোনো ব্যাংক হিসাব ছিল না। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের পাশাপাশি এখন তারা সঞ্চয়, বীমা ও অর্থ হস্তান্তরের মতো সেবা প্রদান করছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রদান করা হচ্ছে সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিষেবা। গত ১৪ বছরে বাংলাদেশের গড়ে ১১ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। 

বিশেষ করে নারীদের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারগুলোর অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তাছাড়া পুরুষের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি সফলভাবে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমকে কাজে লাগাতে সমর্থ হয়েছেন। ক্ষুদ্র ঋণের প্রভাব শুধু দারিদ্র্য বিমোচন সূচক দিয়ে মূল্যায়ন করলেই হবে না, সেটিকে দেখতে হবে আরো বহুমাত্রিকভাবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার প্রসার ঘটেছে।

এ পর্যায়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পরোক্ষ প্রভাবগুলোর দিকে আলোকপাত করা যাক। বিশেষ করে অবকাঠামো ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে গ্রামীণ উন্নয়ন এবং দারিদ্র্যবিমোচনে প্রভাব রাখে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল—১০ বছরে কৃষিতে উন্নত সেচ কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন এবং কৃষি ও অকৃষি খামারের জন্য আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি আরো যে বিষয়গুলোতে জোর দেয়া হয় সেগুলো হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে গ্রামের মানুষের আয় ও ভোগের পরিমাণ বৃদ্ধি। অবকাঠামো আর ক্ষুদ্র ঋণ সম্পৃক্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধি কৃষি কাজ ও এর ধরনগুলোকেও প্রভাবিত করে। এ ঋণ সুবিধা গ্রামীণ কৃষি ও অকৃষি খামার কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এতে গ্রামীণ অকৃষি খামার থেকে আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটে ৬৩ শতাংশ, আগে যেটির পারিমাণ ছিল ২০ শতাংশ। এতে করে মাথাপিছু আয় ও মাথাপিছু ভোগব্যয়ের পরিমাণও বাড়ে। মাথাপিছু আয় ও ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতায়ন, পাকা সড়ক আর এফএফআইয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। পাকা সড়কের সুবিধার কারণে মাথাপিছু ভোগব্যয় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অন্য একটি গবেষণায়ও ইতিবাচক তথ্য মেলে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রয়াসে আশির দশকে ব্যাংক খাতের সংস্কার ও উদারীকরণের কাজ শুরুর বিষয়টিও তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সে সময় বেসরকারি খাতে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিকে সরকার অনুমোদন দেয়। বেশ কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংককে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৮৪ সালে একটি জাতীয় পর্যায়ে মানি, ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কমিশন গঠিত হয় এবং ওই কমিটি ১৯৮৬ সালে আর্থিক খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করে। পরে নব্বইয়ের দশকে গৃহীত ‘আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচি’ বাংলাদেশে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা সৃষ্টির গোড়াপত্তন করে। এর ধারাবাহিকতায় সরকার ‘ব্যাংক সংস্কার কমিটি’ গঠন করে এবং ১৯৯১ সালে ওই কমিটি সরকারকে সংস্কারের প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে। পরে একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প ও বাণিজ্যিক ব্যাংক পুনর্গঠন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের দৃশ্যমান আইনগত ভিত্তি, অটোমেশন ও মানবসম্পদের উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নতি ওই উদ্যোগগুলোর ফল বলে বিবেচিত হয়।

এমএফএসের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংক সম্প্রসারণ কার্যক্রম কৃষির তুলনায় অকৃষির মজুরির বৃদ্ধি ঘটায়। কারণ ঋণসুবিধা আর প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে অনেকেই অকৃষি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া শুরু করে। কেননা কৃষির বাইরেও অনেক ধরনের কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়। দোকানপাট, বাজার, পাকা রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই সঙ্গে সমান্তরালভাবে তৈরি হতে শুরু করে নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র ও ধরন। সব মিলিয়ে গ্রামীণ আবহাওয়ায় বৈচিত্র্যের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বর্তমানে ক্রমে শিল্প ও সেবা খাতনির্ভর হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২০১৯ অর্থবছর) জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি অবদান সেবা খাতের, ৫১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর শিল্প খাতের অবদান হচ্ছে ৩৫ শতাংশ। পৃথিবীর সব দেশেই উন্নয়নের পথপরিক্রমায় এ খাতগুলোর অবদান এভাবে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা শহরের সঙ্গে গ্রামের সংযোগ বাড়িয়ে তোলে। শহর কিংবা মফস্বলের নতুন নতুন কাজ ও সেবা ক্রমে গ্রামেও পাওয়া যেতে শুরু করে। চায়ের দোকান, খাবার দোকান, কিন্ডারগার্টেন স্কুল, কোচিং সেন্টার, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফটোকপি ও প্রিন্টিংয়ের দোকান ইত্যাদি বহু রকমের কাজ ও পেশার সৃষ্টি হওয়া শুরু করে গ্রামের আশপাশের বাজার ও উপশহরগুলো ঘিরে, যা  গ্রামীণ অর্থনীতির বহুমুখী কার্যক্রমের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ঘটে।

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে উন্নত রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ ইত্যাদি জীবনযাত্রার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ ও কমিয়ে এনেছে কাজ সম্পাদন করার সময়। অকৃষিজাত কাজের এ সুযোগ সৃষ্টির নেপথ্যে অন্যতম ভূমিকা পালন করে উন্নত অবকাঠামো। গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুৎ সংযোগের ফলেও কর্মসংস্থান ও আয়ের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাতে কাজ করা বা দোকান খোলা রাখার ফলেও খাতটির উৎপাদনশীলতা বাড়ে। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে গ্রাম থেকে শহরে শ্রমিক স্থানান্তর ও শহরে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রসারও মজুরি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। প্রযুক্তির প্রাপ্যতাও কাজের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি গ্রামের মানুষের বড় শহর এবং বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ বৃদ্ধি করে। কেননা তারা সহজেই পণ্যের বাজার ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ বহুবিধ বিষয়ে জানতে সক্ষম হয়।

তাই আমরা দেখতে পাই, উন্নত অবকাঠামো খামারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বিস্তারে সাহায্য করে। অবকাঠামোগত দিক থেকে উন্নত গ্রামগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয় এবং অকৃষি শ্রমবাজারে চাঞ্চল্য আসে। কারণ অবকাঠামো প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করে।

গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকায় অবকাঠামোর প্রভাব মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমরা উল্লেখিত বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে দেখি। আমরা দেখছি, অবকাঠামোগত রূপান্তরের কারণে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে উন্নত গ্রামের অনুপাত বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা বলতে পারি, গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামোতে প্রবেশগম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আশি ও নব্বইয়ের দশকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিস্তৃতির কথা শোনা যায়। আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও উৎপাদনের মধ্যকার বিরাজমান সম্পর্কটি এখানে তাই খুঁটিয়ে দেখতে পারি। এটা খুবই স্বাভাবিক, উপকরণ আহরণ ও উৎপাদন বিতরণে সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে অবকাঠামো শস্য উৎপাদন কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

সময়ের বিবর্তনে শস্য-নিবিড়তার ক্ষেত্রে উন্নত গ্রামগুলো এগিয়ে আগে। কারণ পাকা রাস্তা ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উন্নত গ্রামগুলো সময়মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ হাতে পাওয়ার সুযোগ লাভ করে। তাছাড়া একই ধরনের সুবিধা এসেছে বাজারজাতের সুযোগ সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ফলে। অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে গ্রামে কৃষি উপকরণ, সম্প্রসারণমূলক কর্মকাণ্ড, কৃষির উৎপাদনশীলতা ও পণ্য বাজারজাত সুবিধা বৃদ্ধি পায়।

গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যামন, যদিও অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার কাজটি কিছুটা কৌশলী। তবে অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ আয় ও ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ বাংলাদেশের গোষ্ঠী এবং পারিবারের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে, যা দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

 

শহিদুর আর খন্দকার: সাবেক লিড ইকোনমিস্ট

বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্র

হুসাইন এ সামাদ: বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক

ইংরেজি গবেষণা প্রবন্ধ থেকে ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস