সভ্যতার ক্রমবিকাশ
ঘটেছে নির্মাণ
শিল্পের উপকরণ
আবিষ্কার এবং
ব্যবহারের সঠিক
পদ্ধতির ক্রমোন্নয়নের
মাধ্যমে। হাজার
হাজার বছর
আগে পিরামিড,
মেসোপটেমীয় সভ্যতা,
ইনকা সভ্যতা
সবই নির্মাণ
শিল্পের এক
অনন্য উত্কর্ষের
উদাহরণ। গুহাবাস
থেকে মানবসমাজ
যখন জনপদে
বসতি স্থাপন
শুরু করে
তখন থেকেই
ধাপে ধাপে
টেকসই বসতি
স্থাপনের জন্য
আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর
ব্যবহার চলে
আসছে। ক্রমাগত
গবেষণার হাত
ধরেই অষ্টাদশ
শতাব্দী থেকে
শুরু করে
একবিংশে এসেও
চলছে তার
ধারাবাহিকতা। বর্তমান
সময়কে বলা
চলে নির্মাণ
শিল্পের চরম
উত্কর্ষের যুগ।
স্বাধীনতা-উত্তর
বাংলাদেশে খাদ্য,
বস্ত্র আর
চিকিৎসার ন্যূনতম
চাহিদা পূরণের
সংগ্রাম চলে
যায় প্রায়
৩০ বছর।
দেশের অবকাঠামো
উন্নয়ন ও
আবাসন শিল্প
ছিল এ
সময় প্রায়
উপেক্ষিত থেকেছে
অথচ দেশের
সামগ্রিক ও
সমন্বিত উন্নয়ন
সূচকের শর্তই
হচ্ছে এ
দুইয়ের সমন্বিত
উন্নয়ন। নব্বই
দশকের মাঝামাঝিতে
এসে দেশ
ধীরে ধীরে
আমদানিনির্ভর নির্মাণ
উপকরণ স্বদেশে
উৎপাদনের যুগে
প্রবেশ করে।
সিমেন্ট ও
ইস্পাত উৎপাদনের
ছোট ছোট
কারখানা গড়ে
ওঠে দেশব্যাপী।
নব্বই দশকে
দেশে মাথাপিছু
সিমেন্ট ব্যবহার
ছিল মাত্র
৫০ কেজিরও
কম। বর্তমানে
তা প্রায়
২২০ কেজি।
সমভাবে ইস্পাতের
ব্যবহারও দুই-আড়াই
দশকে প্রায়
চার গুণ
বেড়েছে।
তার পরও
বিশ্বের গড়ে
সিমেন্ট ব্যবহার
যেখানে মাথাপিছু
৫০০ কেজি
তার তুলনায়
আমাদের নির্মাণ
শিল্প এখনো
প্রাথমিক পর্যায়ে
রয়েছে। এখানে
রয়েছে ব্যাপক
সম্ভাবনা। ইস্পাত
ব্যবহারের ক্ষেত্রেও
আমরা বিশ্বের
পশ্চাত্পদ দেশের
তালিকায় রয়েছি।
ইস্পাতকে বলা
হয় আধুনিক
সভ্যতা বিনির্মাণের
অন্যতম প্রধান
উপকর। যেসব
দেশের হাতে
ইস্পাতের ভাণ্ডার
রয়েছে তারাই
আগামী পৃথিবীর
উন্নয়নের নিয়ন্ত্রক
হবে এতে
কোনো সন্দেহ
নেই। সৌভাগ্যক্রমে
বাংলাদেশের হাতে
সিমেন্ট ও
ইস্পাতের কাঁচামালের
কোনো উপকরণের
নিজস্ব জোগান
না থাকা
সত্ত্বেও এ
দুটি শিল্পের
চাহিদার দ্বিগুণ
পণ্য উৎপাদনক্ষমতা
রয়েছে আমাদের।
সিমেন্ট শিল্পে
বিনিয়োগ হয়েছে
প্রায় ৩০
হাজার কোটি
টাকা, ইস্পাত
শিল্পে বিনিয়োগ
হয়েছে প্রায়
৪০ হাজার
কোটি টাকার
ওপরে। এছাডা
টাইলস, স্যানিটারি
পাইপ, কেবল
ইন্ডাস্ট্রি, পেইন্ট
ইন্ডাস্ট্রিসহ অনেক
নির্মাণসহায়ক সামগ্রীর
কারখানা গড়ে
উঠেছে, যেখানে
বিনিয়োগ হয়েছে
হাজার হাজার
কোটি টাকা,
হয়েছে হাজারো
কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে
কৃষির পর
সবচেয়ে বেশি
কর্মসংস্থান সৃষ্টি
হয়েছে নির্মাণ
শিল্পে, ব্যাপক
গ্রামীণ অবকাঠামো
উন্নয়ন এবং
আর্থসামাজিক উন্নয়নের
কারণে বসতির
চাহিদা বৃদ্ধি
নির্মাণ শিল্পে
ব্যাপক কর্মসংস্থান
সৃষ্টি করেছে।
নির্মাণ শিল্পে
বহুমুখী পণ্যের
চাহিদার কারণে
ব্যাপক সহায়ক
পণ্য উৎপাদন
কারখানা তৈরি
হয়েছে, যা
এ শিল্পকে
শ্রমঘন শিল্পে
রূপান্তর করেছে।
বাংলাদেশে বর্তমান
উন্নয়ন সূচকে
নির্মাণ শিল্পের
ব্যাপক অবদান
রয়েছে। উন্নয়নশীল
দেশগুলোতে কর্মসংস্থান
তৈরি একটা
বড় চ্যালেঞ্জ,
নির্মাণ শিল্পে
ক্রমাগত বিনিয়োগ
যেকোনো উন্নয়নশীল
দেশের অবকাঠামো
ও পরিকাঠামোর
মূল ভিত
রচনা করে
দেয়, যার
হাত ধরে
সামগ্রিক অর্থনীতির
মূল পরিকাঠামো
উন্নয়নের মাধ্যমে
শিল্পায়ন, কৃষি
অর্থনীতির উন্নয়ন,
পর্যটন, সামগ্রিক
বিদ্যুতায়ন নেটওয়ার্ক
গড়ে ওঠে;
তৈরি হয়
ব্যাপক কর্মসংস্থান।
দেশের অভ্যন্তরীণ
যোগাযোগ নেটওয়ার্ক
দুর্বল থাকায়
নির্মাণ শিল্পের
মূল হাব
তৈরি হয়েছে
ঢাকা ও
চট্টগ্রামকে ঘিরে,
যার কারণে
দেশের অবকাঠামো
উন্নয়নের ফোকাসও
তৈরি হয়েছে
এ দুটি
শহরকে কেন্দ্র
করে, যা
কিনা সুষম
উন্নয়নের ধারণার
পরিপন্থী। সুষম
উন্নয়ন নিশ্চিত
করতে হলে
দেশব্যাপী নির্মাণসামগ্রী
উৎপাদন কারখানা
স্থাপনে সরকারের
সমন্বিত পরিকল্পনা
প্রয়োজন। নতুনভাবে
নির্মাণসামগ্রীর কারখানা
স্থাপনের ক্ষেত্রে
সরকারের উচিত
উত্তরবঙ্গ ও
দক্ষিণবঙ্গে কারখানা
স্থাপনে উৎসাহিত
করা। নির্মাণসামগ্রী
ভারী বস্তু
হওয়ায় পরিবহন
খরচ সংবেদনশীল
হয়, যার
কারণে দেশের
সুষম উন্নয়নের
স্বার্থে দেশের
অবহেলিত দুই
অংশে নির্মাণসামগ্রী
উৎপাদনে বিনিয়োগের
আহ্বান জানাতে
হবে। আমাদের
দেশে নির্মাণ
শিল্পে একটা
বড় চ্যালেঞ্জ
হচ্ছে পরিবেশবান্ধব
ইটের ব্যবহার,
সনাতন ইটের
ভাটায় ফসলি
জমির মাটি
কেটে বৃক্ষ
নিধন করে
তৈরি হচ্ছে
ক্লে-ব্রিকস।
জনবহুল দেশে
এভাবে ফসলি
জমির মাটির
ব্যবহার দেশকে
দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য
সংকটের দিকে
ঠেলে দেবে।
ইটভাটার জ্বালানিতে
কাঠের ব্যবহার
পরিবেশের জন্য
মারাত্মক হুমকির
কারণ হয়ে
উঠছে। এমনিতেই
বৈশ্বিক উষ্ণতা
আমাদের জীবনকে
দুর্বিষহ করে
তুলছে, তার
ওপর এভাবে
নির্বিচারে বৃক্ষ
নিধন করে
আমরা আমাদের
পরিবেশকে বসবাসের
অযোগ্য করে
তুলছি দিন
দিন। আমরা
যদি এখনই
বিকল্প উদ্যোগ
না নিই
তাহলে পরিবেশ
বিপর্যয়ের দায়ভার
বহন করা
কঠিন হয়ে
যাবে। বাংলাদেশ
নদীবহুল দেশ
হলেও আমরা
সঠিকভাবে এর
সুফল কখনো
ভোগ করতে
পারিনি অথচ
আমাদের রয়েছে
অপার সম্ভাবনা,
ক্লে-ব্রিকস
তৈরিতে প্রধানত
মাটির প্রয়োজন
হয় আর
আমাদের সব
নদী ভাটিতে
হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবেই
বিলিয়ন বিলিয়ন
ঘনফুট মাটি
উজান ডলের
সঙ্গে ভাটিতে
আমাদের নদীগুলোতে
জমা হয়।
এ মাটি
ব্যবহার করে
আমরা নদী
উপকূলে স্বয়ংক্রিয়
ইটভাটা তৈরি
করে এ
সমস্যার সমাধানের
একটা উপায়
নির্ধারণ করতে
পারি। যেহেতু
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ
উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ
এসব ইটভাটায়
বিকল্প জ্বালানি
হিসেবে বিদ্যুতের
ব্যবহার আমাদের
পরিবেশ বিপর্যয়
থেকে রক্ষা
করবে। নদীর
কূলে ভাটা
স্থাপনের আরেকটি
বড় সুবিধা
পাওয়া যাবে,
নদীপথে পণ্য
পরিবহন খরচ
উল্লেখযোগ্য পরিমাণে
হ্রাস পাবে।
এছাড়া প্রতি
বছর নদীর
নাব্যতা বজায়
রাখতেও সহায়ক
হবে। স্বাধীনতার
সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও
আমরা নির্মাণ
শিল্পকে একটি
আধুনিক পরিবেশবান্ধব
ব্যয়সাশ্রয়ী শিল্পে
রূপান্তর করতে
পারিনি। এখনো
আমরা সনাতনী
সাইট মিক্সিং
পদ্ধতিতে কনস্ট্রাকশন
করে পরিবেশদূষণসহ
যানজট তৈরি
করছি অথচ
প্রায় সোয়াশ
বছর আগে
উদ্ভাবিত রেডিমিক্স
প্রযুক্তি যা
কিনা ব্যয়সাশ্রয়ী,
পরিবেশবান্ধব ও
টেকসই প্রযুক্তি
তার ন্যূনতম
ব্যবহার এখনো
নিশ্চিত করতে
পারিনি। সর্বোপরি
জনবহুল দেশ
হওয়া সত্ত্বেও
আমরা এখনো
বহুতল ভবনের
পরিবর্তে স্বল্প
উচ্চতার ভবন
তৈরি উৎসাহিত
করছি, যার
কারণে শহর
অঞ্চলে জমির
অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি
ঘটছে, অনদিকে
গ্রামেও কোনো
আইন না
থাকায় অবাধে
ফসলি জমি
ভরাট করে
বসতবাড়ি নির্মাণ
করা হচ্ছে।
নির্মাণ শিল্পকে
সর্বোচ্চ গুরুত্বের
সঙ্গে বিবেচনায়
নিয়ে সামগ্রিক
পরিকল্পনা গ্রহণের
মাধ্যমে কর্মসংস্থান
সৃষ্টিসহ ব্যাপক
অর্থনৈতিক উন্নয়ন
ঘটানো সম্ভব।
জহির আহমেদ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেড





