স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে এখন বাংলাদেশ। এ ৫০ বছরকে দশক বা যুগওয়ারি ভাগ করলে দেখা যায়, প্রথম ১০-১২ বছর বিদ্যুৎ খাতে তেমন কিছুই হয়নি, একমাত্র আশুগঞ্জ-ঘোড়াশালে রাশিয়ার নির্মাণ করা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া। প্রথম ১০-১২ বছর বিদ্যুতের চাহিদাও তেমন ছিল না। কাজেই পরবর্তী ১০ বছর আমরা বিদ্যুতের বিষয়টিকে খুব একটা আমলে নিইনি। তৃতীয় ১০-১২ বছরে আমরা বুঝতে পারছিলাম, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে ১৯৯৬-৯৮ সালের দিকে এসে আমাদের পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ ও প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদার কাঠামোগত পরিকল্পনায় একটা গ্যাপ থেকে যায়। তখনকার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোয় বিদ্যুৎ-জ্বালানিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বরং কৃষি, কৃষি ভর্তুকি, সার কারখানা প্রভৃতিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে বেশি।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি এসেছে অনেক পরে। ১৫-১৭ বছর আগে বর্তমান সরকারের আগের সরকারের আমলে। ওই সরকার ২০-৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের একটা ধারণা তৈরি করেছিলেন। তখন পিডিবি দরপত্র আহ্বান করেছিল। ১ লাখ টাকা প্রতিটি দরপত্রের মূল্য এবং ১২০ জন বিডারের কাছ থেকে সংগৃহীত হয়েছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। দরপত্র গৃহীত হয়নি। সিদ্ধান্তও হয়নি এবং কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রও হয়নি। ওইটা আমলাতন্ত্রের কাজ। সেই আমলাতন্ত্র এখনো বিদ্যমান। সেটি আর পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে প্রকিউরমেন্ট নীতিতে সরকার কিছু পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু আমলাতন্ত্রে তেমন পরিবর্তন না আসায় এখনো সরকারি প্রকিউরমেন্ট খুব চ্যালেঞ্জিং।

আমরা দেখি, ২০০৫ সালের পর থেকে বিদ্যুত্টাকে খুব বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়। তখন চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতি মেটাতে সরকার আইপিপিকে উৎসাহ দিতে শুরু করে। মজার বিষয় হলো, তখন এইএইচ নামে একটি মার্কিন কোম্পানি বাংলাদেশে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে। এর মধ্য দিয়ে দেশে আইপিপি সংস্কৃতির উদ্বোধন ঘটে। যতদূর মনে পড়ে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারই ২০০৭-০৮ সালে ১০-৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) নির্মাণের অনুমোদন দেয়। পরবর্তী সময়ে সংসদে সরকার এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য একটা আইন পাস করে, যা এখন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেটি বলবৎ থাকবে। সম্প্রতি সংসদে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আবারো বাড়ানো হয়েছে। যদিও আমার মনে হয় তার খুব একটা প্রয়োজন নেই।

এখন আমাদের যেটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, সেটি যথেষ্ট। আমার মনে হয় সরকার হিসেবে বিশেষ করে আইপিপি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ভালো আলোচনা করেছে। পরবর্তী সময়ে যেসব আইপিপি এসেছে তারা প্রত্যেকেই অনেক পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে। এ ধরনের প্রজেক্টগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, নির্মাণ, অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ভালোভাবে পরিচালনা করছে। বলা চলে, দক্ষতার সঙ্গে ব্যক্তি খাত তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালাচ্ছে। ফলে ২০১০ সাল থেকে আজকে ২০২১ সাল নাগাদ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কার্যকরভাবে চালানো হচ্ছে। চুক্তিতে সরকারও সুরক্ষিত, আইপিপিগুলোও সুরক্ষিত এবং ব্যাংক উপযোগী (ব্যাংকেবল)। চুক্তিটা ব্যাংকেবল করাতে লাভ হয়েছে সবারই।

মনে রাখতে হবে, ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র করার জন্য ন্যূনতম ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়। এ বিনিয়োগের অর্থায়ন সহজেই বাংলাদেশী ব্যাংকগুলো থেকে উত্তোলন করা সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে অবশ্য ইডকলের মতো একটি অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা এ ধরনের প্রজেক্টে অর্থায়ন করে থাকে। চুক্তি ব্যাংকেবল না হলে ফাইন্যান্সিয়াল ক্লোজার করা সম্ভব নয়। ব্যাংকেবলের মধ্যে আবার অনেকগুলো কনট্যাক্ট আছে। যেমন ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট, ফুয়েল সাপ্লাই এগ্রিমেন্ট, ল্যান্ড লিজ এগ্রিমেন্ট প্রভৃতি। যতগুলো এগ্রিমেন্ট আছে সবগুলো যুগোপযোগী ও ব্যাংকেবল। এজন্য এতগুলো প্রজেক্ট স্থানীয়ভাবে কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফাইন্যান্সিয়াল ক্লোজার করা গেছে। প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়ার জন্য সরকার অনেক জায়গায় সভরেন গ্যারান্টিও দিয়েছে। সরকারের এসব সাপোর্ট আইপিপি প্রজেক্ট এবং বিদ্যুৎ খাতকে একটা সেবা প্রদানযোগ্য জায়গায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে।

আমাদের আজকের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সরকারি অব্যাহত নীতি সমর্থন এবং আইপিপিগুলোর কারণে সম্ভব হয়েছে। আমরা অনেকেই বলি, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ আছে। এটা খুব সাংঘর্ষিক। আমার মনে হয় উদ্বৃত্ত দরকার। আজ থেকে ১০ বছর আগে বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে অনেক কষ্ট করতে হতো। অনেক ফ্যাক্টরি অনেকদিন বসে ছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নি। এজন্য তারা ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের দিকে যাত্রা করে। প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে আমাদের। দুটো কারণে—এক. সস্তায় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং দুই. মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ জোগানো। আজকালকার আধুনিক মেশিন চালানোর জন্য মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ খুব প্রয়োজন হয়। সবখানেই মাইক্রো প্রসেস কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট কিংবা পিএলসি দিয়ে ফ্যাক্টরি মেশিন চালানো হয়। পিএলসি কনট্রোলড ইকুইপমেন্ট বসানো হয়। এ ইকুইপমেন্টগুলো অপারেশনাল এবং পারফর্মিং রাখতে হলে খুব মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। নইলে সেখানে তথ্য হারানোর অনেক শঙ্কা আছে। যেখানে শাটডাউন হলে ডাউনটাইমের ব্যয় সাংঘাতিক বেশি। যেখানে যে ডোজিং হওয়ার কথা, সেই কেমিক্যাল ডোজিং যথাযথভাবে করতে হলে মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। সেখানে তারতম্য ঘটলে চূড়ান্তভাবে ভালোমানের পণ্যটি উৎপাদন হবে না। এ বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনকে বুঝতে হবে, সামনে আরো চ্যালেঞ্জিং সময় আসছে। ফলে নির্ভরযোগ্য পাওয়ার সাপ্লাইয়ের ইস্যুটি নিরসন করতে হবে। একই সঙ্গে কোয়ালিটি পাওয়ার সাপ্লাইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আন্ডারভোল্টেজ হতে পারবে না, কোনো ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন হতে পারবে না। এটা নিশ্চিত করতে হবে। কাজেই এখানে সরকারকে আগামীতে যে জায়গাটি মানসম্পন্ন বিতরণ ও সঞ্চালন নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটা নিশ্চিত না হলে এর জাতীয় ক্ষতি অনেক বেশি হবে।

এখানে অর্থনৈতিক ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণও জরুরি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে যদি সরকার ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে, এর মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে ১ বিলিয়ন খরচ বাঁচাতে পারবে। একটা ফ্যাক্টরিতে যদি পাঁচ হাজার কর্মী থাকে, বিদ্যুতের জন্য তারা বসে থাকে ১ ঘণ্টা, তাহলে পাঁচ হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। সেটি উৎপাদনের দিক থেকেও, আর্থিক ব্যয়ের দিক থেকেও, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক থেকেও আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার। এজন্য বিশেষ করে প্রসেস ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে এখনো ক্যাপটিভ বিদ্যুতের চল রয়ে গেছে। যারা করছে তারা সবাই ব্যক্তি খাতের সচেতন উদ্যোক্তা। চূড়ান্তভাবে তারা এটাকে কো-জেনারেশনেও নিয়ে গেছে। একাধারে বিদ্যুতের ব্যবহার নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে করছে, অন্যদিকে ওখান থেকে হিট নিয়ে বিভিন্ন দিকে কাজে লাগাচ্ছে, বিশেষ করে এয়ারকন্ডিশনিংয়ের কাজে, বয়লারের প্রি-হিটিংয়ের কাজে।

একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার, গ্যাসের দাম কম হওয়ায় ক্যাপটিভ বিদ্যুতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সরকারি গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার চেয়েও কম হতো। ফলে ব্যবসা করার ব্যয় কমে আসত, জ্বালানি বা বিদ্যুতের খরচ কমে আসত। এতে উৎপাদনশীল খাত, সুনির্দিষ্ট ফ্যাক্টরি বা শিল্প অনেক ভালো নৈপুণ্য দেখাতে পারত। শিল্পটি পোশাক বা বস্ত্র হলে তারা সময়মতো পণ্য উৎপাদন করে রফতানি করতে পারত কিংবা অভ্যন্তরীণ বাজারে বিপণন করতে পারত। দুঃখজনকভাবে সরকার পদ্মা নদীর পূর্বাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ সীমিত করে রেখেছিলেন। পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি। ফলে ওইসব জায়গায় শিল্পায়ন হয়নি। শিল্প-কারখানাগুলো ভীষণভাবে ভুগছে। গ্যাসের সংযোগ না থাকায় একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা এখন মৃত। নদীর উত্তর, পশ্চিমাঞ্চল কিংবা দক্ষিণাঞ্চলে শিল্প ওইভাবে গড়ে ওঠেনি। কারণ গ্যাস সরবরাহ নেই। কিন্তু অবকাঠামো ঠিকই আছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে।

এখন গ্যাস সরবরাহ নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমিত না রেখে সারা দেশকেই একই জ্বালানির একটা নেটওয়ার্কের ভেতরে আনা জরুরি। কেননা পূর্বাঞ্চলে শ্রমিকের অভাব আছে। পশ্চিমাঞ্চল বা উত্তরাঞ্চলে শ্রমিক প্রচুর পাওয়া যায়। কিন্তু শিল্পায়ন সেখানে সেভাবে হয়নি। এর পেছনে অন্যতম কারণ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ, জ্বালানি কিংবা গ্যাস সরবরাহ না থাকা। ফলে প্রচুর সস্তা শ্রমিক সত্ত্বেও সেসব জায়গায় শিল্প গড়ে উঠতে পারেনি।

নিয়ম হলো, ফ্যাক্টরি মাইনের কাছাকাছি করা থাকবে। যাতে জ্বালানি ওখান থেকে নিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। কিংবা যেখানে চীনা মাটি পাওয়া যায়, সেখানে সিরামিক ফ্যাক্টরি করতে হয়। যাতে পরিবহন ব্যয়টা কমে আসে। সেই বিবেচনায় দেশে শিল্পায়নটা নদীর পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল সবখানে হওয়া দরকার ছিল। এখন এটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশনকে ওইদিকে নিয়ে যেতে হবে। আগামীতে সরকারকে জোর দিতে হবে বিদ্যুৎ খাতে ইনস্ট্রুমেন্টেশন করা, যাতে সুরক্ষা দেয়া যায়; মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময়। বাংলাদেশও সেদিকে যাচ্ছে। এখানে নতুন অনেক কিছু এবং বিদ্যুিনবিড় অনেক কিছু আছে। যেমন রোবোটিক। এর জন্য আমাদের এখনো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নেই। এ জায়গা থেকে সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে অত্যধিক দৃষ্টি দিতে হবে সরকারকে।

দেখা যাচ্ছে, সরকার এখন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রাধিকার দিচ্ছে। যেমন পদ্মা সেতু। এতে অনেক অটোমেশন আসবে। সেগুলো চালাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও গুণগতমানের বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। যেমন মেট্রোরেল। কোনোভাবে অনির্ভরযোগ্য ভোল্টেজ হলেই মেট্রোরেলে বড় ভোগান্তি হবে। আরো এ রকম অনেক আধুনিক অবকাঠামো আসছে। তার সঙ্গে সংগতি রেখে বিদ্যুৎ খাতকে সজ্জিত করতে হবে।

বর্তমানে আমাদের যতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে, সেটিকে ধরে রাখতে হবে। এর সঙ্গে বিদ্যুতের ডিস্ট্রিবিউশন, ট্রান্সমিশন, প্রটেকশন ও ইনস্ট্রুমেন্টেশনে জরুরি ভিত্তিতে সরকারকে জোর দেয়া উচিত। এতে জোর দিলে আমার ধারণা জনগণ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাবে। শুধু জোর দেয়া নয়, এটি একটি জাতীয় পরিকল্পনা হওয়া উচিত।

এতদিন বিদ্যুৎ অবকাঠামোর চেয়ে আমরা বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি বিদ্যুৎ উৎপাদনে। আসলে উৎপাদন না হলে ট্রান্সমিশন, ডিস্ট্রিবিউশন হবে না। এটা সত্যি কথা। এখন ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশনেও নজর দিতে হবে। বিদ্যুৎ খাতে আমাদের অবকাঠামো অনেক পুরনো। এখনো কিছু জায়গায় পাকিস্তান আমলে বসানো ট্রান্সফরমার অপারেশনে আছে। এখনো জিইএমকো বলে চট্টগ্রামে একটা প্রতিষ্ঠিত ফার্ম আছে। ওই প্রতিষ্ঠানের ট্রান্সফরমার এখনো ট্রান্সমিশনে আছে। আমাদের অনেক ট্রান্সমিশন লাইনই পুরনো। অনেক জায়গায় কিছু সাব-স্টেশন আছে, যেগুলোর প্রটেকশন সিস্টেম নেই, ইনস্ট্রুমেন্টেশন ঠিকমতো নেই। সিটি, পিপি যথাযথভাবে করা হয়নি। অগমেন্টেশন করা হয়নি। সরকার এখন সেগুলো করছে। কিন্তু কাজগুলো ধীরগতিতে চলছে। ফলে আমরা এখনো বিদ্যুৎ পেলেও তা মানসম্পন্ন নয়।

আরইবি থেকে প্রায়ই বলা হয়, মেইনটেন্যান্সের জন্য আজকে বিদ্যুৎ থাকবে না। আজকে যে বিদ্যুৎ থাকবে না তারা মাইকে বলে চলে যান। তারা যদি বলে যে অক্টোবরের অত অত তারিখের অমুক সময়ে মেইনটেন্যান্সের জন্য বিদ্যুৎ থাকবে না, তাহলে আমরা ফ্যাক্টরির ছুটিগুলো ওইভাবে ম্যানেজ করতে পারব। এটা আরইবিকে বুঝতে হবে। এখানে কিন্তু একটা গ্যাপ রয়ে গেছে। এ গ্যাপের কারণে ভুগছে ব্যক্তি খাত। সরকারি প্রতিটি জায়গায় সেটি পিডিবি, আরইবি হোক সবখানেই অদক্ষতা প্রচুর। তাদের পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। এখানে দক্ষতা বৃদ্ধি সরকারের একটা আশু করণীয় হওয়া দরকার।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো আমাদের দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করা। যেমন ঢাকা শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল করা হবে, অনেক সাবস্টেশন করা হবে, এটা মাস্টারপ্ল্যানে আছে। এটা করার কাজ একটা চাইনিজ কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে। চাইনিজ কোম্পানি কাজটা করে চলে যাবে। চলে যাওয়ার পর আবার যদি সমস্যা হয়, তাহলে ওই কোম্পানি এসে তা সমাধান করবে না। আমাদের পূর্বাভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, দেশে আসা বিদেশী কোম্পানিগুলো কাজ করে অর্থ নিয়ে চলে গেছে। এর ওয়ারেন্টি, সার্ভিস সাপোর্ট না থাকাতে দেখা যায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। অনেক সাবস্টেশন দেখেছি, নিয়মিত আগুন ধরে যাচ্ছে। এ সাবস্টেশনগুলো যদি দেশীয় কোম্পানির কাছ থেকে কেনা হতো, তাহলে পুড়ে গেলে, আগুন ধরলে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে খুব সহজেই ওয়ারেন্টি বা সার্ভিস ক্লেইম করতে পারত। বিদেশে প্রতিটি ইকুইপমেন্টের সঙ্গে এলটিএসএ (লংটাইম সার্ভিস এগ্রিমেন্ট) করা হয়। এ এলটিএসএ থাকলে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর জন্য সুবিধা। এতে স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারিং সুরক্ষিত হয়, লোকজনের কর্মসংস্থান হয়। সর্বোপরি খুব দক্ষতার সঙ্গে প্রজেক্টগুলো সামলানো যায়। এর নির্ভরযোগ্যতাও বেশি। বিদেশী কোম্পানিকে এলটিএসএ দেয়া হলে এটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। প্রজেক্ট ব্যয় বেড়ে যাবে। তারা স্থানীয় লোকজনকে দক্ষ করবে না। কাজেই স্থানীয় সম্পদকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারিংটাকে কাজে লাগাতে হবে। বিদ্যুৎ খাতে আমাদের অর্জন অনেক। এখন এগুলোয় মনোযোগ দিতে হবে। শুধু উৎপাদন নয়, একটি টেকসই ও স্থিতিশীল বিতরণ-সঞ্চালন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্প খাতে মানসম্পন্ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। এটি আমলে নিয়ে আমাদের বিদ্যুৎ খাত ঢেলে সাজানো জরুরি।

 

হুমায়ুন রশীদ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী

এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড