দেশে গ্যাসের প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালের দিকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর তীরে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর পরই। সেই সময় এ দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের একটা নতুন দিকের সূচনা হয়। গ্যাস ব্যবহারে ‘তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন’ (টিজিটিডিসিএল) গঠন করা হয়। তত্কালীন সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘শিল্প উন্নয়ন সংস্থা’র আওতায় গ্যাসের ব্যবহার শুরু করার জন্য দেশে প্রথম সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করে। ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৫৮ কিলোমিটার তিতাস-ডেমরা সঞ্চালন লাইন ছিল দেশের জ্বালানি খাতের অবকাঠামোর শুভ সূচনা। এ লাইন নির্মাণ করে সিদ্ধিরগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এর আগে মূলত গ্যাসফিল্ড থেকে সরাসরি সার কারখানায় গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ৬২-পূর্ববর্তী সময়ে ছাতক গ্যাসফিল্ড থেকে ছাতক সিমেন্ট এবং সিলেট গ্যাসফিল্ড থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানাসহ আরো একটি সার কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হয়।

গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে তেমন কোনো অবকাঠামো না থাকায় গ্যাসফিল্ড থেকে সরাসরি সার কারখানাগুলো জ্বালানি হিসেবে গ্যাস পেত। ১৯৬৮ সাল থেকে বেশ বড় আকারে গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয় এ দেশে। সেই সময় ঢাকা শহরে প্রথম গৃহস্থালিতে গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়। এর আগে ঢাকায় মূলত রান্নার জ্বালানি হিসেবে কেরোসিন ব্যবহার করা হতো। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের জ্বালানি খাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জ্বালানি খাতকে সম্প্রসারিত করার জন্য ১৯৭২ সালের তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ গঠনের জন্য বাংলাদেশ খনিজ তেল ও গ্যাস করপোরেশন (বিএমওজিসি) গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকটি আদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়। সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে ‘পেট্রোবাংলা’ গঠন করা হয়। যার মাধ্যমে মূলত দেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ আহরণ ও বিতরণে নিয়োজিত কোম্পানিগুলোকে দেখভাল করা শুরু হয়। বর্তমানে সংস্থাটির আওতায় এ খাতে মোট ১১টি কোম্পানি কাজ করছে। এই কোম্পানিগুলো মূলত দেশের গ্যাস উত্তোলন, অনুসন্ধান ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত।

এ ভূখণ্ডে গ্যাস আবিষ্কারের ছয় দশক পেরিয়েছে। ছয় দশকে দেশে গ্যাসের ব্যবহারও বেড়েছে। বর্তমানে দৈনিক ৩ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহূত হচ্ছে। এসব গ্যাস শিল্প, স্যার, গৃহস্থালিসহ ৯টি খাতে ব্যবহূত হচ্ছে। বছরের পর বছর গ্যাস ব্যবহারের খাত বাড়ানো হলেও অবকাঠামো উন্নয়ন করা যায়নি। এখনো দেশের বেশির ভাগ বিতরণ কোম্পানি পুরনো আঙ্গিকে গ্যাস ব্যবস্থাপনা করছে। যে কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। চুরি হচ্ছে গ্যাস। বেখেয়ালে হচ্ছে গ্যাসের অপচয়।

গ্যাসের অবকাঠামো উন্নত না হওয়ায় বর্তমানে বৃহৎ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকায় ঘটছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনার প্রাথমিক সূত্র ছিল মূলত পুরনো পাইপলাইন। কয়েক দশক আগে বসানো এসব পাইপলাইন নিয়ে যেমন মাথাব্যথা নেই সংস্থাটির, তেমনি নেই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা। তিতাসের কথা বলছি এজন্য যে দেশে যতগুলো বিতরণ কোম্পানি রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি তিতাস। সংস্থাটির আওতায় ২৮ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। জনবহুল রাজধানীসহ বেশ কয়েকটি জেলায় গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে তিতাস। এখন পর্যন্ত দেশের যতগুলো গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা ঘটেছে তার বেশির ভাগই তিতাসের আওতাধীন। এছাড়া অবৈধ গ্যাস সংযোগ, পাইপলাইন ও বকেয়া বিলের পরিমাণও সংস্থাটির সবচেয়ে বেশি। নারায়ণগঞ্জ ও মগবাজারে বহু মানুষের প্রাণহানি বলে দেয় তিতাস কতটা অব্যবস্থাপনা আর অনুন্নত। একটি হিসাব বলে দেয় দেশের গ্যাস খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে কতটা বেখেয়ালি সংস্থাটি।

রাজধানীতে তিতাসের ১৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি পাইপলাইন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে সাত হাজার কিলোমিটার। ঢাকার মধ্যে এমনও পাইপলাইন রয়েছে যা ২৫ বছর আগের। এছাড়া ঢাকায় নব্বই দশকের সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ৫০ পিএসআই চাপের পাইপলাইন রয়েছে, যেগুলো দিয়ে এখনো গ্যাস বিতরণ করা হচ্ছে। নানা সময়ে দুর্ঘটনা এড়াতে পাইপলাইন পুনর্নির্মাণ করছে সংস্থাটি। কিন্তু এসব পাইপলাইন স্থাপনে আধুনিকায়নের লেশমাত্র নেই। বিশেষত নতুন পাইপলাইন নির্মাণে ডিজিটাল ম্যাপিং ও জিআইএস মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করার সুযোগ ছিল বহু আগে। কিন্তু সেটা আজ অবধি করা হয়নি। এ প্রযুক্তি প্রতিস্থাপন করা গেলে ঢাকা শহরে তিতাসের কোথায় কোন পাইপলাইন দুর্ঘটনা ঘটবে তার আগাম বার্তা পাওয়া যেত, কোথায় গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে সেটি চিহ্নিত করা যেত। এরই মধ্যে গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে জিটিসিএল নেটওয়ার্ক মাইক্রোওয়েভ বেসড ‘স্ক্যাডা সিস্টেম’ চালু করেছে। এ পদ্ধতি সংস্থাটির সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় গতি এনে দিয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকায় নিখুঁতভাবে সঞ্চালন লাইন পর্যবেক্ষণ করছে সংস্থাটি।

জিটিসিএলের মতো গ্যাসের বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চালু করার সুযোগ থাকলেও বিতরণ কোম্পানিগুলো আজ অবধি তা করতে পারেনি। বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, সঞ্চালনে এটি করা গেলেও বিতরণের ক্ষেত্রে বিরাট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কেননা বিতরণ কোম্পানিগুলোর গ্রাহক সংযোগ জালের মতো ছড়িয়ে আছে।

তবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নও রয়েছে। চ্যালেঞ্জে থাকলেও বিতরণ কোম্পানিগুলো আধুনিকায়ন হওয়ার বহু সময় পেয়েছে। ডিজিটাল ম্যাপিং সিস্টেম ও স্ক্যাডা সিস্টেম চালু করা গেলে অবৈধ সংযোগ এবং নিয়মিত গ্যাস দুর্ঘটনা এড়াতে পারত কোম্পানিগুলো। দেশের গ্যাস দুর্ঘটনা রোধে এখনো তিতাসের ‘হেলথ সেফটি স্ট্যান্ডার্ড’ নেই, থাকলেও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে সংস্থাটির সদিচ্ছা এবং সরকারের যথাযথ তদারকির অভাব রয়েছে। তার বেশকিছু কারণও রয়েছে।

যদি তিতাসের কথাই বলি, তাহলে সেখানে দেখা গেছে, ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে গ্যাস কোম্পানিগুলোতে ক্রমাগত অপেশাদারদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ৯০ দশকে তিতাসের প্রশিক্ষিত জনবলের বড় একটি অংশ বিদেশে চলে যাওয়ায় সেখানেও বড় একটি ধাক্কা খায় সংস্থাটি। কিন্তু এসব অপেশাদারের জায়গায় নবীন প্রকৌশলীদের নিয়োগ দেয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি করা যায়নি। এছাড়া তিতাসের ইউনিয়নের কারণে সুষ্ঠুভাবে কাজ করার প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। চাইলেও সেখানে কর্মকর্তারা সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারেন না।

গ্যাস খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে তিতাসের বাইরে অন্য কোম্পানিগুলোর ইতিহাস দেখা যেতে পারে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮০ সালে বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেড (বিজিসিএল) নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়। গ্যাসের সঞ্চালন অবকাঠামোয় সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে ২০০৪ সালে বাখরাবাদ-ডেমরা সঞ্চালন পাইপলাইন ও বাখরাবাদ-চট্টগ্রাম সঞ্চালন পাইপলাইন গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফলে কোম্পানির কার্যক্রম শুধু বিতরণ ও বিপণনে সীমাবদ্ধ হয়। ২০০৮ সালে তিতাস ও বাখরাবাদকে পুনর্বিন্যাস করে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) ও বৃহত্তর নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও টিজিটিসিএলের নিয়ন্ত্রণাধীন সমগ্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়ে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (মূল কোম্পানি) নামে দুটি কোম্পানি গঠন করা হয়।

দেশের গ্যাসের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস খাতের কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি করা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস খাতের আধুনিকায়নে এসব কোম্পানি নিজেদের বদলাতে পারেনি। তবে গ্যাসের ব্যবহারের শুরুর কথা চিন্তা করলে গ্যাসের প্রাপ্ততা বিবেচনায় অবকাঠামো নিয়ে এতটা গভীরে ভাবা হয়নি। শুরুতেই ধারণা করা হয়েছিল শিল্প খাতেই কেবল গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে। কিন্তু চাহিদার বিবেচনায় যখন গৃহস্থালি সেক্টরে গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হলো তখন পুরনো লাইন থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাসের সংযোগ দিতে থাকে। গত ১৫ বছরে দেশে যে পরিমাণ গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে সে তুলনায় গ্যাসের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়নি।

মূলত সেই সময় ঢাকায় গ্যাসের ব্যবহার বাড়বে এমন পরিকল্পনা থেকেই গ্যাসের অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে গ্যাস ব্যবহারে আরো একটি খাত তৈরি করা হয়। শিল্প খাতকে প্রস্তুত করার জন্য সেই সময় ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়। ব্যক্তি উদ্যোগে শিল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় মূলত তখন। দেশে যখনই গ্যাস ব্যবহারের নতুন খাতগুলো সৃষ্টি হয়েছে তখন সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়েছে। তবে সে তুলনায় বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষ লোকবল ও অবকাঠামো বাড়ানো যায়নি। বাড়াতে হবে সেটি আমাদের বিতরণ কোম্পানিগুলো করতে পারেনি। ২০০৩ সালে ব্যক্তিমালিকানায় সিএনজি খাতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে দেশে সিএনজি স্টেশনগুলো বাড়তে থাকে। এভাবে মূলত পর্যায়ক্রমে দেশের গ্যাসের অবকাঠামো প্রসারিত হয়। তবে সেই অনুযায়ী বিতরণ ব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারেনি তিতাস। বর্তমানের কথাই ধরা যাক, তিতাসের আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও প্রতি বছর সংযোগ সংখ্যা কীভাবে বাড়ছে, কারা বাড়াচ্ছে সেটির কোনো তদারকি নেই। যত্রতত্র গ্যাসের সংযোগ টেনে গ্যাস ব্যবহার করছে অবৈধ সংযোগ প্রদানকারীরা। বছরের পর বছর এসব অবৈধ পাইপলাইন ও সংযোগ আড়ালে থেকে যাচ্ছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিতাসের আওতাধীন এলাকাগুলোতে কী পরিমাণ মিথেন ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো মূলত পুরনো পাইপলাইন থেকে বের হচ্ছে। যা শহরের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

 

ড. এজাজ হোসেন: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অধ্যাপক, বুয়েট