এক. ঘুঘুডাঙা গ্রাম, নিয়ামতপুর, নওগাঁ

নওগাঁর উপজেলা নিয়ামতপুর। বয়স্ক মানুষেরা বছর ২৫ আগেও বলতেন কিয়ামতপুর। বরেন্দ্রভূমির এঁটেল মাটির সড়ক বেয়ে গ্রাম থেকে গঞ্জ, গঞ্জ থেকে উপজেলা সদর কিংবা জেলা সদরে পৌঁছতে মানুষ কিংবা গরুর গাড়ি সবার কিয়ামত হয়ে যেত। এখানকার এঁটেল মাটির প্লাস্টিসিটি ইনডেক্স কমপক্ষে ৩০-এর বেশি। বয়স্ক মানুষ তো বটেই, শিশু-কিশোররাও আছাড় খেলে খবর হয়ে যেত। কত গরু ও পা ভেঙেছে, তার ইয়ত্তা নেই। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত। কৃষক সেদ্ধ আলু, মুড়ি আর গরুর গাড়িতে ধান নিয়ে রাইস মিলে ধান বিক্রি করে ফিরতে ফিরতে কমপক্ষে তিনদিন। আমরা উপজেলার ভেতরের রাস্তা দিয়ে ঘুঘুডাঙা গ্রামের সাঁওতাল পল্লীতে যাই। সাঁওতাল পল্লীর একটা স্কুলে বসে নিয়ামতপুরের বদলে যাওয়ার গল্প শুনি। সড়ক ও বিদ্যুৎ উপজেলার সব গ্রামকেই বদলে দিয়েছে। ধান নিয়ে যাওয়ার জন্য এখন কত রাইস মিল, কত চাতাল। আগে শীতকালে বছরে চার-পাঁচ মাস টিউবওয়েলে পানি উঠত না। খাবার পানি আনতে দুই-তিন মাইল হাঁটা লাগত। সড়ক হওয়ায় সহজে বিদ্যুতের খুঁটি পরিবহন করা গেছে, বিদ্যুৎ এসেছে। তাই এখন সাবমার্সিবল পাম্প বসে গেছে। ওভারহেড প্লাস্টিক ট্যাঙ্ক থেকে পাইপ নেমে আশপাশে বেশ কয়েকটা পানির কল।

গ্রামের মুখে একটা বাড়ির সামনে ব্যাটারি রিকশার গ্যারেজ। গ্যারেজে একটা গাড়ি। মালিকের সঙ্গে কথা বলি। গরু মোটাতাজা করার টাকায় প্রথম রিকশা কিনেছিলেন। এখন তিনটা রিকশা। একটা বাসায় থাকে। তার তিন মেয়ে। দুই মেয়ে দূরের একটা কলেজে পড়ত। একটা স্কুলে। তাই তাদের নিয়ে নিজেই রিকশা নিয়ে বের হতেন। করোনাকালে কলেজ নেই, এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। বাকি দুজনের জেদ, তারা পড়বেই। তাই একটা রিকশা এখনো নিজে চালান। বাকি দুটি ভাড়ায় চলে।

একটি সড়ক তার মতো অনেকের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। তার মেজো মেয়েটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছে। মেয়েদের ঘিরে তার ও স্বপ্ন বড় হচ্ছে।

দুই : বাগমারা, রাজশাহী

বাগমারায় ঢুকতেই বাংলা ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। ২০০৫ সালে বাংলা ভাই তার উগ্র ইসলামী দল নিয়ে বাগমারায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। যাকে ইচ্ছা ফাঁসি দিয়েছেন। বরেন্দ্রভূমির এঁটেল মাটির পিচ্ছিল সড়ক পেরিয়ে তাকে কিংবা তার দলকে পাকড়াও করা সহজ ছিল না। বাগমারা তিন জেলার মাঝামাঝি। দুর্বৃত্তরা এক জেলায় অপরাধ করে আরেক জেলায় লুকিয়ে পড়ত। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতায় সব বদলে গেছে। বাগমারার যেকোনো গ্রাম থেকে উপজেলা সদর তো বটেই, নওগাঁর পোরশা উপজেলা কিংবা নাটোরের সিংরা উপজেলায়ও সহজে যাওয়া যায়।

বরেন্দ্রভূমির বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এসব অঞ্চলে মাইলের পর মাইল বিল। জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ঠিক রেখে মাইলের পর মাইল গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন সহজ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে সড়কের দৈর্ঘ্য দুই-তিন গুণ বেড়েছে কিন্তু বিলের জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা হয়নি। বিগত ১০ বছরে বিলের মাছ উৎপাদন অনেক গুণ বেড়ে গেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে মাছের চাষ করছেন চাষীরা। ট্রাক কিংবা পিক-আপ পৌঁছে যাচ্ছে যখন-তখন। বিল থেকে মাছ নিয়ে রাজশাহী কিংবা বগুড়ার বড় আড়তে যেতে কয়েক ঘণ্টা লাগছে। বাগমারা সত্যিই বদলে গেছে।

তিন: কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর পাথরডুবি গ্রাম। পাশেই পশ্চিমবঙ্গের কুঁচবিহার জেলা। উপজেলা পর্যন্ত সড়ক জনপথ বিভাগের সড়ক। এরপর ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত এলজিইডি নির্মিত গ্রামীণ সড়ক। সড়কের সঙ্গে একটি বড় রাইস মিল। একটু পরই একটি কোল্ড স্টোরেজ। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে আমরা পূর্বনির্ধারিত সভায় বসি। সঙ্গে আমার জেলা-উপজেলার কয়েকজন সহকর্মী। তারপর গ্রাম দেখতে বের হই। ভুরুঙ্গামারীতে বেশ কয়েকটা ছিটমহল ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগের ফলে ছিটমহলবাসীর দীর্ঘ ৬৭ বছরের বঞ্চনারই শুধু অবসান হয়নি, এদের জীবন সত্যিই ম্যাজিকের মতো পাল্টে গেছে। এলজিইডির প্রকল্পে দ্রুত সড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে, বাজার হয়েছে, স্কুল-মসজিদ-মন্দির হয়েছে।

পাথরডুবি বড় গ্রাম। ছিটমহলের অংশে যত উন্নয়ন হয়েছে, পুরো গ্রামে সেভাবে হয়নি। কোনো কোনো পাড়ায় বর্ষায় চলাফেরা খুব কষ্টকর। হেমন্ত-শীতে ব্যাটারি রিকশা চলে। আমরা একটা প্রাইমারি স্কুলে যাই। স্কুল বন্ধ। বিশেষ কাজে শিক্ষক-শিক্ষিকা এসেছেন। শিক্ষিকা উপজেলা সদরে থাকেন। তার সঙ্গে কথা বলি। আগে স্কুলে আসতে-যেতে তার ৪ ঘণ্টা লেগে যেত। সড়ক উন্নয়ন হওয়ায় এখন এক-দেড় ঘণ্টা। খারাপ রাস্তায় শরীরের ধকল এত বেশি ছিল, ভেবেছিলেন চাকরিটাই ছেড়ে দেবেন। এখন ঠিক সময়ে আসেন, ঠিক সময়ে যান। বাচ্চাদের পড়িয়ে আনন্দ পান। বাড়ি ফিরে নিজের পরিবারে সময় দেন। একটি রাস্তা তার ও অনেকের জীবনমান পাল্টে দিয়েছে।

আমরা গ্রামবাসীর সঙ্গে মঙ্গা নিয়ে কথা বলি। মঙ্গা কীভাবে গেল? মঙ্গার সময় সবার টার্গেট ছিল কৃষিশ্রম। কার্তিক মাসে কৃষিশ্রম নেই, ঘরে খাবারও নেই। কৃষিশ্রমের সে ধারণাটিই এখন অতীত হয়ে গেছে। প্রতি পাড়ায় তিন-চারটি ট্রাক্টর। গরুর গোয়ালগুলোর ট্রান্সফরমেশন হয়ে খামার হয়ে গেছে। ধান ওঠার পর গরুর খাবার ভুট্টা অথবা অর্থকরী ফসল পেঁয়াজ কিংবা সবজি চাষ হচ্ছে। জিজ্ঞাসা করি, আগে যারা কৃষিশ্রম দিত, তারা কি করছে? উত্তর থেকে যা বুঝি, অকৃষি কর্মসংস্থান অনেক বেড়ে গেছে। ধানচাষ সবসময় লাভজনক না হলেও দুুই-তিন ফসল মিলে কৃষি লাভজনক। সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষির উন্নয়ন গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করে দিয়েছে। পরিবহন ব্যবসা বেড়ে গেছে, মোড়ে মোড়ে টি-স্টল বসে গেছে। যাদের এসবেও কর্মসংস্থান হচ্ছে না, সোজা ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম। রিকশা চালান কিংবা অন্য কাজে শ্রম দেন, মাসে একবার বাড়ি চলে আসেন। গ্রাম পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন হওয়ায় অভিবাসী শ্রমিক হওয়ার জন্য মনের জোরটা অনেক বেড়ে গেছে। সঙ্গে মোবাইল ফোন তো আছেই। পরিবারের সঙ্গে দিনরাত ইচ্ছামতো কথা বলছেন। মঙ্গার কথা তাদের আর মনেই নেই।

চার: চরের গ্রাম, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা

চরের মানুষ কেমন আছে? এদের তো ভালো সড়ক নেই। এদের জীবনযাপন বুঝতে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় যাই। ফুলছড়ি বাজার থেকে ট্রলারে ফুলছড়ি গ্রাম গেলাম। বর্ষায় জীবন অনেক সহজ। হেমন্তে মাইলের পর মাইল হাঁটা। কোনো কোনো চরে নিজস্ব প্রযুক্তিতে খড় ফেলে  মোটরসাইকেল চালান। হাওরে ডুবো সড়ক নির্মাণ করা যায়, চরে তাও সম্ভব নয়। প্রতি বছর নতুন পলির স্তর সড়ক বিলীন করে দেয়। নদীতে দেখা গেল ট্রলারে মানুষ আর গরু কাতারে কাতার।  কোরবানির সময় নয়, তবুও গরু বিক্রির কমতি নেই। আমরা গ্রামের ভেতর যাই। চরাঞ্চল, তাই উপজেলা থেকে গ্রাম পর্যন্ত রাস্তা নেই। তবে সগ্রামের ভেতর বেশকিছু রাস্তা আছে, বাকি রাস্তা শিগগিরই শুরু হবে। মোটর বাইক চলে। কিছু রিকশাও চলে। সাবমেরিন কেবল দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ চলছে। প্রতিটি জমিই উর্বর। প্রতিটি জমিতেই তিন ফসল। সড়ক যোগাযোগ সহজ না হওয়ায় কৃষক নায্যমূল্য পান না। তবুও তারা থেমে নেই। যতটা সড়ক আছে তা দিয়েই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গরু দিয়ে হালচাষ নেই বললেই চলে। ট্রাক্টর ব্যবসা ও ট্রাক্টরচালকদের একটা নতুন পেশা তৈরি হয়েছে। পেশার রদবদলে শুধু শহর নয়, বাংলাদেশের গ্রামগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে।

পাঁচ: কুতুবদিয়া, কক্সবাজার

দেশের সর্ব দক্ষিণের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া দেখতে যাই। বেড়িবাঁধের অভাবে দ্বীপটা ভেঙে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধের কাছাকাছি সড়কগুলোও বারবার হুমকির সম্মুখীন। তবুও দ্বীপের এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ভালো। লবণ পরিবহনে আগের সেই অমানবিক শ্রমের আর দরকার হচ্ছে না। সরাসরি লবণের মাঠ পর্যন্ত সড়ক। বড় ট্রাক্টরগুলো লবণ নিয়ে জেটিতে গিয়ে নৌকায় তুলছে। পুরনো জেটিগুলো হুমকির সম্মুখীন হয়ে যাওয়ায় সরকার আধুনিক নতুন জেটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের অন্যান্য দ্বীপ উপজেলা—হাতিয়া, চরফ্যাশন, সন্দ্বীপ, মনপুরা, রাঙ্গাবালী কেউ পিছিয়ে নেই। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে হয়তো সড়ক যোগাযোগ নেই, কিন্তু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ এখন অনেক ভালো। দ্বীপগুলোতে কৃষি, অকৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি পর্যটনের সুযোগ বেড়ে গেছে অনেক।

ছয়: শ্যামনগর, সাতক্ষীরা

সুন্দরবনঘেঁষে চুনা নদীর অন্য পারের ইউনিয়ন শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী। শ্যামনগর থেকে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে যাওয়ার গ্রামীণ সড়ক বেশ চওড়া। ভারী যানবাহন চলে। এখানে চিংড়ি হ্যাচারি, খামারের ব্যবসায় ভাটা পড়ে গেছে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে কাঁকড়া। কাঁকড়ার আবার দুই ভাগ। হার্ড সেল (শক্ত খোলস), সফট সেল (নরম খোলস)। নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত, রফতানির জন্য ছয়-সাতটি কারখানা এখানে গড়ে উঠেছে। এলাকার মেয়েরা এক শিফটে চাকরি করে মাসে নয় হাজার টাকা বেতন নিচ্ছে। নোনাপানির অনেক ফার্ম চুক্তিতে কাঁকড়া উৎপাদন করে কারখানায় বিক্রি করছে। এলজিইডি এখানকার সড়কগুলো ক্রমশ আপগ্রেড করে এদের শিল্পসহায়ক অবকাঠামো তৈরি করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে খাবার পানির স্তর আর পাওয়া যাচ্ছে না। রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের জন্য সরকার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি পানির ট্যাংক প্রযুক্তি দিচ্ছে। অন্য প্রযুক্তিও আছে। ইউএনডিপি, স্থানীয় এনজিওরাও এ কাজে সহযোগিতা করছে। পানির কষ্ট আছে, তবুও আগের মতো মাইগ্রেশন নেই। সড়ক, শিল্প, কাজের সুযোগ এদের জীবন সহজ করেছে।

সাত : দ্য ফার্স্ট মাইল, লাস্ট মাইল

২০১৯ সালের অক্টোবর মাস। আবুধাবিতে ওয়ার্ল্ড রোড কংগ্রেসের সম্মেলন। মূল কংগ্রেসের পাশাপাশি অনেক সাইড সেমিনারে চলে। তেমনি এক সেমিনারে আমার টপিকস—বাংলাদেশের রুরাল একসেস ইনডেক্স। ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংক আটটি উন্নয়নশীল দেশের ‘রুরাল একসেস ইনডেক্স’ নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছে। এতে দেখা গেছে বাংলাদেশ প্রথম। বাংলাদেশের ‘রুরাল একসেস ইনডেক্স’ প্রায় ৮৭। সবাই প্রশ্ন করতে লাগল বাংলাদেশের রুরাল একসেস ইনডেক্স এত ভালো হলো কীভাবে? তোমরা কি সব ব্ল্যাক টপ (বিটুমিনাস) সড়ক নির্মাণ করো?

উগান্ডার ট্রান্সপোর্ট রিসার্চের সঙ্গে জড়িত এক অধ্যাপক জিজ্ঞেস করল বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে ‘রুরাল একসেস ইনডেক্স’কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? এর আগের সেশন ছিল দ্য ফার্স্ট মাইল, লাস্ট মাইল। আমি হাসতে হাসতে উত্তর দেই- উত্তর আগের সেশনেই ছিল—দ্য ফার্স্ট মাইল, লাস্ট মাইল।

গ্রামের ভেতর থেকে বড় সড়কে আসার যে চ্যালেঞ্জ সেটাই দ্য ফার্স্ট মাইল। এটা শুধু অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ নয়, এটা এক ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জও। সড়ক উন্নয়নে মানসিক চ্যালেঞ্জ ভেঙে মনের আগল খুলে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গড়পড়তা গ্রামের মানুষ দুই কিলোমিটার কিংবা আধা ঘণ্টা হেঁটে পাকা সড়কে পৌঁছতে পারলে সাহস করে রাস্তায় নামেন। এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এসডিজি ৯.১.১-এর সূচক—রুরাল একসেস ইনডেক্স। নগরের হিসাব আবার আলাদা। নগরের মানুষ ২৫০ মিটার থেকে আধা কিলোমিটারের বেশি হাঁটতে চায় না।

বাংলাদেশে দ্য ফার্স্ট মাইল একসেস—কৃষকের চোখ খুলে দিয়েছে। তারা শুধু বাজারই পাচ্ছেন না, কৃষি প্রযুক্তিও সহজে পাচ্ছেন। অন্য গ্রাম কিংবা অন্য উপজেলায় গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সহজে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে আসছেন। দ্য ফার্স্ট মাইল—অকৃষি অর্থনীতির অকল্পনীয় বিকাশ ঘটিয়েছে। ফলে শুধু কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাঁচার নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। দ্য ফার্স্ট মাইল শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা সহজ করে দিয়েছে। শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মীরা অল্প আয়াশে কর্মস্থলে যেতে পারছেন। ছাত্রছাত্রী, জনগণ রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে স্কুল-হাসপাতালে যেতে পারছেন। জটিল রোগী নিতে বাড়ির কাছে অ্যাম্বুলেন্স চলে আসছে। দ্য ফার্স্ট মাইল পোলট্রি, ডেইরি কিংবা পশুপালন সহজ করে দিয়েছে। বিকল্প কিংবা গৃহস্থালি আয়ের বিশাল প্রবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। দ্য ফার্স্ট মাইল মেয়েশিশুর আকাশটা অনেক বড় করে দিয়েছে। দ্য ফার্স্ট মাইল নির্যাতিতা নারীদের ঘুরে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। এমনকি প্রতিবন্ধীদের ও পথে নামার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমান আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রার পেছনে ‘দ্য ফার্স্ট মাইল রুরাল কানেকটিভিটি’র ভূমিকা অনেক। তবে এর আগের কাজটা করে দিয়েছে ‘লাস্ট মাইল রুরাল কানেকটিভিটি’। বাংলাদেশে পরিকল্পিত ‘লাস্ট মাইল’ রুরাল কানেকটিভিটি শুরু হয়েছে আশির দশকে। গ্রোথ সেন্টার-হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, শিল্প, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বড় সড়ক নেটওয়ার্কের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এখন সরকার ‘ফার্স্ট মাইল’ কানেকটিভিটি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। পাড়া, গ্রাম, গ্রামের ভেতরকার সংযোগ সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে।

আট: গ্রামীণ সড়কের ৫০ বছর

বাংলাদেশে গ্রামের সংখ্যা প্রায় ৮৭ হাজার ২৩০টি। এর মধ্যে প্রায় ৮২ হাজার গ্রামে গ্রাম পর্যন্ত ও গ্রামের ভেতরে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। হাওর, পাহাড় ও চরাঞ্চল ছাড়া সমতলের অধিকাংশ গ্রামেই সংযোগ সড়ক আছে। বাংলাদেশে আশির দশক থেকে গ্রোথ সেন্টার কানেক্টিং রোড ( উপজেলা সড়ক) নির্মাণ করা হচ্ছে। পরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন সড়ক, গ্রাম সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এলজিইডি আজ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার কিমি সড়ক উন্নয়ন করেছে। উপজেলা সড়কের প্রায় ৯০ ভাগ ও ইউনিয়ন সড়কের প্রায় ৭৫ ভাগ নির্মিত হওয়ায় দেশব্যাপী গ্রামীণ সড়কের প্রাইমারি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে গেছে। নদীভাঙন এলাকা, বনাঞ্চল কিংবা উপকূলের বেড়িবাঁধের অভাবে অস্থিতিশীল—এমন কিছু সড়ক নির্মাণে কিছুু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের দ্রুত দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সর্বত্র উন্নয়নের সমান সুযোগ সৃষ্টির জন্য এসব সড়ক রুরাল একসেস ধারণায় নির্মাণ করেছে। এলজিইডি সামাজিক জাগরণ তৈরির মাধ্যমে কোনো ধরনের জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই দেশে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার পল্লী সড়ক বাঁধ নির্মাণ করেছে। বিশ্বে সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরির উদাহরণ আর নেই। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক অংশগ্রহণ ও এলজিইডির দ্রুত সড়ক উন্নয়নের ফলে দেশের পল্লী অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে। দেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে ধারাবাহিকভাবে মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে।

নয় : বিয়ন্ড দ্য হরাইজন

স্বল্প আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরের সময় থেকেই দেশের পল্লী সড়কেও রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। পল্লী সড়কে ভারী ও অধিকসংখ্যক যানবাহন সংস্থান করতে এলজিইডি ‘রুরাল একসেস’ ধারণার পরিবর্তে ‘রুরাল ট্রান্সপোর্ট’ ধারণায় সড়ক উন্নয়ন করছে। এলজিইডির উপজেলা সড়কগুলো জ্যামিতিক স্ট্যান্ডার্ড উন্নয়ন করে ক্রমশ ডাবল লেইন সড়ক হিসেবে আপগ্রেডেশন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, স্থলবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন স্থান সংযোগকারী সড়কগুলো আপগ্রেডেশন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। পল্লী সড়কে দেশের মধ্য আয়ের অর্থনীতি সংস্থান করতে এলজিইডির ‘রোড ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড’ যুগোপযোগী করা হয়েছে।

এ মধ্য আয়ের অর্থনীতির উপযুক্ত সঞ্চালনই দেশকে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে দেবে।

 

আবুল মনজুর মো. সাদেক: প্রকল্প পরিচালক

আমার গ্রাম-আমার শহর কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, এলজিইডি