নদ-নদীর সঙ্গে নৌ-পরিবহন খাতের নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌযান চলাচলের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ; যার উৎস শুধু নদী। রেল, সড়ক ও আকাশ—এ তিন মাধ্যমের চেয়ে নৌপথ তুলনামূলক আরামদায়ক, ব্যয়সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও কম দুর্ঘটনাপ্রবণ। উপকূলীয় জনপদসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য পরিববহনের প্রধান মাধ্যম নদী বা নৌপথ। মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, কৃষিতে সেচসুবিধা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে এসব নদী মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের জীবন-জীবিকা নদী ও নৌ-পরিবহনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বংশপরম্পরায় নির্ভরশীল। এছাড়া নদী আমাদের কৃষ্টি ও সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সুতরাং বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে নদীর। তবে সেই কৃষ্টি-সভ্যতা এখন বিপন্নপ্রায়। নদীগুলো বিলীন হওয়া পথে। কোথাও কোথাও নদী শুকিয়ে মাঠ হয়ে গেছে। আবার কোথাও ধু-ধু বালুচর। ভরাট, দখল, দূষণ ও অপরিণামদর্শী উন্নয়ন বা অপরিকল্পিত নগরায়ন-শিল্পায়নসহ মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের কবলে পড়ে নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে। এক সময়ের খরস্রোতা অনেক নদীর অস্তিত্ব এখন বিপন্নপ্রায়। সেগুলোর উৎস, অবস্থান ও চিহ্ন মুছে যাচ্ছে। সেই নদীনালা, খালবিল ও হাওর-বাঁওড়ের ঠাঁই হচ্ছে ইতিহাসের পাতায়। 

নিকট-অতীতে নৌপথ

নৌ-পরিবহন খাত কিংবা নৌ-যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন-অনুন্নয়নের বিষয়ে বলতে গেলে নদী ও নৌপথ প্রসঙ্গ আসবেই। যেহেতু বিষয়টি স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে, সুতরাং দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর পথপরিক্রমায় নদী-নৌপথ প্রসঙ্গটি অপরিহার্য। নৌপথের আয়তন নির্ধারণে সর্বশেষ নদী জরিপ হয়েছিল পাকিস্তান শাসনামলের শেষ দিকে। নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সে দেশেরই একটি সংস্থা এনইডিইসিও ১৯৬৫-৬৭ সাল পর্যন্ত জরিপ চালিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এনইডিইসিও রিপোর্ট শিরোনামে প্রতিবেদনটি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ১৯৭০ সালে। এরপর ১৯৭৫ সালে সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) কিছুটা সংশোধন করে সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছোট-বড় মিলিয়ে ২৪০টি নদীতে মোট ২৫ হাজার ১৪০ কিলোমিটার (কিমি) দীর্ঘ নৌপথ ছিল; যার মধ্যে ছিল ঢাকা থেকে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উপকূলাঞ্চলগামী দূরপাল্লার শতাধিক নৌপথ। ২৫ সহস্রাধিক নৌপথে বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক নৌযান চলাচল করত।

এ বিষয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডাপ্রবাসী পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দিলীপ ঘোষের ভাষ্যমতে, নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞদের জরিপ প্রতিবেদন ১৯৭০ সালে প্রকাশ করা হলেও তখন নদী, নৌপথ ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষ সচেতন ছিল না। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কারণে নদী-নৌপথ নিয়ে চিন্তাভাবনার সুযোগ ছিল না। নদীগুলো রক্ষণাবেক্ষণ তো দূরের কথা, স্বাভাবিক ড্রেজিংও হয়নি। ৬৯, ৭০ ও ৭১—তিন বছরে নৌপথের আয়তন কমেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আর জরিপ হয়নি। ১৯৭৪ সালে নৌপথ খননের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার বিদেশ থেকে ড্রেজার আমদানির পরই নৌপথের আয়তনের তথ্যটি সামনে আসে ও বিআইডাব্লিউটিএ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, নৌপথের দৈর্ঘ্য ২৫ দশমিক ১৪০ কিমি। তবে তথ্যটি যে ১৯৬৫-৬৭ পর্যন্ত জরিপে প্রাপ্ত, তা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের ধারণা জন্মেছে, ১৯৭৪ সালে ২৪০টি নদীতে যান্ত্রিক নৌযান চলত ও নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৫ হাজার ১৪০ কিলোমিটার।

তবে ১৯৭৪ সালে নৌপথের আয়তন যাই থাকুক না কেন, তাও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পাঁচ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটারে নেমে আসে; যেখানে শুধু বর্ষা মৌসুমেই নাব্য থাকে। আবার বর্ষা মৌসুমেও এই ৫ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটার নৌপথে সব ধরনের জাহাজ বা নৌযান চলতে পারে না। পানির গভীরতা অনুযায়ী, নৌপথকে ভাগ করা হয় চারটি শ্রেণীতে। গভীরতা কমপক্ষে ১২ ফুটের বেশি হলে প্রথম শ্রেণী, ৬ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত দ্বিতীয়, ৩ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত তৃতীয় এবং ৩ ফুটের কম হলে চতুর্থ শ্রেণীর নৌপথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শুকনো মৌসুমে সারা দেশে সচল নৌপথের দৈর্ঘ্য নেমে আসে মাত্র ৩ দশমিক ৬০০ কিলোমিটারে; যা নদীমাতৃক, কৃষিনির্ভর ও বন্যাপ্রবণ একটি দেশের জন্য শুধু অকল্পনীয়ই নয়, রীতিমতো বিপদসংকেতও বটে।

উদ্বেগজনক একটি তথ্য হলো অতিরিক্ত মাত্রায় পলি পড়ে নৌপথের আয়তন হ্রাসসহ নানা কারণে নদ-নদী ভরাট ও বিলুপ্ত হলেও সে তুলনায় কৃষিজমির আয়তন বাড়ছে না। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নদী ভরাট, উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিতভাবে ভরাট করে নদী ও নদীতীরে স্থাপনা নির্মাণ এবং নদীভাঙনের কারণে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৫৫২ হেক্টর আবাদি জমি ধ্বংস হয়েছে। এর বিপরীতে ওই সময়ে জমি বেড়েছে মাত্র ১০ হাজার ৬২৮ হেক্টর।

অপর এক সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শুধু ভাঙনের কারণে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এ তিনটি প্রধান নদীতেই বিলীন হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি। এর বিপরীতে এসব নদীর তীরে নতুন ভূমি জেগেছে মাত্র ৩০ হাজার হেক্টর। সংস্থাটি বলছে, এর বাইরে ছোট ছোট আরো অনেক নদীর অব্যাহত ভাঙনে বহু জনপদ বিলীন হয়েছে। তবে সে হিসাব তাদের কাছে নেই।

পানি উন্নয়ন বোর্ড

১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে পরপর দুই বছর ভয়াবহ বন্যায় উত্তরাঞ্চলসহ দেশের ব্যাপক এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যা-সমস্যা সমাধানের জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয় পাকিস্তান সরকার। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য মার্কিন বিশেষজ্ঞ জুলিয়াস অ্যালবার্ট ক্রুগের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়; যা ‘ক্রুগ কমিশন’ বা ‘ক্রুগ মিশন’ নামে পরিচিত। ১৯৫৭ সালে ক্রুগ সদলবলে দুবার আসেন। এ কমিশন বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোয় পোল্ডার বা বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরামর্শ দেয়। তাদের পরামর্শে ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সরকার ইস্ট পাকিস্তান ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বা ইপিওয়াপদা গঠন করে। স্বাধীনতার পর ইপিওয়াপদা ভেঙে ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’ ও ‘বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড’ নামে আলাদা দুটি সংস্থা গঠন করে সরকার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’ সংক্ষেপে ‘পাউবো’ নামে পরিচিত।

পাউবো গঠনের মূল লক্ষ্য বন্যাপ্রবণ নদীগুলোর আগ্রাসী তত্পরতা থেকে জনপদ রক্ষায় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন রোধ ও নিয়মিত খননের মাধ্যমে নদী এবং খালগুলোকে প্রবহমান রাখা। যাত্রা শুরুর পর সংস্থাটি সর্বপ্রথম বন্যাকবলিত ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী উত্তরাঞ্চলে প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন একর এলাকা বাঁধ দিয়ে ঘিরে দেয়। প্রথমবার এ অপরিকল্পিত ওয়াপদা বাঁধের কারণে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত এবং দুর্বল হওয়ায় দুটি নদীর পশ্চিম তীরে ৪ দশমিক ১৮ মিলিয়ন একর জমিতে পানিপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৫৮ মিলিয়ন একরে পানি ঢোকা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চরাঞ্চলের চেয়ে লোকালয় নিচু হয়ে পড়ে ও নদীভাঙনের হার কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত পলি জমে তলদেশ ভরাট হওয়ায় নদী শুকিয়ে যেতে থাকে। মার্কিন বিশেষজ্ঞদলের পরামর্শে গঠিত তত্কালীন ইপি-ওয়াপদার এ সর্বনাশা প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই শুরু হয় সংস্থাটির নিয়মিত কার্যক্রম।  

সর্বপ্রথম ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বিশাল আয়তনের বাঁধ নির্মাণ ছাড়াও সংস্থাটি ষাটের দশকে বিভিন্ন নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পসহ বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ চালায়। এতে ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণফুলীসহ জিকে সেচ প্রকল্প এলাকার নদীগুলোর করুণ দশা সম্পর্কে সবাই অবহিত। নব্বইয়ের দশকে যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের সময় যমুনা থেকে ধলেশ্বরী নদীর প্রধান উৎসমুখে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পাউবোর সেই সর্বনাশা পদক্ষেপের মাধ্যমে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে এককালের প্রমত্তা ধলেশ্বরী; যার প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা, নৌ-বাণিজ্য, কৃষি ও প্রাকৃতিক মত্স্যসম্পদের ওপর।

সরকারের পদক্ষেপগুলো

দীর্ঘদিনের অবহেলিত ও কার্যত পরিত্যক্ত নৌ খাতকে আধুনিক, যুগোপযোগী এবং জনবান্ধব নৌ-যোগাযোগ খাত হিসেবে গড়ে তুলতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরকে (ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং) গতিশীল ও শক্তিশালী করতে ব্রিটিশ আমলের জনবল কাঠামো সংশোধন করে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং নতুন পদগুলোতে পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। নৌপ্রটোকল চুক্তির আওতায় ভারতের বিভিন্ন বন্দরের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীবন্দরের সরাসরি নৌ-চলাচল সহজ হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন বেড়েছে; যা নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। চুক্তির আওতায় ভারতকে আশুলিয়া নদীবন্দর ব্যবহার করতে দেয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে।

প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, ড্রেজার ও জলযান ক্রয়, নদী খনন, বিলুপ্ত ও বেদখল নদী উদ্ধার, নৌদুর্ঘটনা হ্রাস ও যুগোপযোগী নৌ-পরিবহন আইন প্রণয়নসহ নৌ খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবা সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে নদীবন্দরের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীবন্দরগুলোকে ধাপে ধাপে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌপথে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য কোস্টগার্ডের পাশাপাশি সৃষ্টি করা হয়েছে জনবলসমৃদ্ধ শক্তিশালী নৌপুলিশ বাহিনী। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডাব্লিউটিসি) বহরে ফেরি, স্টিমার ও সী-বোটসহ অন্যান্য জলযানের সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়ানো হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও নৌপথের আয়তন বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি পর্যায়ে নির্মিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অত্যাধুনিক যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান। এছাড়া দীর্ঘ সাত দশক পর ফের শুরু হয়েছে ঢাকা-কলকাতা যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল। এই সার্ভিস আপাতত বন্ধ থাকলেও ফের চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

গত ১৩ বছরে কয়েক ধাপে বিআইডাব্লিউটিএর বহরে যুক্ত হয়েছে ৩৮টি ড্রেজার। আগের সাতটি মিলিয়ে এ সংখ্যা এখন ৪৫। এ বহরে শিগগির আরো ৩৫টি ড্রেজার যুক্ত হচ্ছে। প্রসঙ্গত বিআইডাব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড—দুটি সংস্থাই নদী খননের কাজ করে। তবে নৌ-যোগাযোগসংশ্লিষ্ট কাজ করে বিআইডাব্লিউটিএ। যেমন নৌপথ রক্ষায় নদী খনন ও পলি অপসারণ, খনন করে নতুন নৌপথ সৃষ্টি, নৌপথ সংরক্ষণ ইত্যাদি। শুধু ড্রেজার ক্রয়, সেগুলো যথাযথভাবে পরিচালনা, প্রয়োজনে দ্রুত স্থানান্তর ও সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণে সারা দেশে নতুন ১১টি ড্রেজার বেইজ স্থাপনের কাজ চলছে। ড্রেজার বেইজগুলো স্থাপিত হচ্ছে জামালপুর, খুলনা, মুন্সীগঞ্জ, কক্সবাজার, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বালাশীঘাটে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোসহ সারা দেশের নদীগুলোকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে বছরব্যাপী অভিযান চালানো হচ্ছে।

বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের কারণে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে কন্টেইনার জট ও শ্রমিক অসন্তোষ অনেক কমে এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের মানোন্নয়ন হচ্ছে। ফলে সেখানে বিদেশি জাহাজের আসা-যাওয়া অনেক বেড়েছে। ২০০৯ সালে বিশ্বের ১০০টি কন্টেইনার পোর্টের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৯৮। মাত্র ৯ বছরে ২৮ ধাপ এগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ২০১৭ সালে ওই তালিকায় ৭০তম স্থান অর্জন করে। এছাড়া বিশ্বের সেরা যে ১০টি কন্টেইনার পোর্ট প্রতিকূল বৈশ্বিক অর্থনীতি মোকাবেলা করেও গত বছর নিজেদের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, তাদের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। [সূত্র: লয়েডস লিস্ট (আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা)]। একইভাবে মৃতপ্রায় মোংলাবন্দর সচল হয়ে উঠেছে। সেখানে বিদেশী জাহাজের আসা-যাওয়া বৃদ্ধি পাওয়ায় ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এক সময়ের ব্যস্ততম এ বন্দর। পটুয়াখালীতে নির্মাণ করা হয়েছে ‘পায়রা সমুদ্রবন্দর’; যেটি এরই মধ্যে যাত্রা শুরু করেছে।

এছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকায় নির্মাণ করা হবে গভীর সমুদ্রবন্দর। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রর জন্য আনা কয়লাবাহী জাহাজ ভেড়ানো জেটিকে সম্প্রসারণ করে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে নির্মাণ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বন্দরে অন্তত ১৬ দশমিক ৩ মিটার গভীরের জাহাজ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবে। মাতারবাড়ী বন্দর চ্যানেলের গভীরতা ১৬ দশমিক ৩ মিটার হওয়ায় প্রতিটি জাহাজ ৮ হাজারের বেশি কন্টেইনার আনতে পারবে। বর্তমানে ৯ মিটারের চেয়ে কম খসড়া গভীরতার জাহাজ দেশের দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম এবং মোংলায় প্রবেশ করতে পারে। মাতারবাড়ী বন্দর স্থাপনের কাজে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি চ্যানেল তৈরি করবে জাইকা। প্রধান নেভিগেশনাল চ্যানেল ৩৫০ মিটার চওড়া হবে। সেই সঙ্গে বন্দরের অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে ১০০ মিটার দীর্ঘ জেটি। ২০২২ সালের নভেম্বরে গভীর সমুদ্রবন্দরটির বহুমুখী টার্মিনাল কন্টেইনার জাহাজের জন্য প্রস্তুত হবে।

১০ হাজার ৫০০ কিমি নৌপথ উদ্ধারের মহাপরিকল্পনা

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল ও হাওর এবং পার্বত্যাঞ্চলকে প্রাধান্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৭৮টি নদ-নদীকে প্রবহমান করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উদ্যোগ সফল হলে বিলুপ্ত হওয়া ২০ হাজার কিমি নৌপথের সাড়ে ১০ হাজার কিমি সচল হবে ও সমুদ্রবন্দরগুলো থেকে নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহন করা যাবে। এর পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে সেচ সুবিধা ও মত্স্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে বিকাশ ঘটবে পর্যটন শিল্পের। বিআইডাব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পৃথক পৃথক প্রকল্পের আওতায় এ কাজ সম্পন্ন করবে। ৫০ হাজার কোটি টাকার পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সাল। এ মহাপরিকল্পনায় ১৭৮টি নদ-নদীর মধ্যে উপকূল, হাওর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৮০টিরও বেশি নদ-নদী প্রাধান্য পেয়েছে; যার মধ্যে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের রয়েছে অর্ধশতাধিক নদী। এছাড়া ‘ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পুনর্ভবা নদীর ৪৯৩ কিলোমিটার খনন’ প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই চলছে। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পাওয়া চার হাজার ৩৭১ কোটি টাকার এ মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের সর্বশেষ সময় ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জুন মাস।

 

আশীষ কুমার দে : সাংবাদিক, লেখক এবং নদী ও নৌ-পরিবহনবিষয়ক গবেষক