বিপুল জনসংখ্যা-অধ্যুষিত কিন্তু অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র আয়তনের ভূখণ্ড নিয়ে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালে। আজ ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে গত ৫০ বছরে আমাদের জাতি-রাষ্ট্রের উন্নয়ন চিত্র দেখতে গেলে একদিকে যেমন বিরাট অর্জনের সামগ্রিক একটি ছবি দেখতে পাই, অন্যদিকে তেমনি নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে জনআকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই অনর্জিত রয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে পাকিস্তান নামক যে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা, তা পুরোপুরি অর্থবহ। আমরা গর্ব করে বলতে পারি, সে পাকিস্তানকে আমরা উন্নয়নের সব সূচকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। সংক্ষিপ্ত আকারে এ লেখার বিষয়বস্তু সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আয়তনে ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বে বিশাল এভিয়েশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামো বা আকাশপথে গণযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে। গত ৫০ বছরের অভিযাত্রায় এ খাতে আমাদের অর্জন যেমন অনেক, ঠিক তেমনি অপ্রাপ্তির তালিকা সুবিশাল। সামগ্রিকভাবে বিমানবন্দর, এয়ার নেভিগেশন ব্যবস্থা ও সর্বোপরি আকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থার মুখ্য নিয়ামক এয়ারলাইনস সেবা। বৃহৎ পরিসরে এভিয়েশন অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত বিমানবন্দর কাঠামো ও এয়ার নেভিগেশন সিস্টেম নিয়ে মূল বিষয়বস্তু কেন্দ্রীভূত থাকলেও অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে এয়ারলাইনসের বিষয় বক্ষ্যমাণ নিবদ্ধে অবধারিতভাবে এসে যাবে।

স্বাধীনতা-উত্তর এভিয়েশন খাতের উন্নয়ন সামগ্রিক পরিকল্পনায় বলতে গেলে উপেক্ষিত ছিল। কিন্তু বিশেষভাবে বিগত দশকে এ খাতে অভাবনীয় উন্নয়নের ধারা সূচিত হয়েছে। আর এ উন্নয়নের ধারার রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আকাশ যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। তাঁর সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আজ এভিয়েশন অবকাঠামোর ক্রমোন্নয়নের ধারায় দৃশ্যমান।

বৃহৎ পরিসর বিবেচনায় কাঠামোগতভাবে বাংলাদেশে এভিয়েশনের সূচনা আমাদের স্বাধীনতার রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হাতে। তিনিই ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে ‘সিভিল এভিয়েশন অধিদপ্তর’ ও বাংলাদেশ বিমান করপোরেশন স্থাপনের মাধ্যমে এভিয়েশন অবকাঠামোর একটি কার্যকর ব্যবস্থার সূচনা করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পঁচাত্তর-পরবর্তী বিভিন্ন সামরিক সরকারের সময় বঙ্গবন্ধুর স্থাপিত সুষ্ঠু ব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়নের ধারাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। ১৯৮১ সালে সিভিল এভিয়েশন অধিদপ্তর ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ একীভূত করে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি করা হয়। সিভিল এভিয়েশন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আর অন্যদিকে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ দুটি স্বার্থসংঘাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের মাধ্যমে জনস্বার্থের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হয়। বর্তমানে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী, এভিয়েশন সেবাদানকারী, এয়ার নেভিগেশন সার্ভিস প্রদানকারী ও এভিয়েশন ট্যারিফ নির্ধারণকারী হিসেবে এক মাথায় চারটি হ্যাট বা টুপি পরে আছে। পারস্পরিক স্বার্থ সংঘাতশীল এ চারটি প্রতিষ্ঠান একই কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সামগ্রিক অর্থে ব্যাপকভাবে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে আশার আলো একটাই, বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। মোদ্দাকথা, আমরা যদি কর্মক্ষম, ফলপ্রসূ ও সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে তাল রেখে এভিয়েশন খাতের উন্নয়ন চাই, তবে বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত ব্যবস্থায় আমাদের প্রত্যাবর্তন জরুরি। সামরিক সরকার প্রবর্তিত বর্তমানে কেন্দ্রীভূত সিভিল এভিয়েশন অথরিটির দায়িত্ব ও কর্তব্য বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কার্যকর নীতিনির্ধারণ, প্রয়োগকারী সিভিল এভিয়েশন অথরিটি পুনর্গঠন ও এভিয়েশন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘বাংলাদেশ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করা দরকার।

বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক এভিয়েশন কেন্দ্র বা ওয়ার্ল্ড এভিয়েশন হাব তৈরি করার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী চিন্তার বাস্তবায়ন কি আসলেই কঠিন বা বাস্তবায়নযোগ্য হবে? এককথায় এর উত্তর অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য। কিন্তু তার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের মিশননির্ভর আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশদ অনুধাবনের জন্য আমাদের স্বাধীনতার সূচনালগ্নে প্রাপ্ত এভিয়েশন অবকাঠামোর একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ ও গত ৫০ বছরের পথচলায় আমাদের অর্জন, একই সঙ্গে অপ্রাপ্তির একটা নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আমরা ব্রিটিশ শাসনামলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নির্মিত অনেক  বিমানঘাঁটি ও অবতরণস্থল উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে যাই। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক সময়ে যার অধিকাংশই অযত্ন-অবহেলায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে ওঠে। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তেজগাঁও, কুর্মিটোলা, কুমিল্লা, ফেনী, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম, চিরিঙ্গা, কক্সবাজার, রামু, বরিশাল, যশোর, ঈশ্বরদী, রাজশাহী (২), ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, সিলেট, শমসেরনগর, টাঙ্গাইল ও ঢাকার কাছে আড়াইহাজার মিলে মোট ১৯টি এয়ার ফিল্ড/এয়ারস্ট্রিপ আমাদের হস্তগত হয়। এর মধ্যে শুধু তেজগাঁও বিমানবন্দর হিসেবে কর্মপোযোগী ছিল। যদিও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর স্বল্পপরিসরে ব্যবহূত হচ্ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে কার্যকর আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলেই ক্রমান্বয়ে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, যশোর, ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও ও সিলেট এয়ারপোর্ট হিসেবে কর্মপোযোগী করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে একটি মাত্র নতুন বিমানবন্দর সৈয়দপুরে ১৯৭৯ সালে কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রেক্ষপটে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামোর উন্নয়ন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পাকিস্তান আমলে গ্রহণকৃত কুর্মিটোলাকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ১৯৮১ সালে চালু করা হয়। একদিকে যেমন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অনেক বিমানবন্দরই প্রশাসনিক অবহেলায় বেদখল হয়, অন্যদিকে বিএনপি শাসন আমলে প্রভূত অর্থ অপচয় ও চাষযোগ্য জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে নির্মিত বগুড়া স্টলপোর্ট, বাজিতপুর, পটুয়াখালী, নোয়াখালীর সোনাপুর অকার্যকর ও বেদখল হয়ে আছে। বগুড়ার  স্টলপোর্টটি  বর্তমান বিমানবাহিনী  প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহার করছে। এ হতাশাজনক চিত্রের বিপরীতে সার্বিক এভিয়েশন অবকাঠামোর উন্নয়নে প্রবল গতি আসে মূলত ২০০৮ সাল থেকে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ধারাবাহিক শাসনামলে। বর্তমানে দেশব্যাপী বিস্তৃত বিমানবন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলমান। স্বল্প পরিসরে সে উন্নয়নের চালচিত্র আঁকা ও অতি আবশ্যকীয় অন্যান্য অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণের সে মোতাবেক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে থাকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন অবকাঠামোর উন্নয়নে গতি সঞ্চার হয় ১৯৯৭-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের অধীনেই। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সেই সময় ব্রিটিশ আমলে নির্মিত স্বল্প পরিসরের টার্মিনাল ভবন থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ফ্লাইটই ডিসি-১০-এর মতো সুপরিসর বিমান দ্বারা পরিচালিত হতো। বিদ্যমান অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে রানওয়ে সম্প্রসারণসহ নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে। তত্কালীন প্রাক্কলিত ব্যয়ের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে পূর্ণ হতে ২৪৬ বছর প্রয়োজন। অন্যদিকে জাপান সরকারের এ প্রকল্পে অর্থ জোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এ কারণে যে, আইনগতভাবে মিলিটারি সিভিল যৌথভাবে ব্যবহূত বিমানবন্দরে জাপান কোনো আর্থিক সংস্থান করতে পারে না।

এ দ্বিবিধ বাধার মুখেই তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রাক্কলিত সময়ের দেড় বছর আগে ১৯৯৮ সালে শুরু হয়ে মাত্র তিন বছর সময়ে ২০০০ সালে সমাপ্ত হয়। ২০০১-২০০৬ বিএনপি শাসন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার সময়ের বিরতির পর আবার এভিয়েশন অবকাঠামোর উন্নয়ন বিপুল গতি পায়। সরকার একের পর এক উদার হাতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করে। বিগত সময়ে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সিলেটের অবকাঠামো উন্নয়ন সবচেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছে। লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশীদের সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছানো ও ধারাবাহিকভাবে সিলেট থেকে অর্থমন্ত্রী থাকার ফলে এ বিমানবন্দরের উন্নয়ন চলমান থেকেছে। অতীতে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ফুটে বৃদ্ধিকরণসহ টার্মিনাল ভবনের সম্প্রসারণ হয়েছে। বর্তমান তৃতীয় ধাপে আরো দেড় হাজার ফুট রানওয়ে সম্প্রসারণসহ টার্মিনাল ভবনের বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, এ প্রকল্প সম্পন্ন হলে সিলেট বাস্তবিক অর্থেই একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিমানবন্দরে রূপান্তরিত হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০০০ সাল-পরবর্তী আর কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। যুগোপযোগী অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা সেখানেও বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিমান নিয়ন্ত্রণ রাডার স্থাপন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রকল্পটি ২০১৬ সালে সম্পন্ন হলেও সেটি এখনো অপারেশনাল ঘোষণা করা হয়নি। আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে রাডারটি পরীক্ষা সাপেক্ষে অপারেশনাল ঘোষণা করবেন।

অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে বরিশাল, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের জন্য ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহীত হয়েছে। যার কিছু সম্পন্ন হয়েছে ও বাকিগুলো চলমান। এর মধ্যে সৈয়দপুর বিমানবন্দর পাশের ভারতের সেভেন সিস্টার্স স্টেট, নেপাল ও ভুটানের জন্য ব্যবহার উপযোগী করে বিনির্মাণের প্রক্রিয়া চলমান। এ প্রকল্পগুলো যাত্রীসেবা, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আকাশ যোগাযোগের আধুনিকায়নে প্রভূত ভূমিকা রাখবে।

এ বিরাট কর্মকাণ্ডের মধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। বাংলাদেশের পর্যটনের মূল আকর্ষণ কক্সবাজার এয়ারপোর্টের উন্নয়ন দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। বর্তমান সরকার পর্যটন সম্ভাবনার গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে সুদূর প্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রাথমিকভাবে রানওয়ের দৈর্ঘ সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট থেকে সাড়ে নয় হাজার ফুটে বৃদ্ধি ও টার্মিনাল  ভবনের সম্প্রসারণ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে এখন বৃহৎ আকারের জেট বিমান ব্যবহার উপযোগী হয়েছে, এর সুফল ভ্রমণপিয়াসী পর্যটকরা উপভোগ করবেন। কক্সবাজারে বর্তমানে একটি আধুনিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণের শেষ পর্যায়ে। এ বিমানবন্দরকে পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করার জন্য গত মাসেই  প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার রানওয়েকে আরো ১৭০০ ফুট বৃদ্ধির জন্য সমুদ্রে সম্প্রসারণ কাজ উদ্বোধন করেছেন। অবকাঠামো উন্নয়নে একটি দৃষ্টিনন্দন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হবে। এ সার্বিক কর্মকাণ্ড ২০৩৫ সালে শেষ হলে কক্সবাজার এয়ারপোর্ট এক অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্য নিদর্শন হবে বলে আশা করা যায়।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রসঙ্গে। এ বিমানবন্দরটি স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৮১ সাল থেকেই দেশের প্রধান ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রায় দুই সংখ্যার প্রবৃদ্ধি নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও গড় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সার্বিক অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা এ বিমানবন্দরে উত্কণ্ঠিতভাবে দৃশ্যমান। সময়ে সময়ে জোড়াতালি দিয়ে যেনতেনভাবে চাহিদা পূরণের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেই পদক্ষেপগুলো ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের এক অতি বৃহৎ প্রকল্প চলমান। বর্তমানের সজ্জন ও বিচক্ষণ প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী এবং সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিপুল এ নির্মাণ কর্মযজ্ঞ করোনা পরিস্থিতির মাঝেও পূর্ণ উদ্যমে এগিয়ে চলছে। আশা করি, নির্মাণের প্রথম ধাপ ২০২৪ সালে ও শেষ ধাপ ২০২৬ সালে সম্পন্নের পর দেশবাসী উন্নত একটি বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা পাবে। কিন্তু তার জন্য দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর সঙ্গে দক্ষ, নিবেদিত ও সর্বোপরি সেবার মনোভাবসম্পন্ন জনবলের প্রয়োজন হবে। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ আশা করি, সে রূপ কাঙ্ক্ষিত জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীবাহিনী সৃষ্টি করবে। না হয় এ বিপুল ব্যয়বহুল অবকাঠামো উন্নয়নের সুফল থেকে দেশবাসী বঞ্চিত হবে।

আকাশপথে যোগাযোগের পূর্ণ গতি সঞ্চার, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও এবং শমসেরনগরে অবস্থিত তিনটি বিমানবন্দর বর্তমানে পরিত্যক্ত পড়ে আছে। স্বল্প ব্যয়ে এ তিনটি বিমানবন্দরকে কার্যপোযোগী করে আকাশ যোগাযোগের বিস্তৃতি এখন সময়ের দাবি। তাছাড়া মোংলাপোর্ট, অর্থনৈতিক অঞ্চল  ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের উন্নয়নে এবং শিল্পনগরী খুলনাকে আকাশপথে সংযুক্ত করার জন্য বাগেরহাটের ফয়লাতে প্রস্তাবিত বিমানবন্দর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। যদিও অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ অনুসারে এ প্রকল্পে বিনিয়োগ লাভজনক নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে দূরদর্শিতায় ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের উন্নয়নের দুঃসাহসিক কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন সে একই যুক্তিতে বাগেরহাটে বিমানবন্দর নির্মাণের পদক্ষেপ নেবেন বলে আমরা আশা করি। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি সুবিধাজনক স্থানে একটি স্টলপোর্ট করা হলে এলাকাটি দেশের বাকি অংশের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হবে। নয়নাভিরাম কাপ্তাই লেক ও পাহাড়ি সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। ফলে বিপুল কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের মাধ্যমে এলাকার সুপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদকে সফলভাবে মোকাবেলা করা যাবে।

বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি এয়ার নেভিগেশন সার্ভিস অবকাঠামো একটি সুষ্ঠু আকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ বিষয়টা যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো এয়ার ট্রাফিক রাডার দিয়ে ঢাকা বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক সুষ্ঠু ও নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ রাডার প্রতিস্থাপন অপরিহার্য। অন্যদিকে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক রাডারটি স্থাপনের পর থেকে অব্যবহূত পড়ে আছে। অবিলম্বে রাডারটি সচল করা অপরিহার্য। এয়ার নেভিগেশন সার্ভিসের অনুষঙ্গ ভিওআর, ডিএমই, অবতরণের সহায়তাকারী যন্ত্র ও লাইটিং সিস্টেম অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ এয়ারপোর্টেই অনুপস্থিত। তাছাড়া কোনো এয়ারপোর্টেই বার্ড হ্যাজার্ড কমানোর জন্য কার্যকর ও আধুনিক ব্যবস্থা  বিদ্যমান নেই। উড্ডয়নের বৃহত্তর নিরাপত্তা প্রদানের স্বার্থে অবিলম্বে প্রস্তাবিত এ সার্ভিস স্থাপনের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প হাতে নেয়া অপরিহার্য।

বিমানবন্দর অবকাঠামো ও এয়ার নেভিগেশন অবকাঠামো বিপুল  ব্যয়ে  নির্মাণ করা হয় আকাশ যোগাযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু এয়ারলাইনসকে ঘিরে। বাংলাদেশে সরকারি মালিকানার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও কয়েকটি প্রাইভেট এয়ারলাইনস বিদ্যমান। যার মধ্যে নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও রিজেন্ট এয়ারের নাম উল্লেখযোগ্য। যদিও রিজেন্ট এয়ারের কার্যক্রম মার্চ-২০২০ সাল থেকে স্থগিত রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক আগ্রহে বিমানের বহরকে অত্যাধুনিক ও সম্পূর্ণ নতুন এয়ারক্রাফট দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে। আশা করা যায়, ঐতিহাসিকভাবে জনগণের করের টাকার ভর্তুকিনির্ভর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আশার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যদিকে বিপুল উদ্দীপনা নিয়ে প্রাইভেট সেক্টরে এয়ারলাইন শুরু করে, অনেক এয়ারলাইন এখন দেউলিয়া, যার মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের নাম উল্লেখযোগ্য। প্রাইভেট সেক্টর এয়ারলাইনসের ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ প্রয়োজন। বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি, সরকারি নীতি-সহায়তার অভাব ও যুগোপযোগী আইন এবং ধারা দ্রুত সময়ের মধ্যে তৈরি করা  অপরিহার্য। নতুবা বিপুল সম্ভাবনাময় প্রাইভেট সেক্টর যাত্রী ও কার্গো এয়ারলাইন খাতের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।

সবার অলক্ষ্য আর অগোচরে গত দুই দশকে বাংলাদেশে একটি দৃশ্যমান হেলিকপ্টার সার্ভিস সেবা গড়ে উঠেছে। প্রায় ৯-১০টি কোম্পানি করপোরেট ব্যবহার, রোগী পরিবহন, চার্টার সেবা ও সীমিত পরিসরে এ সেবা প্রদান করে আসছে। অতি সম্প্রতি  পর্যটন সেবা ও এরিয়েল সাইট সিইং সেবাও তাদের কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। হেলিকপ্টার অপারেশনের জন্য স্বতন্ত্র একটি হ্যালিপোর্ট দীর্ঘ সময়ের দাবি ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পূর্ব পাশে প্রায় ৩১ একর জায়গার ওপর হ্যালিপোর্ট নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন। জাতির পিতার নামে প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু হ্যালিপোর্ট নির্মাণ কাজ আশা করা যায় দ্রুততম সময়েই শেষ হবে।

বিশ্বের প্রায় সব দেশে প্রণিধানযোগ্য জেনারেল এভিয়েশন সেক্টর, যা মূল এয়ারলাইন ইন্ডাস্ট্রির জনবলের জোগানদাতা হিসেবে কাজ করে। আমাদের দেশে সে রূপ দৃশ্যমান কোনো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি। তবু আরএন্ডআর এভিয়েশন ও আরিরাং এভিয়েশননামীয় দুটি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সীমিত পরিসরে এ সেবা চালু করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি (আগের ফ্লাইং ক্লাব), গ্যালাক্সি এভিয়েশন ও আরিরাং এভিয়েশন পাইলট ট্রেনিং স্কুল পরিচালনা করে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সব স্কুলের প্রশিক্ষণ মান রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। প্রায় ৭৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির নিজস্ব কোনো প্রশিক্ষণ বিমান নেই। বিপুল সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখ ও হতাশাজনক।

বাণিজ্যিক ড্রোনের ব্যবহার এভিয়েশন সেক্টরে নতুন দিগন্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ টেকনোলজির ব্যবহার ও সুফল পাওয়ার জন্য যে পূর্বপ্রস্তুতি দরকার তা এখনো শুরু হয়নি। ড্রোন ব্যবহারের নীতিগত, প্রায়োগিক আইন ও বিধি এখনই তৈরি না করলে আমরা সমসাময়িক বিশ্বের তুলনায় পিছিয়ে পড়ব।

পাঁচ দশকের চার দশকই এভিয়েশন অবকাঠামো গঠনের অমনোযোগিতায় আমরা হারিয়েছি। বিগত এক দশকে বলতে গেলে পূর্ণ উদ্যমে এ খাত উন্নয়নে বিশাল পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করা হয়েছে। আশা করি, আগামী দশকে জাতি এ চেষ্টার সুফল ভোগ করবে।

 

মফিজুর রহমান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নভোএয়ার লিমিটেড ও সেক্রেটারি জেনারেল, এওএবি