আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামো গড়তে এবং আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে ব্যাংক খাত। দেশের আর্থিক অবস্থার ও প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেক্টরে এসেছে উন্নত সেবা ও আধুনিকায়ন। এখন আর আগের মতো টাকা খরচ করে, লাইনে দাঁড়িয়ে, রোদে পুড়ে-বৃষ্টিতে ভিজে মানুষকে ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয় না। এখন চাইলেই মানুষের হাতের মুঠোয় আর্থিক সেবা, যা সামনের দিনে মানুষের সামনে খুলে দেবে সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার।

দেশের ব্যাংক খাত নিয়ে বলার আগে একটু আগের দৃশ্য দেখা প্রয়োজন মনে করছি। ১৯৭১ সালে ১৭টি বাণিজ্যিক ও স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের দুটি শাখা নিয়ে গঠিত হয়েছিল ব্যাংকিং সেক্টর। তখন ছোটখাটো আরো ১৪টির মতো বাণিজ্যিক ব্যাংক ছিল। স্বাধীনতার পর স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ ব্যাংক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সময় ওই ব্যাংকের ঢাকায় অবস্থিত শাখাটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে সব কার্যপ্রণালি সাজানো হয়। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর আরো ১২টি ব্যাংকিং কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা করেছে, পরবর্তী সময়ে যেসব ব্যাংককে সরকার জাতীয়করণ করে।

দেশে বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৬০ থেকে ৬৩টি এবং অতালিকাভুক্ত পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে। এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ছয়টি, বিশেষায়িত ব্যাংক রয়েছে তিনটি, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ৪২টি ও বিদেশী ব্যাংক রয়েছে নয়টি। গত পাঁচ দশকে আমাদের দেশে ব্যাংকিং সেক্টর পর্যাপ্ত সম্প্রসারণ ঘটলেও এ সেক্টরে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও অনিয়মের মতো ঘটনায় যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হয়েছে এ খাতকে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত কিছু ব্যাংক এখনো মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে তাদের কার্যকলাপ সম্পাদন করছে, যা ব্যাংক ও তার গ্রাহক উভয়ের জন্য সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। আর এ পুরনো কর্মপদ্ধতি ব্যাংকিং সেক্টরকে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে যখন সরকার গঠন করেন, তখন নির্বাচনে তিনি দেশের জনগণকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ২০২১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আজ ২০২১ সালে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশে বসবাস করছি। চারদিকে আজ ডিজিটালাইজশনের হাওয়া বইছে। ব্যাংক খাত থেকে শুরু করে, টেলিকম, কৃষি, পোশাক শিল্প, ওষুধ, বিদ্যুৎসহ সব সেক্টরে আজ আধুনিকায়নের ছোঁয়া। যা আমাদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে পৌঁছাতে সহায়তা করছে।

ডিজিটালাইজেশনের ফলে আজ দেশে বাড়ছে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। ফলে মিলছে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। দেশের মানুষের এ অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)। খাতটি খুব অল্প সময়ে শহর থেকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত মানুষকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আনতে সক্ষম হয়েছে। যা এর আগে এত দ্রুততম সময়ে এমন বিপুল পরিমাণ মানুষকে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তির উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি।

দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যাত্রা হয় প্রায় এক দশক আগে। এরপর বিভিন্ন ব্যাংক তাদের এমএফএস সেবা চালু করে। এই এক দশকে অনেক এমএফএস এলেও বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। ফলে এ মার্কেটে তৈরি হয়েছে একচেটিয়াত্ব। মানুষ সুবিধা ভোগ করার চেয়ে নিজে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ একচেটিয়াত্ব ভাঙতে সক্ষম হয়েছে ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’। মাত্র আড়াই বছরে ‘নগদ’-এর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি। এছাড়া আধুনিক সেবা ও উন্নত প্রযুক্তির সেবা মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছে মোবাইল ব্যাংকিংকে।

এদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা যাত্রার পর থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যেমন সহজ করেছে, তেমনি বাড়িয়েছে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। অবদান রাখছে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে। ঘুরছে অর্থনীতির চাকা। বাড়ছে মাথাপিছু আয়। এখন মানুষ চাইলেই যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো সময় এমএফএস সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করতে পারছে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেকোনো জায়গা থেকে মুহূর্তেই টাকা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের আপনজন বা প্রয়োজনীয় জায়গায়।

এর আগে দেশের যেসব সাধারণ মানুষ আগে ব্যাংকিং সেক্টরের আওতার বাইরে ছিল, তারাও এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। আগে যারা হাতে হাতে টাকা লেনদেন করতে অভ্যস্ত ছিল, তারাও আজ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হয়েছে। ক্যাশ ইন থেকে শুরু করে, ক্যাশ আউট, সেন্ড মানি, বিল পেসহ নানান সুবিধা উপভোগ করছে একসময় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে থাকা এ মানুষগুলো। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে তাদের এ অন্তর্ভুক্তি দিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি। পাশাপাশি বাড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় আয়।

ডাক বিভাগের সেবা ‘নগদ’ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মানুষকে আর্থিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে কোনো কাগজ ছাড়া কয়েক সেকেন্ডে ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে ‘নগদ’। *১৬৭# ডায়াল করে পিন সেট করলে মুহূর্তেই একজন ‘নগদ’ গ্রাহক হয়ে যেতে পারেন। ফলে দিস্তা দিস্তা কাগজ পূরণ ও টাকা খরচ করার হাত থেকে বেঁচে গেছে সাধারণ জনগণ। এখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে তাদের প্রতিদিনকার চাহিদা মেটাতে পারছে। সময়-অসময়ে তারা পূরণ করতে পারছে সব ইচ্ছা। বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস বিল, মোবাইল রিচার্জ কিংবা ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউটের সব কাজ সারছে ‘নগদ’-এর মতো এমএফএসের মাধ্যমে। একসময় মানুষ যে কাজ ঝামেলাপূর্ণ বলে মনে করত, সেই কাজগুলো আজ সহজে এক ক্লিকের মাধ্যমে সমাধান দিচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং।

বর্তমানে বিশ্ব খুব দ্রুততার সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে। এ পরিবর্তনের তালিকায় আর্থিক খাত রয়েছে প্রথম সারিতে। আমরা চাই বা না চাই, এ পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তা না হলে গ্লোবালাইজেশনের গ্রোতে আমরা পিছিয়ে পড়ব। আমরা সবাই জানি যে আগামী দিনের বিশ্বে প্রচলিত মুদ্রার ব্যবহার কমে আসবে। ডিজিটাল মুদ্রা সেই জায়গা দখল করবে। মানুষ আর পকেটে টাকা নিয়ে ঘুরবে না।

সব ধরনের কেনাকাটায় ইলেকট্রনিক মানি বা ই-মানি সেই জায়গা দখল করবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সে পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। দেশের মানুষের মাঝে এখন ই-মানির প্রচলন বেড়েছে। আর ঠিক সে কারণেই দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার পথ সুগম করে দিয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলো।

বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং এখন কেবল একটি সম্ভাবনাময় খাত নয়, দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় আলোর দিশারিও। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষ যত যুক্ত হবে, দেশের অর্থিনীতির চাকা তত ঘুরতে থাকবে। সুযোগ তৈরি হবে নতুন নতুন সব সম্ভাবনার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঁচবে অর্থ। কমবে সাধারণের ভোগান্তি। পাশাপাশি বেকার তরুণদের মিলবে কর্মসংস্থান, যা আমাদের উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পৌঁছাতে সহায়তা করবে।

দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেক্টরে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। সেই চ্যালেঞ্জগুলো আমরা চিন্তিত করতে না পারলে একটা সময় পর এমএফএস সেক্টরে অগ্রযাত্রার এ পথ থমকে যাবে। দেশে এমএফএস আসার এক দশক পার করেছে কেবল। এ খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বাজারে একচেটিয়াত্ব মনোভাব ভেঙে গ্রাহকসেবায় মনোযোগী হলে এ অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব। আর সেটা কেবল সম্ভব হবে অন্যান্য সেক্টরের মতো এমএফএসে মনোপলি বা একচেটিয়াত্ব ভাঙার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি) করে একচেটিয়া মুনাফা করা থেকে এ শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব।

এছাড়া এমএফএস সেক্টরে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা খুব জরুরি। স্বল্প মুনাফায় কীভাবে সর্বোত্তম গ্রাহকসেবা দেয়া যায়, আমাদের সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বাজার একক কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি থাকলে অগ্রগতি প্রায় দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বের উন্নত দেশের মতো আমাদের টেলিকম সেক্টরেও যেমন একক আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্যে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি) নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, তেমনি মোবাইল ব্যাংকিং সেক্টরেও এমন নীতিমালা এখন সময়ের দাবি। একক আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই কেবল সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে। বাজারে যখন সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে, তখন সাধারণ গ্রাহকেরাই এতে বেশি লাভবান হয়। আমাদের দেশের সাধারণ গ্রাহকদের কথা চিন্তা করে হলেও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। এরূপ যথাযথ নিয়ম-নীতির মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতে দিলে মার্কেটে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার কমবে, যার সুফল যাবে সাধারণ জনগণের পকেটে।

 

তানভীর এ মিশুক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ‘নগদ’, ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস