প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ ছিল ১৯৭৩-৭৮। এ পরিকল্পনা দলিলটি পরিকল্পনা কমিশন নভেম্বর ১৯৭৩ প্রকাশ করে, এ পরিকল্পনা দলিলের প্রথম অধ্যায়ে ‘সোস্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল পারস্পেকটিভ অব প্ল্যানড্ ডেভেলপমেন্ট’ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এতে বর্ণিত হয়েছে, পরিকল্পনা প্রণয়নকারীরা তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কী উপলব্ধি করেছিলেন। এ অধ্যায়ের একেবারে শুরুতে তখনকার সংবিধানে বিধৃত চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সম্পর্কে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। গণতন্ত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে সংবিধান নির্ধারিত জনগণের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে ছিল— বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশ করার স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি জনগণের শাসন করার এবং জনগণের অধিকারগুলোর কথা বলা হয়েছে। জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের দীর্ঘ সংগ্রামের উল্লেখ করা হয়েছে। এ জাতীয়তাবাদ বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা থেকে বাংলাদেশকে নিবৃত করে না। জাতীয়তাবাদ দেশের জনগণের কাঁধে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। এ জাতির পরিচয় হলো বাঙালি। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে, আমরা আমাদের উন্নয়নের দায়িত্ব অন্য কারোর ওপর চাপিয়ে দিতে পারি না। ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বলা হয়েছে রাজনীতি থেকে সব সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিষিদ্ধ করার জন্য আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। আরো বলা হয়েছে, ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রামে একাট্টা হয়ে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, বাংলাদেশ থাকবে ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং বর্ণ ও বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে। তবে বাস্তবতাকে স্বীকার করে বলা হয়েছে, যুগ যুগ ধরে তমসাবাদ ও ধর্মীয় উগ্রতা জারি থাকার ফলে এগুলোকে একদিনে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা তখনই উচ্ছেদ করা সম্ভব যখন সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। আমাদের মুক্তিসংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জাতির সমজাতীয় চরিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ধর্মনিরপেক্ষতা জোরদার করবে। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে এ দলিলে একটি সরল স্বীকারোক্তি ছিল, সমাজতন্ত্রের আদর্শ অন্য তিনটি রাষ্ট্রীয় আদর্শের মতো সহজভাবে ও দ্রুতগতিতে অর্জন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এটি একটি ভিশন ও স্বপ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। সমাজতন্ত্রের পথে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু আরো অনেক বেশি করার প্রয়োজন আছে। যে কষ্টদায়ক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অন্য অনেক দেশে সমাজতন্ত্রের মধ্যে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে, সেই ইতিহাস প্রমাণ করে অনেক কিছু করার প্রয়োজন আছে। মাঝপথে আমরা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়তে পারি অথবা কর্তৃত্ববাদী সমাজ ব্যবস্থার শেষ পর্যন্ত ঝুঁকে পড়তে পারি, যদি, সমাজতন্ত্রের উপযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা সম্ভব না হয় এবং এর প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার না থাকে। তাহলে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব হবে না। আরো বলা হয়েছে, উত্তরণকালীন সময় সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকতে পারে, এমনকি স্ট্র্যাটিজি সম্পর্কে পার্থক্য থাকতে পারে। সব সমাজতান্ত্রিক দেশকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কতগুলো মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম হবে না। যারা পরিকল্পনা দলিলটি প্রণয়ন করেছিলেন, তারা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে পৌঁছার পথ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন বলে মনে হয়। তবু আজ এত বছর পর দেশে যখন একটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে উঠতে শুরু করেছে, যার চরিত্র সম্পর্কে কেউ বলেন, এটি একটি লুম্পেন ধনতন্ত্রবাদ; আবার কেউ কেউ বলেন, এটি হলো এক ধরনের ক্রোনি ক্যাপিটালিজম, তা থেকে অনুমান করা যায়, পরিকল্পনা দলিলের প্রণয়নকারীরা সমাজতন্ত্রের অভীষ্টে পৌঁছানোর পথে এর চুলচেরা সমস্যাগুলো কতটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
পরিকল্পনা কমিশনের অন্যতম একজন সদস্য, যিনি আমার শ্রেণীকক্ষের প্রত্যক্ষ শিক্ষক ছিলেন, তিনি আমাকে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে থেমে যাওয়ার পর আমাকে এক আলোচনায় বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা খুবই সহজ। পূর্ব পাকিস্তান যদি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে ডিক্রি জারির মাধ্যমে এখানে সমাজতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব। কারণ, পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের মতো বড় বড় ভূস্বামী ও পুঁজিপতি নেই, যাদের সামাজিক শিকড় খুব গভীরে প্রোথিত। আমি তার এ থিসিসের সঙ্গে একমত হতে না পেরে বলেছিলাম, শ্রেণীগত বিকাশ ও বিন্যাস একেবারেই ভিন্ন কথা বলে। লেনিনের গভীর ও অন্তর্ভেদী উপলব্ধি ছিল, পুঁজিবাদ রক্তবীজের মতোই বিস্তার লাভ করে। সুতরাং নিছক পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা সমাজতন্ত্রের পূর্বশর্ত নির্ধারণে যথেষ্ট নয়। দেখা যাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা এক ভিন্নধর্মী শ্রেণী সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছি। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ দেশে শ্রমিকশ্রেণীর শক্তিশালী ও সংগঠিত ভ্যানগার্ড পার্টি নেই। পেটি বুর্জোয়া অধ্যুষিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সমাজতন্ত্র আশা করা সঠিক হবে না। বাংলাদেশের পরবর্তী সমাজ বিকাশের ধারা এ বাস্তবতাকেই প্রমাণ করেছে।
পরিকল্পনা দলিলে ১৯৭২-এর সংবিধানকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে— ক. মেহনতি মানুষকে সব ধরনের শোষণের শৃংখল থেকে মুক্ত করার জন্য অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। খ. সব নাগরিকের থাকবে কাজ পাওয়ার অধিকার। গ. সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়। ঘ. অনর্জিত আয়-উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। ঙ. উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর ব্যক্তিমালিকানার সীমা আইন দ্বারা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। পরিকল্পনা দলিলে আরো দাবি করা হয়েছে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর সীমারেখা অর্পণ, কাজের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সব নাগরিকের সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণের বিষয়গুলো বিশ্বের সব সামাজিক গণতন্ত্রে স্বীকৃত। সামাজিক গণতন্ত্র বিষয়টি উল্লেখ থেকে স্পষ্ট হয়েছে পরিকল্পনা প্রণয়নকারীরা কোন আদর্শে আস্থা রাখতেন। তারা নিশ্চয়ই মার্ক্সবাদী ভাবাদর্শে বিশ্বাস করতেন না। তাই যদি হতো তাহলে তারা সমাজতান্ত্রিক শিবিরের কথাই উল্লেখ করতেন। তারা বড়জোর ইউরোপের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের আদর্শই মনে রেখেছিলেন। কিন্তু বোঝা দরকার কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাটি এসেছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উন্নত স্তরে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র এসব রাষ্ট্রের শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিল, তা থেকে সংস্কারের পথে এ মতাদর্শের চাপ এড়ানোর কৌশল হিসেবেই সামাজিক গণতন্ত্র বা কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশ তার জন্মলগ্নে ছিল একটি দারিদ্র্যপীড়িত অনগ্রসর দেশ। এ রকম একটি দেশে সামাজিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বস্তুগত ভিত্তি ছিল না। তবে একটি মহৎ লক্ষ্য হিসেবে সামাজিক গণতন্ত্রের ধারণা অবশ্যই তুলে ধরা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছিল বড় সহায়ক শক্তি। ভারতে জওহরলাল নেহরু পশ্চিমা গণতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের মিশ্রণ ঘটিয়ে ভিন্ন এক ধরনের সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই ধারণা করা যায়, স্বাধীন ভারতের প্রথমদিককার নেতাদের ভাবাদর্শ পরিকল্পনা কমিশনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন বিশ্বের কিছু দেশে উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল, তার ওপর মার্ক্সবাদী মতাদর্শের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। এমনকি বিশ্বপরিসরে সমাজতন্ত্রের পক্ষে আপাতদৃষ্টিতে এক অপ্রতিরোধ্য উত্থানের জোয়ার দেখা গিয়েছিল। বলা যায়, বিশ্বপ্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শোষণহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষা, যার বাস্তব রূপকল্প তাদের মধ্যে স্পষ্ট ছিল না, এমনই এক অবস্থার মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের চিন্তাভাবনার আদর্শিক দিকটি নির্মিত হয়েছিল। ওই পরিকল্পনা যারা রচনা করেছিলেন, তারা ছিলেন মহৎ স্বপ্নচারী, যার সঙ্গে সমাজ বিকাশের নিজস্ব গতিধারার যোগাযোগ সামান্যই ছিল। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সম্মেলনে সমিতির সভাপতি ড. মাযহারুল হক যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন, তার একটি অংশ উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘সোস্যালিজমের আসার একটি নির্দিষ্ট পথ রয়েছে এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো তাকে সামাজিক বিপ্লব বলে থাকে। যারা ওয়েলফেয়ার স্টেটকে সোস্যালিস্ট স্টেট বলে থাকেন, তারা জানেন এ ওয়েলফেয়ার স্টেটের ধারণা এবং কার্যক্রম শুধু উন্নত দেশগুলোয় হয়েছে। কারণ জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য যে সম্পদের প্রয়োজন, শুধু সম্পদ উৎপাদনকারীরা সেগুলো জোগাতে পারে।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘সোশ্যালিজমের ধারণা সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য কিছুসংখ্যক চিন্তাশীল ব্যক্তির মনে এসেছিল। কার্ল মার্ক্সের Historical Analysis এর একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও যুগিয়েছে। অথচ মার্ক্সের নির্ধারিত পথে সোস্যালিজম আসেনি, এটা এল প্রথম রাশিয়ায়, যেখানে একটা সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠী বহুদিন থেকে গড়ে উঠেছিল এবং জার শাসনামলে অশেষ নির্যাতনও ভোগ করেছিল। সেই স্বল্পসংখ্যক সমাজতন্ত্রপ্রাণ ব্যক্তি লেনিনের নেতৃত্বে প্রথম মহাযুদ্ধে রাশিয়ায় যে বিপর্যয় ঘটে, সে সুযোগ নিয়ে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব সৃষ্টি করে। সে আজ প্রায় ষাট বছর আগের কথা।
একনায়কতন্ত্রের অবসান এখনো ঘটেনি, যদিও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আগের থেকে অনেক সহজ হয়েছে। পূর্ব ইউরোপে গত মহাযুদ্ধের অবসানের সুযোগে সোস্যালিস্ট দলগুলো রাশিয়ার সামরিক শক্তির সাহায্যে সোস্যালিস্ট একনায়কতন্ত্র কায়েম করে। ১৯৪৯ সালে মাও সে তুং বহুদিনের নির্যাতন ও সাধনার পর সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন চীনে। এসব দেশে গণতন্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি তা নেই, দেশের সব কাজ কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে চলছে এবং এসব দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা দেশের জনসংখ্যার তুলনায় অতি নগণ্য। আবার সব দেশে সোস্যালিজম বলতে ঠিক এক কথা বোঝায় না। দেশভেদে, পরিবেশভেদে সমাজতন্ত্রের রূপ বদলেছে। কিন্তু কোনো দেশে সমাজতন্ত্র সামাজিক বিপ্লব ছাড়া এবং কমিউনিস্ট পার্টির একনায়কত্ব ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশে কি তা ঘটেছে? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কি সোস্যালিস্ট দল? সোস্যালিজম কী, তারা কি ঠিক বোঝেন? (সূত্র পলিটিক্যাল ইকোনমি। ভলিউম-১, নং-১ কনফারেন্স-১৯৭৪)
প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে পৃষ্ঠা ৭-এ ক্যাডারদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ আলোচনায় বলা হয়েছে, সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরে ক্যাডার হচ্ছে একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। সেজন্য উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রাথমিক ধাপে ক্যাডারদের শক্তিশালী করার জন্য একটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ক্যাডারদের অতি যত্নসহকারে বাছাই করতে হবে। তাদের থাকতে হবে লক্ষ্যের অতি দায়বদ্ধতা, কর্মদক্ষতা, সততা, সাহস, কাজ করার ইচ্ছা এবং ত্যাগের মনোভাব। তাদের এমনভাবে বাছাই করতে হবে, যাদের সামাজিক রূপান্তরের প্রতি অঙ্গীকার আছে এবং এ লক্ষ্যে গৃহীত রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি তাদের অনুগত থাকতে হবে। ক্যাডার নির্বাচনে পার্টি নেতৃত্বকে কতগুলো গুণাবলি বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষত জোর দিতে হবে উন্নয়ন কর্মে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলার প্রতি। পরিকল্পনা প্রণয়নকালে আওয়ামী লীগ ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। এ দলটি কখনই ক্যাডারনির্ভর ছিল না। এটি ছিল একটি মাস পার্টি, এ দলে সংশ্লিষ্ট হয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। এদের কোনো সুনির্দিষ্ট আইডিওলজিতে দীক্ষা ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে শত্রুর মোকাবেলা করা ছাড়া সুনির্দিষ্ট আইডিওলজিতে দীক্ষিত হয়ে ওঠারও অবকাশ ছিল না। যেসব দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেসব দেশে দীর্ঘকাল ধরে আইডিওলজিক্যাল প্রস্তুতি দলের মধ্যে নেয়া হয়েছিল। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ও প্রলম্বিত লড়াইয়ের মাধ্যমে দলের ক্যাডাররা ইস্পাতদৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছিল। ফলে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এ ধরনের ক্যাডাররাই হয়ে উঠেছিল সমাজ রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার। সেসব দেশে দেখা গেছে বিপ্লবী প্রজন্মের বিদায়ের পর পার্টিতে যে নতুন প্রজন্ম যোগদান করেছিল, বিপ্লবী অঙ্গীকারে তারাও হয়ে পড়েছিল শিথিল এবং অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাবাদী। সুতরাং সমাজ রূপান্তরের কাজটি সহজ নয়। অথচ পরিকল্পনা প্রণয়নকারীরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এমন চরিত্রের ক্যাডার আশা করেছিলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে। বলা যায় তাদের প্রাথমিক অনুমান ছিল অলীক কল্পনামাত্র। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের নেতৃত্ব যেসব বাধার মুখে পড়েছিল, সেগুলো মূলত আদর্শশূন্যতা থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল।
প্রথম পরিকল্পনার ছয়টি প্রধান লক্ষ্য ছিল। এগুলো হলো— ১. দারিদ্র্য হ্রাসকরণ, বেকারত্ব ও ছদ্ম বেকারত্ব হ্রাসের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছিল। এজন্য আরো প্রয়োজন ছিল জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি দ্রুততরকরণ এবং কার্যকর রাজস্ব ও মূল্যনীতির মাধ্যমে সমতাভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিতকরণ। ২. পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং তা সম্পন্ন করা। অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোয় উৎপাদন বৃদ্ধি— এ উৎপাদনের স্তরকে ১৯৭৩-৭৪ সালের মধ্যে ১৯৬৯-৭০-এর স্তরে নিয়ে যাওয়া। ৩. ন্যূনপক্ষে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৩ শতাংশ হার অতিক্রম করে যায়। ৪. প্রয়োজনীয় ভোগ্যদ্রব্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, যার ফলে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম ভোগের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। ৫. সাধারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির রশি টেনে ধরা। ৬. বার্ষিক ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করা। কমিশনের দৃষ্টিতে এ বৃদ্ধির হার ছিল নগণ্য।
আবারো ড. মাযহারুল হকের ভাষণ থেকে একটি উদ্ধৃতি নিতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে একটি ক্লাসরুম লেকচার দিয়েছেন কিন্তু এটা কাকে দিয়েছেন, বলা ভার। দেশের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী পরিকল্পনা কমিশনের Socialist Planning করা উচিত ছিল। তারা তা করেনি। Socialist Planning করতে হলে সোশ্যালিজম কী, তা বলতে হবে এবং বাংলাদেশের সোশ্যালিজম কেমন হবে, তাও বলতে হবে। পাঁচ বছরে কতখানি করা যায়, তাও নির্ধারিত করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশন এর কিছু করেনি। তাদের শিক্ষার প্রোগ্রাম গতানুগতিক এবং অন্যান্য বছরের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, এটা পাকিস্তানের চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আরেক রূপ।’ ড. মাযহারুল ইসলামের এ সমালোচনা খুবই স্পর্শকাতর। তার অভিযোগ, পরিকল্পনা কমিশন যা করেছে সেটি হলো, পাকিস্তানের চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ভিন্ন এক সংস্করণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইডিওলজি (অন্তত যেভাবে দাবি করা হয়েছে) পাকিস্তান রাষ্ট্রের আইডিওলজির অনুরূপ নয়। তাহলে কি বলতে হবে পরিকল্পনা কমিশন গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার সময় বা সুযোগ পায়নি। এ কাজ করার জন্য প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় আইডিওলজির Deconstruction এবং নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের আইডিওলজি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আকারে অবয়ব সৃষ্টি।
Just FAA Land এবং J.R. Parkinson তাদের লেখা Bangladesh: “The Test Case for Development গ্রন্থে লিখেছেন, The years since 1971 have been a period of experiment with diffterent styles of government. To begin with there was no Constitution, and Sheikh Mujibur Rahman, who had led resistance to West Pakistani influence; assumed government with the backing of his Awami League supporters: when a new Constitution was established elections were held and the Sheikh was returned to power in a Parliament that included only very few members of opposing parties. The imposition of a presidental system of government and dissolution of Parliament (with its own consent) followed in January 1975. Overwhelming support and little in the way of effective opposition could not give rise to strong government, rather the reverse; little was done to come to grips with the administrative, economic and development problems facing the country.
The brutal assassination of Sheikh Mujibur Rahman in August 1975 and the subsequent coups and turmoil are evidence of political instability which may have unpredictable effects on the economy. The basic problems remain the same, as does the need for effective government to deal with them”.
অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আর কোনো সুযোগ থাকল না। বাংলাদেশের ইতিহাস রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ইতিহাস। একটি সরকার দৃশ্যত এক যুগ ক্ষমতায় থাকলেও বলা যায় না, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সুশাসনের অভাব এবং কার্যকর সরকারের অভাব। স্বাধীনতা উত্তরকালে আজকের এই দিন পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তাতে অবদান রেখেছে বাংলাদেশের সৃজনশীল জনগণ। সংকট সমস্যা অতিক্রমে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রশংসনীয় রেজিলিয়েন্স না থাকলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অর্জন সেটি সম্ভব হতো না। ১৯৭৫ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ছেদ ঘটার আগে থেকেই শুরু হয়েছিল প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের অবসান। এমনকি এ প্রশ্নও তোলা যায়, যদি এমন কিছু না হতো তাহলে কি প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতো? ড. এম এন হুদা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সম্মেলনে (১৯৭৪) তার Conditions of Commitment To a Plan প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘Practical commitment to the plan, namely, to do all that is necessary for implementing the plan, involves more and better work for every-body. More taxes to be paid by those who can, and drastic cut-down of unnecessary and ostentatious expenditure at all levels-personal, social, institutional and governmental. Poverty may not be shared immeditely, but austerity must be shared here and now at all levels, as nearly equally as possible, and demostrably so. A national exhibition should be held every year to demonstrate what sacrifice are being made by those who have (either of their own or from govt) how many luxury cars are surrendered, how many cars-owners start riding bicycles. How many luxury house-owners move to utility flats, how many luxury smokers turn to utility smoking, how many weddings serve only sherbat, and so on and so forth By themselves, each one of these sacrifices will probably look small, all together they are not; and what is most important is the salutary effect such demonstration would have on the people- their confidence in what we say and their own urge to make whatever little sacrifice they can. People have never failed the leaders, it is leaders, who have failed the people. Leaders must lead in sacrifice too; leaders everywhere— in politics and government, in busginess and commerce, in universities and colleges, in towns and villages. If this essential first step is taken, seriously and earnestly, only, then other steps will follow which may show us some light in our efforts to remove existing darkness and confussion.&dquote;
ড. এম এন হুদা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শর্ত হিসেবে মিতব্যয়িতা ও কৃচ্ছ্রসাধনের আবশ্যকীয়তার ব্যাপারে তার লেখায় উল্লেখ করেছেন। তার এই হতাশা রয়েই গেছে। বাংলাদেশের প্রথম কয়েকটি বছর ক্ষমতাসীন মহলের পক্ষ থেকে এ রকম কোনো উদ্যোগই আমরা লক্ষ করিনি। যদি সে রকম উদ্যোগ থাকত, তাহলে দেশটির ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত। বিশ্বাস ও অঙ্গীকারের ঘাটতি থেকেই জাতির জন্য দেখা দিয়েছে প্রচণ্ড হতাশা। এ হতাশা সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে প্রকাশ পায়নি। এর জায়গায় এসেছিল অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য। এ অবস্থা থেকে এখনো উত্তরণ সম্ভব হয়নি। মনে হচ্ছে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের ভাগ্যের লিখন হয়ে থাকবে আরো বেশ কিছুকাল।
হার্ভার্ড পিএইচডি প্রফেসর নুরুল ইসলাম ছিলেন প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান। ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করতেন। ওই সময় পরিকল্পনা কমিশনের অন্য সদস্যদের মর্যাদা ছিল প্রতিমন্ত্রীর। সদস্যরা এরূপ মর্যাদা পাওয়ায় পরিকল্পনা কমিশনকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। পরবর্তীকালে পরিকল্পনা কমিশনগুলো আর কখনই এ রকম মর্যাদা ভোগ করেনি। প্রফেসর নুরুল ইসলাম রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হচ্ছে Making of a Nation: Bangladesh An Economist Tale. গ্রন্থটি বাংলাদেশ থেকে UPL ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশ করে। এ গ্রন্থে তৃতীয় অংশের শিরোনাম ছিল Building a State. এর একটি অধ্যায় Discontent and Tensions শিরোনামে লেখা হয়। এ অধ্যায়ের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, কমিশন নিয়ে দুই ধরনের টানাপড়েন চলছিল। তিনি কমিশনের একজন সিভিল সার্ভিস অফিসার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছেন, এ অফিসার কমিশন থেকে বদলি হতে চাইলেন। বদলি চাওয়ার কথিত কারণ ছিল, একজন অর্থনীতিবিদ, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে তার তুলনায় খারাপ ফল করেছিলেন, তাকে উচ্চতর মর্যাদা দিয়ে কমিশনে নিয়োগ করা হয়েছে। প্রফেসর ইসলামের মতে, এ ব্যক্তি পরবর্তীতে একজন পেশাদার অর্থনীতিবিদ হিসেবে উচ্চতর একাডেমিক যোগ্যতা অর্জন করছেন এবং তার গবেষণা অভিজ্ঞতাও ছিল। এ অর্থনীতিবিদ কমিশনে সাময়িক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এবং সরকারের উচ্চতর অন্য কোনো পদে তার নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। এ পরিস্থিতিতে সেই অর্থনীতিবিদ কমিশন ছেড়ে চলে যান।
কমিশনের মর্যাদা ও ক্ষমতা দেখে নীতি-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় অন্যদের কাছ থেকে কমিশন সহযোগিতা পাচ্ছিল না। প্রফেসর ইসলাম উপলব্ধি করেছিলেন, আমলাতান্ত্রিক মুষ্টিযুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল খুবই অসুবিধাজনক। এ প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে একাডেমিক জগৎ থেকে আসা অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি হেনরি কিসিঞ্জারের লেখা The White House Years গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শক্তিশালী ও অদোদুল্যমান সমর্থনই কেবল হতে পারে সরকারে একাডেমিকদের টিকে থাকা ও সাফল্যের শর্ত।
কমিশন মন্ত্রীদের সঙ্গে তাদের মন্ত্রণালয় বা আন্তঃমন্ত্রণালয় ইস্যুগুলো নিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। তাদের বিশ্বাস ছিল, যোগাযোগ স্থাপন ও মিত্র খুঁজে পাওয়ার চেয়ে পেশাদারী কাজে আত্মনিয়োগ করাই সঠিক। কিন্তু এ ধারণা আখেরে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এ সমর্থনই তাদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য যথেষ্ট মনে করা হয়েছিল। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে এবং সর্ববিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কমিশনের পক্ষ হয়ে বৈরী মনোভাবাপন্ন মন্ত্রী বা কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে কমিশনের কাজে সহযোগিতা আদায় করে নেবেন— এ ধারণাও ছিল ভুল। প্রধানমন্ত্রী আশা করেছিলেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কমিশন নিজ চেষ্টায় ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবে। কেবল নির্বাচিত ক্ষেত্রেই তার সহযোগিতা চাইবে। প্রধানমন্ত্রী চাইতেন অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ এবং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ডেপুটি চেয়ারম্যানই মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। মন্ত্রিসভাকে এসব ব্যাপারে সম্মত করানো, দলীয় সভা ও সংসদীয় মিটিংয়ে এসব পাস করিয়ে নেয়ার ব্যাপারে ডেপুটি চেয়ারম্যানই উদ্যোগী হবেন— এটাও ছিল প্রধানমন্ত্রীর কামনা। ডেপুটি চেয়ারম্যানের কাজকে সহজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম যেন ১৯৭৩-এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত একজন মন্ত্রী হয়ে যান। এ ব্যাপারে প্রফেসর ইসলাম বুঝতে পেরেছিলেন একজন সুপার ব্যুরোক্র্যাট যিনি একজন অরাজনৈতিক মন্ত্রীও, তিনি যদি মাঝামঝি অবস্থানে থাকেন তাহলে উভয় অবস্থার সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ভোগ করতে হয়। কিন্তু যেহেতু প্রফেসর ইসলামের রাজনীতিবিদ হওয়ার সাধ ছিল না, সেহেতু এ প্রস্তাব তার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। মন্ত্রীদের ভূমিকা হওয়া উচিত আরো শক্তিশালী এবং প্রকল্প ও নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকা হওয়া উচিত চূড়ান্তভাবে নির্ধারক। প্রফেসর ইসলাম লিখেছেন, ১৯৭৪-এর মাঝামাঝি সময় থেকে অবস্থাটা তাই দাঁড়ালো। কমিশনের ভূমিকা ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে পর্যবসিত হলো। ১৯৭৪ থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছিল। এর ফলে দৈনন্দিন উদ্ভূত জরুরি সমস্যার জন্য প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াল অ্যাডহক সমাধান। নীতি ও কর্মসূচির নিবিড় পরীক্ষণ গৌণ হয়ে গেল। এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রী ও অন্য ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোকে সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে সম্পদ বণ্টনে শৃঙ্খলা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল এবং আশু সমস্যাই প্রাধান্য পেল। নীতিনির্ধারণে কমিশনের প্রভাব শিথিল হতে থাকল। কিন্তু বৈদেশিক সাহায্যের জন্য দেনদরবারে কমিশনের ভূমিকা তেমনভাবে শিথিল করা হলো না।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করতেন, এসব দেনদরবারে কমিশনেরই দায়িত্ব পালন করা উচিত। ভাগ্যের পরিহাস দাঁড়ায়, অ্যাডহকভিত্তিক উদ্যোগে বা প্রকল্পেও দাতারা নীতি সংক্রান্ত প্রস্তাবে সহায়তা দিতে রাজি ছিল না। প্রফেসর ইসলামের মতে, পুরো পরিস্থিতি ছিল আশঙ্কাজনক। আমরা সদস্যরা এবং আমি নিজে এ উপসংহারে পৌঁছলাম যে, সরকারের জন্য আমরা খুব কাজে আসতে পারছিলাম না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। যদি শেখ মুজিব চান তাহলে সুনির্দিষ্ট ব্যাপারে সরকারের বাইরে থেকেই পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। সবকিছু ছাপিয়ে যা সামনে এল সেটি হলো, আসন্ন সাংবিধানিক পরিবর্তন। এর ফলে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিদৃশ্য আমূল পরিবর্তিত হয়ে যাবে। একটি সর্বগ্রাসী অনিশ্চয়তার অনুভূতি সরকারকে কেন্দ্র করে পারসেপশনকে অবনতির পথে নিয়ে গেল। পরিকল্পনা কমিশনও এর বাইরে ছিল না।
এ পর্যায়ে পরিকল্পনা কমিশনের অন্যতম সদস্য প্রফেসর মো. আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করছি। প্রফেসর মো. আনিসুর রহমানকে তার সম্মতি আছে কিনা জিজ্ঞাসা না করেই পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য নিয়োগ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, তার অভিজ্ঞতার মূল্যবান অংশগুলো তারই লেখা স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘পথে যা পেয়েছি’ থেকে নেয়া হয়েছে। তাকে যখন কমিশনে সদ্য নিয়োগ করা হয়, সে সময় তিনি আমেরিকার উইলিয়ামস কলেজে শিক্ষকতা করছিলেন। দেশে ফিরে কমিশনে যোগ দেয়ার ব্যাপারে তার কোনো উৎসাহ ছিল না, এর কারণ তার বয়ান থেকেই পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা যে তেমন কিছু করতে পারব না, রাজনীতিবিদরাই আসল ক্ষমতা ব্যবহার করবেন এবং তাদের ইচ্ছামতোই দেশ পরিচালনা করবেন, এ সম্পর্কে আমরা তো দিল্লিতেই আলোচনা করেছিলাম এবং একমত হয়েছিলাম। ... আমি আমাদের দিল্লি আলোচনা তাদের মনে করিয়ে দিই, বলি যে তারা ভুল করছেন, আমি ও ভুল করতে চাই না, তাছাড়া আমরা সবাই শিক্ষকতা ছেড়ে দিলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডিপার্টমেন্ট অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রদের কে পড়াবে? তারা তবু ছাড়বেন না।
কম্প্রোমাইজ হিসেবে আমি প্রস্তাব করি যে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে পরিকল্পনা কমিশনের জন্য পার্টটাইম সার্ভিস দেব। প্রফেসর আনিসুর রহমানের এ বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেই তিনি এবং তার সহকর্মীরা একমত হয়েছিলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের পরামর্শকে বিশেষ কোনো গুরুত্ব দেবেন না।
পরিকল্পনা কমিশনের কাজ শুরু করার দুদিন পরেই তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী, ডেপুটি চেয়ারম্যান ও পরিকল্পনা কমিশনের অন্য সদস্যদের কাছে ‘দ্বিতীয় যুদ্ধ পরিচালনা’ শীর্ষক একটি নোট দেন। এ নোটের বিস্তারিত বিষয়গুলো পাঠক তার লেখা গ্রন্থ পথে যা পেয়েছি থেকে জেনে নিতে পারেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তার প্রস্তাব ছিল খুবই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু দুর্ভাগজনক এই যে, যা তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘এ নোটের কোনো প্রতিক্রিয়া কোনো মহল থেকে আমি পাইনি। এর কয়েক দিন পরেই, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়, পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং পরিকল্পনা কমিশনের অন্য কলিগদের সঙ্গে। স্বাধীন বাংলাদেশ এবং পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেয়ার পর “জাতির পিতা”র সঙ্গে এটাই আমার প্রথম দেখা। তাই আমার জন্য এ সাক্ষাত্টা ছিল অত্যন্ত ইমোশনাল।” এ প্রসঙ্গে তিনি আরো লিখেছেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আপনার সঙ্গে আমার এই প্রথম দেখা, আমার মনের মধ্যে কয়েকটি কথা জমে আছে। আপনি অনুমতি দিলে সেগুলো বলে আমি নিজেকে হালকা করতে চাই।’
‘কী কথা, নিশ্চয়ই বলবেন।’ ‘আপনি সশরীরে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারেননি, এটা জাতির দুর্ভাগ্য। কিন্তু জাতি মনেপ্রাণে আপনাকে নেতা মেনে সেই চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজকে আপনি ফিরে এসেছেন, এখন দেশ গড়ার কাজে জাতি আপনার কাছ থেকে সেই নেতৃত্ব আশা করে, যে নেতৃত্ব আপনি দিতেন যদি আপনি সত্য সত্যিই সশরীরে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতেন।’ ‘কী করতাম, আপনি বলেন...’ আমার কথা শুনতে শুনতে জাতির জনকের মুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল এবং আমি মনে মনে একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম। আমি তো তাকে প্রায় বলছি যে, আপনার কি তখনো জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা আছে? আপনার সঙ্গে জাতির বাস্তব সম্পর্কের মধ্যে একটি বিরাট ও মৌলিক বিচ্ছিন্নতা হয়ে যায়নি কী? এর জবাবে জাতির পিতা শুকনো হাসি হেসে বললেন, ‘না, না, মনে করব কেন— আপনাদের তো এ জন্যই রেখেছি, মাঝে মাঝে আসবেন, অ্যাডভাইস করবেন।’ এর পরবর্তীতে দেশের তীব্র আর্থিক সংকট এবং পাশাপাশি সরকারের ও বাইরে গাড়ির বিলাসিতা দেখে এবং ডিসেম্বরে সদ্যমুক্ত কুষ্টিয়ার মুক্তিযোদ্ধা তৌফিক-ই-ইলাহীর স্বতঃস্ফূর্ত নেতৃত্বে শহরের গাড়ি ও পেট্রলের ব্যবহার রেশন করার গণসিদ্ধান্ত স্মরণ করে প্রফেসর আনিসুর রহমান ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নোট দেন। এ নোটের বিষয়বস্তু ছিল, ‘কৃচ্ছ্রসাধনের পথে; পেট্রল ও গাড়ি’। তার এ প্রস্তাব যে মোটেও হালে পানি পায়নি, তা আমরা পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে জানি। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর ড. এম এন হুদার প্রাগুক্ত উদ্ধৃতিও প্রণিধানযোগ্য। প্রস্তাবটি করা হয়েছিল একদিকে শোচনীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুখ-দুঃখ সবাই মিলে শেয়ার করে নেয়ার চেতনায়। যে প্রজাতন্ত্র সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য সামনে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তার কুশীলবরা এর স্পিরিট থেকে কত দূরে ছিলেন, এটাই তার জ্বলন্ত উদাহরণ। স্বাধীনতার পরপর এ চেতনা বাস্তবায়নের যে সুযোগ এসেছিল, সেটি বাংলাদেশ উত্তরকালে আর কখনো দেখা যায়নি।
ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে প্রফেসর আনিসুর রহমানের কাছে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব আসে সারা দেশের তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি ‘গ্রাম কর্মী বাহিনী’ গঠন করার। এ কর্মী বাহিনীর সদস্যরা সারা দেশে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে এবং গ্রাম উন্নয়নে তাদের সেবা দেবে। প্রফেসর আনিসুর রহমান প্রস্তাবটি কিছুটা সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীনের কাছে দেন। তাজউদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী অথবা ক্যাবিনেট থেকে এ প্রস্তাবটি আর ফেরত আসেনি। এতে প্রফেসর আনিসুর রহমান তার বয়ানে হতাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। এ প্রস্তাব নিয়ে তার উপলব্ধি সম্পর্কে তার বক্তব্য হলো, একই সঙ্গে তাজউদ্দীন যে তার হাইকমান্ডের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই নন, এ আশ্চর্য সত্যের ইঙ্গিতটাও স্পষ্ট হয়ে আসে।
প্রফেসর আনিসুর রহমানের উপলব্ধি ছিল, উপরের রাজনৈতিক মহল যেন মুক্তিযুদ্ধকে শুধু দেশ স্বাধীন করার জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধ হিসেবেই দেখেছে, কিন্তু এ যুদ্ধের প্রক্রিয়ায় দেশে যে নতুন চেতনা, অনুপ্রেরণা, উদ্যম ও শক্তি জন্ম নিয়েছে, তাকে অস্বীকার করেই দেশ গড়ার (?) কথা চিন্তা করা হচ্ছে। প্রফেসর আনিসুর রহমান কৃচ্ছ্রসাধনের প্রস্তাব-২ দিয়েছিলেন। প্রথম প্রস্তাবের পর এক মাস অপেক্ষা করে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। মন্ত্রী মহলেও এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে শোনেননি। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন— ‘তেমনি ছিল আমার পদমর্যাদা ও ক্ষমতা।’
একটি আধা ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্ততান্ত্রিক সমাজে উৎপাদিকা শক্তিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো ভূমি সংস্কার। ১৯ আগস্ট ১৯৭২ প্রয়োজনীয় আলোচনা-পর্যালোচনা করে ভূমি সংস্কারের একটি খসড়া প্রস্তাব ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান প্রফেসর আনিসুর রহমান। এর ফলাফল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, শুনেছিলাম ক্যাবিনেটে ক্যামেরায় ভূমি সংস্কারের এ প্রস্তাবটি আলোচনা ও বাতিল হয়। এও শুনেছিলাম যে তাজউদ্দীন এই প্রস্তাবের পক্ষে প্রবল সুপারিশ করেন, তাও পরে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এসে এক বন্ধুর কাছে ‘ভূমি সংস্কার হলো না’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
শিল্প জাতীয়করণের পর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ছিল, ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগে প্রাথমিক স্থায়ী সম্পদমূল্য ২৫ লাখ টাকার বেশি হবে না। তবে এসব শিল্পে যে মুনাফা হবে তা পুনর্বিনিয়োগের স্বার্থে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত হতে পারবে। ১৯৭৪ সালের জুলাইয়ে এ বিধিনিষেধ সংশোধন করে বিনিয়োগের সিলিং ৩ কোটি টাকায় বর্ধিত করা হয়। সরকারকে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল পুঁজির বিকাশের ধারার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। কারণ ততদিনে বৈধ ও অবৈধ নানা উপায়ে একটি শ্রেণী গড়ে উঠেছিল, যাদের হাতে অঢেল অর্থ পুঞ্জীভূত হয়। পুঁজি বিনিয়োগের সিলিং ঊর্ধ্বমুখী সংশোধনের সময় পরিকল্পনা কমিশনের অন্যতম সদস্য প্রফেসর রেহমান সোবহান বিদেশ সফরে ছিলেন। সফর থেকে ফিরে ঢাকা বিমানবন্দরে তিনি সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা শুনতে পান। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে সরকার কোনো আলাপ করেনি। আমাকে প্রফেসর রেহমান সোবহান এ ব্যাপারে তার উষ্মার কথা জানিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত কথোপকথনে।
বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশন গঠন, কর্মকাণ্ড এবং তার ইতিবৃত্ত নিয়ে আজ পর্যন্ত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচিত হয়নি। এটি পিএইচডি গবেষণারও বিষয় হতে পারে। এ রকম গবেষণা হলে আমরা জানতে পারতাম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্ষমতার বিভিন্ন লবি ও কেন্দ্র কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। আমরা আরো জানতে পারতাম রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনোভঙ্গি পরিকল্পনা কমিশনের মতো একটি সংস্থার দর্শনের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে। আমরা আমাদের এ সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, শুরু থেকেই প্রথম পরিকল্পনা কমিশন আমলাতন্ত্র বনাম বিশেষজ্ঞদের দ্বন্দ্বে ভঙ্গুরতার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কমিশন সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকেও আন্তরিক সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশনের অতি হাই প্রোফাইল যাত্রা শেষ পর্যন্ত আশা ভঙ্গ ও হতাশায় পর্যবসিত হয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশনের মূল কর্ণধাররা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহল থেকে বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। বলা যায়, পুরো কাহিনীটি ছিল সমাজতন্ত্র নির্মাণের একটি ব্যর্থ প্রয়াস এবং এর করুণ পরিণতি। দেশের সেরা অর্থনীতিবিদরাও এ পরিণতি ঠেকাতে পারেননি, যা কিছু ঘটেছিল তার সবটাই ছিল এ দেশের শ্রেণী বিকাশের ডিনামিক্সের ফল। তাই আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি পাকিস্তানের ২২ পরিবারের স্থলে ২২ হাজার কোটিপতি পরিবারের উত্পত্তি। ইতিহাসের এ পরিণতি অনিবার্য ছিল কিনা, তার বিচারের জন্য হয়তো কেউ কোনো একদিন একটি সুবিশাল অনুসন্ধানভিত্তিক ও বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ রচনা করবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক






