জন্মের সময় পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য অনুকূল ছিল, তা বলা যায় না। ওই সময় দেশটি ছিল কৃষিনির্ভর ও গ্রামীণ এবং প্রধান ফসল ছিল ধান, যা প্লাবনভূমিতে বৃষ্টিপাত-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির মধ্যে চাষ হতো। আর ছিল পাট, যা থেকে সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আসত। যেটা ঘটল তা হলো, বন্যা ও ধারাবাহিকভাবে খারাপ ধান উৎপাদন, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দুর্বল প্রশাসন, শূন্য অর্থ ভাণ্ডার এবং বেহাল অবকাঠামো— এ সবকিছু মিলে সূচনা হয় ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের। এটি শুধু লাখো মানুষের প্রাণই নেয়নি, একই সঙ্গে বাংলাদেশকে একটি দরিদ্র, দুর্ভিক্ষ ও সংকটপ্রবণ দেশ হিসেবে বিশ্বে উপস্থাপন করেছিল, যে দেশকে একটা লম্বা সময় বিদেশী সহায়তার ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভর করতে হবে।

অবকাঠামো পরিস্থিতি দিয়ে শুরু করা যাক। বহু সেতু ভেঙে গেছে, রাস্তাঘাটের অবস্থা মোটেও ভালো না; এমনকি দেশের দুই নৌবন্দর নিজের সক্ষমতার অনেক নিচে কাজ করছিল। এদিকে এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের প্রয়োজন ছিল। তারা ভারতের ক্যাম্পগুলো থেকে ফিরতে শুরু করেছিল, যেখানে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় আশ্রয় নিয়েছিল। এ পুনর্বাসন ছিল দেশের প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বিশাল বোঝা। নির্মাণ সামগ্রী, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, পোশাক, খাদ্য ও ওষুধ— সবকিছুর ঘাটতি ছিল প্রবল।

যেন এ সমস্যাগুলো যথেষ্ট ছিল না। শিগগিরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। এ দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা কমেছে, বেড়েছে, তবে একেবারে চলে যায়নি। এ সময়ের লক্ষণসমূহ— প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল এবং যুদ্ধের ক্ষত মুছে ফিরে দাঁড়াতে পারেনি, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রে চেইন অব কমান্ড ভঙ্গুর হয়ে উঠেছিল, যদিও জ্যেষ্ঠরা খুব জোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন আদেশ-শৃঙ্খলা ফেরাতে। সামরিক ও বেসামরিক জীবনে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে বেশ কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল।

১৯৭২-৮০ সময়টা ছিল বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কঠিন। প্রচণ্ড রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল শাসন এবং চরম বৈরী আবহাওয়ার উপস্থিতি, অন্যদিকে তীব্র বিতর্ক, বিবাদ ও সমালোচনা। এমন পরিস্থিতিতে চরমপন্থীদের সক্রিয় হতে দেখা যায়।

তবে আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ১৯৭০ ও ১৯৮০ দশকের বেশির ভাগটাই কেটেছে একনায়কতন্ত্রের অধীনে, তথাপি রাষ্ট্রের আচরণ ছিল কিছুটা সংযত এবং সাধারণত বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও মিডিয়ার কঠোর সমালোচনার মুখেও ছিল অবিচলিত।

আরেকভাবে বলা যেতে পারে কথাটা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিন্নমত ও সমালোচনা দমন করার মতো শক্তি ছিল না। স্বাধীনতা যুদ্ধের সাম্প্রতিকতম অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধও এখানে কাজ করেছে। আমরা যুদ্ধ করেছি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদার সমাজ ব্যবস্থার জন্য এবং সাময়িকভাবে এগুলো স্থগিত থাকলেও এ লক্ষ্যগুলো অর্জনে সাধারণ মানুষ উৎসাহ দিয়েছিল, আগ্রহ ছিল এবং এগুলোর অনুপস্থিতি কেউ মেনে নেয়নি।

১৯৮০ দশকও ছিল গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় আরএমজি খাতের গোড়াপত্তন হয়। নতুন ওষুধনীতি গ্রহণ করা হয়, যা বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প খাতের দ্রুত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ছিল। এবং সর্বশেষ বাংলাদেশের দরিদ্র ও কম দক্ষতার শ্রমশক্তি নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্যে।

এ সময় আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে, তা হলো— বাংলাদেশে উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরির চেষ্টা, যা ব্যাংকঋণের মাধ্যমে প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহে উৎসাহ দিয়েছে। এ নীতির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে রাজনীতিবিদ, সেনাবাহিনী, আমলা ও দাতাগোষ্ঠী।

এ উদ্যোক্তা শ্রেণীকে ‘স্বাধীন’ বলা যায় কিনা, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। তবে উল্লেখযোগ্য যে এর উত্থান এজেন্সি, কমিশন কিংবা বিদেশী ব্যবসায়ীদের হয়ে মিডল-ম্যানের কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল না। এটি মূলত দেশীয় প্রপঞ্চ বা ফেনোমেনন হিসেবেই দেখতে হবে।

এখানেই কাহিনী শেষ নয়। কমপক্ষে আরো তিনটি স্মরণীয় মাইলফলকের গোড়াপত্তন হয় এ সময়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোফিন্যান্স ব্যবস্থা। এর নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ব্যাপক থাকলেও এটি বিতর্কের বাইরে নয়।

গ্রামীণ, আশা ও প্রশিকার সঙ্গে ব্র্যাক, আরডিআরএসের মতো নেতৃত্বদানকারীর মাধ্যমে স্থানীয় এনজিওর অসাধারণ উত্থান প্রায় সমান উল্লেখযোগ্য। এ অগ্রদূতরা, বিশেষ করে ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংক গবেষণা করেছে এবং তৈরি করেছে তৃণমূল উন্নয়ন মডেলসমূহ, যেগুলো পর্যায়ক্রমে গ্রামের উন্নয়ন হস্তক্ষেপের প্রকৃতি ও গঠনের গতি, ভঙ্গি ও এমনকি বিষয়বস্তুও ঠিক করে দিয়েছে, যা সার্বিকভাবে এনজিওগুলো, এমনকি সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডও (বিআরডিবি) গ্রহণ করেছিল।

দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কৌশল। এটি ছিল দারুণ সফল। ১৯৮০-এর মধ্যেই জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতির অবকাঠামো তৈরি হয়ে যায়। এ নীতির সাফল্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে আমাদের আর্থসামাজিক জীবনে।

তৃতীয় ফ্যাক্টর, যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরও বলা যেতে পারে, তা হলো কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের সূচনা। ১৯৯০ দশকের মধ্যে সবুজ বিপ্লবের চ্যালেঞ্জগুলোর বেশির ভাগই সমাধান হয়ে গিয়েছিল, ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করেছিল চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার।

অন্য ভাষায়, ১৯৭১ সাল-পরবর্তী সবচেয়ে বিক্ষুব্ধ দুই দশকে অনেক অস্থিতিশীলতা ও বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও বড় পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। অথবা সেগুলোর মূল গোড়পত্তন তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

এ সবকিছুই ঘটছিল মারাত্মক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে, বিশেষ করে ১৯৭০ দশকে এবং ১৯৮০ দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময়কালে। 

এজন্য পরবর্তী সফলতার সূত্রসমূহ, যেগুলো পরে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ কেড়েছিল, সেগুলো এ অস্থির অথচ খুব আর্কষণীয় সময়ে তৈরি হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে কিছু ইতিবাচক নির্দেশক দৃশ্যমান হতে দেখা যাচ্ছিল। বিশ্বব্যাংক এ উন্নতিকে বলেছিল ‘উৎসাহদায়ক’। তবে সংস্থাটি এ-ও জানিয়েছিল যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাত যথা পরিবার পরিকল্পনা ও কৃষি খাতে উন্নতি ‘এখনো স্বস্তির তুলনায় বেশ দূরে রয়েছে’ (বিশ্বব্যাংক ১৯৮০)। এছাড়া জিডিপিতে কৃষির অবদান হ্রাস এবং ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতের অংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে কাঠামোগত পরিবর্তনের কিছু প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।

তবে মৌলিক আর্থসামাজিক নির্দেশকসমূহ আশাবাদী ছিল। জনসংখ্যা বাড়ছিল বছরে ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জনসংখ্যা ৮ কোটি ৯১ লাখে পৌঁছে যায়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাক্ষরতার হার ছিল ২২ শতাংশের কাছাকাছি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিবন্ধন ৭৩ শতাংশ। স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সরকারের রাজস্ব বেড়েছিল, তবে তখনো ছিল বেশ ছোট এবং ১৯৮০ সালে বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ ছিল, তা তিন মাসের কম সময়ের আমদানির জন্য যথেষ্ট ছিল, যা আমদানি ও বাজেটের জন্য বিদেশী অর্থায়নের ওপর গুরুতর নির্ভরতাকে সামনে নিয়ে আসে।

১৯৬৬-৬৭ থেকে ১৯৭৩-৭৪ সময়ে গ্রামীণ দারিদ্র্য প্রায় একই রকম অবস্থানে ছিল, অতি উচ্চ (৮৩ শতাংশ); যখন শহুরে দারিদ্র্য প্রকৃতভাবে ৭৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮১ শতাংশ (বিশ্বব্যাংক ১৯৮০)। চরম দারিদ্র্য শহর ও গ্রাম উভয় জায়গায় বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৭৬-৭৭ সালের দারিদ্র্য হিসাব বলছে দরিদ্র পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে- এ পরিস্থিতি দশকের বেশির ভাগ সময়ই খারাপের দিকে ছিল।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরে নীতিনির্ধারকরা প্রতিজ্ঞা করলেন ‘খাদ্য সমস্যা’ সমাধান করতে এবং খাদ্য উৎপাদনে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ হয়ে উঠতে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত এটি অর্জন করা যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আরেকটি দুর্ভিক্ষ যেন না হয় এটা নিশ্চিত করা। ১৯৭৪ সালের প্রভাব আজো নীতিনির্ধারকদের বিবৃতিতে বারবার ধারণ করে এবং চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে তারা এখনো যে চরম স্পর্শকাতর, তাও বোঝা যায়।

এজন্য খাদ্য অর্থনীতি সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলেছিল- দাম, মূল্যস্ফীতি, আমদানি, ব্যালান্স অব পেমেন্ট ও সরকারের বাজেটে; একই সঙ্গে পারিবারিক ভোগ, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সঞ্চয়বিষয়ক সিদ্ধান্তে। অন্য ভাষায়, একটি স্থিতিশীল খাদ্য অর্থনীতি ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতির চাবিকাঠি।

জনসংখ্যা ও পরিবার পরিকল্পনা

১৯৭৯ সালে জন্মহার ছিল আনুমানিক ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ অবস্থান থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ভীতিকর দেখায়। সীমিত চাষযোগ্য জমি এবং তা ক্রমেই নিঃশেষিত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এটি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। দাতাদের ব্যাপক সহযোগিতা পেয়ে ১৯৭০ দশকের মধ্য থেকে জনসংখ্যা সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে সরকার। এজন্য ১৯৭৫-৮০  সময়ে এ খাতে আর্থিক সহায়তা বেড়েছে ৮ গুণ। এই সময়ে এ প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে সক্ষম এমন একটি সম্প্রসারিত সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয় (বিশ্বব্যাংক ১৯৮২)। সেবা সরবরাহ সিস্টেমের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটে, যার মধ্যে রয়েছে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ), যখন এমসিএইচ-এফপি (মা-শিশু স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা) ইউনিটগুলো সব থানায় শহরে ও গ্রামে কাজ করছিল, কর্মী দিয়েছিল ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর।

ইউনিয়ন পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ছিল পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৯৮০ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৩৫০টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় দুই হাজারটিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর সঙ্গে ১৯৮২ সালের মধ্যে ২৫ হাজার প্রশিক্ষিত ‘প্রথাগত জন্মদান সহায়তাকারী বা ধাত্রী’ নিয়োগ দেয়া হয়, প্রতি গ্রামে একটি করে। এ অবকাঠামোর সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সহজেই স্থানীয় পর্যায়ে একীভূত হয়ে গিয়েছিল। নন-ক্লিনিক্যাল পরিবার পরিকল্পনা সেবা কার্যক্রমে ভালো সক্ষমতা দেখিয়েছিল। ক্লিনিক্যাল গর্ভনিরোধক সেবাও বিস্তৃতি পায়। এই দশকের শেষে স্টেরলাইজেশন দেয়া হচ্ছিল ২০০টি টিএসইসি, ৯৩ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, সব সাব-ডিভিশনাল, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্য সেক্টরের ৮৪টি ক্লিনিক ও হাসপাতালে। মোবাইল ইউনিট পরিচালনা করা হচ্ছিল ২০টি জেলায়, যখন আইইউডি সব ইউনিয়ন পর্যায়ের কেন্দ্রগুলোয় ছিল। গর্ভনিরোধক ডিভাইসের বিতরণে জন্য বিস্তর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, যা সম্পূর্ণ করেছিল বেসরকারি খাতের একটি বাণিজ্যিক বিতরণ সিস্টেম (সোস্যাল মার্কেটিং প্রজেক্ট), যার শহরে ও গ্রামে ৭০ হাজার আউটলেট ছিল। স্টাফদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়ল: নারী প্যারামেডিকের সংখ্যা ১৯৭৬-৮১ সময়ে ৯০ হাজারের জন্য ১ জন থেকে বেড়ে হয় ৩০ হাজারের জন্য একজন। স্টাফদের সক্ষমতা প্রশিক্ষণ ছাড়াও গণপ্রচারণা চালু করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল সচেতনতা তৈরি এবং ছোট পরিবারের অনুকূলে আচরণগত পরিবর্তন। ১৯৭৯ সালের বাংলাদেশ কন্ট্রাসেপটিভ প্রিভেলেন্স সার্ভে (বিসিপিএস) বলছে যে, প্রায় সব নারীর মধ্যে গর্ভনিরোধ ও প্রাসঙ্গিক পদ্ধতি নিয়ে মৌলিক সচেতনতা রয়েছে (বিশ্বব্যাংক ১৯৮)। তবে এমন অগ্রগতি সত্ত্বেও গর্ভনিরোধক প্রবণতা কম ছিল, যদিও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এ অর্জন ১৯৮১ সালের জন্য সরকারের বিভিন্ন লক্ষ্য পূরণের তুলনায় কম ছিল যেমন স্ট্রেরলাইজেশন (৬২ শতাংশ), আইইউডি (৪৩ শতাংশ), কনডম (৭০ শতাংশ), ওরাল পিল (৪০ শতাংশ) এবং অন্যান্য পদ্ধতি (৭৩ শতাংশ)। এসব কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া হয়, বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য (এমসিএইচ) ও পরিবার পরিকল্পনা (এফপি)।

এমসিএইচ ও এফপির জন্য তিনটি সহজ সমাধান নিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাংলাদেশ— ১) ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি, ২) গর্ভবতী নারীদের জন্য টিটেনাস টক্সুয়েড টিকা ও ৩) ধাত্রীদের সহজ ও নিরাপদ ডেলিভারি পদ্ধতি প্রশিক্ষণ। এসব উদ্যোগ তিনটি ভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে চালু করা হয়।

সত্তরের দশকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশ এক অন্ধকার সময়ে প্রবেশ করে এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষমতা দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী চেষ্টা শুরু হয়। ওই ঘটনার পর ক্ষমতা কয়েক দফা হাতবদল হয়। ঘটনার পরিক্রমায় ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের পদ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮১ সালে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য দ্বারা নিহত হন, যা আরেক জেনারেল এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা দখলের পথ করে দেয়। জেনারেল এরশাদ ছিলেন পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরা সেনা কর্মকর্তা এবং তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না।

তবে এ ধরনের অস্থিরতার মধ্যেও জিয়ার আমলে কিছুটা সময় স্থিতিশীলতা ছিল বিশেষ করে ১৯৭৯-৮১ সাল, যখন অর্থনীতি উচ্চতর সহায়তার প্রবাহে সাড়া দিতে শুরু করে।

এ সময়টা ছিল সামাজিক পরীক্ষা ও সরকারবহির্ভূত উদ্যোগের, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যেও নিবেদিত ব্যক্তিরা এগিয়ে আসেন, দাতাদের সহযোগিতার অর্থে তারা তৃণমূল পর্যায়ে পুনরুদ্ধার, পুর্নগঠন ও উদ্ভাবনী উন্নয়নের কাজ শুরু করেন। আশা করা হয়েছিল, এ প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়া দারিদ্র্য, ক্ষুধা, ভগ্ন স্বাস্থ্য, নিরক্ষরতা ও বৈষম্য হ্রাস করা যাবে। এসব সামাজিক উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূস, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে আবেদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও প্রশিকার উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের এনজিওগুলো দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে এবং এগুলো বেশির ভাগেরই যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৭০ দশকে।

জিয়া মারা গেলেও তার নীতি বহন করার জন্য রেখে গেছেন একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি কম-ধর্মনিরপেক্ষ, ভারতবিরোধী (এজন্য পাকিস্তানপন্থী) এবং প্রো-ইসলামিক। জিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করা রাজনীতিবিদদের পুনর্বাসন, মূলধারার রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামী দলকে পুনরায় প্রবেশের সুযোগ করে দেয়া। স্বাধীনতার প্রায় পরপরই এমন নীতি পরিবর্তন এবং রাজনীতিতে এর স্থায়ী রূপ, বাংলাদেশের প্রগতিশীল সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ এবং একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, যেটি আমাদের শুধু রাজনৈতিক জীবনে নয় বরং অর্থনৈতিক ভাগ্যেও কালো ছায়া ফেলে রেখেছে।

এ নিবন্ধে এটি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, প্রথম দশকগুলোয় দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, আমাদের উন্নয়নের পেছনে যার ছিল সুদূরপ্রসারী প্রভাব। অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা এবং সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এসব ঘটেছিল, যা দেখিয়ে দিয়েছে— বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য। ব্যবসা-বাণিজ্য ও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের ছিল। তাই যখন আরো একবার আমরা টেক্সটাইল ও পোশাক, শিপিং, ট্রেডিং ও শিল্প উৎপাদনে ফিরে আসি, তখন এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতপক্ষে গত এক হাজার বছরকে ঐতিহাসিক মধ্যবর্তী বিরতি বলা যেতে পারে, যখন আমরা আমাদের মূল নিয়তির দিকে ধাবিত হওয়ার বদলে কৃষিকাজে আটকে ছিলাম। সবসময় বিদেশীরা আমাদের শোষণ করেছে, আমাদের সম্পদ ও উদ্বৃত্ত ছিনিয়ে নিয়েছে। কোনো কোনো বিদেশী অন্যদের তুলনায় বেশি নির্মমভাবে এ কাজ করেছিল। বিপদের সময় এ শাসকরা আমাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ মূলত তাদের সহযোগিতা করত ভাড়াটে সৈনিক; যারা ছিল মানুষের কাছ থেকে মানসিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, স্থানীয় অর্থনীতিতে এদের কোনো অংশ ছিল না। এভাবে দীর্ঘ সময় পর প্রথমবারের মতো আমাদের ভাগ্যের দায়িত্ব আমাদের হাতে এসেছে। শোষণ ও দুর্নীতি থাকলেও যার কিছু বিস্তৃতি লাভ করেছে, ঔপনিবেশিক সময়ে আমরা যে বঞ্চনার শিকার হয়েছি, তার তুলনায় এগুলো সম্ভবত তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। আমাদের ‘রবার ব্যারন (শিল্পপতি)’রা এখন স্বদেশী, সার্বিকভাবে এরা দেশেই বিনিয়োগ ও পুনর্বিনিয়োগ করছে। আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলো দেশীয় এবং এজন্য পাকিস্তান কিংবা মোগল আমলের তুলনায় আমাদের স্বার্থরক্ষায় তারা অনেক বেশি তত্পর।

[ইংরেজি থেকে ভাষান্তর সাঈদ সরকার]

 

লেখক: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক