খাদ্য সহায়তার ওপর অধিক নির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে বিশেষভাবে রাজনৈতিক চাপের কাছে নাজুক করেছে, যা মূলত হয়েছে দাতাদের কর্তৃক খাদ্য একটি রাজনৈতিক অবরোধের ধরন হিসেবে ব্যবহার হওয়ার মাধ্যমে। খাদ্য সহায়তা বন্ধ কিংবা কমানোর যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দাতাদের হুমকি বাংলাদেশকে খাদ্যের সরকারি বণ্টন, বিনিময় হার এবং কৃষি খাতে ভর্তুকি দেয়া সম্পর্কিত নীতিগুলো পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। এসব চাপ অবশ্য অর্থনৈতিক সুনির্দিষ্ট কিছু ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত এবং সেগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কেবল পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছে। তবে ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রাজনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে খাদ্য সহায়তাকে প্রত্যক্ষ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যথেষ্ট প্রমাণ ছিল। বাংলাদেশে বৈদেশিক সম্পর্ক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যকার পারস্পরিক যোগসূত্র বুঝতে খাদ্য রাজনীতির প্রকৃতি ও প্রায়োগিকতার প্রতিফলন পর্যালোচনা করা জরুরি।
খাদ্যের রাজনীতি
মনে করা যেতে পারে, ১৯৭৩ সালের নভেম্বরের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (সিনাই যুদ্ধ নামে সমধিক পরিচিত) এবং তেলের দাম বৃদ্ধির পর পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলো ঊর্ধ্বমুখী তেলের দামের প্রবণতা বদলাতে একটি প্রধান আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা শুরু করে। কিছু সুনির্দিষ্ট বিবেচনার ভিত্তিতে ১৯৭৪ সালে তেলের দাম কমাতে ওপেককে বশে আনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মার্কিন খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার বিষয়টিকে ব্যবহার করে। এ নীতি খোদ প্রতিফলিত হয়েছে মার্কিন নীতিনির্ধারক ও স্বল্পোন্নত সহায়তা গ্রহণকারীদের দ্বিপক্ষীয় খুব কম প্রচারিত চুক্তির মাধ্যমে। তবে সেটি জনসমক্ষে আসে সিনেটর হুবার্ট হাম্ফরে কর্তৃক ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে দেয়া এক চিঠির মারফতে। ওই চিঠির বক্তব্য হলো, ‘প্রশাসনের ভেতরে বারবারই উদ্ধৃত করা হয়েছে, তেলের দাম কমানোর জন্য চাপ সর্বোচ্চকরণে তেলের দাম বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব হাইলাইট এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর ওপর চাপ দেয়ায় উৎসাহিতকরণে এটি একটি কৌশল। যদিও উন্নত দেশগুলোর গৃহীত পদক্ষেপে সৃষ্ট তাদের বিচ্যুতি (ডিসলোকেশন) সহজীকরণ করা উদ্দেশ্য নয়।’
এখানে বিচ্যুতি সম্ভবত খাদ্য সংগ্রহ (ফুড প্রকিউরমেন্ট) এবং তেলের দাম বৃদ্ধিজনিত ব্যালেন্স অব পেমেন্টস সমস্যা সম্পর্কিত বিচ্যুতি। এ ক্ষমতা খেলার পেছনের রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্প্রসারণ আমাদের উদ্দেশ্য নয়; কিন্তু এর সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কিছুটা যোগসূত্র স্থাপনই উদ্দেশ্য।
পশ্চিমা দাতাদের উদ্দেশ্য খোদ বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে এবং সেটি হয়েছে বাংলাদেশের মতো নন-অয়েল এক্সপোর্টিং কান্ট্রি এবং ওপেক মেম্বারদের মধ্যে স্বার্থের বিরোধ ঘোষণার পশ্চিমা সরকারগুলোর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। ব্যাংক বা ফান্ড গ্রুপ এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তৈরিকৃত দলিলে সামনে আনা হয়েছিল, বাংলাদেশও তেলের দাম বৃদ্ধির ভুক্তভোগী এবং দাম কমাতে ওপেকের ওপর চাপ সৃষ্টিতে তাদের পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যোগ দেয়া উচিত। একই সঙ্গে সহায়তা নির্ভরতা বৃদ্ধির পরিণামগত ব্যয়ের অংশটি ওপেক দেশগুলোকে বোঝাতেও পদক্ষেপ নেয়া উচিত মনে করেছিল বাংলাদেশ।
এসব পরামর্শ ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বয়ানে তখন থেকে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে ছাড়কৃত ঋণের প্রবাহ বাড়ানো এবং এমনকি ডেফার্ড পেমেন্টে তেল বেচতে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোকে রাজি করাতে বাংলাদেশ খুব সক্রিয়ভাবে তদবিরও করেছিল। তবে আন্তর্জাতিক ফোরামে একটি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সন্ধানের প্রশ্নে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টাও ছিল বাংলাদেশের এবং কেবল তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিদ্যমান বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট বজায় থাকুক, সেটি কোনোভাবেই চায়নি। অতএব বাংলাদেশ তেলের চেয়ে খাদ্যশস্যের দাম বৃদ্ধিতে বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। তথ্যে দেখা যায়, দাম বৃদ্ধির পরবর্তী চার বছরে খাদ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশকে বাড়তি ২২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে, যেখানে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাড়তি ব্যয় হয়েছে ৮৪ মিলিয়ন ডলার। তবে প্রধান পার্থক্য এতে নিহিত, খাদ্য আমদানির বেশির ভাগই সহায়তার আওতায় পাওয়া গেছে, যেখানে তেল কেনা হয়েছে নগদে কিংবা বড়জোর খুব স্বল্পমেয়াদি ঋণে। অবশ্য ৪৮ শতাংশ আমদানিকৃত খাদ্য সহায়তার আওতায় পাওয়া সত্ত্বেও প্রথম চার বছরে খাদ্য বাবদ বাংলাদেশের খরচ হয়েছে মোট ৪৮৮ মিলিয়ন ডলার, যেখানে তেল বাবদ মোট ব্যয় হয়েছে ৩৮৮ মিলিয়ন ডলার। উদার সহায়তা প্রবাহ সত্ত্বেও বিশ্বে খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের কোষাগারে প্রত্যক্ষ চাপ অনুভূত হয়েছে।
অধিকন্তু খাদ্য বাদেও অধিকাংশ আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির সমস্যায়ও পড়েছিল বাংলাদেশ। যদিও তেলের দাম লক্ষণীয়ভাবে বাড়লেও সেটি বাড়ন্ত আমদানি ব্যয়ে কেবল আংশিকভাবে ভূমিকা রেখেছে। আমরা যদি ১৯৭২-৭৩ এবং ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরের হিসাব তুলনা করি তাহলে দেখব, তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয়ে বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্র ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে সার্বিক আমদানি দাম সূচক ১৯৭২-৭৩ সালে ১০০ থেকে ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে ২১৫ বেড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ খাদ্য ও অন্য ভোগ্যপণ্য রফতানিকারকদের চেয়ে তেল রফতানিকারকদের পরামর্শ দ্বারা কম চালিত হয়েছে।
ওপেক থেকে তৃতীয় বিশ্বের তেল দামের ভুক্তভোগীদের ভাগ করার পশ্চিমা কৌশলে বাংলাদেশ নিজে যুক্ত হওয়ার অনাগ্রহের বিদ্যমানতায় যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য রাজনীতির অদ্ভুত ক্ষমতা ব্যবহারের নাটকীয় প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছে। এটা মনে হয় এ শিক্ষা দেয়ার জন্য যে, বাংলাদেশের মতো খাদ্য নির্ভরশীল দেশের ভবিষ্যৎ ভাগ্য পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনই নিহিত; ওপেকের সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের সংহতি প্রকাশের আগ্রহের মধ্যে নয়।
প্রাকৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বহিঃস্থ ফ্যাক্টরগুলো থেকে উত্থিত সমস্যার সুযোগ পেয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। যেসব ফ্যাক্টর বাংলাদেশকে ১৯৭৪ সালে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে দেয়। ঘটনা ও রাজনীতির ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশে ঘটা মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের অভিঘাত বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই নির্ভরতার রাজনৈতিক অর্থনীতির বয়ানটি ধরতে হবে।
বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি এবং অনুবর্তী বহির্দেশীয় নির্ভরতা গত দুই দশকে বেড়ে চলেছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, খাদ্যের মোট ভোগে আমদানির অংশ চূড়ান্ত ও আপেক্ষিক উভয় অর্থেই বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরিণাম এবং কয়েক বছর ফসল বিপর্যয় বহির্দেশীয় নির্ভরতা বাড়িয়েছে আমাদের। ১৯৭১ সালের আমন থেকে শুরু করে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত আউশসহ পরপর ছয় মৌসুমে ফসল বিপর্যয়ের কারণে ১৯৭০-৭৩ সালে আউটপুট ও অভ্যন্তরীণ শস্যের মাথাপিছু প্রাপ্যতা লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পায়। মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭২ সালের বোরো চাষও ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে। মুক্তিযুদ্ধের পরে আমদানি নির্ভরতায় বড় ধরনের উলল্ফন উৎপাদন ধরনে ব্যাপকতর বিচ্যুতি এবং যুদ্ধের কারণে বাস্তুহারা বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামীণ খাতে সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি পুনরায় চালু করার সমস্যায় প্রতিফলিত হয়েছে।
এটি স্পষ্ট, আমদানি পণ্যের প্রাপ্যতায় তীক্ষ পতন জনসংখ্যার অধিকতর নাজুক অংশের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনে। ১৯৭৩ সাল থেকে তিন বছরে আমনে প্রথম ভালো ফলনের ব্যাপকতা বহির্দেশীয় নির্ভরতার সমাপ্তি ঘটাবে বলে আশা করেছিল সরকার। মনে করা হয়েছিল মজুদ বাড়াতে কৃষকরা ভালো ফলন কাজে লাগাবে, কিন্তু ক্রমাগত ছয় মৌসুমের খারাপ ফলনে তা পুরোপুরি ব্যাহত হয়। ফলে সরকারি বণ্টন ব্যবস্থা যথাযথভাবে বজায় রাখতে সরকারকে শস্য আমদানির পথে হাঁটতে হয়। কাজেই ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে সরকার ২ দশমিক ২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য আমদানির পরিকল্পনা করে। এটা ১৯৭৩ সালে সব ধরনের রেশন কেবল নামমাত্র বজায় রাখতে এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য ফসল বিপর্যয় মোকাবেলার জন্য মজুদ তৈরিতে সাহায্য করে।
১৯৭৪ সালের সংকটের এভাবে জন্ম হয়েছে সরকারের নিজের আমদানি কর্মসূচির প্রভাব বুঝতে না পারা থেকে। বিশ্ব ভোগ্যপণ্য সংকটপ্রভাবিত নিজস্ব বৈদেশিক বিনিময় সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের খাদ্য রাজনীতির প্রভাব বুঝতে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। এ প্রপঞ্চ বুঝতে আমাদের সরকারি বণ্টন ব্যবস্থা ও খাদ্য আমদানির সমস্যায় দৃষ্টি দিতে হবে।
বাংলাদেশে সরকারি বণ্টন ব্যবস্থা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশ খাদ্যশস্যের সরকারি বণ্টন ব্যবস্থা বজায় রেখে আসছে। মর্মবস্তুগতভাবে এ ব্যবস্থায় সরকার কর্তৃক আমদানি ও অভ্যন্তরীণ খাদ্য সংগ্রহ এবং সুনির্দিষ্ট দামে সরকার নির্ধারিত ডিলারদের কাছে খাদ্যশস্য বিক্রি যুক্ত। পর্যালোচনাধীন সময়ে সরকারি বণ্টনে বিবিধ টার্গেটেড ভোগ গোষ্ঠীকে শ্রেণীবদ্ধ বা কাঠামোবদ্ধ করা অব্যাহত থাকে। প্রাধিকার গোষ্ঠীকে স্ট্যাটিউটরি রেশনিং (এসআর) দ্বারা সুরক্ষা দেয়া হয়, যাতে সুনির্দিষ্ট প্রধান শহরকেন্দ্রের সব জনগোষ্ঠীকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭৩ সালের আগ পর্যন্ত এতে চার প্রধান শহর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং খুলনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী এবং ১৯৭৬ সালে রাঙ্গামাটিকে এতে যুক্ত করা হয়। ১৯৭৫-৭৬ সালে এ ছয় কেন্দ্রের জনসংখ্যা ছিল ৪-৫ মিলিয়ন, যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। এসআরভুক্ত এলাকায় বসবাসকারী প্রতিটি লোককেই একটি রেশন কার্ড দেয়া হতো, সেটি ব্যবহার করে নির্ধারিত রেশন দোকান থেকে সুনির্দিষ্ট দামে সপ্তাহে একবার খাদ্যশস্য ও ভোজ্যতেল কিনতে পারত। এসআর এলাকায় রেশন কার্ড গ্রহীতাদের সরকারি বাধ্যবাধকতা ছাড়াও নির্ধারিত প্রাধিকার গোষ্ঠীকে রেশন সরবরাহ করতে সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় আরো কিছু নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। সেখানে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, সরকারি হাসপাতাল, জেলখানা এবং ছাত্রাবাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখানে ব্যক্তিগত কার্ড ইস্যু করা হয় না, তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা খাদ্য মন্ত্রণালয়ে মাসিক একটি দাবিনামা পেশ করে। এসআর-বহির্ভূত এলাকায় সব পর্যায়ের সরকারি কর্মচারী, স্কুল শিক্ষক ও রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কর্মীদের পূর্ণ রেশন কোটা দেয়া হয়। বৃহৎ নিয়োগকারী সেসবের সঙ্গে ৫০ কিংবা প্রতিজন কর্মীর জন্য অর্ধেক এসআর কোটা পায়। সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় এসব প্রাধিকার গোষ্ঠীর অংশ সবচেয়ে অলঙ্ঘনীয় হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এসআর এলাকায় রেশন কার্ডধারী এবং প্রাধিকার গোষ্ঠীর বাইরে সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় স্থিরকৃত বাধ্যবাধকতা অনেক বেশি নমনীয়। এ ব্যবস্থায় এখানে মডিফায়েড রেশনিং (এমআর) প্রবর্তন করা হয়, যেখানে এসআর এলাকার বাইরে সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরির শহর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাস্তবে প্রতিটি এমআর এলাকায় জনসংখ্যার দরিদ্র অংশের মধ্যে নির্দিষ্ট দামে খাদ্যশস্য সরবরাহ করতে পারে। প্রতিটি এলাকায় জনসংখ্যাকে ক, খ, গ ও ঘ শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা হয়। প্রতিটি শ্রেণী একজন ব্যক্তি কর্তৃক প্রদেয় করের ভিত্তিতে ক্যাটাগরাইজড করা হয়, যেটি ব্যক্তির পরিবারের আয়সীমার জন্য প্রক্সি হিসেবে নেয়া হয়। শ্রেণী ‘ক’ হচ্ছে সবচেয়ে দরিদ্রতম; এ গ্রুপের ব্যক্তিরা এতই দরিদ্র যে, প্রকৃতপক্ষে কর দিতে পারে না। এমআরের অধীন কোটা এসআরের মতোই; তবে সেটি মাসে কেবল দুবার সরবরাহ করা হয়। কাজেই এমআর কার্যত এসআর কোটার অর্ধেক। সরবরাহ নিশ্চিত করা হয় ‘প্রাপ্যতার ভিত্তিতে’। বাস্তবে যার অর্থ সেটি করা হয় তখনই, যখন এসআর কার্ডধারী ও প্রাধিকার গোষ্ঠী ওই শর্তগুলো পূরণ করতে পারে। তত্ত্বগতভাবে সরবরাহ ঘাটতি থাকলে এমআর ব্যবস্থায় প্রাধিকার দেয়া হয় সবচেয়ে দরিদ্র গোষ্ঠীকে। এমআর ব্যবস্থা (যেটি এখনো বিপণনকৃত খাদ্যশস্য বণ্টনে রয়ে গেছে) বাদে ত্রাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ব্যবস্থায় বন্যা, দুর্ভিক্ষ কিংবা গৃহযুদ্ধের (যেমনটা ১৯৭২) মতো জরুরি মুহূর্তে খাদ্যশস্য নিঃস্বদের মাঝে বিনা পয়সায় বিতরণ করা হয়। সেক্ষেত্রে বণ্টনে দায়িত্ব পালন করে ত্রাণ মন্ত্রণালয়; খাদ্য মন্ত্রণালয় নয়। এ ক্যাটাগরির অধীনে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের পূর্ত কাজের অর্থায়ন নিশ্চিতে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (ফুড ফর ওয়ার্ক) পরিচালনার উদ্দেশ্যেও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা সৃষ্টি করা হয়।
তথ্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে সরকারি বণ্টন ব্যবস্থার কাঠামো ও প্রবণতা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তখনকার বণ্টন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ১৯৭২-৭৩ সালে এমআরের মাধ্যমে দেয়া। একই সঙ্গে এসআর-বহির্ভূত এলাকার বাইরেও জনগণের কাছে প্রায় ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য ত্রাণ হিসেবে বণ্টন করা হয়েছিল। সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় এমআরের গুরুত্ব বৃদ্ধির মানে হলো জনসাধারণের একটি বড়সংখ্যক মানুষ নিজেদের মৌলিক ভোগ চাহিদা মেটাতে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হচ্ছিল। কেউ যদি অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য ফলনের প্রায় ২৫ শতাংশ বিপণন হওয়া হিসাব করে; তবে বলতে হয় ১৯৭২-৭৩ সালে এমআর ব্যবস্থা একাই ৩৭ শতাংশ খাদ্যশস্য বিপণন করেছিল। যেখানে সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় হিসাব করা হয়েছিল বাজারের ৫৪ শতাংশ খাদ্যশস্য।
বণ্টনের রাজনৈতিক অর্থনীতি
সব অবস্থায় জনসংখ্যার নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির অংশের জন্য খাদ্য জোগানোর বিধিবদ্ধ অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে সমতার চেয়ে রাজনৈতিক উপযোগিতার বিবেচনা দ্বারা চালিত হয়। সরকারি কর্মচারীরা জনসংখ্যার সংবেদনশীল অনুঘটক। বিশেষ করে দাম বৃদ্ধির সময়ে সরকার এ ধরনের নির্দিষ্ট আয়ের কর্মীদের জন্য স্থিতিশীল দামে মজুরি পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতে ব্যাপকভাবে সচেতন থাকে। বাস্তবে রেশন এসব ক্যাটাগরির জনগোষ্ঠীর প্রকৃত মজুরি হ্রাস পাওয়া প্রতিরোধ করেনি। কারণ রেশন-বহির্ভূত আইটেমগুলোর অব্যাহত দাম বৃদ্ধি ঘটেছিল। তবে আপেক্ষিক অর্থে নিজেদের কেনাকাটার জন্য বাজারের ওপর নির্ভরশীল গোষ্ঠীর চেয়ে এসব শ্রেণী তুলনামূলক সচ্ছল ছিল।
কিছু ক্ষেত্রে এ শেষ ক্যাটাগরির অনেকেই উৎপাদন, বাণিজ্য কিংবা খোরাকি অর্থনীতির অংশ হওয়ার মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি থেকে লাভবান হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে সমালোচকরা বলেছেন, ব্যবস্থাটি সমতামূলক হয়নি। যারা ধারণা করেন বিধিবদ্ধ রেশনের সব গ্রহীতাই সচ্ছল শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অংশ ছিল। নগর জনসংখ্যার অংশটি নেয়া হয় দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে, যারা কিনা জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। উল্লিখিত অংশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল নগরের দরিদ্র কর্মী, সরকারি নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনীর নিম্ন পদমর্যাদার সদস্য এবং এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। যেখানে এ ক্যাটাগরির অধিকাংশই (সম্ভবত শহুরে অনানুষ্ঠানিক খাত ব্যতিক্রম) গ্রামীণ দরিদ্রের চেয়ে সচ্ছল; তবু তাদের নিজস্ব জীবনমান দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি। আমরা যদি প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য প্রতি মাসে ৭৫ টাকা ন্যূনতম খাদ্য ভোগের সমান হিসাবে ধরি, তাহলে নগর জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে গেছে; দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে থাকে মাত্র ২২ শতাংশ। তার মানে প্রায় ৭৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীই সামান্য উপরে কিংবা দারিদ্র্যসীমার নিচে। ভর্তুকিকৃত রেশন এ ক্যাটাগরির জনগোষ্ঠী সাম্যতা নিশ্চিতের চূড়ান্ত পরিমাপকে অন্যায্য মনে হতে পারে, তবে নগর মধ্যবিত্তদের বিধিবদ্ধ রেশন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সাম্প্রতিক পরিশ্রমলব্ধ কাজের বিস্তার নতুন পে-কমিশনের মজুরি ঘোষণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসেছে, তবে এটিও মনে হয়, রেশন ব্যবস্থার অধীনে খাদ্যশসের দাম দ্বিগুণ করার কারণে এ শ্রেণীর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বজায় থেকেছে।
আলোচনা করতে এখানে এটি প্রস্তাব করা নয় যে, নগর জনগোষ্ঠী ও সরকারি কর্মচারীদের খাওয়াতে আদৌ বিধিবদ্ধ রেশনিং সবচেয়ে কার্যকর ও সমতামূলক পন্থা কিনা; তবে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিতে জড়িত রাজনৈতিক যুক্তি ও কল্যাণ বিবেচনা এক্ষেত্রে যথেষ্ট স্পষ্ট হওয়া উচিত। অবশ্য এসআরের অধীনে এক ধরনের রেশন বজায় রাখার পরিণামের অর্থ হলো মডিফায়েড রেশনিং দ্বারা সরকারি বণ্টনে সব ধরনের কাটছাঁট হওয়া। বাংলাদেশে খাদ্যনীতির সমালোচকরা অপর্যাপ্তভাবে এ তথ্যের প্রশংসা করেছেন যে, ১৯৬৮-৬৯ সাল, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে জনগণের মাঝে বণ্টনকৃত খাদ্যশস্যের অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ এমআর ও ত্রাণের আওতায় গেছে এবং খোদ এমআরের অধীনে বণ্টনের ৬০ শতাংশ বণ্টিত হয়েছে। এখন যতদূর সম্ভব এমআর জনসংখ্যার দরিদ্রতম অংশের কাছে পৌঁছানোর একটি সচেতন প্রয়াসকে প্রতিনিধিত্ব করে। এমআরের অধীনে প্রধান সুফলভোগী হলো সেসব পরিবার, যাদের আয় মাসিক ২০০ টাকার নিচে এবং যারা কিনা গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে নাজুক ১৬ শতাংশ। খোরাকি কৃষকের বিপরীতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এ অংশ নিজেদের ভোগ চাহিদা মেটাতে প্রাথমিকভাবে বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
একইভাবে ত্রাণের অধীনে বণ্টনকৃত খাদ্যও জনসংখ্যার দরিদ্রতম অংশকে টার্গেট করে দেয়া হয়। এর একাংশ যায় ভূমিহীন শ্রমজীবীদের উদ্দেশে নেয়া কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা) অব্যাহত রাখতে এবং বাকি অংশ যায় গ্রামীণ দুস্থ, এতিম ও বিধবাদের কাছে। বিনামূল্যের ত্রাণ (গ্র্যাচুইটাস রিলিফ— জিআর) হিসেবে বণ্টনকৃত খাদ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে আসা শরণার্থী ও ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের শিকার জনগোষ্ঠীকে খাওয়াতে।
এমআরের অধীনে খাদ্য বণ্টন সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক ফ্যাক্টর হলো, এটি সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় একটি অবশেষ দাবি (রেসিডুয়াল ক্লেইম) তৈরি করে। যখনই বণ্টন ব্যবস্থার বিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা পূরণ হয়, অবশিষ্ট খাদ্য এমআর হিসেবে বণ্টন করা হয়। এভাবে আমদানির পরিমাণ জটিলভাবে নির্ধারণ করে প্রাপ্য পরিমাণ। তথ্যে আমরা দেখেছি, যখন ১৯৭৩-৭৪ সালে আমদানি পড়ে যায়, তখন এমআর ও ত্রাণের অধীন বণ্টনও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। এ ব্যবস্থার পরিণাম হলো, আমদানি ঘাটতির সময় জনসংখ্যার দরিদ্রতম অংশ, যারা এমআর ও ত্রাণের সুফলভোগী— কঠিনতম বিপদে পড়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, স্থানীয় কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের নীতি ছিল এমআরের অধীনে যতটা সম্ভব বেশিসংখ্যক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে ঘাটতির সময়ে পরিমাণ ও রেশনের পৌনঃপুনিকতা কমানো যায়।
খাদ্য এবং দুর্ভিক্ষ
বিপুল মজুদদারি পরিস্থিতিতে ১৯৭৪ সালের জুন-আগস্টে নজিরবিহীন বন্যায় আমদানির ওপর ফটকাবাজি ও অনিশ্চয়তা দেশে খাদ্য সংকট তৈরি করে। গত দুই দশকের বন্যার রেকর্ড পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, এসব বন্যার ব্যাপ্তি ও তীব্রতা অনেক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। আলোচ্য বন্যা আউশ ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তথ্যে যেমনটা দেখা যায় যে, দুই দশকের মধ্যে প্রতি একরে ফলন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতি থেকে আংশিকভাবে উত্তরণ ঘটেছে যে, অতিরিক্ত ১ লাখ ৭৬ হাজার একর জমি পাটের বদলে আউশ চাষের আওতায় এসেছে; যা অবশ্যই পাটের উৎপাদন লক্ষণীয় মাত্রায় কমাতে ভূমিকা রেখেছে। তবে অধিক ভয়াবহ হলো, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আমন সরিয়ে অন্যত্র রোপণ করা হয়, যাতে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে আমন উৎপাদন কমে আসে ৭ লাখ টন।
এটি তাত্পর্যপূর্ণ যে, সামষ্টিক অর্থে দুর্ভিক্ষের ক্ষেত্রে বন্যার প্রভাবে চাষীদের আশা ও আচরণ, খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ীর চেয়ে উৎপাদনে পতন কম প্রাসঙ্গিক ছিল। খাদ্যশস্যের মাথাপিছু প্রাপ্যতা তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে, তবে এ পতন দাম আচরণে কোনো পরিসংখ্যানগত আন্তঃসম্পর্ক বহন করে না। বন্যা এ ভয় উসকে দিয়েছিল যে, আউশ ফলনে ঘাটতি এবং আমন ফসলের প্রতিশ্রুতির চরম পতনে ভয়াবহ ঘাটতি দেখা যাবে। বাংলাদেশের পুরো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মনে বাসা বাঁধা এ অনিশ্চয়তার শঙ্কা ছোট-বড় সব কৃষকের বাজারে বিপণনকৃত বোরো ও আউশ ফসলের সীমিত সরবরাহও প্রত্যাহার করায় ভূমিকা রেখেছে।
খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের অবশ্য তথ্যের একটি অতিরিক্ত আইটেম ছিল, যেটি সাধারণ ভোক্তা ও উৎপাদনকারীরা জানে না। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থেকে তারা জানত, সরকার কঠিন হেমন্ত মাসের জন্য পর্যাপ্ত আমদানি লাইনআপ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সরকারি বণ্টন ব্যবস্থা ধুঁকছিল। ফলে সরকারি খাদ্য মজুদ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের প্রাক-আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভয়াবহভাবে কমতে যাচ্ছিল। এ জ্ঞান তাদের খাদ্যশস্য আটকে রাখতে প্ররোচিত করে, যাতে আগস্ট থেকে উন্মুক্ত বাজারে কোনো শস্য না আসে। ফল হলো, আগস্ট থেকে খাদ্যশস্যের দাম বাড়তে শুরু করে এবং অক্টোবরে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে মণপ্রতি ২৬৩ টাকায় উন্নীত হয়, যা ফেব্রুয়ারি দাম থেকে ৩ দশমিক ৩ গুণ বৃদ্ধি।
এ দাম বৃদ্ধির প্রভাব কৃষককুলের ওই শ্রেণীর জন্য সাংঘাতিক ছিল, যারা খাদ্যশস্যের জন্য কেবল বাজারের ওপরই নির্ভর করত। এ শ্রেণী এরই মধ্যে পাট উৎপাদন, আউশ ফলনের ক্ষতি এবং আমনের চারা রোপণ বিপর্যয়ের কারণে কর্মসংস্থান থেকে আয় কমার সমস্যায় ভুগেছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ে এ পতন ঘটেছে খোলাবাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এবং এমআরের মাধ্যমে অবস্থা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হওয়ার বিপরীতে। প্রকৃতপক্ষে, এসব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমআর হ্রাস ১৯৭৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের ফলন মাসে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। ফলে গ্রামীণ দরিদ্রের পুরো অংশই বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাব ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং খাদ্যসংকটে পড়ে।
কিছু সুনির্দিষ্ট সংকটপূর্ণ এলাকায়— যেগুলো বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হয়— দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর মতো ঘটনার প্রকাশ ঘটে। এর মধ্যে রংপুরই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যেখানে দুর্ভিক্ষের কারণে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। দুর্ভিক্ষের ভুক্তভোগীদের অনেকেই নিজেদের জমি বিক্রি করে এবং ঢাকায় চলে যায়, যেখানে তারা রাস্তায় মারা যায়। দুর্ভিক্ষে মৃত্যু নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি ভাষ্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক আছে। যেখানে সরকারি হিসাবে মৃত্যু ২৭ হাজার ধরা হয়, সেখানে বেসরকারি হিসাবে তা এক লাখের কাছাকাছি। আরো অধিকসংখ্যক মৃত্যু এড়ানো গেছে দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় ৫ হাজার ৮৬২টি লঙ্গরখানা (অক্টোবর-নভেম্বরে দুর্ভিক্ষের চূড়ান্ত সময়ে) খোলার মধ্য দিয়ে, যেগুলো আনুমানিক ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষের বেঁচে থাকার খাবার জুগিয়েছিল। যখন এসব ক্যাম্পের অবস্থা মানবেতর ছিল, তখন আলোচ্য প্রচেষ্টা অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। এ দুই মাসে আনুমানিক ৩০ হাজার খাদ্যশস্য ত্রাণপ্রধানের অধীনে ক্যাম্পগুলোর বাসিন্দাদের খাওয়ানো হয়েছে। এ পরিমাণ অবশ্য এমআর বণ্টন কর্মসূচি থেকে ডাইভার্ট করা হয়, ফলে ১৯৭৪ সালের গত মাসে এমআর কর্মসূচি সর্বনিম্ন মাত্রায় চলে আসে। এ পদক্ষেপের আবার চালের বাজারের ওপর প্রভাব ছিল, যেমনটি আমরা দেখেছি— আলোচ্য সময়ে চালের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যায়।
এভাবে অন্যতম চরম ঘাটতির বিপরীতে দুর্ভিক্ষ প্রধানত মানব-সৃষ্ট অনুঘটকে উদ্ভূত হয়েছে। এর তাত্ক্ষণিক কারণ ছিল মজুদদারি এবং উৎপাদক-ব্যবসায়ীদের ফাটকাবাজি। এর স্থানীয় ভয়াবহতার জন্য অবশ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের রক্ষণশীলতা দায়ী, যে মন্ত্রণালয় রংপুরের মতো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নিঃস্বদের খাওয়াতে বিধিবদ্ধ রেশন হ্রাস করেছে। তবে সংকটের প্রাথমিক উৎস নিহিত আমদানি কর্মসূচির অকার্যকারিতায় বা ভেঙে পড়ায়। সুতরাং সংকটকালীন অবস্থার খাদ্যশস্য আমদানি পর্যালোচনায় আমাদের জন্য অধিক যুক্তিযুক্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য আমদানি
১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরের খাদ্য বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার খাদ্য ঘাটতি হিসাব করেছিল ২ দশমিক ২ মিলিয়ন টন। ১৯৭৩ সালের ১ আগস্টে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্সের কাছে এসব হিসাব উপস্থাপন করেন। ওই বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে তাজউদ্দীন তিন লাখ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেয়ার কথা বলেন। সে সময় মুখোমুখি হওয়া অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে সজাগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে গণহত্যা সংঘটনে দায়ী ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার পরিকল্পনা বাতিলের জন্য চাপ প্রয়োগ করে।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালের ৩০ আগস্টে বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের উপ-চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম এবং ইউএস এইডের উপপ্রশাসক মরিচ উইলিয়ামের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ইসলাম জরুরিভিত্তিতে মার্কিন খাদ্য সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, বিশ্ববাজারে খাদ্যের উচ্চ দামের কারণে বাংলাদেশের নিজের নগদ খাদ্য সংগ্রহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। কাজেই তিনি ইউএস পিএল ৪৮০ টাইটেল ওয়ান প্রোগ্রামের অধীনে তাত্ক্ষণিক শিপমেন্টের জন্য ২ লাখ ২০ হাজার টন গমের পাশাপাশি ২০ হাজার টন ভোজ্যতেল বরাদ্দের অনুরোধ করেন।
আবার ১৯৭৪ সালের ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ২ দশমিক ২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য ও ১ লাখ ২৮ হাজার টন সয়াবিনের জরুরি প্রয়োজনের বিষয় বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ঊর্ধ্বমুখী বিশ্ববাজার থেকে নিজস্ব সম্পদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এক মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুরোপুরি শূন্য করে দিয়েছে। তাই তিনি অনুরোধ করেছেন, টাইটেল ওয়ানের অধীনে আরো কিছু গম বরাদ্দ এবং আগে দেয়া সহায়তা প্রতিশ্রুতি থেকে গম ও সয়াবিনের তাত্ক্ষণিক ক্রয় অনুমতির ব্যবস্থা করার।
এসব প্রচেষ্টা ছাড়াও বাংলাদেশ সরকার অন্য দেশের সরকারগুলো এবং অস্ট্রেলিয়া, কানাডার মতো বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা সক্রিয়ভাবে সন্ধান করছিল। এমনকি নগদ কেনার জন্য রিজার্ভ হ্রাস পাওয়া সমস্যা সমাধানে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির (ইইসি) সাহায্যও প্রত্যাশা করেছিল। নতুন সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতি কিংবা প্রতিশ্রুত সহায়তা জাহাজীকরণে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারি বণ্টন ব্যবস্থার বিপর্যয় প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ইউএসএসআরের নিজস্ব নগদ কেনা খাদ্য থেকে ২ লাখ টন দিতে বাধ্য হয়। এ ২ লাখ টন খাদ্য ১৯৭৩ সালের জুলাই-অক্টোবরে বাংলাদেশে পৌঁছায় এবং আমনপূর্ব সংকটপূর্ণ সময়ে রেশনব্যবস্থা কার্যকর রাখতে সহায়তা করে। ১৯৭৩ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুত সহায়তা থেকে রাশিয়ার নেয়া খাদ্যশস্য পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এ আয়োজন গ্রহণে অস্বীকার করায় বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত ইউএসএসআরের সঙ্গে ডেফার্ড পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় যেতে হয়েছিল।
অবশ্য এসব শিপমেন্ট একবার যখন এল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সহায়তা প্রতিশ্রুতি দেরি হতে লাগল এবং এতে দেশের খাদ্য আমদানি মারাত্মকভাবে কমে যায়। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৪ সালের মার্চ সময়ে গড় আমদানি ৭৪ হাজার টনে নেমে আসে, ১৯৭২-৭৩ এর প্রতি মাসে যা ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার টন। এ ঘাটতির প্রভাব ১৯৭৪ সালের প্রথমাংশে সরকারের খাদ্য মজুদ কমে আসা এবং এমআর কর্মসূচি সংকোচনের তথ্যে দেখা যায়।
১৯৭৩-৭৪ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সহায়তা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার সমস্যার মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশ খোলাবাজার থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করেছিল। এ সময়ে টনপ্রতি খাদ্যের দাম ১৯৭২-৭৩ সালে ১১৫ ডলার থেকে বেড়ে ১৯৭৩-৭৪ সালে ১৯৯ ডলারে উন্নীত হয়। ফলে এসব ক্রয়ের ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাপকভাবে নগদ রিজার্ভ কমাতে বাধ্য হয়। তথ্য বলছে, ১৯৭৪ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নগদ রিজার্ভ নেমে দাঁড়ায় ৬০ মিলিয়ন ডলারে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল এরই মধ্যে চুক্তিকৃত আমদানি বিলের চেয়েও লক্ষণীয় কম। সেদিক থেকে কারিগরিভাবে বাংলাদেশকে দেউলিয়া বললেও অসত্য হবে না। তথ্যে আরো দেখা যায়, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত প্রতি বছরে গড়ে ১৫৬ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ নগদ খাদ্য সংগ্রহের বিষয় মনে রাখলে আইএমএফ থেকে স্বল্পসুদে ছাড়কৃত অর্থও যথেষ্ট অপর্যাপ্ত ছিল। বাংলাদেশের বিপজ্জনক বৈদেশিক/বহিঃস্থ আর্থিক অবস্থান খোদ পশ্চিমা দাতা সংস্থার তরফে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ঋণদাতা দ্বারা প্রকাশ পায়। ফলে স্বল্পমেয়াদি ডেফার্ড ঋণের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যশস্য রফতানিকারকদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের করা দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য শিপমেন্ট চুক্তি বাতিল হয়। কারণ তারা বাংলাদেশের ঋণমান/ঋণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছিল। এটি পরিষ্কার নয়, বাংলাদেশকে কব্জায় রাখার যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনা দ্বারা এ পদক্ষেপ আদৌ উৎসাহিত হয়েছিল কিনা; কিন্তু এটি সবাই জানে, মার্কিন খাদ্যশস্য রফতানিকারকরা দেশটির সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিল।
কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য ও মার্কিন খাদ্য রাজনীতি
এ ধাপে সহায়তা প্রতিশ্রুতি, যা সাধারণত ১৯৭৩ সালের বসন্তে ইউএস এইড কর্তৃক করা হয়েছে, সেই প্রতিশ্রুত খাদ্য এখনো আসেনি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সম্পদ ছাড়াই বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহ অব্যাহত রাখার নীতি নিলে নগদ অর্থ বা ঋণ যোগ্যতার অভাবের বিষয়টি কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ভয়াবহ কার্ডটি খেলে। ১৯৭৪ সালের ২৯ মে সরকারের খাদ্য মজুদ ৫৬ হাজার টন থাকাকালীন এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে বন্যা শুরু হলে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড বোস্টার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে বোস্টার ঢাকার এক সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বিষয়ে কামাল হোসেনের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ৪ মিলিয়ন পাটের থলে বিক্রির জন্য বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন কিউবার সঙ্গে চুক্তি করেছে। এটাকে ইউএস পিএল ৪৮০ ফুড এইডের প্রতিশ্রুতির প্রতি ক্ষতিকারক হিসেবে দেখা হয়। বোস্টারের মতে, ইউএস কংগ্রেশনাল আইনে কিউবা এবং উত্তর ভিয়েতনামের সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদার কোনো দেশের সঙ্গে এ ধরনের (খাদ্য সহায়তা) প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অবশ্য অকৌশলগত কৃষিপণ্য, অকৌশলগত কৃষি উপকরণ এবং চিকিৎসা পণ্য সরবরাহে কিছু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্সিয়াল ওয়েভার হতে পারে। স্বাভাবিকভাবে কাণ্ডজ্ঞান নির্দেশ করে যে, পাটের থলে অকৌশলগত কৃষিপণ্য; কিন্তু এটি পরিষ্কার ছিল, বাংলাদেশের জন্য এ ওয়েভার প্রয়োগ হবে না।
এ বিষয়ের গুরুত্ব নিহিত ছিল মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দ্বিতীয় সাক্ষাতে। ওই সাক্ষাতে সঙ্গী ছিলেন দেশটির নিকট-প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রু লেনজেন। আলোচ্য সাক্ষাতে রাষ্ট্রদূত একটি আনুষ্ঠানিক নোট প্রদান করেন, যেখানে বলা হয়: ‘টাইটেল ওয়ানের অধীনে বিক্রি চুক্তি করার আগে বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে কৃষিপণ্য বিক্রি করছে না এমন এক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। এটি হতে পারে আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রতিশ্রুতি। এটা যদি জটিলতা তৈরি করে, তাহলে বাংলাদেশ সরকার থেকে একটি মৌখিক নিশ্চয়তা গ্রহণ করতে পারি, তারা আমাদের আইনের বিষয়ে সচেতন এবং সরকারি এজেন্সিগুলো বা সরকার-নিয়ন্ত্রিত করপোরেশনগুলোকে কিউবায় রফতানি করার অনুমতি কিংবা বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোনো জাহাজ কিউবার বন্দরে যেতে অনুমতি দেয়ায় আগ্রহী নয় দেশটি।’
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের দিক থেকে যোগাযোগ বাংলাদেশকে পুরোপুরিভাবে বিস্মিত করে। কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যের আলোচনা চুক্তির বেশ কয়েক মাস আগে থেকে চলছিল, যখন ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে শেখ মুজিব ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে আন্তরিকতার ভিত্তিতে আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন পিএল ৪৮০-এর বিস্তারিত প্রতিশ্রুতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এবং বাংলাদেশের মধ্যে আগে থেকে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আলোচনায় এ ধরনের বাণিজ্য অধিকতর সহযোগিতার জন্য প্রতিকূল বা ক্ষতিকর হবে কিনা উল্লেখ ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা যেসব বিষয় তুলে ধরেন সেগুলো হলো:
(ক) কিউবার সঙ্গে লেনদেন ছিল বিচ্ছিন্ন লেনদেন এবং এটি চলমান বাণিজ্য চুক্তির অংশ নয়।
(খ) লেনদেনের সূচনাকারী পাটকল করপোরেশন বাণিজ্য-বিষয়ক ইউএস কংগ্রেসের পিএল ৪৮০ অ্যাক্টের অধীনে থাকা নিষেধাজ্ঞা বিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল না। আবার আলোচনা চলার সময় কিউবাও বিষয়টি বাংলাদেশের নজরে আনেনি।
(গ) বাংলাদেশ প্রচণ্ডভাবে কাঁচা পাট ও পাটপণ্য রফতানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পতনশীল বিশ্ববাজারে পাটের জন্য রফতানি উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে যেখানে বাংলাদেশ তার রফতানি বাজার হারিয়ে আসছে। বিশ্বের সব দেশে পাট রফতানি বাড়াতে বাংলাদেশের দিক থেকে যেকোনো ব্যর্থতা দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে এবং একটি স্বয়ম্ভর অর্থনীতি অর্জনের গভীরতর লক্ষ্য ব্যাহত করবে।
(ঘ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি কিউবায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে গাড়ি রফতানির বিশেষ অনুমতি দিয়েছে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দেশের কাছে গাড়ি রফতানির গুরুত্ব যতখানি, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য পাট রফতানি তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছিল বিদ্যমান অর্থনৈতিক জটিল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাট ও পাটপণ্য রফতানিতে বাংলাদেশকে যেন বিশেষ ছাড় বা অব্যাহতি দেয়া হয়।
এ সহজ আবেদনে মার্কিন সরকারের অনুবেদনের বিপরীতে বাংলাদেশ বরং দেখেছে, ওই সময়ে একই ইস্যুতে মিসরের জন্য বৈষম্যমূলক ছাড়ের ব্যবস্থা করেছে। মিসরও কিছুদিন থেকে কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য ও কাঁচা তুলা রফতানি করে আসছে। সর্বব্যাপী প্রচারিত কিউবা-মিসরের মধ্যকার এ তথ্য জানা সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালের ৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র পিএল ৪৮০ টাইটেল ওয়ানের অধীনে দেশটি থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের চার হাজার টন তামাক কিনতে মিসরের সঙ্গে একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে। অন্যতম প্রথম আইন হিসেবে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড পিএল ৪৮০ অ্যাক্টের অধীনে আরেকটি ওয়েভার ইস্যু করেন সেটি হলো— ১৭ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ১ লাখ টন গম বিক্রি করা। চুক্তিটি ১৯৭৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কায়রোতে স্বাক্ষরিত হয়, ঠিক যখন ঢাকার রাস্তায় দুর্ভিক্ষের ভুক্তভোগীদের আবির্ভাব দেখা যাচ্ছিল। ওয়াশিংটন পোস্টে মার্কিন সরকারের কর্মকর্তারা বলেছেন, কিউবার সঙ্গে মিসরের বাণিজ্য বিবাদের বিষয় ছিল না; যেহেতু এর বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য ১৯৬৭ আইনের শর্তে তুলার মতো পণ্য রফতানি বাদ পড়তে পারে; বাংলাদেশে তৈরি পাটের বস্তার জন্য এ ধরনের অব্যাহতি সম্ভব ছিল না।
তুলার চেয়ে পাটের বস্তা কেন অধিক কৌশলগত পণ্য এবং বন্যা ও দুর্ভিক্ষের প্রকোপ দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশের চেয়ে মিসরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুবিবেচনা সম্প্রসারিত হতে পারে, সে সম্পর্কে কখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। উত্তর স্পষ্টভাবে এ তথ্যে লুকিয়ে আছে যে, আনোয়ার সাদাতের শাসনাধীন মিসর ছিল পশ্চিম এশিয়ায় প্যাক্স আমেরিকানা উন্মোচনে হেনরি কিসিঞ্জারের উদ্যোগের ভিত্তি। সেক্ষেত্রে কাজেই সম্ভবত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বাদে মিসরের জন্য সব দরজাই খোলা রাখা হচ্ছিল।
অন্য যেকোনো পরিস্থিতির বাস্তবতায় শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহ ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর এ আঘাত মোকাবেলা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করা, যেমনটা ১৯৭৩ সালের মার্চে পাকিস্তানের দেনা দায় বিনিময়ের প্রশ্নে করা হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব অবশ্য কোনো ধরনের রাজনৈতিক ভাবোচ্ছ্বাসের মধ্যে ছিল না। এক মণ চালের দাম ১৪০ টাকার বাস্তবতায় বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে সরকারের সামর্থ্য খুব একটা প্রবল ছিল না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি পরামর্শের পর ১৯৭৪ সালের ১০ জুলাই সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুদিন পর ব্যক্তি খাত ও বিদেশী উদ্যোগের পক্ষে তার বিনিয়োগ নীতি সাজিয়ে সরকার বৈদেশিক চাপে আরেকটি ছাড় সৃষ্টি করেন। বন্যার মাত্রা বৃদ্ধি এবং ডুবন্ত বিনিময় রিজার্ভ বৈদেশিক দাতাদের পক্ষে শক্তিশালী অবরোধ হয়ে উঠল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির সত্যিকার গভীরতা এখনো অবশ্য পূর্ণতা পায়নি। প্রয়োজনীয় ছাড় সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট চুক্তির অধীনে কিউবাগামী সব জাহাজ বাতিল না করা পর্যন্ত অধিকতর প্রতিশ্রুতিগুলো স্থগিত দ্বারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চার মিলিয়ন পাটের বস্তা নিয়ে কোনো জাহাজ যাতে কিউবায় যেতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা হলো। তারপর যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালের ৪ অক্টোবর পিএল ৪৮০-এর অধীনে নতুন প্রতিশ্রুতির জন্য চুক্তি স্বাক্ষরে এগিয়ে আসে।
চূড়ান্ত আঘাত অবশ্য আসে এ তথ্য থেকে যে, ১৯৭৩ সালে এরই মধ্যে প্রতিশ্রুত ২০ হাজার টন ভোজ্যতেল— যেটি কিউবান অবরোধের অধীনে স্থগিত করা হয়— সেটি এখন কিছুদিন আগে কার্যকর হওয়া সয়াবিন রফতানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিশ্ব অবরোধের অপকর্মের মধ্যে আনা হয়। নিষেধাজ্ঞা না তোলা পর্যন্ত ভোজ্যতেলের প্রতিশ্রুত সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। ফলে ১৯৭৪-৭৫ সালে কেবল ৫০ হাজার টন সয়াবিন তেল বাংলাদেশে আসে এবং ১৯৭৪-৭৫ সালের জানুয়ারি সময়ে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি টন ২৭১ থেকে বেড়ে উন্নীত হয় ৫১৮ টাকায়। একই সময়ে সরিষার তেলের দামও প্রতি মণে ৫৪৪ থেকে ১ হাজার ৪৪১ টাকায় উন্নীত হয়।
মার্কিন চাপের কাছে বাংলাদেশ সরকারের সমর্পণ ও চুক্তির বাস্তবিক স্বাক্ষরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দেরি তখনই ঘটল, যখন বাংলাদেশ বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। অক্টোবরে মণপ্রতি চালের দাম সর্বোচ্চ ২৬৩ টাকায় উন্নীত হলো এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ মারা যাচ্ছিল ঢাকার রাস্তায়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর— এ সময়ে ঢাকায় দাতব্য সংস্থা কর্তৃক ৪৬৬ জন দুর্ভিক্ষে মারা যাওয়া লোককে সমাহিত করা হয়। রাজধানী শহরে পূর্ণমাত্রায় এ নির্মম নাটক যখন পরিচালিত হচ্ছিল, তখন আলোচ্য সংকটের প্রকৃতি ও গভীরতা সম্পর্কে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত পুরোপুরি ওয়াকিবহাল ছিলেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সব নগদ কেনা এবং অন্য দাতাদের দিক থেকে নিষ্পত্তিকৃত সহায়তা ১৯৭৪ সালের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত কিছু আমদানি পণ্য আসা অব্যাহত রেখেছে। তবে সেপ্টেম্বরে খুব কম খাদ্যই পাইপলাইনে ছিল এবং ওই মাসে কেবল ২৯ হাজার টন খাদ্য বাংলাদেশে আসে। অক্টোবরে আসে ৭৬ হাজার টন। ফলে সরকারি মজুদ ক্রমেই কমছিল এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সন্দিহান ছিলেন যে, তারা পরবর্তী দুই মাসে আদৌ এসআর কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারবে কিনা। রংপুরের বিশেষ সমস্যা ও হতদরিদ্রদের প্রতি সাড়া প্রদানে ব্যর্থতাই প্রতিফলিত হয়েছে যে, কঠিন সময়ের জন্য খুব স্বল্প মজুদ ছিল কিংবা খাদ্য না এলে ডিসেম্বরে আমন না ওঠা পর্যন্ত পরবর্তী তিন মাস পার করা তাদের জন্য কঠিন হবে।
অবশ্য অক্টোবর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, বাংলাদেশের মতো নাজুক দেশগুলোর জন্য প্রতিদানের বিনিময়ে কিছু একটা করবে। এ অবস্থায় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে জরুরি সহায়তার সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন; কিন্তু সেই কঠিন সময়ে কোনো কিছু ম্যানেজ করতে খুব একটা সমর্থ হননি এবং তার সঙ্গে খুব সাধারণ আচরণ করা হয়। শিক্ষা দেয়া হচ্ছিল, বাংলাদেশের মতো নিঃস্ব দেশগুলোর জন্য স্বাধীনতার দাবি এবং জোটনিরপেক্ষতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বদান্যতায় বা সৌজন্যে টিকবে।
খাদ্য সংকটের মানসিক পীড়ন এবং ওয়াশিংটনে শেখ মুজিবকে খুবই অনাড়ম্বর অভ্যর্থনার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন ক্ষমতা সম্পর্কে তাকে বুঝিয়ে দেয়া। তার সময়ের অন্য নেতাদের চেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপরীত আচরণ পায়। নাটকীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে তার বাধ্যতামূলক সমবায় এবং বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনের কর্মসূচিই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লাগসই উত্তর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি খুন হন এবং তার সহকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে পশ্চিমাপন্থী খন্দকার মোশতাক আহমদই হন তার উত্তরসূরি রাষ্ট্রপতি।
দুর্ভিক্ষের রাজনৈতিক অর্থনীতি
দুর্ভিক্ষের কাঠামোগত ভিত্তি এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রকৃতির জন্য বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশ মার্কিন ক্ষমতা খেলা চর্চার ভুক্তভোগীতে পরিণত হয়েছিল, তেলের দামে ওপেক-প্রভাবিত বৃদ্ধি দ্বারা সৃষ্ট আসন্ন উত্তর-দক্ষিণ সংঘাতে যার বিস্তৃত প্রয়োগ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণকে নির্মমভাবে স্মরণ করে দিয়েছিল, সেখানে কোনো কালেকটিভ সাউদার্ন পজিশন থাকবে না যতক্ষণ বাংলাদেশের মতো দেশগুলো সম্পূর্ণভাবে মার্কিন চাপের কাছে নতজানু না হচ্ছে। দেশটি আরো মনে করিয়ে দিয়েছিল, এসব নির্ভরশীল দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ততক্ষণই স্থায়ী হবে, যতক্ষণ না তারা ফসল বিপর্যয় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হবে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এ শিক্ষাও দেয় যে, বৈদেশিক নির্ভরতা উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে যথেষ্ট কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য দায়ী। বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের একটি অব্যবহিত কারণ থাকতে পারে। আর সেটি হলো— পিএল ৪৮০-এর অধীনে খাদ্য আমদানি বন্ধ করে দেয়া। তবে এ চাপ কেবল বাজার শক্তির মধ্য দিয়েও সমাধান করা যেত— যেটি রয়ে গেছে বড় কৃষক ও ব্যবসায়ী এবং জনগোষ্ঠীর বিশেষ অংশকে সরকারের দেয়া বাধ্যবাধকতার নিয়ন্ত্রণে। ১৯৭৪ সালে বিশ্বাস করার যথেষ্ট প্রমাণ আছে, ব্যক্তিগত মজুদ ও আমদানিকৃত খাদ্যশস্য মিলে সৃষ্ট বাজারযোগ্য উদ্বৃত্ত পুরো অ-উৎপাদক শ্রেণীর ভোগ চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত ছিল। যদি এ উদ্বৃত্ত সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতো, তাহলে এটি দিয়ে পুরো জনসংখ্যার জন্য বেঁচে থাকার ন্যূনতম খাদ্য জোগানো এবং কৃচ্ছ্রতা নীতি গ্রহণের মাধ্যমে দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যু এড়ানোও সম্ভব ছিল।
এমনকি খাদ্যশস্য উদ্বৃত্তের সামাজিকীকরণের চরম কৌশল বাদেও বিদ্যমান খাদ্য মজুদের পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যু এড়ানোর কিছুটা সুযোগ ছিল। ১৯৭৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে দুর্ভিক্ষের কঠিন সময়ে সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিধিবদ্ধ রেশনের গড় রয়ে গেছে অপরিবর্তনীয়। কাটছাঁটের পরিমাণ এভাবে আরোপিত হয়েছিল এমআর কর্মসূচির অধীন দরিদ্র গ্রহীতার ওপর। ১৯৭৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এমনকি যদি ২০ শতাংশ এসআর হ্রাস করা হতো, তাহলে তা থেকে ১০ লাখ ২ হাজার টন খাদ্যশস্য রিলিজ করা যেত এবং যার মাধ্যমে একই বছরের জুলাই থেকে ত্রাণ বণ্টনের খাদ্যশস্য দ্বিগুণ হতো। খাদ্য মন্ত্রণালয় কি দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর প্রথম আভাসে ত্রাণকেন্দ্র স্থাপনে অগ্রসর হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে রংপুরের সাবডিভিশন কুড়িগ্রামের মতো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জড়ো করেছিল; যেখানে সরকারি হিসাবে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে? সেটি করা গেলে অন্তত কিছু মৃত্যু তো প্রতিরোধ করা যেত।
আবার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বিশ্ব দাতারা দ্রুত বাংলাদেশে খাদ্যের জরুরি শিপমেন্ট করবে যাতে নির্মম বা কঠোর অভ্যন্তরীণ পুনর্বণ্টনমূলক সিদ্ধান্ত এড়ানো যায়। কিন্তু সে সময় অন্য দাতারা যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছিল এবং বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি সহযোগিতার আবেদনকে বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ কর্মকর্তারা নেয় ক্রাইয়িং ওলফ কেস (মায়াকান্না) হিসেবে। বন্যার প্রভাবের একটি নৈমিত্তিক জরিপের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক মিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ পেপার তৈরি করে। সেখানে বলা হয়, বন্যার পরিণাম সরকারের ঘোষণার চেয়ে অনেক কম। মনে হয় এটি বাংলাদেশে জরুরি খাদ্য শিপমেন্টের অনুরোধের বিপরীতে অন্য দাতাদের দিক থেকে খুবই নৈমিত্তিক সাড়া প্রদানে ভূমিকা রেখেছে।
[ইকনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর— হুমায়ুন কবির]
লেখক: অর্থনীতিবিদ; প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য






