সময়টা ষাট ও সত্তরের দশক। বিদ্যালয় ছুটি হলেই ছুটে যেতাম গ্রামের বাড়ি সুগন্ধি। অতি নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত আমার এই গ্রামে। বাড়ির আঙিনায় পানি উঠত বর্ষাকালের শুরুতেই। মেঘনা নদীর তীরে কৃষিপ্রধান গ্রাম। বর্ষাকালে বোনা আমন ধান (ডিপ ওয়াটার আমন) আর শুষ্ক মৌসুমে ছিটানো আউশ ধান। পাট তখনো রমরমা— পাট চুকায়নি। এর মাঝে কাউন নামে একটা ফসল মাঠজুড়ে ফলত। গরিব ঘরের মানুষ ভাতের সঙ্গে কাউন মিশিয়ে খেত, যাতে ভাতের প্রয়োজন কম পড়ে। কাউনের মোয়া কিংবা জাউ খেতে খুব স্বাদ। ওই সময়টিতে ধানবহির্ভূত ফসল হতো; যার মধ্যে ডাল, মিষ্টি আলু অন্যতম। এগুলো ছিল ‘অর্থকরী ফসল’— বেশির ভাগ বিক্রির জন্য। তখনকার দিনে আমার নিজ গ্রামে যেমনই, তেমনই সারা বাংলাদেশে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের উন্নতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধক ছিল (এবং এখনো আছে, যদিওবা অপেক্ষাকৃত কম তীব্রতায়) প্রকৃতির মেজাজ। হয় অতি বন্যা নয়তো অতি খরা। দুহাত তুলে কৃষকের আর্তনাদ এখনো কানে বাজে— ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই আল্লাহ...’। পানির প্রচণ্ড অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ছিটানো আউশ ধান মোট চাষকৃত জমির প্রায় অর্ধেক দখলে নিত। এর উৎপাদনমাত্রা খুব কম ছিল। বিঘাপ্রতি পাঁচ-ছয় মণ। তার ওপর ঝুলত খরার খড়্গ। তাই বলে পানির মৌসুমে অর্থাৎ বর্ষাকালে যে শান্তি ছিল তা নয়। অতি প্লাবন বা প্রারম্ভিক প্লাবনের মুখে চাষ করা হতো ওয়াটার আমন বা গভীর জলের ধান। গভীর জলের মাছ চালাক-চতুর হয়, কিন্তু গভীর জলের ধান বোকা-সোকা ধরনের। এর উৎপাদনমাত্রা অনেকটা আউশের মতোই— বিঘাপ্রতি পাঁচ-ছয় মণ। কিন্তু মজার ব্যাপার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ধানগাছের বৃদ্ধি ঘটত। একসময় ঢাকা থেকে দাউদকান্দি কিংবা ঢাকা থেকে আরিচা যাওয়ার পথে বর্ষাকালে রাস্তার দুপাশে মাথাসমান পানিতেও ধানগাছের সন্ধান মিলত। এরই নাম ডিপওয়াটার আমন। তখনকার দিনে আউশ ধান, ডাল, আখ, পাট ও তৈলবীজসহ নগদ অর্থকরী ফসলের পরিমাণ ছিল বেশি। এখন অবশ্য সে দিন যে নেই, তা স্বয়ং তারাশঙ্কর বলে গেছেন:

“... সেকাল আর নাই। কালের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। মাঠের বুক চিরিয়া রেললাইন পড়িয়াছে। তার পাশে টেলিগ্রাফ তারের খুঁটির সারি। বিদ্যুৎ শক্তিবহ তারের লাইন। মেঠোপথ পাকা হইয়াছে। তাহার উপর দিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে মোটর বাস ছুটিতেছে। নদী বাঁধিয়া খাল কাটা হইয়াছে। লোকে হুক্কা ছাড়িয়া বিড়ি-সিগারেট ধরিয়াছে। কাঁধে গামছা, পরনে খাটো কাপড়ের বদলে ছোকরারা জামা, লম্বা কাপড় পরিয়া সভ্য হইয়াছে। ছ-আনা, দশ-আনা ফ্যাশনে চুল ছাঁটিয়াছে। ভদ্র গৃহস্থ ঘরে হাল-চাল বদলাইয়াছে” (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘রাই কমল’)

দুই.

সেই সময় অকৃষিজ কর্মকাণ্ড বিস্তৃত ছিল না এবং এর বন্ধনীও তত বড় ছিল না। বর্ষাকাল মানে বাড়িতে ঠায় বসে থাকা। আমন ও আউশের নিম্ন ফলন দিয়ে খানাপ্রতি ছয়জনের অন্নের সংস্থান রীতিমতো কষ্টকর ছিল। মোটকথা, কালটা ছিল কবির কথায় ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ কিংবা ‘ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো’। অভাব, অনটন ও হাহাকার নিত্যদিনের সঙ্গী; সরব দুর্ভিক্ষের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যেত। কিন্তু আস্তে আস্তে একদিন কৃষি তথা কৃষকের কপাল ফেরে এবং বাংলাদেশ অবস্থান নেয় সরব দুর্ভিক্ষের বাইরে— ‘আউট অব দ্য শেডো ও ফেমিন’। এই কপাল ফেরার গল্প না হয় অন্যদিন করা যাবে, তার আগে কপাল পোড়ার কথাটা সেরে নেয়া যাক।

তিন.

ষাট ও সত্তরের দশকে, এমনকি আশির দশকের শুরুর দিকটায়, বাংলাদেশের তাবৎ কৃষি কর্মকাণ্ড ছিল মূলত জীবননির্বাহ স্তরে। ইংরেজিতে বলে সাবসটেনসেস ফার্মিং। ‘গোয়াল ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছে’র কথা শোনা যেত, তবে তা প্রধানত ধনীদের বেলায় এবং নিজেদের ভোগের জন্য। উদ্বৃত্ত বাজারে যেত খুব কম। ১৯৭৩-এর এক তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট দোকান ও গুদামঘরের সংখ্যা ছিল চার লাখের কিছু উপরে। ১৯৮৩ সালের এক সমীক্ষায়ও বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতির কোনো আভাস দেয়নি। মোটকথা, ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত, দুর্বল ও সংখ্যায় কম বিপণন প্রতিষ্ঠান এবং অবকাঠামোগত অসুবিধার জন্য বাজার সম্প্রসারণে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় দালালের দাপটে কৃষকেরও ওষ্ঠাগত প্রাণ। সেই সময় বছরে ব্যক্তিখাতের চেয়ে রাষ্ট্রীয় খাতের ভূমিকা চোখে পড়ত। যা ফলে প্রতিযোগিতার অভাবে দাম ও লাভালাভ নির্ধারণে প্রচুর বিকৃতি ঘটত। অন্যদিকে যুদ্ধকালীন অবকাঠামো ধ্বংস, সদ্য স্বাধীন দেশে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা শ্রেণীর অভাব এবং সর্বোপরি কৃষক পর্যায়ে উদ্যোক্তার অনুপস্থিতির দরুন সেই সময়ের কৃষিবাজার যেমন ছোট ছিল, তেমনি ছিল অনুন্নত। ষাটের দশকে চালের উৎপাদন ছিল ১০ মিলিয়ন টন, যার ৮০-৯০ ভাগ ছিল দেশী ধান এবং মোট উৎপাদনের মাত্র ১২ ভাগ বাজারে যেত।

সত্তরের দশকে উৎপাদন দাঁড়াল ১২ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে ৭০-৮০ ভাগ দেশী ধান এবং বাজারে যেত ৩০ ভাগ ধান। মার্কেটিং এজেন্ট বলতে ইতস্তত ব্যবসায়ী, সংখ্যায় যারা চার-পাঁচ হাজার; স্বয়ংক্রিয় কোনো মিল ছিল না; বড় মিলের সংখ্যা ছিল ১০০-১৫০ আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাড়াই যন্ত্র ছিল ৬-১০ হাজার। যা-ই হোক, ১৯৮৮ সালের থানাভিত্তিক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ওই সময় মোট ধানের মাত্র এক-চতুর্থাংশ বাজারজাত হতো; ২০০০ সালে সেটা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় এক-তৃতীয়াংশ। অতি সম্প্রতি নাকি মোট এ উৎপাদিত ধানের প্রায় অর্ধেক বাজারজাত হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে যে, অর্থকরী ফসলগুলোর সিংহভাগ আগে যেমন বাজারে যেত, এখনো যায়। ১৯৮৮ সালে এক টন সনাতনী ধানের দাম ছিল ২০৪ ডলার, আধুনিক ধান ২০০ ডলার, গম ১৯৪ ডলার, পাট ২২৭ ডলার আর ডাল ৩০০ ডলার। আরো একটা তথ্য না দিলেই নয়। ১৯৮৮ সালে মোট ধান বিক্রির প্রায় অর্ধেক ঘটত ফসল কাটার এক মাসের মধ্যে। এটাকে বলে দুর্দশাগ্রস্ত বিক্রি, কারণ খুব দুর্দশায় না পড়লে কেউ পানির দামে ধান ছেড়ে দিত না। গরিব চাষীরা তাদের উৎপাদিত ফসলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিক্রি করত ফসল ওঠার এক মাসের মধ্যে। এর কারণ পুঞ্জীভূত ধার ও দেনা।

ধার-দেনার প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, তখন সেই সময়ের ঋণের বাজার নিয়ে দু-একটা কথা না বললেই নয়। সেই সময় গ্রাম-বাংলায় কৃষিঋণের প্রধান উৎস ছিল মহাজন, ভূস্বামী, ব্যবসায়ী, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন। এগুলোকে বলা হয় অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস, যারা চড়া সুদে (প্রতি মাসে ২০ শতাংশ) ঋণ দিয়ে থাকে। এখনকার মতো ঘরে ঘরে এনজিও পৌঁছায়নি আর কৃষি ব্যাংক ছিল মূলত থানা বা উপজেলা সদরে এবং তাও বড় চাষীদের ঋণ-ক্ষুধা মেটানোর জন্য। যা-ই হোক, ১৯৮৮ সালে গ্রামীণ ঋণগ্রহীতা থানার ৭০ শতাংশ ঋণ নিত এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে এবং ঋণের বাজারে মোট অর্থপ্রবাহের তিন-চতুর্থাংশ আসত এদের কাছ থেকে। এর পরিণতি যা হওয়ার তা-ই হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’তে উপেনের করুণ অবস্থা: ‘শুধু বিঘে দুই, ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে/বাবু কহিলেন, বুঝেছো উপেন এই জমি লইব কিনে...’।

চার.

যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ে গ্রামীণ মোট খানার ৪০ ভাগের শুধু বসতভিটা ছাড়া অন্য কোনো জমিজমা ছিল না। প্রায় এক-পঞ্চমাংশ খানার জমি ছিল ৫০ শতক পর্যন্ত। এদেরকে বলা হয় কার্যত ভূমিহীন খানা। অর্থাৎ তখনকার দিনে মোট খানার ৬০-৭০ শতাংশ ছিল ভূমিহীন, যাদের নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থা। বড় চাষী বলতে যাদের বোঝায় (অর্থাৎ নিজস্ব জমি দুই হেক্টরের উপরে) তাদের অংশ ছিল ১০ ভাগ। মাত্র ১০ ভাগ হলে কী হবে, মোট জমির প্রায় অর্ধেক ছিল তাদেরই নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং জমির মালিকানায় বেদনাদায়ক বৈষম্য চোখ এড়নোর কথা নয়। নিজস্ব জমির আকার ছিল শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৬০ হেক্টর। বর্গাবাজার বর্তমানের মতো তত বিস্তৃত ছিল না, তবে বর্গা পদ্ধতি ছিল মূলত ভাগ-চাষ ব্যবস্থা, যেখানে ফসলের অর্ধের পেত মালিক আর অর্ধেক চাষী। সত্য কথা বলতে কি, মোট বর্গাজমির প্রায় ৮০ ভাগ হস্তান্তর হতো ভাগ-চাষ ব্যবস্থায়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এ ধরনের ব্যবস্থা শোষণমূলক ও অদক্ষ এবং এ ব্যবস্থা উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক নয়। সেটা কেন তা ব্যাখ্যা করার মতো সময় ও সুযোগ নেই বলে দুঃখিত।

পাঁচ.

পানির অপর নাম জীবন। তা মানুষের ক্ষেত্রে যেমন, কৃষির ক্ষেত্রেও তেমন। পানি ছাড়া ধান হয় না। আবার প্রয়োজনের কম পানি দিয়ে যে ধান, তাতে থাকে না প্রাণ। প্রাণ না থাকলে উৎপাদন শক্তি নেমে যায়। বাংলাদেশের কৃষিতে বরাবর পানির অভাব অভিশাপ, আবার প্রাচুর্য-প্রতিবন্ধক। ষাটের দশকের শুরুতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভূগর্ভস্থ পানির সাহায্যে সেচ কার্যক্রমের সূচনা ঘটায়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেন জেলা ঠাকুরগাঁয়ে ৩৮০টি চার কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন গভীর নলকূপ বসানোর মধ্য দিয়ে এ পরিকল্পনার যাত্রা শুরু। দুর্ভাগ্যবশত অনেক বছর ধরে, এমনকি শতভাগ ভর্তুকি দিয়ে পরীক্ষামূলক এ প্রকল্পটি সফলতার মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়। উত্তোলন থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত নানা ঝুটঝামেলায় ভেঙে পড়ে ব্যবস্থা। পানি ঘিরে হইচই আর হট্টগোল, মনে হতো যেন পানির জন্য পানিপথের যুদ্ধ! সত্তরের দশকের শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্র সেচ যন্ত্রের সংগ্রহ, স্থাপন, বিতরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে জড়িত ছিল তিনটি সরকারি সংস্থা। যথা: বিএডিসি, বিডব্লিউবিডিবি ও বিআরডিবি।

অব্যাহত ভর্তুকির চাপ এবং উপকরণ সংগ্রহ ও বিতরণে বৈষম্য, অপচয়, অদক্ষতা, রেন্ট সিকিং ও অন্যান্য সমস্যার মুখে মনে হয়েছিল সরকার খাল কেটে কুমির এনেছে। সুতরাং ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি এবং এর সর্বোত্তর পথ হচ্ছে খাল বন্ধ করে কুমিরমুক্ত হওয়া।

১৯৭৯ সালের দিকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, সেচ উপকরণের বাজার থেকে সরকারের সম্পৃক্ততা পুরোপুরি উঠিয়ে নেয়া হবে। সেই থেকে ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ ব্যক্তিখাতে।

ছয়.

ষাট ও সত্তরের দশকের মাঝামাঝি একদল প্রভাবশালী সমাজবিজ্ঞানী এমন সন্দেহ পোষণ করেছিলেন যে, কৃষি উপকরণের বাজার বেসরকারীকরণ করা হলে ধনী চাষী আরো ধনী হবে, আর গরিব হবে আরো গরিব। এর কারণ হিসেবে তারা বলতেন, ব্যয়বহুল সবুজ বিপ্লবের উপকরণ কেনার মতো নগদ কিংবা ঋণের অর্থের জোগান দেয়া সম্ভব একমাত্র বড় চাষীদের। দরিদ্র চাষী এ উপকরণ কিনতে ব্যর্থ হবে। দ্বিতীয়ত. বড় চাষী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে গরিবকে বর্গা দেয়া জমি ফেরত নিয়ে নিজে চাষ করবে। পরবর্তীকালে অবশ্য তাদের এ ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক বলে প্রমাণ হয়নি। বর্তমান বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র চাষী আধুনিক প্রযুক্তি পরিগ্রহণ করে।

মোটকথা, ষাট ও সত্তরের দশকের কৃষি প্রধানত দুটো ভীতির ওপর ভিত গেড়েছিল। প্রথমত. ম্যালথুসিয়ান দুঃস্বপ্ন ও দুর্ভিক্ষের ছায়া। অর্থাৎ মানুষ যে হারে বাড়বে, তার চেয়ে কম হারে খাদ্যোৎপাদন বেড়ে মহামারীর জন্ম দেবে। পাতালে থাকবে লাশ। আকাশে উড়বে শকুন। দ্বিতীয়ত. আধুনিক প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ মহামারীর মহৌষধ না-ও হতে পারে। কারণ ব্যয়বহুল এ প্রযুক্তি শুধু বড় ও মধ্যম চাষীর ঘরে শোভা পাবে।

অন্যদিকে নগদ অর্থের অভাবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী বঞ্চিত হবে। ফলে বৈষম্য বাড়বে। সেই সময় আরো একটি উপপাদ্য কৃষি চিন্তায় অবস্থান নিয়েছিল, আর তা হলো বাজারমুখিতা বড়দের, গরিব চাষীর শুধু জীবননির্বাহ কৃষি নিয়ে থাকতে হবে।

সাত.

সময়ের বিবর্তনে এ ভয়গুলো অমূলক বলে প্রমাণ হয়েছে। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণ— এক কোটি থেকে প্রায় চার কোটি টন। ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে গরিব চাষীও বাজারমুখী হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি ও বাজারে গরিব চাষীর অনুপ্রবেশ উল্লেখ করার মতো। যেমনই উৎপাদন তেমনই উপকরণের জন্য বাজার নির্ভরশীলতা বেড়েছে। ১৯৬৭ সালের বোরো মৌসুমে আইআর-৮ বীজ দিয়ে আধুনিক ধানের শুভ যাত্রা। ইরি বা আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) তুলনীয় সময়ে প্রায় ৫০টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করে। এর ফলে জমির ব্যবহার বদলে যায়। হেক্টরপ্রতি এক টন আউশ ধানের জায়গায় এসেছে চার টন আধুনিক বোরো ধান। যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ে প্রায় ৬০ ভাগ চাষী নিজের জমি নিজে চাষ করত। এখন অধিকাংশ জমি বর্গা দিয়ে তারা অকৃষিজ কর্মকাণ্ডে জড়িত। একসময় হালের বলদ ও কৃষি মজুরের ওপর নির্ভরশীল ছিল কৃষি। এখন প্রায় ৮০ ভাগ জমি চাষ হয় যন্ত্র দিয়ে।

মোটকথা, কৃষি খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার গড়পড়তা ২ শতাংশ থেকে এখন প্রায় দ্বিগুণ। গবাদিপশু ও মত্স্য খাতের প্রবৃদ্ধির হারে চিত্তাকর্ষক উন্নতি লক্ষণীয়। আলোচিত সময়ে খানার মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক আসত জমি থেকে। অর্থাৎ জমি ছিল প্রধান উপকরণ। এখন মোট আয়ে জমির ভূমিকা এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ। সময়ের বিবর্তনে গ্রামের খানার আয় আগে যেখানে ৬০ ভাগ আসত কৃষি থেকে, এখন আসে ৪০ ভাগ। গ্রাম-বাংলার জীবন-জীবিকা এখন ওই মাত্রায় কৃষিনির্ভর নেই। অকৃষিজ কর্মকাণ্ড, অভিবাসন ও ফসলবহির্ভূত কৃষি এখন জীবন-জীবিকার প্রধান সোপান।

পাদটীকা:

একসময় গোয়ালঘরের আকৃতি ও পশুর সংখ্যা দিয়ে গ্রামীণ পরিবারের আভিজাত্য বিবেচনা করা হতো। অন্যদিকে পশুসম্পদ বা গোয়ালঘরের অনুপস্থিতিকে ধরে নেয়া হতো দারিদ্র্যের নির্দেশক। আরো বলা হতো, মাছ চাষ করে হতদরিদ্ররা, ধনীরা শুধু সেই মাছ ভোগ করে। সময়ের বিবর্তনে এখন গবাদিপশু গরিবের ঘরে, আর মাছ ধরে ধনী। বাংলাদেশের কৃষি বিবর্তন মানে, কী বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস!

দুর্ভাগ্যবশত সার্বিক কৃষি উন্নয়ন পরিবেশবান্ধব তথা সবুজ কৃষি হয়নি। সত্যজিৎ রায়ের কথায় বলতে হয়, ‘কোথায় ছিল অ্যাদ্দিন এই চিমনির ধোঁয়া বর্জিত মসৃণ আকাশ, এই মাটির গন্ধ মেশানো মন মাতানো বিশুদ্ধ মেঠো বাতাস।’ এর অন্তত কিছুটা ছিল যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ে। পেয়েছি অনেক, হারিয়েছে কম নয়!

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য