পেশাদার বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারে প্রবেশ করবেন, এ আশঙ্কা সবসময়ই ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর বিরুদ্ধে ছিলাম এবং স্বাধীনতা লাভের আগে বিভিন্ন সময় আমার সহকর্মীদের একথা বলেছিলাম। আমি জানতাম, সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। এ প্রতিনিধিরা ও বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত ভিন্ন পরিবেশ ও ঐতিহ্য থেকে আসেন এবং জাতির স্বার্থ সম্বন্ধে এ দুই সম্প্রদায়ের চিন্তাধারণা এক নাও হতে পারে। আরো জানতাম, একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলে তাকে পরামর্শ দিতে খুব বেশি লোক না এলেও ক্ষমতায় আসার পর অনেকজন তাকে পরামর্শ দিতে এগিয়ে আসবেন। তাতে বুদ্ধিজীবীদের মতামতের শক্তি কমে যাবে। এর চেয়ে বাইরে থেকে, স্বাধীন মঞ্চ থেকে পরামর্শ যদি চাওয়া হয়, তবে পরামর্শ দেয়া অনেক বেশি বিচক্ষণতার পরিচায়ক। কিন্তু অবস্থার চাপে ও উত্তেজক মুহূর্তের প্রবণতায় বুদ্ধিজীবীরা ভেতরে ঢুকে পড়লেন। যে কাঠামোর মধ্যে এসে বুদ্ধিজীবীদের কাজ করতে হলো, তা বেশ অদ্ভুত এবং বোধ হয় অদ্বিতীয়। পরিকল্পনা কমিশন তারা প্রায় একচেটিয়াভাবেই দখল করে নেন এবং সিভিল সার্ভিস ও ক্ষমতাসীন পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন নিজস্ব একটি কমপার্টমেন্টে তারা কাজ করতে বসেন। এটি হাস্যকর, অন্তর্দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং নিজেকে নিজেই পরাস্ত করে। প্রথমত. তারা যে উন্নয়ন পরিকল্পনা রচনা করবেন, তা তো বাস্তবায়নের যোগ্য হতে হবে, আর দক্ষ প্রশাসকরাই এ গুণটির বিচার করতে পারেন। দ্বিতীয়ত. রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায় না এবং পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে আগাগোড়া বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদদের মাঝখানে আলোচনার একটা নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকলেও কার্যকর কোনো পরিকল্পনা করা যায় না। সবশেষে পরিকল্পনা কমিশন যদি এ দুটো গ্রুপ থেকেই বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে তাদের উভয়েরই শত্রুতাভাজন হতে হয় এবং এ গ্রুপ দুটির নিজ নিজ আঙিনায় অন্য এক শক্তির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এরা স্বভাবতই হাতও মেলাবেন। এদের কারো সহযোগিতা ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা, তা যতই ভালো হোক, বাস্তবায়ন হবে না।

তাই পরিকল্পনা কমিশন যেভাবে কল্পনা করেছিল, তাতে জাতিকে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে পরিচালিত করতে এটি ব্যর্থ হতে বাধ্য। এর জন্য কল্পনাটাই দায়ী, পরিকল্পনা কমিশনের বিশেষজ্ঞরা এককভাবে কেউ দায়ী নন। আসলে এটা তাদের দুর্ভাগ্য যে, একটি বিচ্ছিন্ন উপদেষ্টামণ্ডলীর আসন থাকলেও তাদের নিজেদের মতামত ও সুপারিশ সরাসরি জনগণের কাছে পেশ করার অধিকার তাদের ছিল না। তাই এ কমিশন দুই ফ্রন্টেই পরাজিত হয়। অন্যদিকে এতে জাতিরও কোনো লাভ হয়নি। জাতির ক্ষতিটা এজন্য নয় যে, অন্যথায় একটি কার্যকর পরিকল্পনা দেয়া যেত, বরং এজন্য যে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, সিভিল সার্ভিস ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে আরো নিবিড় আদান-প্রদান হলে এদের প্রতিটি গ্রুপই নিজের নিজের দৈন্য সম্বন্ধে হয়তো আরো সচেতন হতেন, এতে আমরা সবাই হয়তো আরো একটু বেশি নম্র হতাম।

সিভিল সার্ভেন্টরা ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যে শিক্ষিত হয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা এ ঐতিহ্যেরই অন্তর্গত। এটা তাদের দোষ নয়। কিন্তু তারা সমাজকে দেখেছেন ও শাসন করেছেন ঔপনিবেশিক শাসকদের দৃষ্টিকোণ থেকেই। তারা যে পেশাদার বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে বেশি মাঠের জ্ঞান দাবি করেন, গণতান্ত্রিক ও সমতাবাদী স্পৃহায় জাগ্রত একটি মুক্ত সমাজ পরিচালনার জন্য তা অবান্তর। আমি দেশে সিভিল সার্ভেন্টদের সঙ্গে ঘুরেছি। এদের কেউ কেউ দেশের অত্যন্ত কৃতী সন্তান। এরা গ্রামের ভেতরে তাদের আরামের জন্য ঢাকা শহরের পরিবেশ খুঁজেছেন এবং না পেয়ে বেশির ভাগ সময়ই গ্রামে না গিয়ে সার্কিট হাউজে থেকে গেছেন। এই ‘সার্কিট হাউজ প্রশাসন’ যে অভিজ্ঞতা দেয়, তা ঔপনিবেশিক শাসকদের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু একটি গণসরকার ও জনগণের জন্য তা একেবারেই মূল্যহীন। অন্যদিকে রাজনীতিবিদরা যারা জনগণের সঠিক নাড়ির জ্ঞান দাবি করেন, তারা নিজেরাও নিজ নিজ কনস্টিটিউয়েন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা নিজ নিজ এলাকার বেশির ভাগ গ্রামেই নির্বাচনের আগে একবার গিয়েছেন এবং ভেবেছেন পরের নির্বাচনে কী করে আবার যাবেন। তবে যা-ই হোক, মিথ্যা দম্ভের দিক দিয়ে এ দুটি গ্রুপের কোনোটাই বুদ্ধিজীবীদের ধারেকাছে আসে না।

বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের সবার সঙ্গে এ দেশের বুদ্ধিজীবীরাও ঔপনিবেশিক পরিবেশে ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও আকাঙ্ক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। আমরা যা শিখছি, তার সার্বিক দর্শন একটি সুপরিচিত বাংলা প্রবাদে পাওয়া যায়, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে।’ অর্থাৎ সে তার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, যে সমাজ অল্প কয়েকজন ছাড়া আর কাউকে গাড়ি বা ঘোড়া কোনোটাই দিতে পারবে না, এমনকি এ অভিজাত বাহনে চড়ে সমাজের অধিকাংশ লোকের কাছে পৌঁছাও যায় না, শারীরিকভাবে ও সিম্বোলিকভাবে। আমরা বুদ্ধিজীবীরা এ দর্শন নিয়ে শিক্ষিত হয়েছি আমাদের নিজেদের একটি আলাদা শ্রেণী গড়তে ও তাতে যোগ দিতে। আমরা ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব ইনটেলেকচুয়ালসের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেতে ব্যগ্র নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের সামাজিক জীবন ও অবস্থা এবং গ্রামবাংলার জনগণের মন, মানস ও সম্ভাবনা সম্বন্ধে অজ্ঞ থেকে।

যেসব বুদ্ধিজীবী দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নিয়োজিত, তাদের এ ত্রুটি— যে ত্রুটির জন্য ইতিহাস দায়ী, তারা নিজেরা দায়ী নন— এ কাজের জন্য তাদের খুব একটা যোগ্য বলে প্রতিপন্ন করে না। কারণ উন্নয়ন পরিসংখ্যান দিয়ে হবে না, মেশিন দিয়েও নয়— উন্নয়ন হবে মানুষের দ্বারা, বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের দ্বারা, যাদের অধিকাংশ গ্রামে বাস করে এবং করে যাবে, যাদের অধিকাংশকে আমরা নগরীর বুদ্ধিজীবীরা দেখিনি এবং যাদের কথা খুব কমই জানি। আরো মৌলিক অর্থে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন আনবে এ দেশের লক্ষ লক্ষ নর-নারীর মন ও জাগ্রত মানস, যে মনের পরিচয় দেশের পরিকল্পনাবিদদের প্রায় একেবারেই জানা নেই।

মানুষের মনই তার কর্মকে পরিচালিত করে এবং এ মনের জটিল চরিত্র, তার গতিশীলতা, বিভিন্ন ঘটনা থেকে জাত তার ব্যক্তিগত ও যৌথ প্রতিক্রিয়াই সমাজ পরিবর্তনের গতিপথ ও চরিত্র নির্ধারণ করে।

ঢাকা নগরে বসে থেকে এ মন ও মানস সম্বন্ধে খুব কমই জানা যায়। সংবাদপত্রের খবর, গতানুগতিক পরিসংখ্যান, যা মাঠ থেকে যান্ত্রিকভাবে সংগ্রহ করে অথবা ‘রন্ধন’ করে নিস্পৃহ চ্যানেলে ওপর পাঠানো হয়, সান্ধ্য বৈঠকের আলোচনা ও টেলিভিশনের চিত্র, যাতে দর্শকরা নিজেদের প্রতিবিম্বই বেশি দেখে— এসব খুব সামান্যই প্রকাশ করে। যা প্রকাশ করে তা সাধারণত হতাশাব্যঞ্জক— চারদিকে যন্ত্রণা, অরাজকতা, প্রায় যেকোনো নীতিই বাস্তবায়নে সরকারের ব্যর্থতা, যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়, সমাজের হালছাড়া আশাহীন গতি, উদ্দেশ্যবিহীন সামাজিক হিংস্রতা। বিশেষ করে এজন্যই বাঙালি মনের গভীরে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন এর মধ্যে কোনো ইতিবাচক স্পন্দন রয়েছে কিনা আবিষ্কার করার জন্য, আর যদি তা থাকে তাহলে তাকে কীভাবে লালন করে বিকশিত করা যায় তা বোঝানোর জন্য। যদি না থাকে তাহলে তার বীজ কোথাও শিগগিরই বপন করতে হবে, তা না হলে আমরা কিসের জন্য পরিকল্পনা করছি?

তাই আসুন, গ্রামাঞ্চলে একটি সফরে যাই। কুমিল্লায় আসুন, যেখানে বিশ্ববিখ্যাত একাডেমি রয়েছে, যেখানে এক দশক ধরে গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে পরীক্ষা হচ্ছে। এ পরীক্ষায় উৎপাদনের লক্ষণীয় বৃদ্ধি সাধিত হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক সমাজ উন্নয়ন অর্থে তেমন কিছু হয়নি এবং এ পরীক্ষার মূল লক্ষ্য স্বনির্ভরশীলতা ও উন্নয়ন-উদ্যোগের ফল সবার দরজায় পৌঁছে দেয়া, এ দুটোই ব্যর্থ হয়েছে। আরো দুঃখের কথা, আখতার হামিদ খানের লেখা Tour of Twenty Thanas যেখানে তিনি নিজে তার স্বপ্ন এভাবে ভেঙে গেছে বলে স্বীকার করেছেন, সেই পুস্তিকাটি সাধারণত একাডেমি যারা দেখতে আসেন, তাদের দেখানো হয় না। রাঙ্গুনিয়ার সমবায়গুলোর রঙ একটু ভিন্ন ধরনের। এখানকার উদ্যোগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কুমিল্লার কাঠামো থেকে খুব ভিন্ন নয়, কিন্তু মানুষগুলোর ভিন্ন রূপ দেখা যায়। এখানকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা যে কেউ এসে দেখতে পারেন, যা খুশি দেখতে পারেন, এখানে অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে বিশদ আলোচনা হয়, বিভিন্ন ফোরামে যেখানে চাষী, ছাত্র (ও অনেক ছাত্রী) এবং সরকারি কর্মচারী সবাই একত্রে সমানে-সমানে অংশগ্রহণ করেন এবং এখানকার যুবসমাজ প্রচুর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কাজ করছে। এখানকার চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি ক্রমে চট্টগ্রামের অন্যান্য থানায় ছড়াচ্ছে এবং নিজস্ব দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া সৃষ্টি করছে, যেখানে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এবং প্রগতিশীল সম্প্রদায় পরিবর্তনের পক্ষে চাপ দিচ্ছে। গুরুদাসপুরের গণমিলনে আসুন, যেখানে স্থানীয় যুবসমাজ সমাজ উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে পরীক্ষা করছে সমবায় গড়ে, গণশিক্ষার প্রোগ্রাম নিয়ে, কুটির শিল্প গড়ে। এদের মৌলিক সমাজদর্শন এখনো স্পষ্ট হয়নি, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই এরা সমাজের নেতা হয়ে গেছেন এবং এতে স্বার্থান্বেষী মহল ও ঢাকার সরকারি আমলারা পর্যন্ত বেশ বিচলিত হচ্ছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের কচুবাড়ী-কৃষ্টপুর গ্রামে আসুন, যেখানে স্থানীয় হাইস্কুল ও কলেজের ছাত্রেরা গ্রাম থেকে টিপসই একেবারে উঠিয়ে দিয়েছে। সাত বছরের ওপরে প্রত্যেক গ্রামবাসী এ গ্রামে এখন অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত এবং নিজেদের নাম সই করতে পারে। এ কৃতিত্ব যুব উদ্যোগের একটি নতুন মান সৃষ্টি করেছে, যা ঠাকুরগাঁওয়ের আরো কয়েকটি এবং দেশের অন্যত্র কয়েকটি গ্রামের যুবসম্প্রদায় নিজেদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। অন্যান্য গ্রামে যাওয়ার পথে আপনারা বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে নামতে পারেন, সেখানে তিতুমির হোস্টেলের ছাত্ররা তাদের শিক্ষার খরচের জন্য অভিভাবকদের ওপর আর্থিক চাপ দূর করতে নিজেরাই ধান, মাছ ও কলা চাষ করছে, শার্ট, লুঙ্গি, শাড়ি ও বিছানার চাদর বুনছে এবং এ কলেজের অন্যান্য হোস্টেল— ছাত্র ও ছাত্রী উভয়েই— এ পথপ্রদর্শক উদ্যোগের সঙ্গে শামিল হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। রংপুরের কুঁজিপুকুর গ্রামে যান, যেখানে একজন স্থানীয় সরকারি কর্মচারী স্বনির্ভর আদর্শে গ্রামের আর্থসামাজিক উন্নয়নের উদ্যোগ প্রণোদিত করেছেন। এ গ্রামও টিপসই থেকে মুক্ত হয়েছে, এর সমবায় সমিতি আগে বাইরে থেকে যা ঋণ নিয়েছিল তা সব পরিশোধ করছে, গ্রাম থেকে ভিক্ষা ও বেকারত্ব দূর করেছে, প্রত্যেক গ্রামবাসীর জন্য বাসস্থান তৈরি করেছে, বর্গাচাষীর ভাগ শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগে তুলেছে এবং গ্রামের উন্নয়নকাজ তদারক করার জন্য কর্মী-ব্রিগেড তৈরি করেছে— সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য, নিয়মিতভাবে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য, প্রতিবেশী গ্রামগুলোতে তারা কী করছে বলার জন্য, অন্য গ্রাম থেকে তাদের গ্রামের উদ্যোগ দেখতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য এবং অন্য গ্রামের জনগণকে এ রকম উদ্যোগ নিতে সাহায্য করার জন্য। সবশেষে ইরি— ২০ ট্রেনে চেপে দেখুন, ছাত্ররা কী করছে— ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছাত্র একটি পাইলট প্রজেক্টে চাষীদের সঙ্গে মাঠে দৈহিক শ্রম দিচ্ছে, যে প্রজেক্টে স্বেচ্ছাসেবক সমাবেশ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি, এমন একটি সম্প্রদায় থেকে, যাদের মধ্যে অনেকে হাইজ্যাকার ও পথভ্রষ্ট তরুণদেরই বেশি দেখেন।

আরো অনেক এ রকম উদ্যোগ নিশ্চয়ই আছে, যার কথা আমরা জানি না। কোনো কোনো উদ্যোগ হয়তো অকালে মরে গেছে। অন্য কোনো উদ্যোগ, এমনকি যেগুলোর কথা ওপরে উল্লেখ করেছি, তাদের কোনোটা হয়তো এভাবে হঠাৎ শেষ হয়ে যাবে। কোনোটা হয়তো প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে পড়ে বিপথে মোড় নেবে— সব উদ্যোগেরই প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এমনিতেই দেশের পরিধির তুলনায় এ ধরনের উদ্যোগের সামগ্রিক আয়তন বোধ হয় খুবই ছোট। কিন্তু তবু এগুলো বাঙালি মনের দৃঢ়তার, একটির পর একটি দুর্যোগের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা ও তার কল্পনাশক্তির পরিচয়। এ মন যে এখনো বেঁচে আছে, চিন্তা করছে এবং গঠনমূলক উদ্যোগ নিচ্ছে, তার পরিচয়, যে পরিচয় পরিকল্পনাবিদদের কাছে গতানুগতিক যে পরিসংখ্যান আছে, যা দিয়ে গতানুগতিক পরিকল্পনা রচিত হয়, তাতে পাওয়া যায় না, কিন্তু যে পরিচয় জাতির উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য একেবারে অপরিহার্য।

আমাদের এত তাক লাগিয়ে দেয়া একাডেমিক ট্রেনিং সত্ত্বেও আমরা উন্নয়নের ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সত্যিকারের সৃষ্টিশীল কোনো সংজ্ঞা পাইনি। অ্যাংলো-স্যাক্সন জগতের কল্পনাশক্তিহীন অর্থনীতিবিদ মহল আমাদের উন্নয়নচিন্তাকে জাতীয় আয় বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে ভীষণ চেষ্টা করেছে। এটি ডাস্টবিনের আবর্জনা এবং একে এভাবেই দেখা উচিত। উন্নয়নের অর্থ মানুষের সৃষ্টিশক্তির মুক্তি, আর এ মুক্তির পরিকল্পনাই হলো উন্নয়ন পরিকল্পনা। কতগুলো রেলওয়ে ওয়াগন আমদানি করতে হবে, কত মাইল রাস্তা তৈরি করতে হবে এবং কতখানি জমি দেশী ধানের চাষ থেকে উচ্চফলনশীল ধানের চাষে আনতে হবে, এগুলো সব উন্নয়ন অ্যাকাউন্টিংয়ের কাজ, যে কাজ দক্ষ অ্যাকাউন্ট্যান্টরা করবেন। পরিকল্পনাবিদদের কাজ মানুষের আত্মা যে দরজায় আঘাত করছে, তা কী করে খোলা যায় তার পরিকল্পনা করা। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সফর করুন, এ করাঘাত শুনতে পারেন। হয়তো এ আঘাত এখনো সংখ্যায় কম এবং তার দর্শন এত স্পষ্ট নয়, কিন্তু দরজা খুলে এ আত্মাটিকে মুক্ত করুন, তাকে উঁচুতে তুলে ধরুন, যাতে সে তার পারস্পেকটিভ দেখতে পায়, তারপর তাকে সামনে ধাবিত হতে দিন। কেবল এভাবেই বাংলাদেশ তার কীর্তির শীর্ষে উঠে সমস্ত বিশ্বকে অবাক করে দিতে পারে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভীষণ পরিশ্রম করে আমাদের পরিকল্পনাবিদরা একটি খসড়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। এরা নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি এবং অত্যন্ত প্রতিভাবান ও বিশ্লেষণ-দক্ষ। নিজ নিজ বিষয়ে তারা বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তুলনীয়। সমস্ত বাংলাদেশ সরকারের আর কোনো মন্ত্রণালয় নেই, যেখানে দেড় বছর ধরে এত সৎ, নিবেদিত ও কঠোর পরিশ্রমী টিমওয়ার্ক দেখা গেছে, যেখানে দেশের রাজধানীতে সাধারণ পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে নীতিভ্রষ্ট হয়ে গেছে। জাতির কাছে এই নিবেদনের স্বীকৃতি এদের প্রাপ্য এবং যে অবদান এদের কাছ থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা মনে রাখার যোগ্য। কিন্তু এদের গ্রামে যেতে হবে নিজেদের শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে এবং সত্যিকার উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য যে পরিসংখ্যান প্রয়োজন তা সংগ্রহ করতে— মানুষের এবং তার মন ও মানসের পরিসংখ্যান। আট-দশ জনের গ্রুপে ভাগ হয়ে যান, র্যানডমভাবে তিনটি গ্রাম বেছে নিন এবং প্রতিটি গ্রামে এক মাস করে থাকুন। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মেঝেতে একটি মাদুর পেতে নিন, মশা সহ্য করতে না পারলে একটি মশার কয়েল রাখুন— এর বেশি নয়। গ্রামে গ্রামবাসীর মতো থাকুন, তাদের সঙ্গে দিনে কয়েক ঘণ্টা করে মাঠে কাজ করুন, কাজ করতে করতে তাদের সঙ্গে কথা বলুন, অন্য সময় কথা বলুন তাদের একেকজনের সঙ্গে এবং তাদের একেকটি গ্রুপের সঙ্গে। সন্ধ্যার পর যতক্ষণ সম্ভব বাইরে থাকুন। রাত যখন গভীর হতে থাকবে, তখন দিনের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গ্রামের সামাজিক মানস আপনার কাছে প্রতিভাত হতে থাকবে। তখন, কেবল তখনই, বাংলার চাষীর সম্ভাবনা আপনার কাছে ধরা পড়বে। এভাবে তিনটি গ্রামে থাকুন এবং আরেকটি মাস একটি শিল্পাঞ্চলে থাকুন শ্রমিকদের সঙ্গে। এ শ্রমিকেরাই— কোনো ফ্যাক্টরি বা মেশিন নয়— আরো যথাযথভাবে বলতে হলে এ শ্রমিকদের মন ও মানসই আমাদের শিল্পের ইতিহাস দৃষ্টি করবে। এ মন ও মানসকে এর ভেতরে যে শক্তি আর কল্পনা লুকানো আছে, তাকে স্টাডি করুন— সে যখন সকালে ফ্যাক্টরিতে যায়, তখন তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এবং তার অপ্রস্তুত কথাবার্তা শুনতে শুনতে, ফ্যাক্টরিতে সে যখন কাজ করে, তখন তার কাজে একটি হাত এগিয়ে দিয়ে আবার তার কথা শুনতে শুনতে এবং তারা ইতিহাস সৃষ্টি করতে কোথায় বাধা পাচ্ছে তার খোঁজ করুন।

চার মাস পর ফিরে এসে খসড়া পরিকল্পনাটি আরেকবার দেখুন। আপনারা তখন এটিকে বদলাতে চাইবেন, আর যতখানি বদলাতে চাইবেন, তা আপনাদের আজকের অক্ষমতার পরিমাপ দেবে। দুর্ভিক্ষের প্রতি সরকারের প্রত্যুত্তর হয়েছে— ক. মজুদদার, কালোবাজারি ও চোরাচালানকারীদের তাদের পেশা ত্যাগ করতে বলা; খ. অনাহারীদের খাওয়ানোর ভঙ্গি করার জন্য লঙ্গরখানা খোলা; আর গ. আন্তর্জাতিক সাহায্যের জন্য ভিক্ষার ঝুলিটি আরো এগিয়ে দেয়া।

এর কোনোটিই একক বা সম্মিলিতভাবে সংকটের কোনো সমাধান নয়।

ক. একটি কাঠামোগত গলদ

মূলত মজুদদারি, কালোবাজারি ও চোরাচালানকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বলা হলেও দ্রব্যাদির দুষ্প্রাপ্যতা যখন দুষ্প্রাপ্য দ্রব্যাদির ওপর অধিকারের এমন একটি কাঠামোর সঙ্গে মিলিত হয়, যার সঙ্গে দ্রব্যাদির চাহিদার কাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই, তখন এ ধরনের আচরণ ব্যক্তিস্বার্থের পূজারিদের অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত আচরণই। এ ধরনের ‘সমাজবিরোধী’ কার্যকলাপ এটাই দেখিয়ে দেয় যে, যখন মানুষ অনাহারে মরছে তখনো উদ্বৃত্ত (খাদ্য) রয়েছে। এ ধাঁধার সহজ ব্যাখ্যা এই যে, একদিকে কোনোমতে বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু খাদ্য প্রয়োজন অনাহারী যারা তাদের এটুকুর ওপরেও কর্তৃত্ব নেই, অন্যদিকে যারা এগুলোর ওপর কর্তৃত্ব করছে, তাদের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি আছে এবং এর থেকে তারা শুধু ব্যক্তিগত সুবিধাই লুটে নিচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রধান খাদ্য চালের চাহিদার কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিহীন এ দ্রব্যটির ওপর কর্তৃত্বের কাঠামোর এ অবস্থাটি কয়েকটি ব্যাপারের সমন্বয়ে হয়েছে:

ক. জমির মালিকানার একটি প্যাটার্ন যাতে সরাসরি উৎপাদন থেকেই বেশ কিছু অংশ পরিবারের প্রয়োজনের ওপর উদ্বৃত্ত হয়ে প্রবাসী ভূস্বামী ও উদ্বৃত্ত চাষীর হাতে জমা হয়;

খ. আর্থিক পরিস্থিতির চাপ, যা অনেক গরিব চাষীকে তারা যা ধান উৎপাদন করে তার অনেকখানিই তাদের ঋণ শোধ করার জন্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করার জন্য ফসল কাটার পর পরই, এমনকি তার অনেক আগেই পানির দামে বিক্রি করে ফেলতে বাধ্য করে যদিও এ ধান তাদের নিজেদেরই খাবারের জন্য প্রয়োজন; এর থেকে লাভবান হয় মহাজন, ফড়িয়া, জোতদার এবং অন্য যারা এসব ক্ষুদ্র চাষীর দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের উদ্বৃত্ত আরো বাড়াতে পারে, যখন অদৃষ্টের পরিহাসে চাষীরা নিজেরা অর্থাৎ উৎপাদকরাই পরে খুচরা বাজার থেকে অনেক বেশি দামে চাল কিনতে এবং ফলে ঋণ করতে বাধ্য হয়।

গ. একশ্রেণীর ভূমিহীন মজুরের অস্তিত্ব, যারাও তাদের শ্রম দিয়ে খাদ্য উৎপাদনে অবদান রাখে, কিন্তু শ্রমের সরবরাহ ও চাহিদা দ্বারা নির্ধারিত যে মজুরি তারা পায় তার সঙ্গে ফটকাবাজদের মর্জিমাফিক নির্ধারিত খাদ্যমূল্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এ গ্রামীণ প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর কর্মসংস্থানের কোনো নিশ্চয়তা নেই, বিশেষ করে বন্যা, অতিবৃষ্টি বা খরার সময় যখন জমিতে কাজ একেবারে কমে যায় বলে তাদের খাদ্যের ওপর কর্তৃত্বও একেবারে কমে যায় এবং অদৃষ্টের পরিহাসে তখন খাদ্যমূল্যও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

যে সমাজে নৈতিকতার মূল সুর মানুষের ‘নিজ’কে কেন্দ্র করেই বাজে, সে সমাজে যারা বিভিন্ন উপায়ে উদ্বৃত্ত খাদ্যের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারে, তারা এ ক্ষমতা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করতেই ব্যবহার করবে এবং ফটকাবাজি, মজুদদারি, কালোবাজারি ও চোরাচালান চালিয়েই যাবে। আবেদন করে কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে; এমনকি পুলিশ অথবা মিলিটারি অপারেশন চালিয়েও এটা থামানো যাবে না। কথায় বলে, রাঘববোয়ালরা লাফিয়ে জালের বাইরে চলে যায়, চুনোপুঁটি পালায় পানির ফাঁক দিয়ে; ধরা পড়লে পড়ে মাঝারিগুলোই। কিন্তু রাঘববোয়ালেরা যদি বহাল তবিয়তে থাকে, তবে মাঝারিগুলোর শূন্যস্থান আবার পূর্ণ করা যায়।

তাই অনাহার ও উদ্বৃত্ত খাদ্য (মজুদদারি ও চোরাচালান অথবা দেশের বাইরে রফতানির জন্য) যে একই সঙ্গে বিরাজ করে, তার কারণটি কাঠামোগত এবং এ সমস্যার মোকাবেলাও কাঠামোগতভাবেই করতে হবে। দেশের খাদ্যোৎপাদনের ওপর কর্তৃত্বের মৌলিক কাঠামোটি বদলানো ছাড়া এ সদস্যার কোনো সমাধান নেই। যদি দেশের কর্তৃত্বে একটি কার্যকরী ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক যন্ত্র থাকত, তাহলে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা ও রেশনিং পদ্ধতি দ্বারা এটি করা যেত। কিন্তু তা নেই, অতএব এটি কোনো সমাধান নয়। একমাত্র কার্যকর বিকল্প হলো সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর প্রাথমিক জনগোষ্ঠীর (প্রাইমারি কমিউনিটি) হাতে খাদ্যশস্যের কর্তৃত্ব হস্তান্তর করা, এ জনগোষ্ঠীকে বলা শস্যের বণ্টন যাতে ন্যায্য হয়, তা সুনিশ্চিত করতে এবং প্রতি জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে সবচেয়ে দুর্দশাপীড়িত সদস্যদের বলা কোনো রকম অন্যায় সুযোগ বা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে।

এ রকমভাবে জনগণের কাছে, বিশেষ করে আমাদের নিম্নস্তরের জনগোষ্ঠীর কাছে, সরাসরি ক্ষমতা হস্তান্তর বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। মজার কথা হলো, দেশের বর্তমান শাসক পার্টিরই নেতৃত্বে একাত্তরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এ পদ্ধতির দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি, যখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো সম্পদ যাতে পাচার না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য এ নেতৃত্ব জনগণকে আহ্বান করেন, তাদের সতর্ক থাকতে বলেন, যাতে ব্যাংক থেকে টাকা ওঠানোর যে সীমা এ পার্টি নির্ধারণ করে দেয়, তা কেউ লঙ্ঘন করতে না পারে ইত্যাদি। স্মরণ করা যেতে পারে, জনগণ এ আহ্বান নজির সৃষ্টি করার মতো সাড়া দিয়েছিল এবং এমন দক্ষতা ও শৃঙ্খলা দেখিয়েছিল, যার জন্য তারা গর্ব করতে পারত। যদি সেই একই নেতৃত্ব আজকে দেশের বর্তমান সংকটে জনগণের কাছে আবেদন না করে মজুদদার, কলোবাজারি ও চোরাচালানিদের কাছে আবেদন করছেন, যারা নেতৃত্বের নিজেদের কথা অনুযায়ীই জনগণের শত্রু এবং শুধু প্রশাসনিক সমাধানের কথাই বলছেন, তারা যে এ সংকট মোকাবেলায় শুধু ব্যর্থ হবেন তা-ই নয়, তারা এও প্রমাণ করছেন যে, একাত্তরের পর তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে এবং আজকে তারা জনগণের থেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন যে, জনগণকে আর বিশ্বাসই করতে পারছেন না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক, কারণ মানব ইতিহাসে এ রকম দৃষ্টান্ত নেই যে, কোনো নেতৃত্ব জনগণের ওপর আস্থা ন্যস্ত করে প্রতারিত হয়েছে, ইতিহাসের রেকর্ড বরং বারবার এর উল্টোটাই হয়েছে।

খ. লঙ্গরখানা

একটি লঙ্গরখানার বিশেষ চরিত্রটি হলো এই যে, এখানে লাঠি হাতে কিছু মানুষ শত শত নর-নারী ও শিশুর মধ্যে একেবারে অপরিমিত পরিমাণে খাদ্য ও আধাখাদ্য বিতরণ করে। বিভিন্ন কারণে শহরের লঙ্গরখানাগুলো গ্রামের লঙ্গরখানাগুলোর চেয়ে বেশি খাবার দিতে পারে; সদর দপ্তরের কাছে থাকার জন্য এরা সরকারি সরবরাহের বণ্টনে অগ্রাধিকার পায়; আরো অগ্রাধিকার পায় এজন্য যে, বিদেশে প্রচারের জন্য এগুলোতে বিদেশী অতিথি, সাংবাদিক ও টেলিভিশনের ফটোগ্রাফারদের নিয়ে আসা হয়; গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরের কেন্দ্রগুলোতে বেসরকারি সাহায্যও বেশি আসে। যত বেশি গ্রামাঞ্চলের ভেতরে যাওয়া যায়, সরবরাহের অবস্থাও তত খারাপ হতে থাকে। রংপুরের ইউনিয়নগুলোতে আমি দেখেছি, চার, পাঁচ, ছয় মাইল দূর থেকে শত শত অনাহারী মানুষ আসে এবং সারা দিন বসে থাকে শেষ পর্যন্ত মাথাপিছু একটিমাত্র চাপাতি পাওয়ার জন্য, যার ওজন দৈনিক আটা সরবরাহ ও মাথা গুনতি অনুযায়ী বাড়ে-কমে। এগুলো আবাসিক লঙ্গরখানা নয় এবং গ্রাম থেকে লঙ্গরখানায় আসা ও গ্রামে ফিরে যাওয়া বাবদ লঙ্গরখানায় যে পরিমাণ ক্যালরি পাওয়া যায়, তা চেয়ে বেশি ক্যালরি খরচ হয়ে যেতে পারে। ক্ষুধার্ত মানুষগুলো স্বভাবতই আরো বেশি আশা করে এবং চায়। ফলে বিশৃঙ্খলা হয় এবং আমি ব্যবস্থাপকদের দেখেছি মানুষগুলোকে রীতিমতো প্রহার করতে যতক্ষণ না এই একগাদা মানুষগুলো কেঁদে-কঁকিয়ে বশ্যতা স্বীকার করে এবং শৃঙ্খলায় ফিরে আসে।

আমাদের বর্তমান অবস্থায় একটি সফল বণ্টন ব্যবস্থার চাবিকাঠি রয়েছে গ্রহীতাদের যৌথভাবে সংগঠিত করা এবং এভাবে সংগঠিত জনগোষ্ঠীকে বণ্টনের দায়িত্ব দেয়ার মধ্যে, প্রয়োজন হলে কিছুটা পরামর্শ ইত্যাদি দিয়ে। সমস্যাটা সমষ্টির এবং প্রাশসকেরা যদি নিজেরাই কে কতটা পাবে ঠিক করতে যান, তাহলে সবাই তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ সুবিধা আদায়ের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে যাবে এবং সবাই এ ধরনের সুবিধা পেতে পারে না বলে প্রত্যেকে একা একা যে বঞ্চনা অনুভব করবে, তার যোগফল একটি সার্বিক অসন্তোষের আকার ধারণ করবে। আর যদি ব্যাপারটি যৌথ দায়িত্বের ওপর দেয়া হয়, তাহলে ব্যক্তিগত বঞ্চনার চেতনা প্রথমে এ কারণে কমবে যে, সবাই জানবে দেয়ার মতো খুব বেশি নেই; দ্বিতীয়ত. সবার ওপরেই একটি সামাজিক দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ আসবে; তৃতীয়ত. বণ্টন ব্যবস্থাটি সবাই মিলেই ঠিক করবে বলে এর চেয়ে ন্যায়তর বণ্টন হয় না, এটি সবাই বুঝবে। এভাবে যৌথ দায়িত্বে যে সিদ্ধান্ত হবে, তা সবাইকে একই সমান চাপাতি দেবে না, কে কতদিন অনাহারে আছে এবং কার স্বাস্থ্য কতটা খারাপ তার ওপর হয়তো নির্ভর করবে কে কতটি পাবে, কিন্তু প্রত্যেকে জানবে যে, যে ব্যবস্থাটি হচ্ছে, তা তাকে ঠকাবে না এবং তার প্রয়োজন যখন তীব্রতম হবে, তখন এ ব্যবস্থা তারই পাশে এসে দাঁড়াবে।

সবশেষে লঙ্গরখানার শ্রমিকদের ভিখারি বানিয়ে ফেলে, যা মানুষকে মনুষ্যত্বহীন করে দেয়ারই শামিল। এ রূপান্তরের সামাজিক পরিণাম সুদূরপ্রসারী হতে পারে। কোটারির মাধ্যমে রিলিফসামগ্রী বণ্টন করে লঙ্গরখানার দুর্নীতিকেও ডেকে আনে। সেই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মানুষের বিবেকের কাছে এসব লঙ্গরখানার সরাসরি আবেদনের ফলে এমন সব সম্পদ হাতে আসে, যার হিসাব দেয়ার দায় থাকে না, আর সে কারণে আরো বেশি কালোপথে সেগুলো চলে যেতে চায়।

কাজেই লঙ্গরখানার সঙ্গে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ মেলানো যায় না। মৌলিক অর্থে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ বলতে বুঝতে হবে, জীবনরক্ষার জন্য প্রাথমিক অবলম্বনগুলোর চরম দুষ্প্রাপ্যতার ফলে মানুষের মনুষ্যত্ব হারিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা হয় এবং ক্ষমতাসীনদের দ্বারা মানুষের দুরবস্থা নিয়ে ব্যবসা করার যে খেলা শুরু হয়, তাকে প্রতিরোধ করা। অন্যান্য জিনিসের মধ্যে এর একটি অর্থ লঙ্গরখানাকেই প্রতিহত করা।

আরেকটি গ্রামে, গাইবান্ধায় গ্রামবাসীর একই ধরনের উদ্যোগ চলছিল এবং প্রায় সম্পূর্ণ সফলতা দাবি করা হয়েছিল। শুধু একটি বিশেষ মুসলিম গোষ্ঠীভুক্ত গ্রামবাসীকে একটি ছোট অংশ এ উদ্যোগের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল না। আমার সফরকালে সেই গ্রামেও একটি তাত্ক্ষণিক সভা হয়, যেখানে সেই দলটির নেতা বলেন, যখন দুস্থদের দেখাশোনার জন্য লঙ্গরখানা রয়েছে, তখন গ্রামের আর সবার খরচে তাদের সাহায্য করতে হবে কেন, এটি তার বোধগম্য নয়। আলোচনায় এ কথাও বেরিয়ে আসে যে, গ্রামটি খোদ ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বারেরই গ্রাম, যিনি তার নিজের কোনো বিশেষ কারণে গ্রামে রিলিফ আনবেনই। সভাটি ভিন্নমতধারক দলটিকে দিয়ে স্বনির্ভর প্রোগ্রামের সঙ্গে সহযোগিতা করাতে সক্ষম হয়নি, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও স্পষ্ট হয় যে, বাকি গ্রামবাসীর মধ্যে এর মধ্যেই যথেষ্ট আত্মগর্ব জাগ্রত হয়েছে; এদের অধিকাংশই আমাকে আশ্বাস দেন যে, তারা তাদের গ্রামকে সম্পূর্ণভাবে রিলিফ ও ভিক্ষাবৃত্তি থেকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করে যাবেন।

কুড়িগ্রামে একটি লঙ্গরখানায় দেখলাম, একজন ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার চাপাতি বাটোয়ারার তদারকে খুব ব্যস্ত। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি যে তামাশাটি পরিচালনা করছেন, তার থেকে কি বেশি গর্ব ও সম্মানবোধ করতে পারেন, না তার ইউনিয়নের গ্রামবাসী যদি যৌথভাবে দুস্থদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেয়, তাদের জন্য কাজ উদ্ভাবন করে এবং তাদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেয়, তাহলে বেশি গর্ব ও সম্মানবোধ করবেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করলেন যে, তিনি যা করছেন তা একটা তামাশাই এবং গ্রামবাসীকে mobilize করতে পারলে তা অনেক বেশি মূলবান কাজ হবে। কিন্তু তিনি যোগ করলেন, মানুষ তো স্বার্থপর এবং নিজের যা আছে তার ভাগ অন্যকে দিতে চায় না। আমি প্রস্তাব করি, এখানেই তো তার নেতৃত্বের পরীক্ষা। এতে তিনি আমার দিকে একবার তাকালেন এবং তারপর হঠাৎ উঠে পড়ে আবার চাপাতি বাটোয়ারার কাজ ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

গ্রামবাসীকে যোগযুক্ত করার এসব প্রচেষ্টার সাফল্য বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন নেই। এ যুক্তি দেয়া যেতে পারে যে, যে গ্রামগুলোর কথা বলা হলো তাদের চেয়ে আরো দুর্দশাগ্রস্ত গ্রাম রয়েছে, যেখানে এ ধরনের উদ্যোগ সব দুস্থ পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। এ কথাও বলা হচ্ছে না যে, বাইরের সাহায্য সবসময় প্রত্যাখ্যান করতেই হবে। কথা হলো এই যে, লঙ্গরখানাগুলো এখন যেভাবে চালানো হচ্ছে, তা মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেয় এবং এর চেয়ে অনেক মানবিকভাবে অবস্থার মোকাবেলা কার যেত গ্রামবাসীকে mobilize করে এবং এ দুঃসময়ে গ্রামের ভেতর ও বাইরে থেকে প্রাপ্ত সম্পদাবলি একসঙ্গে জড়ো করে গ্রাম সম্প্রদায়ের যৌথ দায়িত্বে সেগুলো ন্যস্ত করে, তাতে বণ্টন ব্যবস্থা আরো ন্যায় হতো, মানুষের আত্মসম্মান এবং সবার জন্য সবার একটা যৌথ দায়িত্বের চেতনা জাগ্রত হতো। ওপরে বর্ণিত অভিজ্ঞতাগুলো এতটুকুই বলে যে, এ ধরনের mobilization সম্ভব এবং তা একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে যা কোটারি দ্বারা পরিচালিত লঙ্গরখানার চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর, সম্মানজনক ও সম্মুখগামী। এগুলো এও দেখায় যে, গ্রামবাসীর মধ্যে মৌলিক মানবিক মূল্যবোধগুলো এখনো বেঁচে আছে এবং যথাযোগ্য নেতৃত্ব পেলে তারা প্রাধান্য পেতে পারে।

এ নেতৃত্ব এখনো আসেনি। আমার সফর করা রংপুরের গ্রামগুলোর যে প্রচেষ্টা চলছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন এবং চারপাশের নরম প্রোগ্রামগুলোর সঙ্গে এত কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন যে, এগুলো হয়তো বেশিদিন টিকবে না। জাতীয় নেতৃত্ব মনে হলো তৃণমূল পর্যায়ে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ বুভুক্ষু জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় করাতেই বেশি আগ্রহী। বাংলাদেশ এক ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি’ হয়ে যাবে বলে রাষ্ট্রদূত জনগণের ভবিষ্যদ্বাণী আজকে সত্য হয়ে গেছে আর অদৃষ্টের পরিহাস এই যে, বর্তমান দুর্ভিক্ষেই এ দেশে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক সাহায্য এসেছে। এ থেকে এ কথাই স্পষ্ট হয় যে, একটি উদ্দেশ্যসাধক নেতৃত্ব এবং যথাযথ প্রতিষ্ঠানাদি ছাড়া একটি জাতি অনাহার থেকে রক্ষা পেতে পারে না। দেশে প্রতিটি লঙ্গরখানায় বুভুক্ষু পরিবারদের লতজানু হয়ে যাওয়ার এবং বিদেশী ভিক্ষার জন্য জাতির নতজানু হয়ে থাকার চরম অসম্মানজনক দৃশ্য বর্তমান সংকটের কোনো সমাধানই দিতে পারে না।

এখন এ কথা সাধারণভাবে স্বীকৃতি যে, স্বাধীনতার পর থেকে দুষ্প্রাপ্য দ্রব্যাদি নিয়ে বেপরোয়া র্যাকেটিয়ারিং, যার পুঞ্জীভূত পরিণাম আজকের দুর্ভিক্ষ, বহুলাংশে ওপরতলার পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট হয়েছে। মনে হয় জাতির সম্পদ ও আয় আকাশছোঁয়া দামের মাধ্যমে, চোরাচালানির মাধ্যমে এবং বিদেশী সাহায্যলব্ধ সম্পদসহ সরকারি তহবিল তছরুপের মাধ্যম, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রিয়ভাজন এক সম্প্রদায়ের কাছে পুনর্বণ্টনের একটি নীতি নেয়া হয়েছে। এ সম্প্রদায়ের নেতারা লঙ্গরখানা খোলা আর বিদেশী সাহায্য চাওয়ার যে নীতি নিয়েছেন, যা বর্তমান দুর্ভিক্ষের কোনো উত্তরণই নয় এবং যা শুধু আরো দুর্নীতিরই পথ খুলে দেয়, এ নীতি উপরোক্ত ধারণাকেই সমর্থন করে।

অন্যান্য মহল, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়সহ এ সংকটের উত্তরণে রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধনের জন্য তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর’ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আবেদন জানাচ্ছে। এতে সমস্যাটির মূল স্পর্শ করা হয় না। আজকে দেশ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, সেগুলো তীব্রভাবে মতাদর্শভিত্তিক (ideological) এবং কেবল অভিন্ন মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করেই কার্যকর একতা আসতে পারে। এ না হলে যখনই বখরা নেয়ার মালগুলো চোখের সামনে এসে পড়বে, তখনই ঐক্যফ্রন্ট ধসে যাবে। আরো খারাপ যা হতে পারে তা হলো, এ ধরনের ঐক্যফ্রন্ট সমাজের বর্তমান শোষকদেরই সুবিধামতো তাদের পোশাক বদলানোার জন্য ‘কভার’ দিতে পারে।

[লেখকের ‘অপহূত বাংলাদেশ’ বই থেকে পুনঃমুদ্রণ ]

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ; প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য