১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয় মাসের মুুক্তিযুদ্ধ শেষে যখন আমরা স্বাধীন দেশে আসি, তখন দেশটির অবস্থা ছিল ভয়াবহ। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী বাংলাদেশ ছাড়ার আগে পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করে গেছে। তারা ব্রিজ ভেঙে দিয়েছে, কলকারখানা-পুঁজি বিনষ্ট করেছে। শস্য ক্ষেত ও ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে। মানুষ হত্যা করেছে। আত্মসমর্পণের আগমুহূর্তে দেশের সূর্যসন্তান হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবী ও মেধাবীদের ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। উদ্দেশ্য ছিল মেধার দিক দিয়েও আমাদের পঙ্গু করা, যাতে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারি। সুতরাং ভয়াবহ এক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে আমাদের উন্নয়ন যাত্রা হয়। আমাদের অবকাঠামো ছিল না, সেটি সামাজিক ক্ষেত্রে ছিল না, ভৌত ক্ষেত্রেও ছিল না।
তখন আমাদের সামনে মৌলিকভাবে যে ইস্যুগুলো ছিল, তার মধ্যে প্রধান হলো আমাদের স্বাধীনতাকে বিভিন্ন দেশ কর্তৃক স্বীকৃতি প্রদান। তখন পর্যন্ত পাকিস্তান, চীন, আমেরিকা ও সৌদি আরব আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি। আমাদের সামনে অন্যতম ইস্যু ছিল নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের শিল্প খাতের বৃহৎ শিল্পের (২৫ লাখ টাকার বেশি পরিসম্পদ) সবটুকুই জাতীয়করণ করা হয়। বৃহৎ শিল্পের মালিকানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ধনিক শ্রেণীর হাতে। তাদের ফেলে যাওয়া শিল্পের আর কোনো মালিক ছিল না। বাঙালি মালিকানাধীন বড় বড় পাটকল, বস্ত্রকলও সে সময় ১১ দফায় প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয়করণ করতে হয়েছে। শিল্প-কারখানার পাশাপাশি ব্যাংক-বীমাসমূহও আমাদের জাতীয়করণ করতে হয়েছে। কারণ এগুলো ছিল পরিত্যক্ত সম্পত্তি এবং এগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল আমাদের ব্যক্তি খাতে তখনো তৈরি হয়নি। আদর্শ ও বস্তুগত উভয় কারণেই সরকার এ জাতীয়করণ নীতি গ্রহণে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু বেতারে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানেও নতুন দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের একটি সম্ভাব্য রূপরেখার সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি ওই বক্তৃতায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন,
‘নতুন ব্যবস্থায় (অর্থাৎ তিনি যা প্রতিষ্ঠা করতে চান— লেখক) ইকুয়িটি ক্যাপিটালে শ্রমিকদের অংশ থাকা উচিত— মনোপলি এবং কার্টেলকে পুরোপুরি উত্খাত করা উচিত। কর কাঠামোকে সত্যিকারভাবে প্রগতিশীল করা উচিত এবং বিলাসপণ্য ভোগের ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা উচিত।— সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্রায়তন শিল্পকে বিকশিত করা উচিত এবং গ্রামের গভীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের ছড়িয়ে দেয়া উচিত যাতে করে অত্যন্ত তীব্রভাবে প্রয়োজনীয় কর্ম-নিয়োজন সুযোগ গ্রামীণ জনগণের দ্বারে পৌঁছে যায়।— পাট বাণিজ্যেও জাতীয়করণ পাটকে সমগ্র অর্থনীতিতে তার যোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম করবে।’ [দেখুন, শেখ মুজিবুর রহমান, ‘বাংলাদেশ মাই বাংলাদেশ, সিলেক্টেড স্পিচেস অ্যান্ড স্টেটমেন্টস, সম্পাদনা রামেন্দু মজুমদার।]
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যে ব্যাপক জাতীয়করণ (প্রায় ৯২ শতাংশ শিল্প!) নীতি অনুসৃত হয়েছিল, তার কারণ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাম শক্তির ভূমিকা, শাসকদলের অভ্যন্তরে পেটি বুর্জোয়া শক্তির প্রাধান্য, বাঙালি বুর্জোয়াদের দুর্বলতা এবং মুত্সুদ্দি ও বিদেশী বুর্জোয়াদের পলায়নের পটভূমিতে এ ব্যাপক জাতীয়করণ নীতি ঘোষিত হয়েছিল। বস্তুত এর প্রতিটি উপাদান তদানীন্তন জাতীয়করণ নীতির পক্ষে বিষয়গত ও বিষয়ীগত অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
যেহেতু আমরা সমাজতন্ত্র করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তাই স্বাভাবিকভাবে শিল্পক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানার অবসান ছিল প্রত্যাশিত এবং সেটি গ্রহণও করা হলো। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে কী পরিকল্পনা নেয়া হবে, সেটি নিয়ে একটি বিতর্ক ছিল। কেউ কেউ সিলিং আরোপ করে উদ্বৃত্ত ভূমি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সিলিং কত হবে, সেটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের মধ্যেই নানা বিতর্ক ছিল। পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করে বেশ উঁচুতে ১০০ বিঘা সিলিং নির্ধারিত হয়। বলা হয়েছিল, পরিবারপ্রতি ১০০ বিঘা জমির মালিক হওয়া যাবে। কিন্তু পরিবারের সংজ্ঞা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। যদি পরিবারের সংজ্ঞা ধরা হয়, পুত্র-কন্যা-জামাই-পুত্রবধূ-নাতি-নাতনী, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু যদি পুত্র একটি পরিবার, কন্যা একটি পরিবার হয়, তবে প্রত্যেকে ১০০ বিঘা করে জমি রাখলে, তার পরিমাণ বেড়ে যাবে। তাহলে ভূমি সংস্কার হবে না। সুতরাং ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে পরিবারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করাটাই হয়ে গেল বিতর্কের মৌলিক কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারের সংজ্ঞা হিসেবে নিউক্লিয়ার ফ্যামেলি ধরে পুত্র-কন্যাকে আলাদা করে দিলে ভূমি সংস্কার অর্থহীন হয়ে যাবে। আর যদি পরিবারের সংজ্ঞা বদল না করে ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমি রাখতে দেয়া হতো, তাহলেও ভূমি সংস্কার উঁচু সিলিংয়ের কারণে খুব বেশি ফলপ্রসূ হতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও উত্তরাঞ্চলের সংসদ সদস্যদের চাপে পরিবারের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে ভূমি সংস্কার কার্যক্রমকে এক প্রকারে রুদ্ধ করে দিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বত্র আওয়ামী লীগের নেতা ও বামপন্থীদের কারো কারো মধ্যেও একটি বিশ্রাম ও ভোগের মানসিকতা গড়ে উঠেছিল। অনেক কষ্ট-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করেছি, এখন আমাদের পাওয়ার সময়, একটু আরাম করার সময়, এ ধরনের প্রচ্ছন্ন মনোভাব সৃষ্টি হয়। আবার নিচের দিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশ গঠনের জন্য আরো আত্মত্যাগ-সংগ্রাম-কৃচ্ছ তাসাধনের প্রস্তুতি থাকলেও উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে তারাও নিশ্চুপ হয়ে বসেছিল। রাজনৈতিক কর্মী, এমনকি অনেক মুক্তিযোদ্ধার মধ্যেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে একটি প্রশ্ন এসে যায়, তাহলে আমরা কী করব? উৎপাদন তো কম। সংকট আছে। বাইরে থেকে আমদানি বা বিপুল সাহায্য পাওয়ারও উপায় নেই। কিন্তু পাওয়ার চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে অসীম। ফলে বেশি বেশি পাওয়ার জন্য যারা শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, তারা লাইসেন্সবাজি শুরু করলেন। ফেয়ার প্রাইসের দোকান থাকলেও সাধারণ মানুষের লাইন বাইপাস করে দলঘনিষ্ঠরা পেছন দিক দিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে নিতে থাকলেন। পাবলিক সেক্টরে উৎপাদিত পণ্যের দাম কম রাখার একটি নীতি তখন গ্রহণ করা হয়। এর পেছনে কারণ ছিল, আমরা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব, মানুষকে কম দামে পণ্য জোগান দেব, লাভ কম করব ইত্যাদি ধরনের সহজ বুঝ। চাহিদার চাপে জোগান মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে যেত। পণ্যের চাহিদা ছিল অনেক বেশি, বাজারে জোগান ছিল কম, এ অবস্থায় দাম ফিক্সড করে রাখায় কোনো লাভ হয়নি। এ সুযোগ ব্যবসায়ীরা গ্রহণ করেন। তারা রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা থেকে কম দামে পণ্য কিনে অনেক অনেক বেশি দামে তা বিক্রি করে স্ক্যারসিটি প্রিমিয়াম পকেটস্থ করে। যদি দাম বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উঁচুতে রাখা হতো, তাহলে কিন্তু স্ক্যারসিটি প্রিমিয়ামটি রাষ্ট্রের হাতে থাকত, তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক হয়ে যেত। কিন্তু সেটি রাষ্ট্রের হাতে আর থাকেনি। এখানে ভোক্তারাও খুশি ছিল না, কারণ তারা রাষ্ট্র নির্ধারিত দামে কোনো পণ্যই পায়নি। একে বলা হয় ‘লাইসেন্সবাজ’। দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি এভাবে গেড়ে বসেছিল। সুতা আমদানির লাইসেন্স পেলে একটি লোক রাতারাতি বিরাট বড়লোক হয়ে যেত। বাজারে সুতার সংকট ছিল। তখন আমরা ৪ টাকা ৭৬ পয়সায় ১ ডলার পেতাম। অল্প টাকা দিয়ে ডলার কিনে তা দিয়ে সুতা আমদানি করে বহুগুণ দামে বিক্রি করতে পারত এ লাইসেন্সধারীরা। লাইসেন্সগুলো দেয়া হতো ক্ষমতার কাছাকাছি ব্যক্তিদের। এসব বিষয়কে আমি বলব একটি সঠিক নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৌশলগত বিভ্রান্তি। সমাজতন্ত্রের নামেই এ বিভ্রান্তি। আমাদের ন্যায্যমূল্যে পণ্য দিতে হবে, আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার পণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না, বাজারকে আমরা বিশ্বাস করি না ইত্যাদি আমরা বললাম ঠিকই, কিন্তু জনগণ তো মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে ন্যায্যমূল্যে জিনিসও পেল না। সমাজতন্ত্রকে ডেলিভার করতে হবে, নাহলে সমাজতন্ত্র টিকে না।
সত্তরের দশকে আরেকটি বিষয় ছিল, তাহলো পণ্য আমদানির ওপর উচ্চ শুল্ক। এর পেছনে যুক্তি ছিল স্বনির্ভর দেশ গঠন। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে আমদানি প্রতিস্থাপনযোগ্য পণ্য উৎপাদন। আমরা এখন স্থানীয় শিল্প গড়ে তুলব, সুতরাং এখানে আমরা বেড়া দিয়ে রাখব সব জায়গায়, যাতে বাইরের কেউ প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু শুল্ক বেড়া দিয়ে রাখলে দুটো ফল হয়। প্রথমত. বিদেশী পণ্য আমদানি বা বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দিয়ে স্থানীয় মুদ্রার অতিমূল্যায়ন হয়। দ্বিতীয়ত. স্থানীয় মুদ্রা অতিমূল্যায়িত হয়ে গেলে রফতানির ওপর বিদেশীদের আগ্রহ আর থাকে না। ফলে বাংলাদেশে তখন শ্রমঘন রফতানি শিল্প আর তৈরি হলো না, সামান্য হলেও বিস্তার লাভ করল পুঁজিঘন আমদানিবিকল্প শিল্প। পুঁজিঘন আমদানিবিকল্প শিল্প আবার বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়। এদিক থেকে হীতে বিপরীত হয়ে গেল, সমাজতান্ত্রিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হলো। স্বয়ম্ভরতার জন্য শুল্ক আরোপ করে যে নীতি নেয়া হলো, তা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈষম্য নিরসন নীতির সহায়ক হলো না। সে সময়ে আমরা যদি শ্রমঘন রফতানিমুখী শিল্পে যেতাম, তাহলে অনেক লোক দ্রুত চাকরি পেত। তখন ৭৪ শতাংশ মানুষ ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। তারা সস্তা মজুরিতে চাকরি পেলে তাদের আয় আগের তুলনায় বাড়ত এবং ন্যূনতম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারত। পাশাপাশি যদি রাষ্ট্র প্রবৃদ্ধির অংশকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে নিয়ে যেতে পারত, তাহলে অর্থনীতিতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুষম বণ্টন একই সঙ্গে সম্পন্ন হতো।
কিন্তু আমরা তখন পর্যন্ত ক্ল্যাসিক্যাল সমাজতান্ত্রিক মডেলেই বিকাশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। বিশ্বায়নের মধ্য থেকে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার সাম্প্রতিক চৈনিক প্রয়োগবাদী উন্নয়ন কৌশলের কথা আমরা তখন ভাবতেই পারিনি, আমরা গেলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বার্টার ট্রেড করে অগ্রসর হতে, সেই নীতিতে ভারতের মতো ভারী শিল্প হয়তো গড়ে তোলা যেত, কিন্তু তাতে পুঁজি লাগত অনেক বেশি, কর্মসংস্থান হতো খুবই কম।
উচ্চ শুল্কের আরেকটি খারাপ দিক হলো চোরাচালান। বিদেশী জিনিসের দাম এখানে বেশি হয়ে গেল এবং অনেক বিদেশী জিনিস আমদানি নিষিদ্ধও ছিল। ফলে যেটি দাঁড়াল, অনেক পণ্য ভারতে আসত এবং সেখান থেকে পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসত এবং ধনিক শ্রেণী সেগুলো ব্যবহার করত। মূলত ধনীদের জন্য এসব পণ্য স্মাগলিং হতো। বিদেশী পণ্যের চাহিদা ধনীদের মধ্যে ছিল। স্বাধীনতার পর বিদেশী সাহায্য নিব কি নিব না, সেটি নিয়ে বিতর্ক চলছিল। তাজউদ্দীন আহমদ সঠিকভাবেই বললেন, ‘বিদেশী সহায়তা নিয়ে সমাজতন্ত্র হয় না।’ শেখ মুজিবুর রহমান এর পরও তাজউদ্দীনকে বুঝিয়ে বিদেশে পাঠালেন, বললেন আমাদের বিদেশী সাহায্য লাগবে। তাজউদ্দীন ওয়াশিংটন গেলেন, বিদেশী দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। কিছু সাহায্য আসা শুরু করল। সাহায্য দাতা সংস্থা ও দেশগুলো যে কায়দাটি গ্রহণ করে, তা হলো ‘প্রথমে নরম, পরে গরম’। প্রথমে দেদার অর্থ দেয়ার সময় কোনো শর্ত দেয়া হয় না। বলা হয়, ধীরে ধীরে সবকিছু ফেরত দিলেই হবে। পরে ঋণ দিয়ে নির্ভরশীল করে ফেলার পর প্যাঁচ দিতে থাকবে এবং বলে, এসব সংস্কার না করলে বা নীতি না নিলে অর্থ দেব না। প্রথমে আমাকে নির্ভরশীল করবে, পরে নীতি পরিবর্তনের চাপ দেবে, এটাই তাদের কৌশল। তাজউদ্দীন বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি বললেন, দ্বিপক্ষীয়ভাবে আমরা বিশ্বব্যাংকের মুখোমুখি হব। তখন প্যারিস কনসোর্টিয়ামে যেতে হতো, সেখানে দরকষাকষি করে সাহায্য ঠিক হতো। তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, বৈঠক হবে ঢাকায় এবং দ্বিপক্ষীয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক সেটি মানেনি। ফলে প্যারিসে গিয়েই আমাদের সহায়তা নিয়ে আসতে হতো, যাতে আমাদের ওপর শর্তারোপ তাদের জন্য সহজতর হয়। এ পদ্ধতিতে তারা কাজটি আদায় করে নেয়। তার পরও স্বীকার করতে হবে যে সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে তারা তেমন কোনো প্রতিকূল শর্তারোপ করতে পারেনি। তারা সরকারের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে— এখানে দুর্নীতি হচ্ছে, এখানে ভুল অর্থনৈতিক নীতি হচ্ছে প্রভৃতি। তারা এমনও প্রতিবেদন দিয়েছে, দেশ চালানোর কোনো যোগ্যতা নেই মুজিব সরকারের। মোট কথা হলো, শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের ব্যাপারে তারা সুখী ছিল না।
সত্তরের দশকে যেহেতু পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল, সেহেতু বড় আকারের মুদ্রাস্ফীতি হলো। মুদ্রাস্ফীতি হওয়ায় চাকরীজীবী-মধ্যবিত্তের ফিক্সড আয় কমে গেল। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা গেল। অবশ্য দুর্ভিক্ষ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল আমেরিকার খাদ্য কূটনীতি। আমাদের তখন প্রতি বছর খাদ্য ঘাটতি ছিল ৩০ লাখ টন। চাল-গম বাইরে থেকে না এলে দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাবে, মাথাপিছু যেটুকু চাল দরকার, সেটুকুও থাকবে না, মানুষ না খেয়ে থাকবে— এ রকম নাজুক ছিল অর্থনীতির অবস্থা। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে বন্যা হলো কয়েকবার, তাতে মোট চালের উৎপাদন কমে গেল। কিন্তু অমর্ত্য সেন তার বইয়ে দেখিয়েছেন ১৯৭৪ সালে চালের মাথাপিছু প্রাপ্যতা এর পরও খুব একটা কমেনি। তবে প্রাপ্যতা ছিল টায় টায়। বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির চাপ ছিল এবং অগ্নিমূল্য ছিল। সেটি নিয়ন্ত্রণ করা যেত যদি বাইরে থেকে চালের জোগান আসত। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার পিএল ৪৮০-এর অধীনে গরিব দেশগুলোকে যে খাদ্য সাহায্য দিত, বাংলাদেশ মূলত তার ওপরই নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু তখন আমেরিকা হঠাৎ করে বলল, বাংলাদেশ সরকার চটের বস্তা কিউবায় রফতানি করেছে। কিউবা ওই চটের বস্তা ভিয়েতনামকে দিয়েছে। ভিয়েতনাম ওই বস্তায় বন্দুক বহন করেছে। সেই বন্দুক আমেরিকান সৈন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং আমেরিকানরা পিএল ৪৮০-এর অধীনে বাংলাদেশকে খাদ্য সাহায্য দিতে পারবে না। পিএল ৪৮০-এর একটি সিকিউরিটি ল’ আছে, তাতে বলা হয়েছে, যেসব দেশ আমেরিকার সিকিউরিটির বিরুদ্ধে, তাদের তারা খাদ্য সাহায্য দিতে পারবে না। যে জাহাজ খাদ্য নিয়ে বাংলাদেশে আসছিল, সেটিকে আগস্টে মাঝ সমুদ্র থেকেই ফিরিয়ে নেয়া হয়। পরের মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর, অক্টোবরে চালের বাজারে তীব্র সংকট সৃষ্টি হলো। যদিও বছরব্যাপী চালের সরবরাহ বিশ্লেষণে দেখা যাবে গড় মাথাপিছু সরবরাহ ঠিকই আছে। এর ভিত্তিতে অমর্ত্য সেনের অভিযোগ ছিল, মাথাপিছু চালের গড় সরবরাহ ঠিক থাকলে কেন দুর্ভিক্ষ হবে? এ যুক্তির খণ্ডন রেহমান সোবহান করেছেন, গড় ঠিক থাকলেও বণ্টনের সমস্যা ও সময় নির্দিষ্টতার কারণে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চালের ঘাটতি তীব্র হয়েছিল আর তখনই দুর্ভিক্ষ হয়। দুর্ভিক্ষের আরেকটি কারণ— সেই সময় বন্যা দেখা দেয়ায় ক্ষেতমজুররা কোনো কাজ পায়নি। সুতরাং চালের দাম যা-ই থাকুক না কেন, তা কেনার সামর্থ্য বা অর্থ কোনোটিই তাদের ছিল না, দাম কম হলেও তারা কিনতে পারত না। কারণ তাদের হাতে তো কোনো অর্থই ছিল না। মজুতদারি এবং সরকারের দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণেও অনেক স্থানে সংকট তীব্র হয়েছে। যেসব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ঘাটতি ছিল, তাদের কেউ কেউ শহরের লঙ্গরখানায় ভিড় করেছে, আর বাকিরা পথে মারা গেছে।
সমাজতান্ত্রিক দেশ গঠনে শুরু থেকেই অনেক সমস্যা ছিল। আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের ধারায় গড়ে ওঠা কোনো দল ছিল না। আওয়ামী লীগে যারা কিছুটা বাম মনোভাবাপন্ন ছিলেন, তারা মূলত জাসদীয় সমাজতন্ত্রের ধারক, যারা তখন অপেক্ষাকৃত কড়া ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ স্লোগান তুলেছিল। পরবর্তীতে তারা আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়েও গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিল ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি, মস্কোপন্থী বামপন্থীরা। চীনপন্থী বাম দলগুলো স্বাধীনতাই মানেনি, তারা বলত বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের করদ রাজ্য। মুসলিম লীগ-জামায়েতে ইসলামী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিল। আওয়ামী লীগের ভেতরে রাজনৈতিক ভারসাম্য ছিল নেতিবাচক। বড় ভূমিস্বামীরা চায়নি ভূমি সংস্কার হোক। তারা সফল হওয়ায় কৃষি খাতের মতো বড় একটি খাতে সমাজতন্ত্র কার্যকর হয়নি। বঙ্গবন্ধু বাজারও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। সুতরাং বাজারে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। সহায়তা সংস্থা ও বিদেশের চাপে দুর্ভিক্ষও রোধ করা সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে অবস্থাটা ছিল খুবই হতাশাজনক। সমাজতন্ত্রের বাস্তব কোনো ফলাফল তখন মানুুষ দেখতে পাচ্ছে না। কলকারখানা জাতীয়করণ করা হলে সেখানে যে নেতিবাচক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন হচ্ছিল, সেখানে লাল বাহিনী, নীল বাহিনী ইত্যাদি তৈরি হয়। সেখানে তারা ভাবছিল আমরা যথেষ্ট কষ্ট করেছি, এখন আমাদের পরিশ্রম না করে বেতন পেলে ভালো।
তবে সবাই এক রকম ছিলেন না। এ সময়ে বাওয়ানী জুটমিল শহীদুল্লাহ সাহেব কষ্ট করে দাঁড় করিয়েছেন। এটি ছিল ব্যতিক্রম। আসলে দেশ কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে তখন দেশের ভেতরে-বাইরে এক প্রচণ্ড টানাপড়েন চলছিল।
কিছু নীতি যে ভালো ছিল না, তা নয়। কিন্তু সেগুলো কার্যকর করার কোনো রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল না, নেতৃত্বও ছিল না। নীতির মধ্যে অসমাঞ্জস্যতা ছিল, সরকার নানামুখী চাপে দোদুল্যমান ছিল। আওয়ামী লীগের মধ্যে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আগে থেকেই দক্ষিণপন্থী একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উদীয়মান নব্য ধনিক শ্রেণী। লাইসেন্সের মাধ্যমে অনৈতিক ব্যবসা করে এ শ্রেণী অর্থ তৈরি করেছিল। যতক্ষণ ব্যবসা করে তারা অর্থ তৈরি করতে পেরেছে, ততক্ষণ তারা বিরাষ্ট্রীয়করণের দাবি তোলেনি। যাদের পাটকল ও বস্ত্রকল জাতীয়করণ করা হয়, তারা জীবনেও তা ভুলবে না। তাদের আত্মীয়রাই পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা সবাই চেয়েছিল অর্থনীতি পুনরায় দক্ষিণ দিকে মোড় ঘুরুক।
পক্ষান্তরে সরকার নীতিনিষ্ঠভাবে সরকার চালাতে পারেনি। কেন তারা তা করতে পারেনি, তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিম্নরূপ। আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে দক্ষিণপন্থীদের বিরোধিতা, উগ্র বামদের বিরোধিতা, আর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাসদ সরকারের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান নেয়, যাকে স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামী লীগের ভেতরের দক্ষিণপন্থীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। জাসদের পুরো আন্দোলন ব্যবহূত হয়েছে জিয়াউর রহমানের দ্বারা। তাদের আন্দোলনের ফলাফল দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। জাসদের যারা মূল নেতা, পরবর্তীতে তারা আরো দক্ষিণপন্থায় চলে গেল। একমাত্র শক্তি যারা বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে সমাজতন্ত্র করতে চেয়েছিল, অপুঁজিবাদী পথে যাবে বলে ভেবেছিল, তারা ছিল মস্কোপন্থী। তাদের সামনে উদাহরণ ছিল সুকর্ণ, আলেন্দে, নাসের— যদিও আমরা জানি যে এদের মধ্যে কেউই শেষ পর্যন্ত সফল হননি। জাতীয়তাবাদী নেতারা যদি ঠিকমতো দেশপ্রেমিক হন, তবে তারা অনেক দূর এগোতে পারেন। তবে বেশির ভাগ জায়গায় জাতীয়তাবাদী নেতারা মাঝপথে হত্যার শিকার হয়েছেন। তারা এগোতে পারেননি। সেখান থেকে মস্কোপন্থিরা একটি শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে ভিন্ন রাজনীতি করছে। কিন্তু ওই সময়ে তারা ওই শিক্ষাটা নেয়নি। তারা ভেবেছে জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে ঐক্য করে তারা সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নেবে। মার্ক্সের মতো সমাজতন্ত্র হবে না, কিন্তু দেশপ্রেমিক সরকার উৎপাদনশক্তির বিকাশ ঘটাবে। তাদের কল্পনায় ছিল এক ধরনের রাষ্ট্রীয় খাতের প্রাধান্যে পরিচালিত নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতি। যেটাকে কেউ কেউ এখন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা কল্যাণ রাষ্ট্র বলে অভিহিত করে থাকেন। তবে তখন অপুঁজিবাদী পথে সমাজতন্ত্র— এ তত্ত্বটাই ছিল প্রধান তত্ত্ব। চীনসহ অন্যান্য আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ থেকে আজ আমরা বলতে পারি অপুঁজিবাদী পথের ধারণাটি সঠিক ছিল না। সঠিক ধারণাটি সম্ভবত হবে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী খাত আরো বহুদিন থাকবে, সমাজতন্ত্রের খাতও থাকবে, সমবায়ও থাকবে। ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয় খাতে উৎপাদন হবে। ব্যবস্থাপকদের প্রধান কাজ হবে উৎপাদন শক্তি বিকশিত করা এবং এই বিকাশের প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তারা যাতে উৎপাদনের এমন একটি বড় অংশ পায়, যার মাধ্যমে বৈষম্য ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। এ ধরনের উন্নয়ন কৌশলের পূর্বশর্ত হিসেবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখে তার সুযোগ সর্বজনীন করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এটিই হতে পারত তখনকার জন্য অত্যন্ত সঠিক একটি নীতি-কৌশল। সোভিয়েত বলয়ে থেকে দ্রুত ১৫তম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্নটি সঠিক ছিল না।
বামপন্থীসহ কিছু বুদ্ধিজীবী তখন শেখ মুজিবকে কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেগুলো গ্রহণ করা হয়নি। গ্রহণ করা হলে কি হতো, তা বলা মুশকিল। মূলত কৃচ্ছ তা সাধনকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবগুলো এসেছিল। হোটেল-মোটেলে ৫ টাকার বেশি বিল হলে তার ওপর ১০০ শতাংশ কর। ফার্স্ট ক্লাস রেলে যারা ভ্রমণ করে, ফার্স্ট ক্লাস সিনেমা যারা দেখে, তাদের ওপর ট্যাক্স বসাতে হবে। মাঠপর্যায়ে ন্যূনতম বেতন হবে ১ হাজার ৫০০ টাকা, সচিব ১২ হাজার টাকার বেশি পাবেন না। প্রস্তাব ছিল, সমগ্র বাজেটের ৩৩ শতাংশ হতে হবে উন্নয়নমূলক। ব্যক্তিগত গাড়ি উৎসাহিত করা হবে না। বাইসাইকেল ও বাস সার্ভিস চলবে। ব্যবসায়ীদের ওপর ট্যাক্স বসাতে হবে, তারা যে স্কেরসিটি প্রিমিয়াম ভোগ করছে, তা থেকে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। নন মনিটাইজড লেবার মোবিলাইজেশনের কথাও বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল মজুরকে অর্থ দিয়ে আমরা কাজে আনতে পারব না। ফলে কাজের বিনিময়ে খাদ্য সহায়তার কর্মসূচি চালুর পরামর্শও এসেছে। এর মাধ্যমে গ্রামের রাস্তাঘাট মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হলো। স্বেচ্ছায় খাল খনন কর্মসূচিও গ্রহণের তাগিদ দেয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের তিন মাস ছুটি দেয়া হবে, ওই তিন মাস তারা মাঠে গিয়ে নিরক্ষর মানুষদের শিক্ষিত করবে এবং ওই নিরক্ষরতা দূর করার সনদ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের ডিগ্রির সনদ দেয়া হবে, এমন অনেক প্রস্তাব ছিল। সেই সময় উৎসাহও ছিল মানুষের মধ্যে। শেখ মুজিবুর রহমান আমলতন্ত্রের মধ্যে বন্দি না হয়ে তখনই যদি উন্নয়নের দেশ গড়ার আহ্বান নিয়ে মাঠে নামতেন, তাহলে অবস্থা পাল্টে যেত। ৬৪ জেলায় বক্তৃতা দিলেই জাতি আবার ঘুরে দাঁড়াত। কিন্তু তিনি সেই কাজটি তখন করেননি। তার বড় দুর্বলতা ছিল তিনি সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। তাজউদ্দীনকেও নিতে চেয়েছেন আবার মোশতাককেও নিতে চেয়েছেন। সবুর খানকেও জেলখানার মধ্যে খাবার পাঠিয়েছেন। সুতরাং কাউকে তিনি ছাড়তে পারেননি। কিন্তু তারা তাকে ঠিকই ছেড়েছে। তার শেষের বক্তৃতাগুলো দেখলে পরিষ্কার বোঝা যাবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কারা দেশের ক্ষতি করছে। কিন্তু তিনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি।
শেখ মুজিবুর রহমান শেষ দিকে এসে বুঝেছিলেন। তখন তিনি একাধিক জনসভায় বলেছেন, চাটার দল সব লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে তিনি বাকশাল গঠন করলেন। কিন্তু বাকশালে পুরনো সব লোক রাখায় সেটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একটি হলো, বিকেন্দ্রীকরণ। জেলা জেলায় গভর্নর হয়ে যাবে। আরেকটি ছিল— বাধ্যতামূলকভাবে সমবায় হবে। আইল থাকবে না, সমবায়ের মাধ্যমে জমি চাষ হবে, সব ইনপুটের জোগান দেবে রাষ্ট্র। উৎপাদন তিন ভাগ হবে। একটি অংশ জমির মালিক পাবে, একটি অংশ শ্রমিক এবং এক অংশ রাষ্ট্র পাবে। কোনো জমি ফেলে রাখা যাবে না। শিল্প-কারখানা সম্পর্কেও নতুন নতুন পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছিল। কীভাবে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দক্ষতার ভিত্তিতে শিল্প-কারখানা পরিচালনা করা যায়। ম্যানেজারকে কন্ট্রাক্ট দেয়া, তোমাদের স্বাধীনতা দেয়া হলো, মুনাফা করতে পারলে তার একটি অংশ তোমরা পাবে। মুনাফার বাকি অংশ রাষ্ট্রকে দেবে। রাষ্ট্র ম্যানেজারদের উৎপাদনে হস্তক্ষেপ করবে না ইত্যাদি অনেক নতুন নতুন কৌশলের কথা তখন ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু সাধারণ মানষ এসব কিছুই ধরতে পারেনি। বাকশালের মিশ্র লিডারশিপ দেখে মানুষ উৎসাহ বোধ করেনি। কিন্তু শত্রুরা পরিষ্কারভাবে বুঝেছে, বাকশাল যদি শিকড় বিস্তার করে ফেলে, তবে তা সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দিকেই যাবে। যদিও বাকশালের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি আইডিয়াল ছিল না। কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী লীগের একদলীয় শাসন চালু না করে একটি মৈত্রী জোট করে অগ্রসর হওয়াই ঠিক ছিল। এটিই ছিল তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাব, যদিও মানুষের ভুল ধারণা যে রাশিয়া ও কমিউনিস্ট পার্টিই মুজিবকে বাকশাল গঠনে প্ররোচিত করেছে!
সত্তরের দশকটি হচ্ছে একটি মধ্যবর্তী সময়কাল। আমরা সোভিয়েত শিবিরেও নেই, আমেরিকার শিবিরেও নেই। খুব বেশিক্ষণ মধ্যবর্তী সময়ে থাকা যায় না, হয় তাকে আমেরিকার শিবিরে যেতে হবে, না হয় সোভিয়েত শিবিরে। ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত শিবিরের দিকেই ঝুঁকছিলেন। একটি পর্যায়ে এসে যখন ঠিক করতে হবে আমি কি আসলে কঠিনভাবে সমাজতন্ত্রের পথে যাব, নাকি সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে দোদুল্যমান থাকব; তখন তিনি কঠিন সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু তা জনগণের ভেতর থেকে আসেনি, এসেছে ওপর থেকে। বঙ্গবন্ধু তখন সব জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন। জামায়াত শিবির ও মুসলিম লীগ থেকে তিনি অনেক আগে থেকেই বিচ্ছিন্ন। অনেক সৎ বামপন্থী তখন তাকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। দলের মধ্যে দক্ষিণপন্থীরা তার বিরুদ্ধে রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারতও বাকশালকে সমর্থন করছে না। এ সময় ছিল বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে নরমতম সময়। সুযোগসন্ধানীরা তাকে হত্যার জন্য এ সময়টাকেই বেছে নিয়েছিল।
শেখ মুুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার কয়েক বছর পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলেন। এর মধ্যে বহু ক্যু ও পাল্টা ক্যু হলো। কাউন্টার ক্যু করে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার আগে কে ক্ষমতায় ছিলেন, সে প্রশ্ন করলে আমরা দেখতে পাব প্রথম ক্ষমতায় ছিলেন খন্দকার মোশতাক, আওয়ামী লীগেরই দক্ষিণপন্থী অংশ। তবে অনেকেই তখন নেপথ্যে থেকে এই ষড়যন্ত্রকে আশকারা দিয়েছিলেন। এর অর্থ দাঁড়াল আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী অংশ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা দখল করেছিল। এটি ইতিহাসের সত্যতা, একে এড়ানোর সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের মধ্যে বর্তমানে যারা আছেন, তাদের অনেকের ভূমিকা তখন ছিল দোদুল্যমান। এমনকি ন্যাপেরও কেউ কেউ দোদুল্যমান ছিলেন। তবে খুব দ্রুতই মানুষ বুঝে গেল মোশতাকের এজেন্ডা হলো— পুঁজিবাদ। বঙ্গবন্ধুর দোদুল্যমান্যতা থাকার পরও আওয়ামী লীগের মৌলিক সেসব নীতি তখনো টিকে ছিল, খন্দকার মোশতাক সেগুলো দ্রুত বদলে দিতে শুরু করলেন। প্রথম যে নীতিটি তিনি পরিবর্তন করেন, তা হলো ব্যক্তি বিনিয়োগের ওপর কোনো সিলিং থাকবে না। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র ব্যক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সিলিং নির্ধারণ করে দেবে, এর বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না। মোশতাক এটি উঠিয়ে দিয়ে বলেন, যে যত খুশি বিনিয়োগ করতে পারবে। পুরো স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ২২ পরিবার আর যাতে তৈরি না হয়, সেজন্যই সিলিং আরোপ করা হয়। কিন্তু মোশতাক ক্ষমতায় এসে এটি তুলে দিয়ে ব্যক্তি বিনিয়োগকে অবারিত করে দেন।
বিদেশী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহযোগে যে বিনিয়োগ, সেটিও উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। আগে ছিল বিদেশীরা এখানে বিনিয়োগ করতে এলে ৫১ শতাংশ দেশীয় এবং ৪৯ শতাংশ শেয়ার বিদেশীদের থাকার বিধান, মোশতাক সেই ধারা বাতিল করে দেন। তার মানে অর্থনীতি খুলে দেয়া হলো বিদেশীদের জন্য। তুমি আসতে পারো, যত ইচ্ছা বিনিয়োগ করতে পারো এবং মুনাফা বাইরে নিয়ে যেতে পারো। বিদেশীরা এককভাবেও বিনিয়োগ করতে পারে আবার স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগও করতে পারে, সেখানে ৮০/২০ শতাংশও হতে পারে শেয়ারের অনুপাত। এর অর্থ দাঁড়াল আমরা জাতীয় স্বার্থকে বাদ দিলাম। বঙ্গবন্ধু শেষ মুহূর্তে একটি কাজ করেছিলেন, তা হলো ডি-মনিটাইজেশন। যখন দেশে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা গেল, কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছে না, তখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ডেকে ৫০০ টাকার নোট বাতিল করার পরামর্শ দিলেন; যাদের হাতে কোটি কোটি টাকা ছিল, তাদের অর্থ তখন রাতারাতি বাতিল হয়ে গেল। উদ্দেশ্য ছিল, তারা যখন অর্থ ব্যাংকে নিয়ে আসবে, তখন কেস বাই কেস— কোনটি দুর্নীতি, কোনটি ভালো অর্থ, তা দেখে অনুমতি দেয়া হবে। কালো টাকার মালিকদের ধরার প্রচেষ্টা থেকেই ডিমনিটাইজ করা হয়েছিল। মোশতাক ক্ষমতায় এসে বললেন, কালো টাকার মালিকরা যদি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কিনে নেয়, তবে কালো টাকার জন্য তাদের ট্যাক্স দিতে হবে না। তিনি এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন, বিরাষ্ট্রীয়করণও করলেন আবার কালো টাকাকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনলেন, যার মাধ্যমে প্রাইভেট ক্যাপিটালিস্ট ক্লাসও তৈরি করে ফেললেন। তিনি আরো প্রতিশ্রুতি দিলেন, সরকার বাংলাদেশী মালিকদের যেসব কারখানা রাষ্ট্রীয়করণ করেছিল, সেগুলো ক্ষতিপূরণসহ তাদের ফেরত দেয়া হবে।
সত্তর দশকের শেষে জিয়াউর রহমান ও সাত্তার পরবর্তীতে মোশতাকের এ নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন, তবে শ্লথগতিতে এবং প্রাগমেটিজমসহ। জিয়াউর রহমান বলতেন, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ হবে না। কারণ রাষ্ট্র তো সেখান থেকে মুনাফা পাচ্ছে। তিনি বলতেন, একটি লাভজনক তৈরি কারখানা আমি কেন ব্যক্তি খাতকে দেব। যেসব কারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় লোকসান করছে, সেগুলো ব্যক্তি খাতে দেব। এ সিদ্ধান্ত ছিল প্রাগমেটিক। অন্তত আদমজী জুট মিলের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান এ নীতি নিয়েছিলেন। বিশ্বব্যাংক তাকে প্রচুর চাপ দিয়েছিল মিলটি ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়ার। কিন্তু তিনি রাজি হননি। বড় বড় লাভজনক জুটমিল বা বস্ত্রকলের কোনোটিই ব্যক্তি খাতে তার আমলে ছেড়ে দেয়া হয়নি, এমনকি যেগুলো লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, সেগুলোর কোনোটিই জিয়াউর রহমান বিরাষ্ট্রীয়করণ করেননি। এগুলো বিরাষ্ট্রীয়করণ করেছেন সামরিক শাসন দিয়ে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। জিয়াউর রহমান মোশতাকের শুরু করে যাওয়া পথে কিছুটা প্রাগমেটিকভাবে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। সম্ভবত সেই কারণে জিয়াউর রহমানকে মারার প্রয়োজন হয় আরো দক্ষিণপন্থীদের। এরশাদই ছিলেন তাদের প্রতিনিধি এবং তিনি ক্ষমতায় আসার পর পুরো বিষয়টিই চলে গেল বিদেশীদের হাতে। পুরো বাংলাদেশ তখন তাদের হাতে জিম্মি। তবে রাজনীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ছিলেন আদর্শচ্যুত। নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন করেছিলেন এবং খুনী মেজরদেরও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। এরশাদও একই ধারায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে স্বীয় ক্ষমতা সংহত করার স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। আশির দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের ১০০ শতাংশের বেশি অর্থায়ন হতো বিদেশীদের অর্থে— হোক সেটি ঋণ বা অনুদান। এরশাদ তখন কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি হাতে নেন। এর প্রধান তিনটি বিষয় ছিল— বেসরকারীকরণ, বিনিয়ন্ত্রণ এবং উদারীকরণ। বাজার পুরো খুলে দেব, সব নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেব, যে খুশি আসতে পারে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারবে। রাষ্ট্র কোনো ব্যবসা পরিচালনা করবে, সব ব্যক্তি খাত পরিচালনা করবে, এটাই ছিল এরশাদের উন্নয়নকৌশল। তবে জাতীয় ঔষধ শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে তার একটি ব্যতিক্রমী অবদান ছিল।
সত্তর দশকের উন্নয়ন কৌশলের এ সংক্ষিপ্ত চালচিত্র থেকে আজ আমরা কি শিক্ষা পেতে পারি? সত্তরের দশকে সমাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পথ সম্পর্কে যে ধারণা ছিল, সেই ধারণার মধ্যে বাজার এবং পুঁজিবাদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখার কথা প্রায় ছিল না বললেই চলে। বিষয়টি ছিল একপেশে। মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বর্তমানে উন্নত হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মিশ্র অর্থনীতির মধ্যে যে খাতটি উৎপাদনশীল নয় বা যে খাতটি অর্থ বাইরে পাচার করে দেয় অথবা যে খাতটি একচেটিয়ামূলক হয়ে গেছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে বণ্টনের দিকটি ঠিক রাখা। অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য অর্থনৈতিক যেসব পূর্বশর্ত রয়েছে, যেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দূর করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করা— এগুলোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি সমাজতন্ত্রের একদলীয় শাসনের অধীনে না-ও হতে পারে আবার বহুদলীয় শাসনের অধীনে না-ও হতে পারে। গণতন্ত্রের রূপ বা মাত্রা নির্বিশেষে রাজনৈতিক শাসকরা কতটুকু জনগণের কাছে জবাবদিহি করছেন এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছেন, তার ওপর এটি নির্ভর করে। আর জনগণ নিজে অধিকার আদায়ে কতটা সচেতন, তার ওপরও এসব বিষয় নির্ভর করে। এ ধরনের একটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তর্বর্তীকালীন স্তরের প্রয়োজন আজো ফুরিয়ে যায়নি। সঠিক উন্নয়নের জন্য সঠিক ধরনের রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক






