মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলোতে পরিকল্পনা তৈরি কিংবা লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ খুব একটা ভালো করেনি। একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশে প্রথম পরিকল্পনা কার্যত মুলতবি রাখা হয়। দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভিক্ষ ক্ষত আরো বাড়িয়ে তোলে। ১৯৭২ সালে শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ নীতি সফল হয়নি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি অর্থ জোগানের বিপরীতে বড় অংকের লোকসান অব্যাহত ছিল। পরবর্তী সময়ে কিছু শিল্প-কারখানা বেসরকারীকরণ করায় রাজস্ব বোঝা কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ আরেকটি বড় ধাক্কা। এ পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হিসেবে অব্যাহত থাকবে।
স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশ সরকার ও দাতাদের মধ্যে পাকিস্তানের ঋণ দায় ইস্যু নিয়ে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে; যৌথ ঋণ দায়ের কতটা বাংলাদেশ ঘাড়ে নেবে। ১৯৭৩ সালের মার্চে দাতাগোষ্ঠীর প্রথম বৈঠকে দাতারা পরামর্শ দেয় যে, যা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়েছে, সেসব ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার দায়ভার বাংলাদেশেরই নেয়া উচিত। দাতারা ইঙ্গিত দেয় যে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার রাজি না হলে নতুন সাহায্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে, যা বাংলাদেশের খুবই প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত দাতাগোষ্ঠীর বৈঠকে সভাপতিত্বের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ। পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ড. নুরুল ইসলাম এ বৈঠকে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
জাতির জনক প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে এ সমস্যা সমাধানে একটি ‘অপ্রচলিত’ নীতি নির্দেশনা আসে। সরকার এ সমস্যা দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানে অগ্রাধিকার দিচ্ছিল। এ-সংক্রান্ত একটি আলোচনায় জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধু একটি অনুপ্রেরণামূলক নীতি বিবৃতি দেন, ‘আচ্ছা, যেসব প্রকল্প এসব বিদেশী ঋণে তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো কি এখনো বাংলাদেশে রয়েছে? আমাদের মানুষের উপকার করছে, এমন কয়েকটি প্রকল্প আপনারা দেখাতে পারবেন? যদি সেগুলো থাকে এবং আমাদের জনগণের উপকার করে, তাহলে আমি এগুলোর দায় গ্রহণ করব। আর যদি সেগুলো না থাকে, তাহলে এ ঋণের দায়িত্ব নেব না। সাইদুজ্জামান বলেন, ওই সময় থেকে আমরা নীতি নির্দেশনা পেয়েছিলাম।’
দীর্ঘ আলোচনা ও সুবিবেচনাপূর্ণ বাস্তব প্রকল্প হিসাব (যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দায় ছাড়, অর্থাৎ একেবারে ক্ষতিগ্রস্ত ও আংশিক প্রকল্পগুলো বাদ দেয়া) এবং আলাদা করে প্রকল্প ও প্রোগ্রাম ঋণের বিস্তারিত আর্থিক অডিট (ঋণের ডাবল গণনা এড়ানোর জন্য, যেহেতু পূর্ব পাকিস্তান এরই মধ্যে প্রতিরূপ তহবিল ব্যয় পেমেন্ট করেছে) করার মাধ্যমে দাতাদের সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছানো হয় যে, বাংলাদেশের দায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার, ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ডলার নয়, যেটা আগে দাতারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে চেয়েছিল। দ্বিপক্ষীয়ভাবে ঋণ পেমেন্ট নিয়ে মধ্যস্থতা করা হবে। একমত হয় যে, সব ঋণ আইডিএর শর্ত অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে, যেটি যেকোনো দ্বিপক্ষীয় দাতার কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে সহজ শর্ত।
বাংলাদেশ এটা পরিষ্কার করে দেয় যে, ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই থেকে ঋণ দায় গ্রহণ করবে। এটি গণমানুষের ক্যারিশম্যাটিক নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারের একটি অসাধারণ কৃতিত্ব এবং এজন্য কাজ করেছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক এবং ওই সময়ের অত্যন্ত যোগ্য আমলারা, যার মধ্যে ছিলেন মধ্যস্থতাকারী দলের নেতা পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ড. নুরুল ইসলাম। মানুষের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে এ অবস্থান খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। দাতাদের সঙ্গে দরাদরি করতে বেশি সময় নিলে কিংবা অপেক্ষাকৃত কম অনুকূল শর্তাবলিতে ঋণ ইস্যু নিষ্পত্তি করতে গেলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে গুরুতর বাধা তৈরি করতে পারত। প্রবৃদ্ধি ওই সময় শ্লথ হলেও এগিয়ে চলছিল।
১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কয়েকজন পর্যালোচনাকারী সমালোচনা করেছিলেন। যদিও তাদের কণ্ঠে সহানুভূতি ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কাঠামোর মাধ্যমে, যেখানে বেসরকারি খাতের কার্যক্রমের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা ছিল। জেমস হিটজম্যান ও রবার্ট ওয়ার্ডেন ‘আ কান্ট্রি স্টাডি: বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক সম্পাদকীয়তে লেখেন, ‘পাকিস্তানের জোট সরকার চাষযোগ্য এলাকা ও কিছু সেচ সুবিধা বাড়িয়েছিল বটে, কিন্তু গ্রামের লোকজন সাধারণভাবে ১৯৪৭-৭১ সালের মধ্যে আরো গরিব হয়েছে। কারণ গ্রামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে উন্নয়নের গতি তাল মেলাতে পারেনি। উন্নয়নের জন্য পাকিস্তানের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে শিল্পায়নের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু উন্নয়ন বাজেটের প্রধান অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়।
পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সব শিল্প-কারখানা জাতীয়করণের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর সব শিল্প-কারখানা জাতীয়করণের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গ্রহণ করার দরুণ অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা, ব্যবস্থাপক, প্রশাসক, প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান তৈরি শ্লথ হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের জন্য কাজে ব্যাঘাত ঘটায় প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য ও পণ্যের গুরুতর সংকট দেখা দিয়েছিল। অস্থিতিশীল সরবরাহ ও বিকল্প পণ্য সিনথেটিকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে পাটের বহির্বাজারগুলো হারিয়ে গিয়েছিল।
রিজার্ভ ছিল যৎসামান্য এবং ব্যাংকিং ও মনিটারি সিস্টেম ছিল অনির্ভরযোগ্য। ...যদিও বাংলাদেশের বিশাল কর্মশক্তি রয়েছে, কিন্তু এদের বেশির ভাগ অংশই অপ্রশিক্ষিত এবং কম মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের বেশির ভাগই ছিল অশিক্ষিত, অদক্ষ ও আংশিকভাবে বেকার। প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যতীত বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োজনীয় শিল্প-সম্পদের ঘাটতি ছিল। মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ৩০০-৪০০ শতাংশের মধ্যে ওঠা-নামা করছিল। মুক্তিযুদ্ধের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার প্রথম কয়েক মাস ভারত জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউএসএসআর থেকে প্রাপ্ত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে বাংলাদেশকে ২৩২ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিল।
বিভিন্ন ঘটনার নিচে চাপা পড়ে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) কখনই বাস্তবায়ন করা যায়নি। বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম কনফারেন্সে একটি চিত্তাকর্ষক বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট ড. মাযহারুল হক ও অংশগ্রহণকারীরা প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেন। সমালোচনা হলেও এটা বলা কঠিন যে, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে ফলাফল কী হতো। সরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কি দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এনে দিতে পারত, যে দারিদ্র্য ছিল গভীর উদ্বেগের কারণ? বিপথে চলে যাওয়া জাতীয়করণের গতিপথ কি কখনো ঠিক করা যেত? পরবর্তী ইতিহাস বলছে, পরিস্থিতি অনুসারে এর উত্তর, না। অর্থনীতি উদারপন্থী করার পরই শুধু প্রবৃদ্ধি এসেছিল এবং জাতীয়করণের বেশে থাকা কিছু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা ছিল। একটি কায়েমি গোষ্ঠী, বিশেষ করে আমলাদের মধ্যে যারা চাননি জাতীয়করণ বাতিল হোক, তারা যুক্তিসঙ্গতকরণ ও সংস্কারের যেকোনো প্রচেষ্টায় বাধা দিতেন।
জাতীয়করণের দুজন সমর্থক ছিলেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। তারা এ বিষয়ে নিজ অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন, কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি রয়ে গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, যার র্যাংক ছিল কেবিনেটমন্ত্রী ও যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার কাজে সাহায্য করার জন্য বঙ্গবন্ধুর নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী ব্যক্তি। তিনিও নিজ জীবনীগ্রন্থে ১৯৭২-৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তার সময়ের কথা লিখেছেন। কিন্তু এসব চমত্কার অবদান অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দেয়নি।
জাতীয় চার নেতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ব্যতীত উপদেষ্টা ও দলীয় সহকর্মীরা বেঁচে রয়েছেন। আমাদের সবারই সম্মিলিতভাবে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। যদি আমরা প্রথম পরিকল্পনা না লিখতাম এবং এর বদলে দিনভিত্তিক অপরিহার্য নীতির দিকে নজর দিতাম, ঘনিষ্ঠভাবে নজরদারি করতাম বাড়তে থাকা খাদ্য সংকটের দিকে, যা পরবর্তী সময়ে দুর্ভিক্ষের জন্ম দিয়েছিল, তাহলে কী হতো?
যেটাই ঘটুক না কেন, আমরা যদি জাতির জনকের পাশে থাকতাম এবং সামনে সামান্য সমস্যার চিহ্ন দেখলেই সটকে পড়ার চিন্তা না করতাম, তাহলে কী ঘটত? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশী হয়েও যখন অনেকেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, তখন বঙ্গবন্ধুকে, যিনি বাংলাদেশকে সৃষ্টি করেছেন, কেন চূড়ান্ত মূল্য দিতে হলো? যেমনটা অধ্যাপক আতিউর রহমান ভোরের কাগজে ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ এক নিবন্ধে লিখেছেন, যদি বঙ্গবন্ধুকে এভাবেই মৃত্যুবরণ করতে হলো, তাহলে বাংলাদেশ সৃষ্টির কী প্রয়োজন ছিল।
দুই বর্ষপরিকল্পনা (১৯৭৮-৮০) পথ ঠিক করার একটি পরিমিত প্রচেষ্টা ছিল। ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল সম্ভাবনার অনেক নিচে। ১৯৭০-এর দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ওঠা-নামা করেছিল। গড়ে ৪ শতাংশের বেশ নিচে ছিল। দারিদ্র্য ছিল ৮০ শতাংশের ওপর
১৯৭০-এর দশকে, বিশেষ করে ওই দশকের প্রথম দিকে গুরুতর সম্পদ সংকটে ভুগতে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি খুবই খারাপ সময় পার করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল এতটাই ন্যূনতম যে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বাণিজ্যিক শর্তে খাদ্যশস্য কিনতে পারেনি সরকার। বছরজুড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সোনাসহ ছিল দুই মাসের আমদানির সমান। দাতারাও খুব বেশি সহযোগিতামূলক ছিল না। প্রথম বছরগুলোতে পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণের জন্য অনুদান সহায়তা ছাড় নিয়ে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ঘিরে সংশয় তৈরি হয়। সরকারের সভাপতিত্বে এক এইড গ্রুপ বৈঠকে পাকিস্তান শাসনামলে নেয়া ঋণ পরিশোধ নিয়ে ঝামেলা চলায় মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়া নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়নি। পাকিস্তান আমলে নেয়া ঋণ ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করে সমাধান করা হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খাদ্য সহযোগিতা আলোচনা এক বছর লেগেছে চূড়ান্ত হতে। বৈদেশিক মুদ্রা ও বাজেট সংকট বাড়িয়ে তুলেছিল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণের ভার, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে হুমকি তৈরি করেছিল। সরকারের জরুরি অনুরোধ সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংক ও দ্বিপক্ষীয় দাতারা স্বল্পমেয়াদে দ্রুত তহবিল ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিল।
১৯৭৪ সালের অক্টোবরে প্রথম এইড গ্রুপ বৈঠকে বাংলাদেশ ৮০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পায়। সাইদুজ্জামানের মতে, ততদিনে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করেছে। উত্তরাঞ্চলের সংকট পরিস্থিতি সরকার বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছিল; শীতকালীন শস্য বেশ ভালো হয়েছিল; দামও কমতে শুরু করেছিল। তবু সরকারের আইএমএফের ঋণের প্রয়োজনীয়তা ছিল। বিশ্বব্যাংকের তৃতীয় প্রোগ্রাম ঋণের সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার ৫৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন, ৭ দশমিক ৫ টাকা থেকে ১২ দশমিক ৫ টাকা, ১৯৭৫ সালের মে মাসে মুদ্রারোহিতকরণ এবং ঋণ ও অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ মূল্যস্ফীতিকে দমন করে, যা দেশের অর্থনীতির ওপর, যা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, দাতাদের আস্থা অর্জন করে।
অনুকূল নিয়ামকগুলো (ভালো রবিশস্য উৎপাদন ও পণ্যের দাম হ্রাস) ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি উদ্যোগ সঠিক পথে (অর্থ সরবরাহ শ্লথ করে দেয়া এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও কৃষির ওপর গুরুত্ব দেয়া) চলমান অবস্থায় দ্বিতীয় এইড গ্রুপ বৈঠক বসে ১৯৭৫ সালের মে মাসে, যা থেকে ১ দশমিক ২০০ মিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি পায় সরকার।
নতুন দেশে বিনিয়োগনীতি ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। পাকিস্তান থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শিল্পনীতি নজর দিয়েছিল আমদানির বদলে কম বৈদেশিক বিনিয়োগে বেসরকারি শিল্প-কারখানার ওপর, যেখানে থাকবে লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ করবেন আমলারা, বিদেশী মুদ্রা অবচয় ও আমদানির ওপর পরিমাণগত সীমাবদ্ধতায়। বেশির ভাগ শিল্প-কারখানার মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। ১৯৭২ সালের শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ আদেশের (বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেস ন্যাশনাইলেজশন অর্ডার, ১৯৭২ ও বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাইলেজশন অর্ডার, ১৯৭২) মাধ্যমে এর পরিবর্তন আসে। এটিকে অনুসরণ করে আসে নতুন শিল্পনীতি, ১৯৭৬ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালু করা হয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয় ও ১৯৭৮ সালে বেসরকারি শিল্প-কারখানার ওপর থেকে সীমা উঠিয়ে নেয়া হয়।
১৯৭০-এর দশকে যেসব শিল্পনীতি নেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল। ১) শিল্প বিনিয়োগনীতি, ১৯৭৩; ২) নতুন শিল্পনীতি, ১৯৭৪ (ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদান ও বিনিয়োগ কমানোর মাধ্যমে সরকারি খাতের প্রভাব হ্রাস); ৩) সংশোধিত বিনিয়োগনীতি, ডিসেম্বর ১৯৭৫ (সরকারি উদ্যোগের কয়েকটিতে বিলগ্নীকরণ ও উদার ঋণনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ)
বাণিজ্যনীতিসহ এসব নীতি স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দিয়েছিল, যখন বিদেশীদের রফতানিকে নিরুৎসাহিত করেছিল। বাণিজ্য ও বিনিময় হারনীতি টাকার ও ট্যারিফ অতিমূল্যায়ন এবং নন-ট্যারিফ বাধা) পরিষ্কারভাবে রফতানিবিরোধী ছিল (অ্যান্টি-এক্সপোর্ট বায়াস)।
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে আপেক্ষিক উদারীকরণ নীতিগুলো দমিত ছিল এবং বাস্তবায়ন ছিল অকার্যকর বা ভুল পথে নির্দেশিত। সুদহার নিয়ন্ত্রণ, উদার ঋণ, রফতানিতে উদ্দীপনা প্রদান ও সম্পদ বিক্রির অপব্যবহার করা হয় এবং শিল্পায়নের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে খুব কমই অবদান রাখে, যদিও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমূল্যে সরকারি থেকে বেসরকারি হওয়া প্রতিষ্ঠানের সম্পদ কেনার সুযোগ গ্রহণ করে। অন্যদিকে উদার ঋণ অস্থানে যাচ্ছিল বা আত্মসাৎ করা হচ্ছিল, যেটা ছিল আজকের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় চলমান বিশৃঙ্খলার সূচনা, যার জন্য ধন্যবাদের প্রাপ্য রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। শিল্পনীতির স্থানীয় উৎপাদনের দিকেই নজর দেয়া অব্যাহত ছিল।
১৯৭০-এর দশকে আর্থিক সংকট ও নীতি অনিশ্চয়তার কারণে শিল্প ও সেবা খাতে আইসিটি বা প্রযুক্তির সম্প্রসারণ পিছিয়ে যায়। তথাপি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। সেচ পাম্পের ওপর জোর দিয়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অব্যাহত ছিল, যখন প্রাথমিকভাবে ধাক্কা খেয়ে ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতে প্রযুক্তি পিছিয়ে পড়লেও ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে টেলিকমিউনিকেশন ও যোগাযোগ খাত এগিয়ে যেতে শুরু করে।
স্বাধীনতাযুদ্ধের কারণে সাময়িক বিরতির পর ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে ‘আর অ্যান্ড ডি’ সংস্থাগুলো পুনর্গঠন করা হয়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (এইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটি করা হয়। কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কাজ ছিল সামগ্রিকভাবে কৃষি গবেষণা সিস্টেম নিয়ে পরিকল্পনা ও সমন্বয় করা। ১৯৭০ সালের অক্টোবরে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত ও কুমিল্লা একাডেমি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পারমাণবিক কৃষি ইনস্টিটিউট (আইএনএ) সহযোগিতা প্রাপ্ত ইস্ট পাকিস্তান রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (ইপিআরআরআই) ধান নিয়ে গবেষণা অব্যাহত ছিল। গৌণ ফসলগুলো নিয়ে গবেষণা করছিল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত (যেমন ভার্জিনিয়া টোব্যাকো নিয়ে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি ও কিছু এনজিও)।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিজের বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে যোগ করে আইবিএম ৩৭০, আইবিএম ৯১০০ ও আইবিএম ৪৩৪১। ১৯৭৯ সালে আইবিএম ৩৭০ ও আইবিএম ৪৩৩১ নিয়ে বুয়েটে একটি কম্পিউটার সেন্টার (পরবর্তী সময়ে যার নাম হয় কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। উৎপাদন, রফতানি ও নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
[ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: সাঈদ সরকার]
লেখক: অর্থনীতিবিদ






