শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এ সিদ্ধান্ত মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আমরা দুটি প্রেক্ষাপটকে আমলে নেব। প্রথমত. ওই সময়ের পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং দ্বিতীয়ত. সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে এরপর বাংলাদেশে চিন্তাধারা, নীতি ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল?

জাতীয়করণের বিষয়টি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায়, ১৯৬০ দশকের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের ১১ দফায়, ১৯৭০ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ও ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ সংবিধানে ঠাঁই পেয়েছিল। এসবে বড় শিল্প, ব্যাংক, বীমা এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশকে জাতীয়করণের কথা বলা হয়েছে। আরো পরামর্শ দেয়া হয়েছে, শ্রমিকরা শুধু শিল্প-কারখানার ব্যবস্থাপনায়ই অংশগ্রহণ করবেন না, বরং মুনাফারও ভাগ পাবেন।

জাতীয়করণ নীতির জন্ম নিয়ে আলোচনার আগে এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, জাতীয়করণের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে কিংবা ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে কোনো মতৈক্য ছিল না। এদিকে অনেকেই এক ধরনের মিশ্র অর্থনীতিতে বিশ্বাস করত, যেমনটা ১৯৬০ দশকে পাকিস্তানে বিদ্যমান ছিল। যেসব শিল্প-কারখানা বেসরকারি খাতের গ্রহণ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা ছিল না, সেসব গ্রহণ করত সরকারি খাত। এটি ঘটত বিভিন্ন কারণে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— প্রাথমিক পর্যায়ের উচ্চঝুঁকি, প্রযুক্তিগত জটিলতা, বেশ বড় অংকের মূলধন বিনিয়োগ, উৎপাদনে দীর্ঘ সময় এবং প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধোপকরণ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বড় আকারের ভর্তুকি বা নিরাপত্তাজনিত গোপনীয়তা। এটা প্রত্যাশিত ছিল যে, সময়ের সঙ্গে এগুলোর মধ্যে কিছু শিল্প-কারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হবে। ইতিহাস দেখলে দেখতে পাব, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদে এমনটা দেখা গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এখন খুব কমই স্মরণ করা হয় যে, ১৯৭২ সালে সার, কাগজ, নিউজপ্রিন্ট, কেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল, লোহা ও স্টিলের মতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যার সরকারি খাতের শিল্প-কারখানা উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশ পেয়েছিল। এগুলো ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (ইপিআইডিসি) মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

১৯৭২ সালে জাতীয়করণ নীতি নিয়ে ক্যাবিনেটে আলোচনার সময় দুই দলের মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট ছিল। ক্যাবিনেটের বাইরে জাতীয়করণের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ছিল ছাত্র ও শ্রমিকরা, যারা সে সময় দারুণ প্রগতিবাদী। বঙ্গবন্ধু অনেকটাই এদের পক্ষে ছিলেন। কারণ তিনি নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতি সৎ থাকা কর্তব্য মনে করেছিলেন। সমাজতন্ত্রের প্রতি নিজের অঙ্গীকারের কথা তিনি বারবার জনসমক্ষে প্রচার করেছিলেন। জাতীয়করণ নীতিতে আপস করা তার জন্য কঠিন ছিল। পরবর্তী সময়ে শিল্পের ব্যবস্থাপনা ও মুনাফায় শ্রমিকদের অংশ দেয়ার যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কেননা তিনি শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। জাতীয়করণবিরোধী গোষ্ঠী জোর দিয়ে বলেছিল, পরিত্যক্ত সম্পদের সঙ্গে অন্যান্য শিল্প-কারখানা অধিগ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় যথেষ্ট ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা অথবা পর্যাপ্ত সাংগঠনিক কাঠামো বাংলাদেশ সরকারের নেই। এজন্য জাতীয়করণ নিয়ে আরো পদক্ষেপ নেয়ার আগে এ ধরনের সক্ষমতা তৈরির আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারা যুক্তি দেখান, তাদের মতভেদ প্রয়োগিক কারণভিত্তিক; কোনো মতাদর্শগত আপত্তি নয়। যদিও জাতীয়করণ নীতির প্রবক্তারা যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, দেশে ব্যবস্থাপনাগত ও উদ্যোক্তাগত সক্ষমতার বন্দোবস্ত যদি থাকে, তাহলে তা সরকারের মধ্যে না থাকলেও সরকার সেটিকে জাতীয়করণ খাত ব্যবস্থাপনার জন্য টেনে আনতে সমর্থ হবে। প্রকৃতপক্ষে জাতীয়করণকৃত শিল্প-কারখানা পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতের বহু ব্যবস্থাপককে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

ক্যাবিনেট ও এর বাইরে থাকা জাতীয়করণবিরোধী গোষ্ঠী পাকিস্তানের পরিত্যক্ত শিল্প-কারখানা সরকারের অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেনি; অন্তত জনসমক্ষে বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে। তারা বাংলাদেশের নাগরিকদের মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা জাতীয়করণের বিরুদ্ধে ছিলেন। যুক্তিসঙ্গতভাবে জাতীয়করণবিরোধী গোষ্ঠীর উচিত ছিল পরিত্যক্ত সম্পদ বেসরকারি খাতের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করার পরামর্শ দেয়া। ওইসব সম্পদ বাংলাদেশের জন্য ছিল দৈবধন অর্জন। এগুলোতে সরকারের কোনো বিনিয়োগ ছিল না। বেসরকারি উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ পরিত্যক্ত সম্পদগুলো একটি আদর্শ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারত। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এমন কোনো পূর্বনির্ধারিত বিভক্ত সীমারেখা রাখা উচিত হবে না, যা নির্দেশ করবে যে, বিদ্যমান বেসরকারি খাত হলো সীমাবদ্ধ। এর বাইরে বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্যোগ বাড়াতে পারবেন না। অথবা সরকারি খাত কেবল পরিত্যক্ত সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারবে, এর বাইরে নয়। ন্যূনতম দামে যারা কিনতে পারবে, সেসব বিক্রেতার কাছে এগুলো বিক্রি করে দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে এদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে হবে। যুক্তি হলো, ওই সময় এ ধরনের সম্পদ কিনতে পারে, এমন শিল্পপতি ছিলেন হাতেগোনা। বেশির ভাগ শিল্পসমৃদ্ধ দেশে (পাকিস্তানেও শুরুর দিকে) ব্যবসায়ী, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, আমদানি-রফতানিকারক ও ভূমি মালিকরা প্রারম্ভিক বা পথিকৃৎ শিল্পপতি গোষ্ঠী গঠন করে। এদের ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে উদার প্রকৃতির ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয় এবং উচ্চমুনাফায় পূর্ণ বিনিয়োগ ও সুরক্ষিত বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে আয় করে এরা শিল্প-কারখানার আকার বড় করে। বাংলাদেশ এ ধরনের নীতি অনুসরণ করতে পারত। চিন্তার বিষয় ছিল, শিল্প-কারখানার নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান অল্পসংখ্যক শিল্পপতির হাতে চলে যাবে, যা অনেকটাই ঘটতে পারে সম্ভাব্য ক্রেতাদের আয়তন বাড়ানোর মাধ্যমে, যেখানে রয়েছে ভাড়াপ্রত্যাশী, ব্যবসায়ী, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সামরিক-বেসামরিক উভয়ই)। সার্বিকভাবে আজকের সাফল্যমণ্ডিত গার্মেন্ট শিল্প গঠন হয়েছে এ ধরনের উদ্যোক্তা ও উদ্যমী সরকারি কর্মচারী ও সামরিক কর্মকর্তা দ্বারা। এখানে যেটা প্রাসঙ্গিক ছিল তা হলো, বিশাল উদ্দীপক ও বেসরকারি মালিক বা ব্যবস্থাপনার মনে থাকা অপ্রত্যাশিত অর্জনের প্রত্যাশা। এর ওপর বেসরকারি মালিকানার ঘাঁটি বিস্তৃত করতে উদ্যোগগুলো বিদেশী ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেয়া যেতে পারত; প্রয়োজন পড়লে স্থানীয় উদ্যোগ পরিচালনার জন্য বিদেশী ম্যানেজার নিয়োগ দেয়া যেতে পারত। অবধারিতভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ তৈরি হতে পারত, যেটা উন্নয়নশীল বিশ্বের শিল্পায়নের অতীত ইতিহাস প্রমাণ করে। উল্লিখিত পদক্ষেপসহ পুঁজিবাদী উন্নয়নের চিরায়ত পথ অনুসরণ করতে পারত বাংলাদেশ।

যদিও এখানে যুক্তি দেখানো যেতে পারে যে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এমন নীতির সফলতার পেছনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এ বিষয়গুলো সরকারি বা বেসরকারি, পরিত্যক্ত কিংবা বাঙালি মালিকানা, সব ধরনের উদ্যোগের ওপর প্রভাব ফেলে। এজন্য বিশ্বাস নিয়ে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য একটি প্রচেষ্টা করা যেত। কিন্তু ওই পথ অনুসরণ করা হলো না। কেন? এর সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হলো, হয়তো এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ার জন্য ওই সময় আর্থসামাজিক পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না। বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীরা নিজেদের আড়ম্বরপূর্ণ ভাষণের মধ্যে আটকে ছিলেন এবং তাদের নীতি ঘোষণা দেয়া হয়েছিল স্বাধীনতার বেশ আগে। সর্বোপরি ১৯৫০ ও ১৯৬০ দশকে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় অল্প কিছু পরিবার দ্বারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ ও অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের বিরুদ্ধে পূর্ব ও পশ্চিম পকিস্তানে জনঅসন্তোষ বাড়ছিল, উৎসাহ জুগিয়েছিল সব রাজনৈতিক দল।

কারো কারো অভিযোগ ছিল, বঙ্গবন্ধু শিল্প-কারখানার জাতীয়করণ বিষয়ে নিজের চিন্তা নিয়ে স্পষ্ট ছিলেন না এবং কোনোভাবে অল্প কিছু মন্ত্রী ও পরিকল্পনা কমিশনের কারণে নিজের সর্বোত্তম বিচার থেকে সরে এসে তিনি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটি তার ব্যক্তিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কে সঠিক বার্তা দেয় না। ভালো-মন্দ বিবেচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। শিল্প-কারখানার জাতীয়করণ নীতির প্রতি তার মনোনিবেশকে দেখা হয়েছিল তার অতীত অঙ্গীকার, এক ধরনের জনতুষ্টিবাদী সমাজতন্ত্রের প্রতি তার বিশ্বাস এবং নিজ দলের ভিত্তিগত উপাদানের কারণে নিজের ওপর সৃষ্ট বড় চাপ, বিপ্লবী ছাত্র ও শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের পরিপ্রেক্ষিতে। অতীত অঙ্গীকার ও জনতুষ্টির দিকে নজর রেখে তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। জাতীয়করণে মূল্য চড়া নয়, তিনি ক্ষুদ্র শিল্পশ্রেণীকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি নিতে পারতেন, যারা এখনো অসংগঠিত ও রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই। তিনি পরবর্তীকালে ভূমি সংস্কারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, সেই একই প্রকৃত বা নিপাট রাজনৈতিক কারণে। এটি নিজ দলের গ্রামীণ ক্ষমতার ভিত্তি অগণতি মধ্যম ও বড় কৃষকের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলত। বঙ্গবন্ধু জাতীয়করণ নিয়ে ক্যাবিনেট সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ সম্পর্কে ভালোভাবেই সচেতন ছিলেন। প্রাক-জাতীয়করণ দলে থাকা বিশিষ্ট ও বাকপটু সদস্য ছিলেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা, যেমন শিল্পমন্ত্রী, অর্থ ও আইনমন্ত্রী। বিরোধী দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী, যিনি নিজেই একজন শিল্পপতি ছিলেন। তবে এটি দুর্বল দল ছিল। বাকিরা এ নিয়ে উদাসীন ছিলেন অথবা নিজেদের শক্তিশালী মতামত ছিল না। জাতীয়করণ নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন মতের লোকের সম্ভাব্য ভাবাদর্শগত বিশ্বাস ও মতামত যাচাই করার চিরায়িত পথ অনুসরণ করতেন। তিনি দেখতে পেলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়করণ নীতি অজনপ্রিয় নয়। জাতীয়করণ ঘোষণা নিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও সাধারণ মানুষের বৈঠক ও আলোচনা এটি প্রমাণ করে। বেশির ভাগ পত্রিকা এ সংবাদকে ব্যানার হেডলাইন ও রিপোর্ট দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিল। চরম উৎসাহে জানান দিয়েছিল, কীভাবে সমাজতন্ত্রের পথে প্রথম পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর একটি কারণ হতে পারে যে, যারা তার নীতির বিরোধিতা করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়ে থাকবে হয়তো।

সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ বা আয়ের উচ্চবৈষম্য ও মধ্যবিত্তদের প্রতি পক্ষপাত শুধু অপছন্দই করতেন না, বঙ্গবন্ধু ক্ষুদ্র ও মধ্যম স্তরের বেসরকারি উদ্যোগের শক্তিশালী সমর্থকও ছিলেন। বেসরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা প্রাথমিকভাবে ছিল ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ফিক্সড সম্পদ ও জাতীয়করণের ওপর ১০ বছরের স্থগিতাদেশ ছিল।

১৯৭৩ সালের শুরুর দিকে সম্পদ আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও সরকারি উদ্যোগের অদক্ষতা নিয়ে অভিযোগ বাড়তে থাকে। দুর্নীতি বন্ধ করা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মানুষের দাবি বাড়ছিল, কিন্তু তারা নিশ্চিতভাবে জাতীয়করণ নীতির বিরোধী ছিল না।

সরকারি উদ্যোগের ম্যানেজারিয়াল-কাম-এন্ট্রাপ্রেনারিয়াল নিয়ে শিগগিরই দুই শিক্ষা পাওয়া গিয়েছিল। প্রশাসক বা ব্যবস্থাপকরা একটি আরো স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো ব্যবস্থা চালু করার আগেই যাদের ১৯৭২ সালে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল পরিত্যক্ত সম্পত্তি পরিচালনার জন্য, তারা ছিল বেশির ভাগই অনভিজ্ঞ। এদের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক কর্মী, সাবেক ব্যবস্থাপক বা সিনিয়রদের ডিঙিয়ে প্রমোশন পাওয়া জুনিয়র ম্যানেজাররা। অনিবার্যভাবে তাদের অব্যবস্থাপনা ও সম্পদ আত্মসাতের কারণে বহু উদ্যোগে আর্থিক লোকসান দেখা দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, সরকারি উদ্যোগ অব্যবস্থাপনায় চলবে।

দ্বিতীয়ত. অনেক ক্ষেত্রে জাতীয়করণকৃত শিল্প-কারখানার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় মালিকানাচ্যুত মালিকদেরই, যাদের শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ করা হয়েছিল মালিকানা ত্যাগের বিপরীতে তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া ছাড়াই। যারা নিজেদের সম্পদ হারিয়েছিলেন, তাদের উদ্দীপনা ও প্রেরণা নিয়ে ভুল বোঝাকে প্রতিফলিত করেছিল। ফলে মালিক থেকে ব্যবস্থাপক বনে যাওয়া ব্যক্তিরা তাদের দায়িত্বে দেয়া শিল্প-কারখানা থেকে নিজের লোকসান পূরণের জন্য যতটুকু সম্ভব সম্পদ আহরণ করতে শুরু করেন।

প্রথম দিকে দাতা এজেন্সিগুলো জাতীয়করণের পক্ষে ছিল না। সময় অতিবাহিত হয়, বেসরকারীকরণের পক্ষে তারাও চাপ সৃষ্টি করে। যখন বঙ্গবন্ধু ভারসাম্য রেখে চলছিলেন, সে সময় তার ওপর দলের নেতৃত্বের কাছ থেকে বেসরকারি বিনিয়োগসীমা ক্রমান্বয়ে বাড়ানো, অর্থনৈতিক সিস্টেমকে আরো উদারীকরণ করা ও ধীরগতিতে বেসরকারি উদ্যোগের ভূমিকা বাড়ানোর জন্য চাপ আসতে থাকে।

এমন চাপের জন্য বিনিয়োগসীমা প্রকৃত সীমা থেকে ১২ গুণ বাড়ানো হয় এবং বেসরকারি উদ্যোগের জাতীয়করণ স্থগিতাদেশ ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করা হয়। এসব নীতি পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি খাতের প্রতিক্রিয়া ছিল সামান্যই। আংশিকভাবে বেসরকারি খাতের আস্থা তখনো পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আইন-শৃঙ্খলার অস্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি। এসব বিদ্যমান ঘাটতির জন্য স্বল্পমেয়াদি মার্কেটিং, বিতরণ ও আমদানি-রফতানি ব্যবসার মুনাফা শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার তুলনায় উচ্চতর ছিল। তাই বেসরকারি উদ্যোক্তারা এসব সুযোগ গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন।

১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে অর্থনৈতিক নীতির ভবিষ্যৎ রূপ আরো একবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠাকালে (বাকশাল) বঙ্গবন্ধু একটি নতুন সংবিধান বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার ঘোষণা করেন, যা হলো ‘শোষণমুক্ত সমাজে জনসাধারণের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তি ও শোষিতের জন্য সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।’ বিভিন্ন অনিয়ম, যা দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল, তা এ পরিবর্তনকে ন্যায্যতা দান করে। তিনি যেসব অনিয়মের কথা বলেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল— বাজে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অপর্যাপ্ত খাদ্য, বহির্বিশ্বের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীলতা, শিল্প-কারখানায় বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি। নতুন শাসনের অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম ছিল কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রবিধানভিত্তিক। শিল্প-কারখানা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করবেন শ্রমিকদের প্রতিনিধি এবং শিল্প ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। অবশ্য এ বিধান শুধু সরকারি শিল্প-কারখানার জন্য প্রযোজ্য ছিল। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি শিল্প-কারখানার কী হবে, তা নিয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না। এ নতুন সিস্টেম যে বেসরকারি খাতেও খাটবে, এমন কথা বলা ছিল না। তবে সরকারি খাতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিয়ম হয়ে উঠলে বেসরকারি খাত এর বাইরে থাকতে পারবে না। বড় কৃষক, যাদের বিস্তার বেশি, তাদেরও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা হয়। যদিও কৃষিকাজে ব্যক্তিগত মালিকানা বজায় ছিল, তবে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব কৃষককে বহুমুখী সমবায় সমিতিতে দলবদ্ধ হতে হবে। তাদের উৎপাদনকে তিনটি সমান ভাগে ভাগ করতে হবে। একটি ভাগ পাবে মালিক, একটি পাবে রাষ্ট্র ও বাকিটা সমবায় সমিতি। গ্রামের সব ভূমিহীন ও বেকার শ্রমিক সমবায় সমিতির সদস্য হবেন এবং কৃষকের উৎপাদন থেকে সমান সুবিধা পাবে। বহুমুখী সমিতি খাদ্য কিনবে, একই সঙ্গে কৃষকের পক্ষ হয়ে উৎপাদিত পণ্যের মার্কেটিং ও বিতরণ করবে। প্রকৃতপক্ষে কিছু ক্ষেত্রে সমবায় সরকারি বিভিন্ন কৃষিসেবার প্রবিধান বা সরবরাহের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে সহযোগিতা করবে।

১৯৭৪ সালের শেষ দিকে অর্থনীতি নিয়ে অনেকে যেমনটা অনুমান করেছিল, তার তুলনায় ছিল একেবারে ভিন্ন। ১৯৭২-৭৪ সময়ে সার সরবরাহে দেরি কিংবা ব্যাঘাত অথবা নিজেদের উৎপাদিত ফসলের নিম্ন বা অস্থির দাম নিয়ে কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিক্রিয়া আমার মনে রয়েছে। তিনি কৃষকদের সমবায় গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করতেন। সমবায় কৃষকদের কৃষিকাজের উপাদান সরবরাহ করবে এবং বিনিময়ে একটি চুক্তির অধীনে তাদের ফসল কিনবে বা সংগ্রহ করবে।

তবে তিনি কখনো এ আইডিয়াকে গুরুত্বসহকারে নেননি, কিংবা আমাকে এ নিয়ে গবেষণা বা সম্ভাব্যতা যাচাই চালানোর জন্য বলা হয়নি। ওই সময় বাংলাদেশে যে ধরনের অর্থনীতি ও গ্রাম পর্যায়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল এবং সমবায়ের অতীত ইতিহাস মনে রেখে সিদ্ধান্ত ছিল যে, এ বিষয়ে আগ্রহ না দেখানোই উত্তম হবে। আমি কি ধারণা করতে পারছিলাম যে, তার সাধারণ পর্যবেক্ষণ একসময় নীতি ও অর্থনীতি পুনর্গঠন পরিকল্পনার একটি অংশ হবে?

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাকশাল ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু গুরুত্ব দেন, যে ধরনের সমাজতন্ত্র তিনি বাংলাদেশের জন্য মনস্থ করেছেন, তা ‘বিশ্বের অন্য জায়গা থেকে আমদানি করা নয়।’ এটি হবে একেবারে আমাদের নিজস্ব। অবশ্যই অভিপ্রায় ছিল, অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতির বিভিন্ন উপাদান নিয়ে সেগুলোর মিশ্রণ ঘটানো এবং এদের এমন একটি উপায়ে প্রতিষ্ঠা করা, যা তার নিজের ধারণা অনুযায়ী বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বা প্রত্যাশা পূরণ করবে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে প্রস্তাবিত পরীক্ষাটি ভেঙে পড়ে। তাই এটা কখনো জানা যায়নি, এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোয় কী ঘটত বা কীভাবে বাস্তবায়নের বছরগুলোয় শিল্পনীতি বিবর্ধিত হতো।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরও জাতীয়করণ নীতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি, উপরন্তু সরকারি খাতের শিল্প-কারখানার দুর্বল পারফরম্যান্স নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনা বাড়তে থাকে। কেন তত্কালীন শাসকরা বহুলাংশে আগের নীতিতে ফিরে যেতে পারলেন না? সার্বিকভাবে যে গোষ্ঠীটি জাতীয়করণ নীতিতে বিরূপভাবে প্রভাবিত হয়েছিল, তারা ছিল নতুন শাসনের উত্সুক সমর্থক। সামরিক আইনের অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের সংবিধানেও। নির্বাহী অধ্যাদেশের মাধ্যমে শিল্পনীতিতে পরিবর্তন আনা যেত, যা প্রকৃতপক্ষে পরবর্তী বছরে করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান নিজ শাসনামলে (১৯৭৬-৮১) (প্রথমে সামরিক শাসন ও পরে তা ছাড়াই) শুধু কিছু ধাপগত পরিবর্তন এনেছিলেন। কেন আরো বেশি কিছু করা হলো না? জাতীয়করণ নীতির সমর্থকরা কোনো ধরনের হুমকি বা চ্যালেঞ্জ তৈরির জন্য সংগঠিত বা শক্তিশালী ছিল না। বিশেষ করে সামরিক শাসনের সময়, যদি জিয়া সত্যিকারভাবে আগের নীতিতে ফিরে যেতে চাইতেন। বিপরীত দিকে বরং বেসরকারীকরণ নীতির প্রতি উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জোর সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিভিন্ন অনুমান নিয়ে অগ্রসর হওয়া যেত।

প্রথমত. জিয়া পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না যে, বাংলাদেশের শিল্প-কারখানার উন্নতির গতি বাড়ানোর জন্য বেসরকারীকরণ অপরিহার্য। কেন আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না এবং কেন সরকারি উদ্যোগগুলো কার্যকর হবে না, তার পেছনে কোনো কারণ ছিল না। সেনাবাহিনী কি দক্ষতার সঙ্গে সরকারি খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তেমন কোনো দুর্নীতি ছাড়াই পরিচালনা করেনি? কেন বেসামরিক ও সরকারি খাত সমানভাবে ভালো করতে পারবে না? এটা স্বাভাবিক যে, এসব চিন্তা হয়তো একজন শক্তিশালী অভিলাষী জেনারেলের মনে এসেছিল। দ্বিতীয়ত. প্রগতিবাদী ছাত্র ও শ্রমিক জাতীয়করণ সমর্থনকারীর মতো সামাজিক শক্তিগুলো তখনো বজায় ছিল। যদিও তারা খুব বেশি উচ্চবাচ্য বা সংক্রিয় ছিল না। কিন্তু তারা রাজনৈতিক দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাধারণ জনগণের মধ্যে বেসরকারি অর্থনৈতিক শক্তির সম্পদ পুঞ্জীভূত করা নিয়ে সন্দেহ বহাল ছিল। এজন্য আগের ধারায় ফিরে যাওয়া জনগণের মাঝে খুব বেশি জনপ্রিয় হতো না।

তৃতীয়ত. ওই সময় ধনী ও সমৃদ্ধিশালী শ্রেণীর সহায়তাকারীর চেয়ে ভাগ্যের উন্নতি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি পরিচিত ছিলেন বাংলাদেশে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর লোক হিসেবে, গ্রামের মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও তাদের সমস্যার প্রতি সাড়া দেয়ার জন্য। এজন্য বাংলাদেশের শিল্প-কারখানা বেসরকারীকরণের জন্য দ্রুত অগ্রসর হওয়া রাজনৈতিকভাবে সমীচীন বা প্রত্যাশিত ছিল না। এমনকি যদিও বেসরকারীকরণের কিছু অর্থনৈতিক অর্জন রয়েছে, তবে তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। নিজ বিচারে বেসরকারীকরণের ফলে তার ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হবে, তার চেয়ে এ অর্জন সম্ভবত অপেক্ষাকৃত কম ছিল। এর ওপর সরকারি খাতের শিল্প-কারখানাগুলো কিছু সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দিচ্ছিল। সরকারি শিল্প-কারখানার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সেক্টর করপোরেশনের পরিচালক পদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা কাজ করতেন।

এজন্য জিয়া বিদ্যমান নীতিগুলো সংস্কার করার পথে খুব সতর্কভাবে এগোচ্ছিলেন। প্রথমত. সংবিধানের ‘সমাজতন্ত্রের’ পরিবর্তন হয় ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ দ্বারা। এটা ছিল খুব ছোট, কিন্তু বেসরকারি উদ্যোগের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইতিবাচক ইঙ্গিত। দ্বিতীয়ত. বেসরকারি বিনিয়োগসীমা বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়। এটি একদিক থেকে বঙ্গবন্ধু ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তারই ধারাবাহিকতা। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাতের শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ না করার মাধ্যমে তিনি শিল্পপতিদের ভয়, যা তাদের বিনিয়োগ করতে বাধা দিচ্ছিল, তা প্রশমিত করার চেষ্টা করেন। আট ক্যাটাগরির শিল্প-কারখানা (এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশী প্রধান প্রধান উদ্যোগ, যা ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয় যেমন— পাট, টেক্সটাইল ও চিনি) সরকারি খাতের জন্য রিজার্ভ ছিল। বেসরকারি-সরকারি উভয় খাতে বিদেশীদের অংশগ্রহণ অনুমোদিত ছিল। বেসরকারি খাতের জন্য শিল্প-কারখানার তালিকা বিস্তৃত করা হয়েছিল। ১০ ক্যাটাগরির শিল্প-কারখানা, যেগুলোর বেশির ভাগ স্বাধীনতার আগে ও পরে সরকারি খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল, সেগুলো বেসরকারি-সরকারি যৌথ উদ্যোগের জন্য উন্মুক্ত করা হলো। তবে সরকারের হাতে শেয়ারের বড় অংশ থাকল।

১৯৬০ দশকের শেষ দিকে ও ১৯৭২ সালে আংশিকভাবে যেসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, এসব পদক্ষেপ সেখান থেকে সরে আসার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। কেন যৌথ মালিকানা নিয়ে জোরাজুরি? কেন বেসরকারি উদ্যোগ নিজেরাই এসব ক্যাটাগরিতে অনুমোদিত নয়? কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জিয়া ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা বাংলাদেশী শিল্প-কারখানাগুলো বেসরকারীকরণ করেননি। এমন উদ্যোগগুলো থেকে বহু অনুপ্রেরণাদায়ী শিল্পপতি এসেছিলেন। এসব পদক্ষেপকে শিল্প-কারখানাগুলোকে আগের মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরীক্ষা হিসেবে গণ্য করেছিলেন শিল্পপতিরা। জিয়ার পুরো শাসনামলে (১৯৭৫-৮১), শুধু ২৩টি উদ্যোগ, যার বেশির ভাগই পরিত্যক্ত সম্পত্তি বেসরকারীকরণ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল শিল্পনীতি পরিবতর্নের একটি ক্রমিক পদ্ধতি। আমার বিশ্বাস অনুযায়ী, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না, বরং তিনি বিশ্বাস করতেন না যে, বেসরকারি খাত চাহিদা অনুযায়ী অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম। আর্থসামাজিক শক্তি, যা ১৯৭০ দশকে জাতীয়করণ নীতিকে উৎসাহিত করেছে, তা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, কিন্তু সঠিক পথে যেতে পারেনি।

শিল্পনীতিতে পরিবর্তনে বেসরকারি খাত থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কিছু কিছু লোক যুক্তি দেখাল যে, বেসরকারি খাত এটা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিল না যে, তাদের মাথার ওপর থেকে জাতীয়তাবাদের তলোয়ার তুলে নেয়া হয়েছে এবং আগামীতে নীতিতে আবার কোনো পরিবর্তন আসবে না। যদি এ ধারণা বজায় থাকত, তবে বেসরকারি খাত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকত।

জাতীয়করণ নীতি চালু করার পুরো এক দশক পর মূল নীতি তৈরি করার মাধ্যমে একটি উল্লেখযোগ্য বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৮২ সালে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর আরোপ করা সীমা তুলে নেয়া হয়। ছয়টি বাদে (বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিমান, যোগাযোগ, অস্ত্র) সব খাত বেসরকারি উদ্যোগের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন পাট, টেক্সটাইল ও চিনি শিল্পকে, যা ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয়েছিল, তা বেসরকারীকরণ করা হয়। সব শিল্প খাত— সরকারির জন্য রাখা ছয়টি ছাড়া— বেসরকারি-সরকারি যৌথ উদ্যোগের জন্যও উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন নীতি হলো সরকারি উদ্যোগের শেয়ার বেসরকারি মালিকদের হাতে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়া। এ নীতি আশ্চর্যজনকভাবে জনগণের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয় এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত মুলতবি রাখতে বাধ্য হতে হয়। বেসরকারীকরণের দিকে এগিয়ে আনার জন্য জনগণের মনোভাব তখনো প্রস্তুত ছিল না।

জনগণের মনোভাবের ক্রমান্বয়ে বা শ্লথগতির পরিবর্তনের কারণে যেটা শুরু হয়েছে ১৯৭০ দশকের মধ্য থেকে, জাতীয়করণ নীতি থেকে সরে আসতে ১০ বছর সময় লেগেছে। আচরণ ও নীতিতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে দুটি নিয়ামক বা বিষয় অবদান রেখেছিল। প্রথমত. পুরো সময়জুড়ে বেসরকারীকরণের পক্ষে থাকা দাতাগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান চাপ ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অগ্রগতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব। দ্বিতীয়ত. সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে, যা বাজার অর্থনীতির পক্ষে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে পুনর্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশে পরিবর্তনের ঝড় বয়ে যাচ্ছিল এবং বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক চিন্তাধারা ও কর্মশক্তিতে পরিবর্তন আনতে ধারাবাহিকবাবে সাড়া দিয়েছে, যা শীর্ষ নেতৃত্বের হঠাৎ নেয়া কোনো সিদ্ধান্তের ফলাফল নয়। এরশাদ জনগণের সম্মতি অর্জন করেন, অন্তত একটি পক্ষের, যাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হতো। সার্বিকভাবে নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের মধ্যে মৌন সম্মতি ছিল, এমনকি শক্তিশালী সামরিক শাসকও এটি সমীচীন বলে মনে করেছিলেন।

জাতীয়করণ করা শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা ত্বরিতভাবে নীতি পরিবর্তনের বিরোধিতা করে। বেসরকারীকরণের ক্ষেত্রে মুনাফালোভী বেসরকারি মালিকরা অতিরিক্ত শ্রমিকদের ছাঁটাই চাইতেন এবং ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ ছিল অনিশ্চিত। এটি পেতে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ কি যথেষ্ট বড় হবে পরবর্তীকাল সামাল দেয়ার জন্য? কী হবে যদি নতুন চাকরির জন্য স্থান পরিবর্তন করতে হয় অথবা অপেক্ষাকৃত কম বেতন ও সুবিধা দেয়? এসব বিষয় ও অনিশ্চয়তা কর্মচারীদের কম্পেনসেশন স্কিম তাত্ক্ষণিকভাবে গ্রহণে বাধা দিচ্ছিল। বেসরকারীকরণ নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল বেসরকারি ক্রেতাদের জন্য ক্রয় শর্ত ঠিক করা, যা খুব একটা মসৃণ প্রক্রিয়া ছিল না। শেয়ারবাজারে বেসরকারি ব্যক্তিদের কাছে সরকারি উদ্যোগের শেয়ার বিক্রি করে দেয়া শুধু সম্ভব, যদি সেগুলো মুনাফাজনক হয়। তবে বেশির ভাগই ক্ষেত্রে এটি কমই হয়েছে। ক্রয়নীতির শর্ত অনুযায়ী, অতীত ঋণ দায় ও একই সঙ্গে পেমেন্টের নির্ধারিত সময় নিয়ে ক্রেতাদের একটি চুক্তি করতে হতো।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিল্প-কারখানার যে মূল্য সরকার নির্ধারণ করে, যার ভিত্তি ছিল মূলত ন্যূনতম প্রতিস্থাপন ব্যয়, তা ক্রেতার ভবিষ্যতের মুনাফার হিসাব অনুমানের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। প্রতিস্থাপন ব্যয়টাকে কি নিমগ্ন ব্যয় (সানক কস্ট) হিসেবে ধরা উচিত ছিল? সরকারের রিজার্ভ প্রাইস নির্ধারণ বর্তমান লোকসান দ্বারা নির্ধারিত হওয়া কি উচিত ছিল না এবং বেসরকারি করলেই কি এড়ানো যাবে? এর ওপর বাণিজ্যে মুনাফার উচ্চহার, বিদেশী সরবরাহকারীদের জন্য পণ্য ফরমায়েশ, নির্মাণ বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম, অফার প্রাইসকে অবনমিত করেছিল। যখন বেসরকারীকরণ নীতি পরবর্তী বছরগুলোতে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন এসব এবং একই ধরনের অন্যান্য বিবেচনা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রবেশ করেছিল।

[ইউপিএল থেকে প্রকাশিত ‘মেকিং অব অ্যা নেশন বাংলাদেশের’ নবম অনুচ্ছেদ থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর সাঈদ সরকার]

[বইটির বাংলা সংস্করণ ‘বাংলাদেশ: জাতি গঠনকালে এক অর্থনীতিবিদের কিছু কথা’ ইউপিএল থেকে প্রকাশিত হয়েছে]

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ; প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান