ভূমি সংস্কারের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে বুঝতে আমাদের অবশ্যই এর সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। এর জন্য সংক্ষিপ্ত পরিসরে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রসঙ্গ টানা প্রাসঙ্গিক। উল্লেখ্য, এ অঞ্চলের উঁচু শ্রেণীর সম্ভ্রান্ত মুসলমান নাগরিকদের মাধ্যমেই পাকিস্তান আন্দোলনের গোড়াপত্তন। পরবর্তীতে আন্দোলনটি সংগঠিত করার পাশাপাশি তারা এর প্রতিনিধিত্ব করে। নির্দিষ্ট বা একক কোনো শব্দ দিয়ে এই ‘সম্ভ্রান্ত’ শ্রেণীটিকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না; বরং সুবিধাবাদী ভূমি মালিকদের সংঘ (প্রধানত তারা ছিল পাঞ্জাব, মধ্য প্রদেশ ও সিন্ধুর), ব্যবসায়ী গোষ্ঠী (বেশির ভাগই গুজরাট ও বোম্বের মেমন, বোহরা ও খোজা সম্প্রদায়) এবং শহরের অভিজাত মুসলিম হিসেবে তাদের আখ্যায়িত করা যায়। এর মধ্যে পশ্চিমা সংস্কৃতিঘেঁষা শহুরে মুসলিমদের অভিজাত শ্রেণীটি ছিল সবচেয়ে আধুনিক, সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী। স্বভাবতই তারা গোটা মুসলিম জোটের নেতৃত্বে ছিল। এটি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজের সাধারণ চিত্র; কারণ ঔপনিবেশিক শাসন প্রায় নিশ্চিতভাবেই স্বদেশি সাধারণ শ্রেণীর অর্থনৈতিক বিকাশ রোধ করে। বিপরীতভাবে পেশাদার ও প্রশাসনিক মধ্যবিত্তের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অস্বাভাবিকভাবে ত্বরান্বিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলার মুসলমানরা ছিল অর্থনৈতিকভাবে উপমহাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠী। শুধু তা-ই নয়, বাংলার হিন্দু গোষ্ঠী থেকে শুরু করে অন্য অঞ্চলের মুসলিমদের তুলনায়ও তারা ছিল অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাত্পদ। পাকিস্তানের জন্য গঠিত জোটে তাদের অবদান মূলত শহরের উদীয়মান পেশাদার মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিসেবে।
জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে মুসলিম লীগের সম্পর্ক এক্ষেত্রে খানিকটা পরস্পরবিরোধী অবস্থা ও ধীরগতি যোগ করে। স্বাভাবিকভাবেই গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে মধ্যবিত্ত এ শ্রেণীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষরা কেউ জমিদার বা ভূস্বামী ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কৃষক। কেননা সে সময় জমিদার আর ভূমি মালিকদের একটি বড় অংশই ছিল হিন্দু। মুসলিমদের মধ্যে তখন যে কয়েকটি ধনী পরিবার, তার মধ্যে ঢাকার নবাব পরিবারগুলো ছিল শীর্ষ এবং তারাই পাকিস্তান আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। তবে এ শ্রেণীটি শুধু নামেই বাঙালি ছিল, এমনকি তারা তাদের বাঙালি নাম-পরিচয়ের পাশাপাশি ভাষা ও বাঙালি রীতিগুলোকে একরকম তাচ্ছিল্য করত। তবে সংখ্যায় স্বল্প হওয়ায় বৃহত্তর গ্রামীণ জনসাধারণের ওপর তাদের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ তেমন ছিল না বললেই চলে। কিংবা গ্রামীণ সাধারণের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বসতি স্থানান্তরের বিষয়টিও এককভাবে তাদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ সহজ ছিল না। কিন্তু সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত কৃষক, যে তার সন্তানদের স্কুল কিংবা কলেজে পাঠাতে সক্ষম কিংবা শুধু কয়েকজন ভৃত্য দিয়ে যার মালিকানাধীন জমিগুলোর চাষাবাদ সম্ভব নয় অথবা পরিবারের ভরণপোষণ মেটানোর পরও যার শস্য উদ্বৃত্ত থাকে— এমন ব্যক্তির কাছে তার বর্তমান বসতি গুটিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে আলাপ চালানোটা ছিল খানিকটা নিরাপদ। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময় সচ্ছল এ মানুষগুলোকে আল্লাহর তরে মুসলিম লীগের জন্য সংগঠিত করাটা কিছুটা সহজ ছিল।
প্রকৃতপক্ষে মুসলিম এ ‘উদ্বৃত্ত’ কৃষকরা ছিলেন গ্রামীণ সমাজের সামন্তবাদী কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। যারা কিনা যৎসামান্য অর্থনৈতিক ক্ষমতা আস্বাদন করতে পেরেছিলেন। তাই তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা অর্জনের দিকে মনোযোগী ছিলেন। বহুল প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, দেশভাগের আগে মুসলমানদের মধ্যে ‘উদ্বৃত্ত’ এ কৃষকদের অস্তিত্ব ছিল না। এরা আইয়ুব শাসনামলের সৃষ্টি। ‘বেলস অ্যাকাউন্ট অব দ্য জোতদার অব দ্য দিনাজপুর’-এ পাওয়া তথ্যের সাহায্যে ভ্রান্ত এ ধারণাটি দূর করা সম্ভব। তাছাড়া বুকানন হ্যামিলটনের উদ্ধৃতি অনুসারে, আনুমানিক ১৮০৮ সালে ১৬ জন রায়তের মধ্যে মাত্র একজন ৩০ থেকে ১০০ একর জমি এর মূল স্বত্বাধিকারীদের নিকট থেকে নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ১৯৪৬ সালের গ্রামীণ বাংলার প্রেক্ষাপট ঘিরে একটি নমুনা জরিপের ওপর ভিত্তি করে নিম্নোক্ত সারণিটি তৈরি করা হয়েছে:
অর্থ-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে ছকের প্রথম শ্রেণীতে অবস্থানকারী মুখার্জি পরিবার ছিল ভূস্বামী বা জমির মালিক। যাদের কাজ ছিল মূলত তত্ত্বাবধায়কের। জমিতে সরাসরি চাষাবাদের কাজ না করেও তারা সমৃদ্ধবান এবং সমাজে তাদের নিরবচ্ছিন্ন উচ্চাবস্থান নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। তবে বিষয়টি উল্লিখিত ‘উদ্বৃত্ত’ কৃষক ধারণার সঙ্গে খানিকটা প্রতিবন্ধক। তালিকার দ্বিতীয় সারিতে অবস্থানকারী শ্রেণীটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষক, আরো রয়েছেন কারিগর ও ব্যবসায়ী। তবে শ্রমিক, বর্গাচাষী ও অন্যান্য সেবাদানকারী গোষ্ঠীও তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। স্পষ্টভাবেই প্রথম সারিতে প্রতিনিধিত্বকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কম দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুতভাবে তৃতীয় শ্রেণীতেও একই চিত্র বিদ্যমান। তবে দ্বিতীয় সারিতে আবার তাদের সংখ্যা বেশি হিসাবে দেখা যায়। তাই বিষয়টি স্পষ্ট যে, যদি প্রথম শ্রেণীতে জমিদার এবং তত্ত্বাবধায়ক কৃষকদের আলাদা ভাগ করা হয়, তাহলে জমিদার শ্রেণীতে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের উপস্থিতি কম হবে। ফলে প্রথম সারিতে থাকা হিন্দুদের মধ্যে বেশির ভাগই হবে ভূমি মালিক এবং একই তালিকায় মুসলিমদের উপস্থিতি হবে মূলত তত্ত্বাবধায়ক কৃষক হিসেবে। দ্বিতীয় সারিতে অন্তর্ভুক্ত কিছু ব্যক্তি যোগ্যতার ভিত্তিতে উদ্বৃত্ত কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে অনুমানটি ন্যায়সঙ্গত যে, মুসলিমদের মধ্য থেকে যে অংশটি ‘উদ্বৃত্ত’ কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তারা সংখ্যা ও মর্যাদায় উচ্চবর্গের হিন্দুদের সংখ্যার সমান হবে। তাছাড়া এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটাই ছিল পূর্ব বাংলায়, তাই গ্রামের সাধারণ জনগণের ওপর তারা সহজেই আধিপত্য বিস্তার করতে পারত, যদি এখানে কোনো হিন্দু জমিদার কিংবা তাদের অনুগত কর্মচারীরা না থাকত।
অতএব, স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম লীগ সরকার হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সন্দেহ নেই, এর ফলে কয়েকটি মুসলিম জমিদার পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা ছিল (উল্লেখ্য, পশ্চিম পাকিস্তানে ভূস্বামীদের অবস্থা কখনই এমন ছিল না। কারণ এখানকার ভূমি মালিকরা গ্রামীণ অর্থনীতি এবং গ্রামীণ সমাজের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন)। এদিকে পূর্ববঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ অনুমোদিত হওয়ার আগেই বেশির ভাগ জমির মালিক দেশ ছেড়ে যান। তাই আইনটি এই অর্থে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে যে, তাহলে এটি কি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। এক্ষেত্রে মুসলিম লীগ সরকারের ভূমিকা, বিশেষ করে উদ্বৃত্ত কৃষক দ্বারা মধ্যস্থতা পরিচালনা, ইচ্ছাপূর্বক নির্মমতার অদ্ভুত মিশ্রণ, আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি আইনটি সংস্কারের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। পি এস জোসিও আইনটি সংস্কার ও বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
যা-ই হোক, উদ্বৃত্ত এ কৃষকরা বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় কার্যকর ক্ষমতাবান গোষ্ঠী হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে ছিল দুর্বল। তবে হিন্দু ভূস্বামীদের ছেড়ে যাওয়া ক্ষমতার শূন্যস্থানটি তারা ক্রমে পূরণ করছিলেন, বিশেষ করে হিন্দু বায়না দলিলের মাধ্যমে স্ব্বত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যবশত এ শ্রেণীটির নামের পাশে ‘ডায়নামিক’ শব্দের প্রচলন ঘটেনি। যদিও তারা ন্যূনতম কোনো ঝুঁকি ও শ্রম ছাড়াই উদ্বৃত্ত অর্থ তাদের প্রতিবেশী দরিদ্র কৃষকের কাছে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে পারতেন। বিনিময়ে তাদের কাছে আসলের সমান সুদ ফেরত আসত। এদিকে আসল অর্থ অপরিশোধিত থেকে যেত। প্রতি বছর অল্প পরিমাণ ধান সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে তা ধার হিসেবে দিয়ে বিনিময়ে এক অথবা আধা মণ কিংবা দ্বিগুণের চেয়েও বেশি ধান ফেরত আসত তাদের কাছে। সুতরাং উদ্বৃত্ত এ কৃষকদের যখন উন্নত কৃষিপদ্ধতি, ভালো বীজ ও সার ব্যবহারের মাধ্যমে আরো বেশি ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়ার তাগিদ দেয়া হতো, তারা এতে খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না। যদি প্রশ্ন করা হয়— পঞ্চাশের দশকে বাংলার কৃষি খাত কেন বিকাশহীন অবস্থায় ছিল? সেক্ষেত্রে আমরা বার্কির যুক্তিগুলো খণ্ডিয়ে দেখতে পারি। তার যুক্তি অনুসারে, ফসলের অনুকূল মূল্য নির্ধারণ, জমির সরবরাহ উপকরণের জোগান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে এ সময় বাংলার গ্রামীণ সমাজে সক্ষম কোনো গোষ্ঠী তৈরি হয়নি। বরং উদ্বৃত্ত এ গোষ্ঠীটির না ছিল শক্তিসামর্থ্য, না ছিল সরকারি নীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। তবে পঞ্চাশের দশকের দিকে ওই গোষ্ঠীটির ক্ষমতা ক্রমে বাড়তে থাকে, বিশেষ করে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার সূত্র ধরে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের স্বীকৃতি এবং অনুমোদন দেয়া হয়। তখন যেসব প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়, তা ছিল সম্ভবত কৃষি বাণিজ্যের শর্তাবলির উন্নতির সঙ্গে শহরগুলোতে সরবরাহ বৃদ্ধি। এ ব্যবস্থার সুফল পেতে কিছুটা দেরি হয়েছে বৈকি। তবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাণিজ্যের এ শর্তাবলি কৃষির পক্ষে কাজ করতে শুরু করে।
সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বাজারজাতের দৃষ্টিতে কৃষকদের এ শ্রেণীটি ছিল উদ্বৃত্ত, একই সঙ্গে শিল্পজাত পণ্যের প্রধান গ্রামীণ ভোক্তা। তাই সে সময় প্রণীত রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রামকে এভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে যে, অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ওই প্রভাবগুলোকে প্রতিরোধ করার প্রচেষ্টা। তাছাড়া ওই কর্মসূচির আওতায় কেন রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মাণের দিকে বেশি মনোযোগ প্রদান করা হয়; যেখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচকার্য কিংবা পানি নিষ্কাশনের (কর্মসূচির সামগ্রিক তহবিলের মাত্র ১০ শতাংশ এ কাজের জন্য ব্যয় করা হয়) মতো অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ কর্মসূচির দিকে মনোযোগ কম দেয়া হয়।
এদিকে বাংলাদেশে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্যগুলো অনেকটা মনগড়া, যা দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াটা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া জরিপকৃত এলাকা থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতেও তথ্যগুলো রাতারাতি পরিবর্তিত হয়। তাই যদি কেউ ১৯৬০ সালের আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে ১৯৬৭-৬৮ সালের জরিপের তুলনা করেন, তাহলে মনে হতে পারে যে, ভূমি অধিগ্রহণের কর্মসূচিটি জমিদারি প্রথাকে রহিত করছে। উল্লেখযোগ্য আরো একটি বিষয়টি হচ্ছে, ৫ থেকে ২৫ একর সমপরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণের হার ছিল স্বল্প ও কম। অথচ ২৫ একরের উপরে জমি অধিগ্রহণের হার সর্বাধিক। আবার ২৫ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ যেখানে ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিপরীতে তারা যে এলাকা থেকে এসেছে, সেখানে জমির পরিমাণ কমেছে মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে মালিক পরিচালিত জমির শতাংশের ক্ষেত্রে খুব কম পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, অসচ্ছল বা দরিদ্র শ্রেণীর পাশাপাশি দুটি বড় শ্রেণীর ক্ষেত্রে ভূমির শতকরা হারের পতন ঘটেছে। অন্যদিকে বিষয়টি আমাদের অনুমানকে সঠিক বলে প্রমাণ করে যে, ক্ষুদ্র কৃষকদের দ্বারা পরিচালিত এলাকাগুলোতে মালিকানা পরিবর্তনের ফলে খুব একটা পরিবর্তন সাধিত হয়নি। তবে বৃহত্তর অধিগ্রহণের ফলে জায়গাগুলোতে আগের তুলনায় প্রজাস্বত্ব বা দখলদারের সংখ্যা বেড়ে যায়। সে সময় স্থানীয় রাজনীতিতে এদের উত্থানটি নিচের ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হল। এখানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণও উঠে এসেছে।
স্পষ্টভাবেই প্রথম নমুনাটি খুব ছোট, তবে এর ভ্রান্তিগুলো অনেক বড় হতে পারে। তবে শতাংশের নাটকীয় পরিবর্তন ছকে উল্লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করাটা কঠিন। কেবল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদধারীরাই নয়, সাধারণ সদস্যরাও গ্রামীণ সমাজের তুলনামূলক সমৃদ্ধ শ্রেণী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। ১৯৬১ সালে নির্বাচিত ৩৯২ জন ইউনিয়ন কাউন্সিলরের মধ্যে দেখা যায়, ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশের প্রায় ১২ দশমিক ৫ একর কিংবা এর চেয়েও বেশি জমি রয়েছে। যদিও মাত্র ২ দশমিক ৫ একরের কম জমি আছে মাত্র ২ দশমিক ২৯ শতাংশের কাছে। তাই বলা যায়, ১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে ইতিহাস তার বৃত্ত রচনা করে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্য ছিল মূলত স্থিতিশীল ভূমি রাজস্ব সংগ্রহ। বাংলায় প্রতিষ্ঠিত জমিদারদের অধীনে তালুকদার ও কর-সংগ্রাহকদের সঙ্গে তিনি চুক্তিটি সম্পন্ন করেন; যা তাদের ক্ষমতা ও আধুনিক জীবনযাপনের উৎসগুলোকে সংক্ষিপ্ত করে দেয়। এ ব্যবস্থার ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের বেশির ভাগই ছিল মুসলিম পরিবার।
পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে, পূর্ব পাকিস্তান সরকার কিছুটা রাজনৈতিক বিবেচনায় ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তায় যে আইনটি প্রবর্তন করে সেটিও মূলত উচ্চবর্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য কল্যাণকর হয়ে আসে। লর্ড কর্নওয়ালিস কিংবা ১৯৫০ সালের আইন প্রবর্তন কোনোটাই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যবর্তী শ্রেণীটি উপকৃত হলেও তারা গতিশীল উৎপাদন ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়।
উদ্বৃত্ত এ কৃষকরা কেন ক্ষমতাবান পুঁজিবাদী কৃষক হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হন? এ প্রশ্নের জটিল, তবে কাছাকাছি একটি জবাব হতে পারে, সম্প্রসারিত বাজার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ প্রণোদনার অভাব, অযন্ত্রচালিত মৌসুমি কৃষি ব্যবস্থার ঝুঁকিগুলোর অর্থঋণ এবং ক্ষুদ্র জমিদারি প্রথাগুলো আকর্ষণীয় করে তোলা, শিল্পায়নের প্রতি সরকারি নীতির পক্ষপাতের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ওই নীতির অকার্যকারিতা এখানে বড় ধরনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
সংস্কারের ভূমিকা সামান্যই ছিল; তবে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, আগে থেকে অস্তিত্ব ছিল কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি একটি শক্তিশালী উচ্চবর্গীয় শ্রেণীর সৃষ্টি (হিন্দু জমিদারদের দখলচ্যুত করে, তাদের সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর কিংবা অন্য উপায়ে সেখানে তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ মুসলমান কৃষকদের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে) সরকারের ওপর ভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি করেছিল এবং গ্রাম ও শহরে গড়ে উঠেছিল একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশ ৯৬-কে বলা হয়, ‘দ্য স্টেট অ্যাকোইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি (তৃতীয় সংশোধন) অর্ডার ১৯৭২’ এবং রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশ ৯৮-কে বলা হয়, ‘দ্য বাংলাদেশ ল্যান্ডহোল্ডিংস (লিমিটেশন অর্ডার) ১৯৭২’। এটি গেজেট আকারে প্রকাশ হয় ১৯৭২ সালের ১৫ আগস্ট।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ভূমি আইন:
এক্ষেত্রে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ সংস্কারটি সাধিত হয় ১৯৭২ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশ পিও ৯৬ ও পিও ৯৮ প্রণয়নের মাধ্যমে। সে সময় যেসব পরিবারের হাতে ২৫ বিঘার কম বা এর সমান জমি রয়েছে, তাদের খাজনা মওকুফ করে দেয়া হয়। তবে অন্যান্য কর ও খাজনা পরিশোধে বাধ্য থাকে। যেমন ভূমি উন্নয়ন ও ত্রাণ কর, শিক্ষা কর ও আঞ্চলিক কর। আইনের ১৫১ ধারা মোতাবেক, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অথবা জারি হওয়া নতুন অধ্যাদেশের তারিখ অনুসারে যেসব পরিবারের একক কোনো ব্যক্তি কিংবা পরিবারের সম্মিলিত সদস্যদের মোট কৃষিজমির পরিমাণ ২৫ বিঘার বেশি, তাদেরকে নির্দিষ্ট ফরমে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে রাজস্ব অফিসারের নিকট বিবৃতি পেশ করার আদেশ দেয়া হয়। ওই আদেশ পালনে ব্যর্থ হলে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা জরিমানাসহ বাড়তি জমি জব্দ করার কথা উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ ল্যান্ড হোল্ডিং লিমিটেশন অর্ডার, ১৯৭২ (১৯৭২ সালের ৯৮ নং আদেশ)-এর ৩ ধারা মোতাবেক পরিবার/সংস্থার মালিকানাধীন ১০০ বিঘার অতিরিক্ত সরকারের নিকটে সমর্পণযোগ্য জমি। ফলে রাষ্ট্রে বাড়তি জমি বা খাসজমি-সংক্রান্ত নতুন ব্যবস্থার সূচনা হয়। অনুচ্ছেদ ৭ অনুসারে, ১০০ বিঘার ওপর জমি থাকলে ব্যক্তি বা সংস্থা সরাসরি রাজস্ব অফিসার বরাবর ৯০ দিনের মধ্যে বাড়তি জমির বিবরণ দাখিল করতে বাধ্য থাকবে (১৯৭২ সালের ১৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে)। যারা এ আদেশ পালনে ব্যর্থ হবে, তাদের শাস্তিস্বরূপ ছয় মাসের ওপর কারাভোগ কিংবা ১০ হাজার টাকার চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। অধ্যাদেশ ১৩ অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক অধিগত প্রথম ৫০ বিঘার জন্য বাজারমূল্যের ২০ শতাংশ হারে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয় এবং ৫০ বিঘার উপরে জমির জন্য বাজারদরের ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। পূর্বশর্তানুসারেই পরিবারগুলো তাদের সুবিধামতো অতিরিক্ত জমি সরকারকে ছেড়ে দিতে পারবে। তবে এরপরও দেখা যায়— প্রথমত. অনেক পরিবারের কাছেই ২৫ বিঘার উপরে কৃষিজমি ও আয় অনুসারে অতিরিক্ত জমি রয়েছে। দ্বিতীয়ত. এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের কাছে রয়েছে ১০০ বিঘারও বেশি জমি। তাছাড়া মাত্র ৫ হাজার ৩৭১টি পরিবার তাদের অতিরিক্ত জমির বিপরীতে রিটার্ন দাখিল করেছে এবং এমন মোট অতিরিক্ত জমির পরিমাণ ৭৬ হাজার ৭১২ একর।
পরবর্তীতে খাসজমির বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়:
১) ভূমিহীন কিংবা মাত্র ১ দশমিক ৫ একরের সমপরিমাণ জমি রয়েছে, এমন কৃষিভিত্তিক পরিবারগুলোর হাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাসজমি তুলে দেয়া যাবে।
২) সমবায়ভিক্তিক চাষাবাদ ছাড়া, কোনো পরিবারের খাসজমিসহ মোট জমির পরিমাণ কিছুতেই ১ দশমিক ৫ একরের বেশি হবে না। (যেমন— কোনো পরিবারের কাছে যদি নিজস্ব শূন্য দশমিক ৫ একর পরিমাণ জমি থাকে, তাহলে ওই পরিবারটিকে এক একরের বেশি জমি দেয়া যাবে না)।
৩) খাসজমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়ায় কোনো সেলামি কিংবা খাজনা নেয়া হবে না, তবে সংশ্লিষ্ট দায়বদ্ধতা খাজনার সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে।
৪) ৫০ একরের বেশি জমির ক্ষেত্রে বন্দোবস্ত শর্তসাপেক্ষ হবে এই মর্মে যে, সেটলমেন্ট হোল্ডাররা সমবায় প্রকল্প গড়ে তুলবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি পরিবারকে আলাদা করে জমির বাজারমূল্যের অর্ধেক সেলামি পরিশোধ করতে হবে। আর সেলামি পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের ১০টি বার্ষিক কিস্তির চেয়ে বেশি সময় দেয়া হবে না।
৫) ৫০০ একর কিংবা এর চেয়ে বেশি পরিমাণ জমির ক্ষেত্রে সমবায় ভিত্তিতে চাষাবাদের জন্য এ ধরনের ব্লকগুলোয় গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এটি নিঃসন্দেহে বিদ্যমন পরিস্থিতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করে। বিশেষ করে সেলামি বিলুপ্তি, যা খাসজমির বন্দোবস্তের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তাছাড়া ২৫ বিঘার জমির খাজনা মওকুফ ব্যবস্থাটি লাখ লাখ মানুষের জন্য খানিকটা স্বস্তির বার্তা হয়ে আসে। তবে এটি সরকারের ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের উৎসগুলোতে সংকোচন করে, যা কিনা সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের অন্যতম উৎস। ঠিক একই সময়, যখন থেকে খাজনা এবং শুল্ক সংগ্রহ প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন এ-সম্পর্কিত সন্নিবেশিত যন্ত্রপাতি-বিষয়ক কোনো প্রশ্ন উত্থাপন হয় না, এমনকি বড় ধরনের কোনো সংকোচনের সম্ভাবনা থেকেও না। যেহেতু ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের বিভিন্ন আনুমানিক খরচ ধরা হয় ২০ থেকে ৭৭ শতাংশ, যদিও বিবিধ হার শুল্কের পরিমাণ ছিল ভূমি রাজস্বের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। বিষয়টি রাজস্ব বিভাগের ওপর গুরুভার হয়ে আসে— অনেকটা আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। রাজস্ব প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে, যা সব ধরনের কর ও শুল্ক বাতিল করা বিষয়টিকে ত্বরান্বিত করে।
অন্যদিকে রাজস্ব নির্ধারণের হারটি উৎপাদন ও বিক্রয়কে উৎসাহিত নাকি নিরুৎসাহিত করে, তা তর্কসাপেক্ষ। তবে প্রচেষ্টাটি তালিকার বহুল সংখ্যক কৃষককে রাজস্ব জমা দিতে বাধ্য করে।
চাষী সম্প্রদায়কে কীভাবে চাপে রাখা যায়— বিগত সময়ের জের বর্তমানেও প্রচেষ্টাটি থাকে অব্যাহত। তবে এবারের ছল-চাতুরিটি সম্পন্ন হয় আরো বেশি সংশোধিত প্রথাগত পদ্ধতিতে।
মূল প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তি এবং কার্যকর ভবিষ্যতের চিন্তা:
১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে স্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্ত করে এবং ভাড়াটিয়া চাষীদের সরাসরি রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসে। রাষ্ট্র ও কৃষকের মধ্যকার স্বার্থ বিলুপ্ত করা হয়। এর মাধ্যমে ৩০ লাখ মধ্যস্বত্বভোগীর অবসান হয়, যাদের মধ্যে জমির মূল স্বত্বাধিকারীর সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার। সিলিং আইন তৈরির মাধ্যমে একটি প্রচেষ্টা করা হয়। যেখানে প্রতি পরিবারের জন্য ১০০ বিঘা (৩৩ দশমিক ৩ একর) পরিমাণ কৃষিজমি নির্ধারিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে আইয়ুব খান সরকার এর পরিমাণ ধার্য করে ৩৭৫ বিঘা বা ১২৫ একর। পুনর্বিন্যাসের জন্য অতিরিক্ত কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৭৪১ একর; যা কিনা প্রয়োজনীয় ২০ মিলিয়ন একরের তুলনায় খুবই কম। যদি কেউ ১৯৬১ সালের আদমশুমারি থেকে ভূমিহীন শ্রমিকদের জন্য সংখ্যা বের করে, তাহলে দেখা যাবে তাদের সবার মধ্যে যদি ওই জমিগুলো সমানভাবে বরাদ্দ করা যেত, তাহলে প্রত্যেকে শূন্য দশমিক শূন্য ৭ একর পরিমাণ জমি বরাদ্দ পেত। তবে সেলামির উচ্চহার তাদের জমির মালিক হওয়ার বিষয়টিকে অসম্ভব করে তোলে। তাছাড়া বৃহৎ জমির মালিকরা সাধারণত চাষের অযোগ্য জমিগুলোকে ইজারা দিতে উৎসাহী থাকেন, তাই বাড়তি জমি বরাদ্দের বিষয়টি ছিল নেহাতই অপব্যয়। এমনকি সাধারণ একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, নতুন বরাদ্দকৃত জমির প্রায় ৪০ শতাংশই ছিল চাষাবাদের উপযোগী। সুতরাং জমির পুনর্বিন্যাসের প্রভাবটি ছিল গুরুত্বহীন এবং অর্থনীতিবিদ ডরেন ওয়ারিনারের মানদণ্ড অনুসারে, এটিকে কোনো অর্থেই সংস্কার বলা যেতে পারে না। আইনটিকে বরং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার নামে ডাকা যেতে পারে। তদুপরি এটি মোটামুটি সফল ছিল, কৃষি উদ্বৃত্তকে কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছিল। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্রদের জন্য নেয়া উদ্যোগগুলো আক্রান্ত হয়েছিল। এতে পরাশ্রয়ী শ্রেণীকে নির্মূল করার যে চেষ্টা এখানে করা হয়, এর ফলে পরবর্তীতে শ্রেণীটি তৈরি হয়, তারা কতটা কম পরাশ্রয়ী তা স্বাভাবিকভাবেই তর্কসাপেক্ষ। নতুন করে বিলিবন্দোবস্তের জন্য যে জমিগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো ছিল সাধারণত নদীতে পলি পড়ে তৈরি জমি, খাজনা দিতে অপারগদের কাছ থেকে অধিগ্রহণকৃত জমি, রাষ্ট্রের কাছে সমর্পিত জমি এবং পরিত্যক্ত অঞ্চল ইত্যাদি।
১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি, এ ধরনের মোট জমির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ২৮ হাজার ৪৬৮ দশমিক ৩৫ একর; যার মধ্যে ৪ লাখ ১৫ হাজার ২৬৭ দশমিক ৮৩ একর জমি বন্দোবস্তের উপযোগী এবং ৪৭ হাজার ৬১২ দশমিক ৩৮ একর পুনরুদ্ধারপূর্বক বন্দোবস্তের উপযোগী এবং বাকি ১ লাখ ৯২ হাজার ৭৭৪ দশমিক ৮৮ একর ছিল চাষাবাদের অনুপযুক্ত অচল জমি।
কিছু অসম্পূর্ণ তথ্য অনুসারে, ১৯৫৬-৫৭ থেকে ১৯৭২-৭৩ সাল পর্যন্ত বন্দোবস্তকৃত মোট কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ২৬৭ একর। এর বিনিময়ে মোট ৬ হাজার ৬১৬ দশমিক ৮৭১ রুপি সেলামি তোলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিষয়টি উপলব্ধি করা আবশ্যক যে, সরাসরি প্রধান উৎস থেকে বন্দোবস্ত জমি কিংবা অধিগৃহীত অতিরিক্ত জমি— কোনো অবস্থাতেই ভূমি বন্দোবস্তের প্রক্রিয়াতে পুনর্বন্টনের প্রয়োজন ছিল না। ভিন্নমত পোষণ করা হয় যে, সংস্কারের প্রকৃতি এবং এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কেবল পাকিস্তান আমলের শ্রেণী প্রকৃতির বরাতে বোঝা যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী আইনগুলো সঠিক নির্দেশনায় ছিল, কিন্তু দক্ষতা ও ইকুইটি উভয় শর্তাবলি অনুযায়ী আইনটির সামগ্রিক প্রভাব খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। রাষ্ট্রপতির আদেশ ৯৬ ও ৯৮ অনুযায়ী প্রধান শর্তগুলো ছিল প্রথমত. যেসব পরিবারের হাতে ২৫ বিঘা (৮ দশমিক ২৫ একর) বা এর কম পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে, তাদের খাজনা পরিশোধের দায় থেকে মুক্ত করা। দ্বিতীয়ত. একটি পরিবারের জমি রাখার ঊর্ধ্বসীমা ১০০ বিঘা হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করা। বর্তমানে হিসাব করে দেখা যায়, এর ফলে পুনর্বণ্টনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৭৬ হাজার ৭১২ বিঘা ভূমি। তবে যখন থেকে খাসজমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সেলামি উঠিয়ে নেয়া হয়, তখন থেকে বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া তত কার্যকর হয়।
বাংলাদেশে কিংবা সাধারণত কোনো দরিদ্র দেশের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই প্রস্তাবিত হয় যে, জমির চূড়ান্ত পুনর্বণ্টন বিকাশ ও ন্যায্যতার ওপর নির্ভর করে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, মাত্র ২ দশমিক ৫ থেকে ৫ একর পরিমাণ ভূমি রয়েছে, এমন কৃষকরা বড় কৃষকদের তুলনায় দক্ষ ও কার্যক্ষম। প্রথমত. একরপ্রতি তাদের শস্যের উচ্চফলন রয়েছে। দ্বিতীয়ত. তাদের এলাকাগুলোতে বাণিজ্য শস্য উৎপাদনের পরিমাণ বেশি। তৃতীয়ত. জমিতে একরপ্রতি তারা যেমন বেশি শ্রমিক ব্যবহার করে, তেমনি তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাণ বা ফলন তুলনামূলক বেশি। শেষের এ পয়েন্টটি উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে কৃষিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টি ছিল অনেকটাই অভিকাঙ্ক্ষিত।
যদিও পরিস্থিতি যা দাঁড়ায়, তাতে করে ওই যুক্তিটি টেকে না। বরং কৃষির সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের ভিত্তির বদলে পুঁজিবাদী পদ্ধতিতে কৃষির বিকাশমান সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ নির্মূলের সুপারিশ করে। এর ফলে শস্যের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ব্যবস্থা খুব একটা ক্ষুদ্র কৃষক মালিকদের অনুকূলে যায় না, তাছাড়া বিদ্যমান ক্ষুদ্রপণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াটিও বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সংগঠিত কম ছিল: যা ভেতরে ভেতরে পুঁজিবাদের জীবাণু বহন করে। তাছাড়া যুক্তিটি এটি উপেক্ষা করে যে, উৎপাদনের মাত্রা কেবল এর আকারের ওপর নয়, বরং মোট কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। আর এটি মেনে নেয়াটাও বোকামি। উদাহরণস্বরূপ যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বড় কৃষক বেশি পরিমাণে উদ্বৃত্ত চালের জোগান দিতে না পারছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষুদ্র কৃষকরা ধারাবাহিকভাবে নগদ শস্য উৎপাদনে নিয়োজিত থাকবেন।
তবে এ ধরনের একটি দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন মূলত পরিসংখ্যানগত দক্ষতা বিবেচনার জন্য নয়, বরং সমাজতান্ত্রিকভিত্তিতে কৃষি ব্যবস্থাকে সংগঠিত করার মধ্যে নিহিত। যার মানে খামার পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রদ্ধতির প্রবর্তন। তবে কেবল রাজনৈতিক সক্রিতার মাধ্যমে এ ধরনের কর্মসূচির বাস্তবায়ন সম্ভব। এটি যদি শুধু একটি নীতি হিসেবে সুপারিশ করা হয়, তবে তা অর্থহীন প্রচেষ্টা।
[বিআইডিএস থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর রুহিনা ফেরদৌস]
লেখক: অর্থনীতিবিদ; বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক






