স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পরবর্তী সময়ে প্রশাসন ব্যবস্থা সুসংগঠিত অবস্থায় ছিল না। দেশের প্রশাসনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূলত দুভাগে বিভক্ত ছিল— এক. সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, এবং দুই. সাবেক পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, যাদের একটি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত ছিলেন। তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি ও করাচিতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, স্বশাসিত সংস্থা ইত্যাদিতে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল অংশটি মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে আটকা পড়ে যায়। এদের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসেন এবং তাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আরেকটি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাস্তবরূপ লাভ করার পর পরই পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং সরকারে যোগদান করেন। পাকিস্তানে অবস্থিত বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৃহৎ অংশটি পালিয়ে আসতে সক্ষম হননি। তারা বাংলাদেশে চলে আসার জন্য ‘অপশন’ প্রদান করায় তাদের চাকরিচ্যুত করা হয় এবং তাদের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রবিশেষে এককভাবে বা পরিবারসহ পাকিস্তান ডিফেন্স রুলসের অধীনে পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পে বন্দি রাখা হয়। ১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট দিল্লিতে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সহায়তায় ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে পাকিস্তানে ক্যাম্পে বন্দি থাকা বাঙালি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার এবং ক্যাম্পের বাইরে নিজ নিজ বাসস্থানে থাকা বাঙালি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের রিপ্যাট্রিয়েশনের কাজ শুরু হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চাহিদা মোতাবেক ওই সরকারের সার্ভিসগুলোর পদে নিয়োগে সুপারিশ প্রদানে পরীক্ষা পরিচালনা করত ঢাকায় অবস্থিত ইস্ট পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন। কেবল পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী প্রার্থীরাই এ কমিশন কর্তৃক পরিচালিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেন। কমিশন কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রার্থীদের পূর্ব পাকিস্তান সরকার নির্দিষ্টকৃত সার্ভিসে নিয়োগ দিত। এসব সার্ভিসের মধ্যে ছিল— ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (ইপিসিএস), ইস্ট পাকিস্তান সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস (ইপিএসএস), ইস্ট পাকিস্তান এডুকেশন সার্ভিস (ইপিইএস) ইত্যাদি। পাকিস্তান সরকারের চাহিদা মোতাবেক অল-পাকিস্তান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সার্ভিসগুলোর পদে নিয়োগদানে সুপারিশ প্রদানে পরীক্ষায় পরিচালনা করত করাচিতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশন (সিপিএসসি)। এ পরীক্ষায় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করতেন। একই পরীক্ষায় যেসব প্রার্থী মেধাতালিকায় প্রথম দিকে অবস্থান করতেন, তাদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে অল-পাকিস্তান সার্ভিসগুলোয় যথা— সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি), পাকিস্তান ফরেন সার্ভিস (পিএফএস) ও পুলিশ সার্ভিস অব পাকিস্তানে (পিএসপি) নিয়োগ দেয়া হতো। তবে পূর্ব পাকিস্তান, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশগুলোর জন্য কোটা নির্ধারণ ছিল। অর্থাৎ এসব পদে নিয়োগে মেধা ও কোটা উভয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। মেধাতালিকা ও কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করে অল-পাকিস্তান সার্ভিসগুলোয় নিয়োগদানের পর কেন্দ্রীয় সার্ভিসগুলোয় নিয়োগ দেয়া হতো। এসব সার্ভিসের মধ্যে ছিল— পাকিস্তান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিস (পিএ অ্যান্ড এএস), পাকিস্তান কাস্টমস অ্যান্ড এক্সসাইজ সার্ভিস (পিসি অ্যান্ড ইএস), পাকিস্তান ট্যাক্সেশন সার্ভিস (পিটিএস),পাকিস্তান ইনফরমেশন সার্ভিস (পিআইএস), সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস (সিএসএস), পাকিস্তান পোস্টাল সার্ভিস (পিপিএস) ও পাকিস্তান ল্যান্ড অ্যান্ড ক্যান্টনমেন্ট সার্ভিস (পিএমএলসিএস)। এসব সার্ভিসে নিয়োগেও মেধা ও কোটা উভয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। স্বাধীনতা-পরবর্তী কয়েক বছর সাবেক কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিসগুলোর কর্মকর্তাদের তাদের নিজ নিজ সার্ভিসের পরিচিতিতে বদলি বা পদায়ন করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, অল-পাকিস্তান বা কেন্দ্রীয় সার্ভিসগুলোর কর্মকর্তাদের সাবেক সিএসপি, সাবেক পিএসপি, সাবেক সিএসএস, সাবেক পিটিএস ইত্যাদি এবং প্রাদেশিক সার্ভিসগুলোর কর্মকর্তাদের সাবেক ইপিসিএস, সাবেক ইপিএসএস প্রভৃতি পরিচিতিতে বদলি, পদায়ন বা প্রশিক্ষণে পাঠানো হতো।
এটা স্বীকার্য যে, নতুন স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো এবং বেসামরিক চাকরির পদ্ধতি সম্পর্কে সরকারের নীতি কী হবে তা নির্ধারণে তত্কালীন আওয়ামী সরকার তত্পর হয়ে ওঠে। এসব বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের জন্য সরকার ১৯৭২ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট ‘প্রশাসনিক ও চাকরি পুনর্গঠন কমিটি’ গঠন করে। এ কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে ছিল— ক. টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল উভয় ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন চাকরি কাঠামো বিবেচনা করে সরকারের চাহিদা ও কার্যোপযোগী ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করা; খ. বিদ্যমান বেসামরিক সব চাকরিকে অভিন্ন চাকরি কাঠামোর আওতায় আনার প্রশ্নটি বিবেচনা করা; গ. সমন্বিত চাকরি কাঠামোয় বিভিন্ন ধরনের চাকরিতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কোন নীতির ভিত্তিতে একীভূত করা হবে, সে ব্যাপারে সুপারিশ প্রদান করা; ঘ. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অপরাপর যোগ্যতার আলোকে সরকারি চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে ভবিষ্যতে নিয়োগের নীতি নির্ধারণ করা। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল ও অক্টোবরে এ কমিটি দুই কিস্তিতে সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করে।
সরকারবিরোধী দলগুলোর তত্পরতা, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় ব্যস্ত থাকার কারণে আওয়ামী লীগ সরকার কমিটির রিপোর্টের প্রশাসনিক সংস্কার-সংক্রান্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি সাধন করতে পারেনি। তবে নতুন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিসগুলো পুনর্গঠন করার ক্ষমতা গ্রহণের জন্য সরকার ‘চাকরি (পুনর্গঠন ও শর্তাবলি) অধ্যাদেশ, ১৯৭৫’ জারি করে। অধ্যাদেশটিকে ওই বছরে জাতীয় সংসদে আইনে পরিণত করা হয় এবং ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকারিতা দেয়া হয়। এ আইনে বলা হয়, সরকার গেজেটে প্রকাশিত আদেশ দ্বারা প্রজাতন্ত্রের অথবা কোনো ‘পাবলিক বডি’র বা জাতীয়করণকৃত কোনো এন্টারপ্রাইজের সার্ভিস পুনর্গঠন করতে পারবে এবং এ উদ্দেশ্য পূরণে ‘নিউ সার্ভিসেস’ গঠন বা বিদ্যমান সার্ভিসগুলোকে একত্রীকরণ বা একীভূত করতে পারবে। সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের উপস্থিত সব সদস্যকে হত্যা করলে তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন এবং তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। কিন্তু সে সরকারের মেয়াদ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে চাকরি (পুনর্গঠন ও শর্তাবলি) আইন, ১৯৭৫-এর উদ্দেশ্য পূরণে কার্যক্রম গ্রহণ সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। একটি নতুন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারি নীতিগুলো যথাসম্ভব দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করার জন্য সুদৃঢ় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠন করার উদ্দেশ্যে সিভিল সার্ভিসগুলো পুনর্গঠন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কাঠামো সম্পর্কে সুপারিশ প্রদানের জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সরকারের সাবেক সচিব এ রশীদের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট ‘পে অ্যান্ড সার্ভিসেস কমিশন’ গঠন করেন। ১৯৭৭ সালের মে মাসে কমিশন দুটি অংশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। প্রথম অংশের (সার্ভিসেস অংশের) রিপোর্টে কমিশন ৬৩টি সুপারিশ রাখে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো— (১) আধুনিক সরকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এমন একটি সিভিল সার্ভিস গঠন প্রয়োজন যেখানে প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী ও সহজাত গুণসম্পন্ন ‘জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের’ সমন্বয় ঘটবে; (২) সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ ও পদন্নোতির একমাত্র মাপকাঠি হবে মেধা; (৩) ‘সিভিল সার্ভিস’ বলতে মিলিটারি ছাড়া সরকারি সব ‘ফাংশনারিজ’কে বোঝাবে; (৪) একটি ‘সুপিরিয়র পলিসি পুল’ গঠিত হবে, যেখানে সব ক্যাডারের উজ্জ্বল রেকর্ডের অধিকারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হবে এবং এটি নতুন ‘অ্যাপেক্স ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত হবে; (৫) বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে চারটি স্তর থাকবে এবং এগুলো হলো— ক. প্রশাসনিক, শীর্ষ পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা ও বিশেষজ্ঞ গ্রুপ; খ. নির্বাহী এবং মধ্যম পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা গ্রুপ; গ. ‘ মিনিস্টেরিয়েল’ ‘ ইন্সপেক্টরাল’, ‘ টেকনিক্যাল’ এবং ঘ. ‘মেসেঞ্জারিয়াল’ ও ‘কাস্টোডিয়ান গ্রুপ’; (৬) করপোরেশন এবং স্বশাসিত সংস্থার চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টরের ৬৬ শতাংশ পদে সিনিয়র সার্ভিস পুলের কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রদান; (৭) প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা ক্যাডারসহ ২৯টি সুবিন্যস্ত সার্ভিস থাকবে এবং এগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো— অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস, ফরেন সার্ভিস, পুলিশ সার্ভিস, জুডিশিয়াল সার্ভিস, ডিফেন্স সিভিল সার্ভিস, ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিস, কাস্টমস অ্যান্ড এক্সসাইজ সার্ভিস, ট্যাক্সেশন সার্ভিস; (৮) সংস্থাপন বিভাগ বিলোপ এবং সরকারপ্রধানের সরাসরি অধীনে একটি সিভিল সার্ভিস মন্ত্রণালয় গঠন; এবং (৯) সিভিল সার্ভিস কোড প্রয়োগের জন্য একটি সিভিল সার্ভিস ট্রাইব্যুনাল গঠন।
কমিশনের রিপোর্টের সার্ভিসেস অংশের সুপারিশ পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৯৭৯ সালের ২৩ আগস্ট ‘সিনিয়র সার্ভিসেস পুল (এসএসপি) আদেশ, ১৯৭৯’ জারি করে এবং এটিকে ওই বছরের ১ মার্চ থেকে কার্যকারিতা দেয়া হয়। এসএসপি অ্যাপেক্স ক্যাডারের পরিচিতি লাভ করে। এসএসপি আদেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, পরিচালক, মহাপরিচালক ও তদূর্ধ্ব পদগুলোর (পররাষ্ট্র সচিবের পদ ব্যতীত) ৫০ শতাংশ পদ, আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদগুলোর ৫০ শতাংশ পদ এবং সাবেক সচিবালয় ক্যাডারের উপসচিবের ১০ শতাংশ পদ ব্যতীত বাংলাদেশ সচিবালয়ের সব উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিবের পদ এসএসপির আওতাভুক্ত করা হয়। আদেশে পুলের সদস্য সংখ্যা ৬২৫ জনে নির্ধারণ করা হয়। তাছাড়া ভবিষ্যতে এসএসপিতে কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্তির নিয়মাবলি, তাদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয় আদেশে বিধৃত করা হয়। অতঃপর বিএনপি সরকার ১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসেস (পুনর্গঠন) আদেশ জারি করে। এতে অন্তর্ভুক্ত ১৪টি সার্ভিস ক্যাডার হলো— (১) বিসিএস (প্রশাসন), (২) বিসিএস (কৃষি), (৩) বিসিএস (শিক্ষা), (৪) বিসিএস (অর্থনীতি ও বাণিজ্য), (৫) বিসিএস (প্রকৌশল), (৬) বিসিএস (অর্থ), (৭) বিসিএস (পররাষ্ট্রবিষয়ক), (৮) বিসিএস (স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা), (৯) বিসিএস (তথ্য), (১০) বিসিএস (বিচার), (১১) বিসিএস (ডাক), (১২) বিসিএস (আইন প্রয়োগ), (১৩) বিসিএস (রেলপথ), (১৪) বিসিএস (সচিবালয়)। তবে বিসিএস (প্রশাসন), বিসিএস (কৃষি), বিসিএস (শিক্ষা), বিসিএস (অর্থনীতি ও বাণিজ্য), বিসিএস (প্রকৌশল), বিসিএস (অর্থ), বিসিএস (আইন প্রয়োগ) এবং বিসিএস (রেলপথ) ক্যাডারগুলোর প্রত্যেকটির একাধিক সাব-ক্যাডার থাকায় মোট ক্যাডারের সংখ্যা বাস্তবে ২৮টিতে দাঁড়ায়।
নতুন স্বাধীন দেশের সরকারি ও আধা-সরকারি কার্যালয়, স্বশাসিত সংস্থা এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ সত্তরের দশকের সরকারগুলোর আরেকটি বড় প্রশাসনিক সাফল্য। ১৯৭২ সালের জুলাইয়ে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। এ বেতন কমিশন গঠনের সময় বাংলাদেশ সরকারে চাকরিরত সাবেক পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন স্কেল মিলে সর্বমোট বেতন স্কেল ছিল ২ হাজার ২০৮টি (সূত্র: জাতীয় বেতন কমিশন প্রতিবেদন, ১৯৯৬)। তত্কালীন রাজনৈতিক চিন্তাধারা অনুসরণে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে কমিশন ২ হাজার ২০৮টি বেতন স্কেলকে ১০টি জাতীয় গ্রেড ও বেতন স্কেলে সংকুচিত করার সুপারিশ করে। এতে সর্বোচ্চ (গ্রেড-১) এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে (গ্রেড-১০) মাসিক বেতন সুপারিশ করা হয় যথাক্রমে ২ হাজার টাকা (নির্ধারিত) এবং স্কেল ১৩০-২৪০ টাকা। ২ হাজারের বেশি বেতন স্কেলকে ১০টিতে রূপান্তর করতে গিয়ে সরকার এক বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং শেষ পর্যন্ত নিচের দিকের ছয়টি স্কেল অর্থাৎ ৫-১০ নং স্কেলগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। উপরের স্তরের চারটি গ্রেডে, অর্থাৎ ১ থেকে ৪ গ্রেডের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সর্বোচ্চ পদাধিকারীসহ কোনো কর্মকর্তাকে মাসিক ২০০০ (দুই হাজার) টাকার বেশি বেতন দেয়া হয়নি।
জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকার পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ‘মিশ্র অর্থনৈতিক’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করে। ১৯৭৬ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান গঠিত উপর্যুক্ত ‘পে অ্যান্ড সার্ভিসেস কমিশন’ সরকারের মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলোকে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান কমিয়ে দ্বিতীয় অংশের (বেতন কাঠামো অংশ) রিপোর্ট পেশ করে। এতে কমিশন সর্বমোট ৫২টি গ্রেড ও স্কেল সুপারিশ করে। সর্বোচ্চ পদে মাসিক বেতন ৪ হাজার টাকা (নির্ধারিত) এবং সর্বনিম্ন পদে স্কেল ২৩০-৩২০ টাকা সুপারিশ করা হয়। সরকার কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে ২০টি গ্রেড ও স্কেল প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে সর্বোচ্চ পদের মাসিক বেতন হয় ৩ হাজার টাকা (নির্ধারিত) এবং সর্বনিম্ন পদে স্কেল নির্ধারিত হয় ২২৫-৩১৫ টাকা। এ বেতন কাঠামোর নামকরণ করা হয় ‘নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ১৯৭৭’ এবং তা ১ জুলাই ১৯৭৭ থেকে কার্যকর হয়।
সত্তরের দশকে আরো যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদিত হয় তা হলো— ১. ‘রুলস অব বিজনেস’ বা কার্য বিধিমালা প্রণয়ন; এবং ২. ‘সেক্রেটারিয়েট ইনস্ট্রাকশনস’ বা সচিবালয় নির্দেশিকা প্রণয়ন। সরকারের কার্যাবলি বণ্টন ও পরিচালনার জন্য তত্কালীন সংবিধানের ৫৬(৫) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা বলে সরকার ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে ‘রুলস অব বিজনেস’ প্রণয়ন করে। সরকারি কাজে স্বচ্ছতা আনয়ন ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণে এটি ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সরকার ও স্বশাসিত সংস্থাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কীরূপ হবে তা নিয়ে ১৯৭৬ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি গাইডলাইন জারি করা হয়। এতে স্বশাসিত সংস্থাগুলোর ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দায়বদ্ধতা বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের কাজে ‘ইউনিফর্মিটি’, শৃঙ্খলা ও গতি আনতে প্রণীত হয় ‘সেক্রেটারিয়েট ইনস্ট্রাকশনস’। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘সেক্রেটারিয়েট ইনস্ট্রাকশনস’-এর মুখবন্ধে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সচিবালয়ের কার্যাবলি পরিচালনার জন্য ‘সেক্রেটারিয়েট ইনস্ট্রাকশনস’ না থাকায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের কাজে শুধু ‘ইউনিফর্মিটি’র অভাব ছিল না, বরং সচিবালয়ের কাজে রীতি ও পদ্ধতি অনুসরণে বিরাজ করছিল বিশৃঙ্খলা। ‘সেক্রেটারিয়েট ইনস্ট্রাকশনস’ প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তত্কালীন রেলওয়ে বিভাগের সচিব (পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব) মো. মাহবুবউজ্জামান।
সত্তরের দশকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। স্বাধীনতার পর পরই ১৯৭২ সালে জারিকৃত রাষ্ট্রপতির ৭নং আদেশ দ্বারা তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যমান সব স্থানীয় সরকার কমিটি ভেঙে দেয়। অবশ্য ১৯৭৩ সালে নতুন করে জারিকৃত রাষ্ট্রপতির আদেশের অধীনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সর্বনিম্ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ গঠনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আশার আলো দেখা দেয়। স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকার তিন ধরনের— ইউনিয়ন পরিষদ, থানা পরিষদ ও জেলা পরিষদ— স্থানীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করে।
সর্বশেষে যা বলতে চাই, সত্তরের দশকটি নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থার সংস্কারে ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ দশকেই অনেকটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় থাকা সাবেক পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সার্ভিসগুলোকে বিলুপ্ত করে স্বাধীন দেশের উপযোগী সার্ভিস ক্যাডারগুলো চালু করা হয়। আশির দশকে রাষ্ট্রপতি এরশাদের সরকার কর্তৃক এসএসপি বাতিল ছাড়া সত্তরের দশকে প্রবর্তিত সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থা গত চার দশকে প্রায় অটুট রয়েছে। এ দশকে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০টি গ্রেড সংবলিত যে কাঠামো চালু করা হয়, সে কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বেতন ও ভাতার পরিমাণ বেড়েছে। থানা পরিষদের স্থলে উপজেলা পরিষদ গঠিত হওয়া ছাড়া সত্তরের দশকের স্থানীয় সরকার কাঠামো বহুলাংশে বহাল রয়েছে। সব মিলিয়ে সত্তরের দশক প্রশাসন ব্যবস্থার সংস্কারে ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর উন্নয়নে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: সাবেক সচিব






