আর্চার কেন্ট ব্লাড (৮১) ছিলেন একজন পেশাদার কূটনীতিক। পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার নিন্দাসূচক তার ‘ব্লাড টেলিগ্রামে’র জন্য ঢাকায় কনসাল জেনারেলের পদ থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলোরাডোর ফোর্ট কলিন্সের একটি হাসপাতালে আর্টেরিয়াল স্ক্লেরোসিসে তিনি মারা যান। তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে ফোর্ট কলিন্সে থাকতেন।

গ্রিস, আলজেরিয়া, জার্মানি, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভারতে পোস্টিংসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টে ৩৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। মার্কিন কূটনৈতিক কর্পসের ২০ জন সদস্যের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র কর্মকর্তা, যিনি ভিন্নমত পোষণ করে তারবার্তায় স্বাক্ষর করেছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মম ক্র্যাকডাউন তাকে এ কাজে প্ররোচিত করেছিল। প্রথম তিনদিনে কমপক্ষে ১০ হাজার বেসামরিক লোককে হত্যা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা তিন মিলিয়ন পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। প্রায় ১০ মিলিয়ন বাঙালি, যা ছিল পূর্ব বাংলার জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।

ব্লাড ও তার অনুগামী স্বাক্ষরকারীরা তারবার্তায় অভিযোগ করেছিলেন, ‘আমাদের সরকার গণতন্ত্রের দমনকে নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার তার নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য জোরদার ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্যপূর্ণ সরকারকে শান্ত করার বদলে পিছু হটছে। আমাদের সরকার এমন নজির স্থাপন করেছে, যাকে অনেকে নৈতিক দেউলিয়াত্ব বলে মনে করবে। অথচ ঠিক সেই সময়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে গণতন্ত্র রক্ষার বার্তা পাঠিয়েছেন। ...’

লেখক ক্রিস্টোফার হিচেনস তার ২০০১ সালে প্রকাশিত দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার বইয়ে তারবার্তাটিকে ‘স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মচারীর পক্ষ থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্টে এ পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে জোরালো শব্দযুক্ত রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম. নিক্সন ও সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানকে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালুর গোপন দরজা হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাই তারা অবিলম্বে ব্লাডকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেন। যদিও ছুটির পর তার পাকিস্তানে আরো ১৮ মাসের সফর নির্ধারিত ছিল, তবে তিনি তার পদে ফিরে আসেননি। তাকে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মীদের অফিসে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

সরকারি সূত্র পরের বছর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিল যে হত্যাকাণ্ডের মাত্রা সম্পর্কে প্রতিবেদনগুলোকে তখন অবিশ্বাস করা হয়েছিল। স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা এ প্রেরণকে বিপজ্জনক বলে মনে করেছিলেন।

যদিও ব্লাড ১৯৭১ সালে ‘উদ্যোগ, সততা, বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস এবং সৃজনশীল ভিন্নমত’ সম্পর্কিত অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ক্রিশ্চিয়ান এ. হার্টার পুরস্কার পেয়েছিলেন, তবে তার ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৮২ সালে দ্য পোস্টকে তিনি বলেন, ‘আমি আমার ভিন্নমতের জন্য মূল্য দিয়েছি। কিন্তু আমার কোনো বিকল্প ছিল না। সঠিক ও ভুলের মধ্যকার রেখাটি খুব পরিষ্কার ছিল।’

AFSA থেকে হার্টার অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও ব্লাড স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে জন জ্যাকব রজার্স অ্যাওয়ার্ড, মেরিটোরিয়াস অনার অ্যাওয়ার্ড এবং সেনাবাহিনী বিভাগ থেকে ডিস্টিংগুইশড সিভিলিয়ান সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।

ব্লাড শিকাগোয় জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড় ছিলেন। তিনি লিঞ্চবার্গে তার হাই স্কুল ক্লাসের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৩ সালে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ফি বেটা কাপা স্নাতক হন। ১৯৬৩ সালে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে ব্লাড ও তার স্ত্রী ফোর্ট কলিন্সে স্থায়ী হয়েছিলেন। যেখানে তারা ‘পৃথিবীর সেরা জলবায়ু’-তে এবং দাদা-দাদি হিসেবে পূর্ণকালীন অবসর উপভোগ করেছিলেন। ব্লাডের শখের মধ্যে ছিল বাগান করা, ভ্রমণ ও হাইকিং।

১৯৪৭ সালে থেসালোনিকিতে ভাইস কনসাল হিসেবে পোস্টিং দিয়ে তার ৩৫ বছরের ফরেন সার্ভিস ক্যারিয়ার শুরু হয়, তারপর ১৯৪৯ সালে মিউনিখে পোস্টিং হয়। ১৯৫০ সালে তাকে এথেন্সে পাঠানো হয় এবং আলজিয়ার্সে ভাইস কনসাল হিসেবে একটি সংক্ষিপ্ত সফরের পর তাকে ১৯৫৩ সালে বনে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৬০ সালে তাকে উপপ্রধান কর্মকর্তা হিসেবে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি কাবুলে ডেপুটি চিফ অব মিশন পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এথেন্সে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭০ সালে তাকে ঢাকায় কনসাল জেনারেল হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল কিন্তু ১৯৭১ সালের জুনে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিষয়ে মার্কিন প্রতিক্রিয়ার অভাবের জন্য ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’-এর পরে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মী অফিসে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে তাকে পেনসিলভানিয়ার কার্লাইলে ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজে কমান্ড্যান্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে পদায়ন করা হয়। যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক বিষয়ের জন্য ডেপুটি কমান্ড্যান্ট পদে প্রথম বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একজন নৌকর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৪৭ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেন। ফরেন সার্ভিসে তার কর্মজীবনের শেষ দশকে তিনি আফগানিস্তানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং দুই মেয়াদে নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্লাড ১৯৮২ সালের মে মাসে মেডভিলের অ্যালেগেনি কলেজে কূটনীতিক হওয়ার জন্য ফরেন সার্ভিস ত্যাগ করেন। ১৯৯০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর, যাকে তিনি ‘স্ব-আরোপিত নির্বাসন’ বলে অভিহিত করেন, কার্লাইলের ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজের কমান্ড্যান্টের একজন কূটনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ব্লাড ২০০২ সালে দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ: মেমোয়ার্স অব অ্যান আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট শীর্ষক বইটি লেখেন এবং মিডভিলের অ্যালেগেনি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক ছিলেন।

জীবিতদের মধ্যে রয়েছেন তার স্ত্রী মার্গারেট (মিলওয়ার্ড), যিনি আগে নিউ জার্সির টেনাফ্লাইয়ে থাকতেন, তিনি ১৯৪৮ সালে তাদের বিয়ের জন্য গ্রিসে গিয়েছিলেন; ফোর্ট কলিন্সের মেয়ে শিরিন আপডেগ্রাফ ও ডেনভার, কলোর বারবারা রাঙ্কিন; পুত্র পিটার আর. ব্লাড অব আলেকজান্দ্রিয়া এবং আর্চার এল. ব্লাড অফ শেকার হাইটস, ওহিও। তিন বোন এবং আট নাতি। তার স্মৃতিচিহ্নগুলো দ্য নেচার কনজারভেন্সিতে রাখা যেতে পারে।

আর্চার কেন্ট ব্লাড টেলিগ্রামে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার নিন্দা করেছিলেন।

 

জো হোলি: লেখক ও পুলিৎজার বিজয়ী সাংবাদিক

ভাষান্তর: হাসান তানভীর