আর্চার ব্লাড
বাংলাদেশে বেশ
সুপরিচিত নাম।
বাংলাদেশের একজন
অকৃত্রিম বন্ধু।
২০০৪ সালের
৩ সেপ্টেম্বর
তিনি ইহধাম
ত্যাগ করেন,
পরিণত বয়সেই।
তার জন্মের
তারিখটি ছিল
২৩ মার্চ
১৯২৩ সাল।
এ দেশের
বন্ধু ২০০৪
সালের ১৮
আগস্ট এক
চিঠিতে লিখেছেন,
we were
saddened to read about the terrible effects of the recent flooding in
Bangldesh.
আমি একজন
বন্ধু ও
শুভানুধ্যায়ীকে হারিয়েছি।
তার সঙ্গে
পরিচয় আমার
১৯৬০ সালে।
তখন তিনি
ঢাকায় মার্কিন
কনসাল জেনারেলের
দপ্তরে ডেপুটি
প্রিন্সিপাল অফিসার।
ঢাকায় তখন
বিদেশী মিশন
মাত্র কয়েকটি।
ব্রিটিশ ডেপুটি
হাইকমিশনার, ভারতীয়
ডেপুটি হাইকমিশনার,
জাপানি কনসাল,
ফরাসি কনসাল
এবং বোধহয়
সবে স্থাপিত
ইরানি কনসাল।
কূটনীতিবিদদের দেখাশোনার
দায়িত্ব পালন
করতে গিয়ে
পরিচয় হয়
ব্লাড দম্পতির
সঙ্গে। সে
সময় ১৯৬১
সালে তোলা
একটি ছবি
আর্চার আমাকে
পাঠান ২০০৪
সালের ১৮
আগস্ট। চিঠিটি
পাই সেপ্টেম্বরের
শুরুতে। ভেবেছিলাম
টেলিফোনে ধন্যবাদ
জানাব কিন্তু
তা আর
হয়নি।
আর্চার যেমন
ছিলেন সুপুরুষ
তেমনি ছিলেন
সাহসী ও
নীতিমান। আর
সেই সাহস
ও নীতিবোধ
তিনি আহরণ
করেন ছাত্রাবস্থায়
ও যৌবনে।
১৯৪৩ সালে
তিনি ভার্জিনিয়া
ইউনিভার্সিটি থেকে
অর্থনীতিতে মেজর
নিয়ে বিএ
পাস করেন।
ছিলেন মেধাবী
ছাত্র, তারপর
যথাযথ নিয়মে
সামরিক বাহিনীতে
কাজ করেন
তিন বছর।
মার্কিন নেভিতে
তিনি ছিলেন
লেফটেন্যান্ট। সামরিক
কর্মকর্তা আর্চার
ব্লাড। অত্যন্ত
সুচারুভাবে তিনি
তার দায়িত্ব
সম্পন্ন করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র
দপ্তর থেকে
মেলে তার
স্বীকৃতি। তিনি
পান ১৯৭১
সালের মেরিটারিয়াস
অনার অ্যাওয়ার্ড।
১৯৭১ সাল
আমাদের দুঃখের
সময় আবার
আমাদের গৌরবের
সময়ও বটে।
পাকিস্তানের মোনাফেক
গোষ্ঠী মারণাস্ত্র
নিয়ে ঝাঁপিয়ে
পড়ে আমাদের
ওপর। নির্বিচারে
চালিয়ে যায়—হত্যা
ও ধ্বংসযজ্ঞ।
কিন্তু মার্কিন
মহাপরাক্রমশালী প্রেসিডেন্ট
রিচার্ড নিক্সন
এতে নিন্দা
জ্ঞাপনের কিছুই
পেলেন না।
তার কূটবুদ্ধিদাতা
হেনরি কিসিঞ্জার
আর তিনি
তখন এক
বড় দাবা
খেলায় ব্যস্ত।
পাকিস্তানের দূতিয়ালিতে
মহাচীনের সঙ্গে
২২ বছরের
জমা বরফ
তখন গলছে।
এই গণহত্যা,
এই ধ্বংসলীলা
এবং গণতন্ত্রের
এই নিধন
তারা মেনে
নিলেন আর
এর বিরুদ্ধে
কঠোর প্রতিবাদ
এল সংবাদমাধ্যমে।
বার্তা পাঠানোর
কারণে তাকে
নানাভাবে হেনস্তা
করা হয়।
অবশ্য তার
সহযোগী কূটনীতিবিদরা
তাকে বিশেষ
সম্মানে ভূষিত
করেন। তিনি
পান পররাষ্ট্র
দপ্তরের ক্রিশ্চিয়ান
হার্টার অ্যাওয়ার্ড।
আমার সৌভাগ্য
তার অ্যাওয়ার্ড
অনুষ্ঠানে যোগ
দিতে না
পারলেও সেই
উচ্ছ্বাসে শরিক
হতে পারি।
এপ্রিলের ৬
তারিখ সেই
১৯৭১ সালে
ঢাকার মার্কিন
দূতাবাসের কর্মকর্তারা
কী বলেন
তা আবার
জানার আমাদের
প্রয়োজন আছে।
কনস্যুলেট জেনারেলের
মোট ২০
জন কর্মকর্তা
বলেন, মার্কিন
সরকারের পাকিস্তান
ও জেনারেল
ইয়াহিয়াকে তোষণ
করার নীতিটি
তারা বোঝেন
না এবং
মানেন না।
তারা মনে
করেন, এ
নীতি মার্কিন
নৈতিক ও
জাতীয় স্বার্থের
পরিপন্থী। তারা
আরো বলেন,
পাকিস্তানি আওয়ামী
নিধনযজ্ঞকে ‘Genocide’ বলে
গণ্য করা
যায়। আর্চার
ব্লাড এ
অভিমতের সঙ্গে
ঐকমত্য পোষণ
করে আরো
যোগ করেন
যে তিনি
বিশ্বাস করেন,
এ সংঘাতের
ফলে বাংলাদেশ
স্বাধীন দেশ
হিসেবে প্রতিষ্ঠা
পাবে এবং
এই নতুন
দেশের সঙ্গে
সুসম্পর্ক বজায়
রাখা মার্কিন
স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বন্ধু
ও শুভানুধ্যায়ীর
পরিচয় এখানেই
পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের এ
বন্ধুটিকে অনেক
দিন আমরা
ভুলে ছিলাম।
তবে আমাদের
রজতজয়ন্তী উৎসবে
তাকে দাওয়াত
করে নিয়ে
আসা হয়।
২৫ বছর
পর ১৯৯৬
সালে আর্চার
ব্লাড ঢাকায়
এলেন, সময়াভাবে
তার স্ত্রী
মার্গারেট মেগ
তখন আসতে
পারলেন না।
আর্চার তখন
কলোরাডোর ফোর্ট
কলিন্সে অবসর
জীবনযাপন করছেন।
ফোর্ট কলিন্সেই
তিনি শেষ
নিঃশ্বাস ত্যাগ
করেন। তিনি
যান যুদ্ধরত
বাংলাদেশে থেকে,
প্রত্যাবর্তন করেন
স্বাধীন বাংলাদেশে।
৭০ পেরিয়ে
যাওয়া আর্চার
তখন কী
রকম কর্মব্যস্ত
আর আনন্দে
উদ্বেল। বহু
কষ্টে এক
সকালে তাকে
আমার বনানীর
বাড়িতে ডেকে
নিয়ে আসলাম।
বাংলদেশ নিয়ে
বই লেখার
বিষয় তখনই
তার মনে
আসে। অবশ্য
যথার্থ একটি
বই লেখার
জন্য তিনি
অপেক্ষা করেন
বাংলাদেশ সম্পর্কিত
সরকারি কাগজপত্র
যখন উন্মুক্ত
করে দেয়া
হয় ততদিন
পর্যন্ত। তারই
চমত্কার ফসল
দ্য
ক্রুয়েল বার্থ
অব বাংলাদেশ। এর
প্রচ্ছদ আঁকেন
মেগ নিজে।
বাংলাদেশের জন্য
এমন নিবেদিত
দম্পতি আর
কোথায় পাব?
২০০৪ সালের
১৭ সেপ্টেম্বর
আর্চার ব্লাডের
শেষকৃত্য সম্পাদন
করা হয়।
আর্চার ব্লাডের
চার সন্তান।
তার স্ত্রী
মার্গারেট মেগ
ছিলেন একজন
রুচিশীল নারী।
এ দম্পতির
উপস্থিতি ১৯৬১
সালে আমার
বিয়ের আসরে
ছিল দৃষ্টিকাড়া
ঘটনা। বাংলাদেশে
এখন আর্চারের
পরিচিতি অনেক
ব্যাপক। তার
ক্রুয়েল
বার্থ অব
বাংলাদেশ আমাদের একটি
অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ।
আর্চার কূটনৈতিক
সার্ভিস থেকে
অবসর গ্রহণ
করে প্রায়
১০ বছর
ছিলেন আলেগনি
কলেজের অধ্যাপক।
এ কলেজ
ম্যাগাজিনে তারা
২০০৩ সালের
শেষ সংখ্যায়
আর্চারের বইয়ের
পরিচিতি প্রকাশ
করে। জুনে
আর্চার এ
ম্যাগাজিনের একটি
সংখ্যা আমাকে
পাঠান। বাংলাদেশ,
বাংলাদেশের সমস্যা,
বাংলাদেশের আনন্দ-বেদনা
এসবই আর্চারের
জীবনের একটা
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হয়ে দাঁড়ায়।
তার প্রতি
অশেষ শ্রদ্ধা।
কাকতালীয়ভাবে আর্চার
ব্লাডের বিদায়বেলায়
বাংলাদেশ ছিল
নিদারুণভাবে বিপর্যস্ত।
প্রায় একাত্তর
সালের মতোই।
আর আমাদের
প্রতিপক্ষ ছিল
একাত্তরের প্রেতাত্মা
গোষ্ঠী। আর্চার
তুমি ভাগ্যবান—এই
পুনরাবৃত্তি তোমাকে
দেখতে হয়নি।
১৯৭১ সালে
হামলা ছিল
বঙ্গবন্ধুর ওপর,
গণতন্ত্রের ধ্বংস
সাধনের জন্য
এবং বাঙালির
স্বকীয়তা বিনাশের
জন্য। ২০০৩
সালের ২১
আগস্ট হামলা
হয়েছে বঙ্গবন্ধু-তনয়া
শেখ হাসিনার
ওপর। এ
হামলা হয়
গণতন্ত্র ধ্বংস
করতে এবং
বাঙালি জাতিসত্তা
বিলুপ্ত করতে
এবং আমাদের
সুরুচিসম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক
জীবনবোধকে উচ্ছেদ
করতে। কিন্তু
হামলাকারীদের উদ্দেশ্য
সফল হয়নি।
বর্তমানে বঙ্গবন্ধু
কন্যা শেখ
হাসিনার নেতৃত্বে
দেশ ঘুরে
দাঁড়িয়েছে।
গোরস্তান ও
ধ্বংসস্তূপ থেকে
বাংলাদেশ জেগে
উঠেছিল। এ
বাংলাদেশকে ধ্বংস
করার শক্তি
পরাজিত গোষ্ঠীর
নেই। [পুনর্মুদ্রণ]
আবুল মাল আবদুল মুহিত: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী





