বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি ও এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা জলনিমগ্ন হয়ে পড়বে। এ কারণে একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়বে এক থেকে তিন কোটি মানুষ। পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলবে জমির পরিমাণ হ্রাস, সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির হার বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার ঘটনা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চলমান ভূমিক্ষয়ের হার। এসব বিবরণ থেকে একটা জিনিসই মনে হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির কাছে অসহায় বাংলাদেশের মানুষ জলের এ স্তরবৃদ্ধির বিষয়টিকে কোনোভাবেই ঠেকাতে পারবে না।
কিন্তু এসব ধারণা ও বিবরণ ভুল। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ধরন মোটেও একই রকম নয় এবং এটি স্থিরও নয়। বাংলাদেশের উপকূল যেমন পরিবর্তনশীল, তেমনি পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের মানুষও। এক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির সম্ভাব্য বাস্তবিক প্রভাব ঠেকানোয় কার্যকর ও নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাতিবেশিক বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি আসলে পরিবেশবিজ্ঞানীদের। এ উচ্চতাবৃদ্ধি রোধে উপকূলীয় নিচু এলাকায় অঞ্চলভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত ভিত্তি তৈরির জন্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য (জিওমরফোলজি), পানির ধরন (হাইড্রোলজি), মাটি, ভূমির ব্যবহার ও আর্থসামাজিক ভৌগোলিক পরিস্থিতির কী ধরনের তথ্য দরকার, তা এখানে পরিষ্কার হয়ে যায়।
১৯৬৩ সালে তদানীন্তন গোটা পূর্ব পাকিস্তানে এক মৃত্তিকা জরিপ শুরু হয়, যা শেষ হয় বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৫ সালে। এতে দেখা যায়, এখানকার মাটিতে অঞ্চলভিত্তিক বৈচিত্র্য অনেক বেশি। এবং এসব অঞ্চলে আবার জমি, মাটি ও পানির গঠনও প্রায় ক্ষেত্রেই বেশ জটিল। স্যাটেলাইট ইমেজেও এ বৈচিত্র্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের উপকূল চার ধরনের ভূমিকেন্দ্রিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে তিনটিকে আবার ভিন্ন ভিন্ন উপাঞ্চলে (সাবরিজিয়ন) ভাগ করা যায়। এ চার ধরনের অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী নিচু এলাকাগুলো আবার উপকূলের এতটাই কাছাকাছি যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব এগুলোতেই পড়তে পারে সবার আগে।
উপকূলীয় অঞ্চলে জমির ক্ষয়বৃদ্ধির হার আবার এলাকাভেদে ভিন্ন ধরনের। এসব এলাকার প্রতিটিতেই প্রাকৃতিক পরিবেশের বস্তুগত পরিবর্তনের পেছনে মানুষের হাত রয়েছে। বিশেষ করে জোয়ারের মাধ্যমে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ বা বন্যা প্রতিরোধে গড়ে তোলা বাঁধের এতে বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রায়ই প্রাক-মৌসুম বা মৌসুম-পরবর্তী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকে উপকূলীয় অঞ্চল।
মেঘনার অববাহিকা অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন ঘটছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। ১৯৮৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে নতুন ভূমি জেগে উঠেছে প্রায় ৪৫১ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ এখানে প্রতি বছর স্থলভাগের পরিমাণ বাড়ছে গড়ে ১৯ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার গতিতে। এর আগে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭৯২ থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে নতুন জমি জেগে উঠেছিল বার্ষিক ৪ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার গতিতে। সেখানে ১৮৪০ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত এ জমি বৃদ্ধির গড় পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার গতিতে। মেঘনার মোহনা অঞ্চলে প্রতি বছর ব্যাপক হারে জমি বৃদ্ধির এ ঐতিহাসিক রেকর্ড থেকে একটা জিনিস অনুমান করা যায় যে, এ ভূমি বৃদ্ধির পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাজনিত কারণে ডুবে যাওয়া জমির পরিমাণকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যদি পূর্বাভাসমতো মৌসুমি বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পায়, তাহলে গঙ্গা- ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার ক্যাচমেন্ট এলাকায় বর্ধিত জল ও পলিপ্রবাহ বেড়ে এ ভূমি বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি গতি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া উপকূলের কাছাকাছি নবগঠিত চরাঞ্চল ও ভূমির উত্তর-পূর্ব দিকে ক্রস বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দ্বীপগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ তৈরি করা হলে এতেও নতুন করে ভূমি জেগে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার ক্যাচমেন্ট এলাকায় যদি ভবিষ্যতে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, সেক্ষেত্রে পলিপ্রবাহ কমে গিয়ে এ ভূমি জেগে ওঠার হার কমে যাবে।
তবে মেঘনার মোহনা এলাকায় নতুন ভূমি যেমন জেগে উঠেছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য হারে ভূমিক্ষয়ও ঘটেছে। যেমন সন্দ্বীপ দ্বীপটির ভূমি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। হাতিয়ার উত্তরাংশ, ভোলার উত্তরপূর্বাংশ ও সাবেক রামগতি দ্বীপের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি তলিয়ে গেছে পানিতে। মেঘনার মোহনার বাইরে উপকূলের অন্যান্য অংশে পরিবর্তন ঘটলেও তা খুবই সামান্য ও এখনো সে রকমভাবে শনাক্তযোগ্য হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে দক্ষিণপশ্চিম উপকূলে স্থানীয় পর্যায়ে সামান্য কিছু ভূমিক্ষয় ঘটছে, তবে আরো পশ্চিমে ভারতের হুগলি নদীর মোহনা অঞ্চলে এর পরিমাণ বেশি। দক্ষিণপূর্বে চট্টগ্রামের উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চলের ভূমি গঠনেও কিছু পরিবর্তন ঘটছে, তবে তা তুলনামূলক কম ও শনাক্তের অযোগ্য। তবে কুতুবদিয়া দ্বীপের দক্ষিণাংশে ভূমিক্ষয় ঘটেছে ১০ শতাংশ।
মেঘনার মোহনা অঞ্চল জনবসতি গড়ে তোলার মতো এখনো সে রকম স্থিতিশীল পর্যায়ে যায়নি। এছাড়া এখানে সাইক্লোন ও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ততার ঝুঁকিও মারাত্মক রকম বেশি। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে ঘটে যাওয়া এক মেগা সাইক্লোনে উপকূলীয় অঞ্চলের আনুমানিক তিন-পাঁচ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটেছিল।
জমির অশক্ত গঠন, লবণাক্ত নতুন পলির আস্তরণ এবং জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে পুরনো ভূমির তুলনায় নতুন জেগে ওঠা জমিগুলোর বসতি স্থাপন ও কৃষিকাজের উপযুক্ততা তুলনামূলক কম। এছাড়া গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য সুপেয় পানির অভাবও আরেকটি কারণ। বন্যা ও মোহনা অঞ্চলে স্রোতের তীব্র গতির কারণে এখানে ভূমিক্ষয় ঠেকাতে যাওয়াটাও খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়।
অন্যদিকে ভূখণ্ড হিসেবে গাঙ্গেয় বন্যা অববাহিকা অঞ্চলটি তুলনামূলক স্থিতিশীল। তীরবর্তী বাঁধসহ প্রচুর স্রোতস্বিনী নদী ও খাঁড়ি দিয়ে গঠিত অঞ্চলটিতে ভারী পাথুরে মাটির ওপর প্রতিনিয়ত পলির আস্তরণ পড়ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জোয়ারের উঁচু স্রোতে অঞ্চলটিতে বন্যা দেখা দেয়। কখনো সারা বছরই, কখনো বসন্তে আবার কোথাও কোথাও ভরা মৌসুমে নদীর বাড়তি জলপ্রবাহের কারণে। দেশের একেবারে দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে সারা বছরই লবণাক্ত পানির প্রবাহ থাকে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে উপকূলের উত্তরপশ্চিম ও দক্ষিণপূর্ব অংশে কিছুটা লবণাক্ততা দেখা যায়।
সুন্দরবন অঞ্চলটিতে সাইক্লোন ও ঝড়ের ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে ঝড়ের কারণে নদীর জোয়ারের পানি উপকূলের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়ে, যেমনটি দেখা গেছে ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার সময়ে। জোয়ারের ঢল থেকে সুরক্ষা পেতে গাঙ্গেয় বন্যা অববাহিকা অঞ্চলে উত্তরপূর্বাঞ্চল ও সুন্দরবন অংশ বাদে প্রধান নদীগুলোর তীরে পোল্ডার নির্মাণের কাজ শুরু হয় পঞ্চাশ ও ষাটের দেশের শেষ দিকে। জমে যাওয়া বৃষ্টির পানি বের করে দিতে স্থাপন করা হয় স্লুইস গেট। শুধু শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ ও দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের নদীতীরবর্তী এলাকার মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। জমির ভূগর্ভের পানিবাহিত লবণাক্ততা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কারের জন্য বৃষ্টির পানিই পর্যাপ্ত। ফলে এদিককার যেসব অঞ্চলে সুপেয় পানি পাওয়া যায়, সেখানে ধান জন্মানো সম্ভব হয়। অন্যদিকে যেসব এলাকার নদীগুলোর পানিতে লবণাক্ততা থাকে না, শুষ্ক মৌসুমে সেখান থেকে পানি এনে সেচকার্য চালানো যায়। ফলে অতিরিক্ত আরেকটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়।
গড়াই-মধুমতি অববাহিকা অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যায়। ১৯৭৫ সালে ভারতে গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা থেকে গড়াইয়ে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এছাড়া নদী ও ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলনের মাধ্যমে সেচকার্য চালানোর কারণে এ সময় এ প্রবাহ আরো কম থাকে। দেশের মধ্য পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি নদী গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে কয়েক শতাব্দী ধরে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পার্শ্ববর্তী দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ শুষ্ক মৌসুমে এমনিতেই লবণাক্ত হয়ে উঠছে।
শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর লবণাক্ত পানির অন্তর্মুখী প্রবাহ এখানকার জমির লবণাক্ততা, ফসল উৎপাদন ও গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য স্বাদু পানির প্রাপ্যতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে এখানকার ক্রমাগত ঘটে চলা পরিবর্তনগুলোকে পরিমাপ করাটাও অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময়ে জমিতে উঠে আসা লবণাক্ত পানি ও পলির কুপ্রভাব বাঁধ ও স্লুইস সংস্কারের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এছাড়া গত কয়েক দশকে এখানে স্থানীয়ভাবে বাঁধে ফাটল ধরিয়ে সেখানকার লোনা-মিঠা পানিতে চিংড়ি চাষের প্রবণতা বেড়েছে। এতে ফসল উৎপাদনের যে লক্ষ্য নিয়ে বাঁধগুলো তৈরি করা হয়েছিল, তা আসলে তার উদ্দেশ্য থেকে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভূমি দেবে যাওয়া। স্বাভাবিক অবস্থায় ভূমির দেবে যাওয়া অংশ নদীতে ভেসে আসা পলি দিয়ে পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের কারণে পোল্ডারের ভেতরের অংশে প্রাকৃতিকভাবে পলির আস্তরণ পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ভূমি দেবে যাওয়ার প্রকৃত হার ও এর কারণ নির্ধারণে এখন পর্যন্ত খুব কমই গবেষণা হয়েছে। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে বাঁধে ফাটল ধরিয়ে চিংড়ি চাষ ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাস।
কিছুদিন আগে হাই রেজল্যুশন স্যাটেলাইট অল্টিমেট্রিক ডাটা ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলটি বছরে গড়ে ১৮ মিলিমিটার করে দেবে যাচ্ছে। তবে গবেষণায় মাঠপর্যায়ে কাজ চালিয়ে এ উপাত্তের সহায়ক প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের ৩৩টি বদ্বীপ অঞ্চলের ভূমিতে এ দেবে যাওয়ার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছে। দেখা গেছে, ওইসব অঞ্চলেও মূলত বাঁধ নির্মাণ ও ভূগর্ভের পানি ও গ্যাস উত্তোলনের মতো মানবসৃষ্ট কারণেই এ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে গবেষণাটিতে গলদ পাওয়া গেছে। গাঙ্গেয় অববাহিকায় কোথাও এত বেশি হারে ভূমি দেবে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এবং দেবে যাওয়ার হার সবখানে সমানও নয় যে, একে সাধারণ একটি গড় সংখ্যা (১৮ মিলিমিটার) দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে।
বাগেরহাটে পঞ্চদশ শতাব্দীর একটি মসজিদ, সুন্দরবনের একটি ৪০০ বছর পুরনো হিন্দু মন্দির ও খেপুপাড়ার ২৫ কিলোমিটার উত্তরপূর্বের ২০০ বছর পুরনো মন্দিরের ভিত্তিমূল পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদে এখানে দেবে যাওয়ার গড় বার্ষিক হার কোথাও এক থেকে আড়াই মিলিমিটারকে অতিক্রম করেনি। ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বছরে যদি ১৮ মিলিমিটার করে দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটত, এসব স্থাপনা এতদিনে সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে ২ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৫ মিটার নিচে চলে যেত।
সুন্দরবন অঞ্চলের মাটির গভীরের জৈব উপাদানের রেডিও কার্বন ডেট পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এখানে ভূমি দেবে যাওয়ার বার্ষিক গড় হার ১ দশমিক ৩ থেকে ৭ দশমিক ১ মিলিমিটার। কুয়াকাটার ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে সুন্দরবনের পূর্ব উপকূলে দেখা গেছে, এ দেবে যাওয়ার বার্ষিক গড় হার ৫ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ১ মিলিমিটার।
মূলত খুলনার মতো কয়েকটি স্থানে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে এ অঞ্চলের ভূমি দেবে যাচ্ছে। গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি হলোসিন, প্লাইস্টোসিন ও টারশিয়ারি যুগের বালুময় পলি দিয়ে গঠিত। সাধারণত এ ধরনের ভূমি পানি তুলে নেয়ার কারণে দেবে যায় না। সম্ভবত বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের টেকটোনিক গঠন দেবে যাওয়ার কারণেই এ ঘটনা ঘটছে, যাকে আরো জটিল করে তুলছে অববাহিকার বিভিন্ন ভাঁজ ও ত্রুটি। এছাড়া অন্য যেসব এলাকায় ভূমি দেবে যাওয়ার যেসব বড় ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে নোয়াখালী জেলা ও চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল উল্লেখযোগ্য। ১৭৬২ সালে আরাকান ভূমিকম্পের সময়ে এখানকার মাটি দেবে গিয়েছিল।
বিশ্বব্যাপী জোয়ার-ভাটার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হিসাব করে দেখা গেছে, গোটা বিশ শতক ধরেই সমুদ্রপৃষ্ঠে পরিবর্তন এসেছে। ভারত মহাসাগরের উত্তরের কয়েকটি কেন্দ্রের ৪০ বছরের বেশি সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময় এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি ঘটেছে অঞ্চল ও সময়ভেদে বছরে ১ দশমিক শূন্য ৬ থেকে ১ দশমিক ৭৫ মিলিমিটার করে, যার বার্ষিক আঞ্চলিক গড় দাঁড়ায় ১ দশমিক ২৯ মিলিমিটার।
পরিবেশে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট পরিবর্তনের প্রভাবকে আরো বাড়িয়ে বা গতিশীল করে তুলবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে লোনা পানির প্রবাহ মূল ভূখণ্ডের আরো ভেতরের অংশে ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া মেঘনার নিম্নাঞ্চল থেকে আরো পূর্বের এলাকা এবং পশ্চিমের স্বতন্ত্র বেসিনগুলো থেকেও পানি নিষ্কাশন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির কারণে মেঘনার মোহনায় অবস্থিত দ্বীপগুলোর তুলনামূলক পুরনো ভূমিতে ক্ষয়ের হারও বাড়বে। তবে এ ক্ষতি আবার অন্য স্থানে নতুন ভূমির উত্থান-পুনরুত্থান দিয়ে পুষিয়েও যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ উদ্ভাবন, এর পরীক্ষণ এবং সব শেষে কার্যকর জায়গায় এর বাস্তবায়নের পথ খুঁজে বের করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূমির উত্থান বা ক্ষয় এবং ঝড়-বন্যা-জলোচ্ছ্বাসের ফলে ঘটা পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোয় কয়েক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা রয়েছে বাঙালির। এদের ফসল উৎপাদনের ঐতিহ্যগত রীতি ও প্যাটার্ন দুটোই মাটি ও পানির ধরনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ১৯৫০ সালে প্রথম বড় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ স্থাপনের পর স্থানীয় পরিবেশে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, দ্রুতই তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে বাঙালিরা। খাপ খাইয়ে নিয়েছে পরবর্তীতে উদ্ভাবিত শুষ্ক মৌসুমের সেচ ব্যবস্থা ও উচ্চফলনশীল শস্যের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গেও। পরিবর্তনশীল পরিবেশের ব্যবস্থাপনা নিয়েও বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা রয়েছে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার বিষয়েও। সুতরাং এটুকু বলা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কাছে অসহায় নয় বাংলাদেশ। তবে এর প্রভাব প্রশমনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার জন্য অন্যত্র থেকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে বাংলাদেশের।
[লেখক ১৯৬১-৭১ পর্যন্ত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গৃহীত মৃত্তিকা জরিপ প্রকল্পের প্রধান ছিলেন। ১৯৭৪-৮৭ পর্যন্ত বাংলাদেশে এফএওর কৃষি উন্নয়ন উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া ১৯৮৮-৯৫ পর্যন্ত বাংলাদেশ ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানে বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। উপরিউক্ত প্রবন্ধটি তার ‘বাংলাদেশ’স ডায়নামিক কোস্টাল রিজিয়নস অ্যান্ড সি-লেভেল রাইজ’ শীর্ষক গবেষণা নিবন্ধের অনূদিত ও সংক্ষেপিত সংস্করণ]
ভাষান্তর: সাইফ বাপ্পি






