বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলের একটি অংশ হলো ভবদহ অঞ্চল, যা জোয়ারবাহিত পলি দ্বারা এ অঞ্চলের ভূমি গঠিত। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল বলতে পূর্বে পিরোজপুর, পশ্চিমে সাতক্ষীরা, উত্তরে যশোর জেলার অভয়নগর, কেশবপুর, মণিরামপুর পর্যন্ত। নদী-নালা-খাল এ অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। মাথাভাঙ্গা, গড়াই, মধুমতি, কপোতাক্ষ, ভৈরবের প্রবাহে প্লাবিত ভূমির অংশ হলো কপোতাক্ষ, ও ভৈরবের মধ্যবর্তী অঞ্চল। এ অঞ্চলের উজান ও ভাটি দ্বারা বিভক্ত অংশের মধ্যবর্তী অঞ্চল হলো ভবদহ জলাবদ্ধ অঞ্চল। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জলাবদ্ধ এলাকার সবচেয়ে ভয়াবহ অঞ্চল এটি। বিলবোকড়, বিল কেদারিয়া, বিলভায়না, বিলখুকশিয়া, বিল আড়পাতা, বিল দহকূলা, বিল দামুখালী বিল ও নিম্নাঞ্চল ভবদহ অঞ্চলের ভূগাঠনিক প্রধান বৈশিষ্ট্য। অতীতে এখানে যেমন নদীর প্লাবন দ্বারা ভূভাগ স্নাত হতো, তেমনি জোয়ার-ভাটাবাহিত লবণাক্ত পানিও তার পদধৌত করত। এঁটেল মাটি এখানকার নিম্ন ভূমির ভূগঠনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। জৈব পদার্থের পচন দ্বারা সৃষ্ট অগঠিত নরম মাটি হাজার বছর ধরে বিলগুলোর তলদেশ পূর্ণ করেই জলাবদ্ধতার পরিধি বাড়তে থাকে এবং নব্বইয়ের দশকে সেটি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বর্তমানে জলাবদ্ধতা ক্রমে ভাটির দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে এর পরিধি সমগ্র খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা, যশোর জেলার নিম্নাংশ এবং বাগেরহাট জেলার একাংশ নিয়ে বিস্তার লাভ করেছে।
খুলনা-যশোর-সাতক্ষীরার নয়টি উপজেলার খুলনার ফুলতলা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা ও খুলনা সদর, যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর, যশোর সদর ও সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মোট ৬২টি ইউনিয়ন জলাবদ্ধতা কবলিত। এসব জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি প্রকল্পগুলো তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
আমাদের এই দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ জলাবদ্ধতা নামক দুর্যোগের সঙ্গে বেশ পরিচিত। এ অঞ্চলের প্রায় সব উপজেলায় এ দুর্যোগ আছে। এ অঞ্চলে প্রায় ১০-১২ লাখ মানুষ দুই যুগের বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতার মধ্যে আছে। এই জলাবদ্ধ অঞ্চলকে নিষ্কাশন চ্যানেল অনুযায়ী দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১) দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা (বিলডাকাতিয়া এলাকা)। ২) উত্তর-পশ্চিম এলাকা (যশোর এলাকা) ভবদহ। ভবদহ এলাকাটি মূলত রেগুলেটরের নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। আর বিলডাকাতিয়া ও ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা বললে কেজিডিআরপি অঞ্চলের জলাবদ্ধতা বোঝায়।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিবেশগতভাবে তিনটি বিভাজন করা যায়। ক) উপকূলীয় জলাভূমি বা ম্যানগ্রোভ প্লাবন ভূমি। খ) ইষৎ লবণাক্ত অঞ্চল বা জোয়ার-ভাটা প্লাবন ভূমি। গ) মিষ্টি পানির অঞ্চল বা প্লাবন ভূমি।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের তত্ত্ব উদ্ভাবন করা হয়। এই তত্ত্ব্ব অনুযায়ী সারা বিশ্বে অধিক খাদ্য ফলাও অভিযান শুরু করা হয়। উৎপাদন বৃদ্ধিও লক্ষ্যে কৃষিজমি সম্প্রসারণ, সেচ ব্যবস্থা, সার ও কীটনাশকোর প্রচলনের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল দানাশস্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে উপক্ষো করে ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হয় উপকূলীয় বাঁধপ্রকল্প। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল সামুদ্রিক লবণাক্ততা, জলস্ফীতি ও বন্যা থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের বসতভিটা ও শস্যক্ষেত্র রক্ষা করা। মূলত উপকূলীয় জলাভূমিকে সারা বছর কৃষিভূমিতে পরিণত করার লক্ষ্যে দুটি পর্যায়ে বাঁধপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা শুরু হয়।
প্রথম পর্যায়ে ৯২টি পোল্ডার ৪ হাজার কিলোমিটার বাঁধ ও ৭৮০টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। ১৯৬০-৬৯ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ হয়। খুলনা অঞ্চলে ৩৭টি পোল্ডার, ১৫৬৬ কিলোমিটার বাঁধ ও ২৮২টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়।
এর ফলে প্রথম দিকে এক দশক বেশ ভালোই সুবিধা পেয়েছেন কৃষকরা। ব্যাপক ফসল ঘরে তুলেছেন। কিন্তু পোল্ডারের ভেতর জোয়ারের পানি ঢোকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীতে পলি পড়তে শুরু করে। পলি পড়ে রেগুলেটরের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হলো জলাবদ্ধতা। পরবর্তীতে নদীর তলদেশ বিলের তলদেশ অপেক্ষা উঁচু হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ ধারণ করে। এর ফলে এলাকায় ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
নদীগুলোর জোয়ারের প্লাবন ভূমি সংকুচিত হয়ে পড়ল এবং সব নিম্নভূমি নদীবাহিত পলি থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ল। ফলে পানিবাহিত পলি নদীর তলদেশে দ্রুত জমা হতে লাগল। ফলে অনেক নদী হারিয়ে ফেলে নাব্যতা, অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পানি নিষ্কাশনের পথ। শুরু হয় জলাবদ্ধতা। ভূমি গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এবং প্রতিবেশের ওপর প্রভাব দেখায় মাছ ও সামুদ্রিক জীবের চরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ল; অনেক দেশীয় প্রজাতির ধানের বিলুপ্ত ঘটল; সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ল। সেই সঙ্গে আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর একটি প্রভাব পড়ল— জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকরা বাস্তুচ্যুত ও পেশাচ্যুত হতে থাকে। বৃহদাকারে চিংড়ি খামার ব্যবস্থার উদ্ভব হওয়ার ফলে সাধারণ কৃষকরা জমি হারাতে শুরু করেন।
পোল্ডার ব্যবস্থার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ভিন্নতার কারণে এক ধরনের ঝুঁকির উত্পত্তি হয়। পোল্ডার নির্মাণের পর পরই কৃষি উৎপাদন বেড়ে যায়। এতে স্বভাবতই জনগণ উপকৃত হয়। কিছুদিন পর পোল্ডারের কার্যকারিতা অচল হয়ে পড়ে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অকোজো হয়ে পড়লে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফলে কৃষিতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এবং পোল্ডার আগে যে অবস্থায় ছিল, তার থেকে আরো খারাপ হতে থাকে।
অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার বিলডাকাতিয়ায় ১৯৬৭ সালে ২৫ নং পোল্ডার নির্মিত হয়। বাঁধের বাইরে নদীগুলো থেকে জোয়ার ভাটার লোনাজল পোল্ডারের ভেতর ঢোকার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এভাবে লবণাক্ততা কমে যায়। ফলে ভেতরের জমিতে মিঠা পানির চাষের প্রসার ঘটে এবং কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ১৯৮২ সালে পোল্ডারের ভেতরে পানি জমতে থাকে। এ ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতার ফলে জনবসতি ও ফসলি জমি ধ্বংস হতে থাকে।
১৯৬২ সালে ভবদহ স্লুইসগেট নির্মাণ শুরু হয়। সত্তরের দশকে যশোর জেলার ২৭টি বিলের নিষ্কাশন এলাকা এ স্লুইসগেটের নিয়ন্ত্রণে আসে। ভবদহ স্লুইসগেট নির্মিত হওয়া ১২ বছর পর হতে এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতার শুরু। ১৯৯৭ সালে এ জলাবদ্ধতা ব্যাপক রূপলাভ করে এবং জনগণের জীবন দুর্বিসহ করে তোলে।
জলাবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলে দেখা যায়, অতি নগণ্য অংশের জমি ভরা মৌসুমে আবাদযোগ্য হচ্ছে। এলাকাবাসীর ভসতভিটা ভেঙে পড়ছে। জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। নারকেল, তাল, ইত্যাদি গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। গবাদিপশুর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকট বাড়ছে। জ্বালানি ও খাবার পানি সংগ্রহে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুকনা মাটির অভাবে উন্মুক্ত পানিতে পায়খানা-প্রস্রাব করায় দূষিত পানি আরো দূষিত হচ্ছে। চাষযোগ্য জমি ডুবে যাওয়ায় এলাকাবাসী মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাছাড়া জীবধারণে কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে অনেকেই এলাকাছাড়া হয়েছেন।
ভবদহ জলাবদ্ধ এলাকার কৃষকরা বরাবরই সুবিধাবঞ্চিত। সমাজ ব্যবস্থায় তারা প্রাচীনকাল থেকেই পিচিয়ে। সামাজিক বঞ্চনায় এ জনপদের বাসিন্দাদের আত্মপরিচয় ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। আবার পলল গঠিত নদী অববাহিকার ভূমি হওয়ায় এখানকার কোনো স্থাপত্যও দীর্ঘদিন স্থায়িত্ব লাভ করে না। ভবদহ অঞ্চলের জাত-পরিচয় তথা পেশা এখন একটাই, মত্স্য শিকার। এ অঞ্চলের প্রায় দুই লাখ পরিবার কোনো না কোনোভাবে মত্স্যজীবী। বাকি জনগোষ্ঠীর অনেকে কার্গো শ্রমিক, মৌসুমি ব্যবসার ফড়িয়া কিংবা শহরের মৌসুমি শ্রমিক। আর যারা এসব কাজের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি, তারা এখন প্রায় সবাই মত্স্যজীবী।
এ অঞ্চলের মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে এবং সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। কৃষক আন্দোলনের মধ্যে ছিলেন— কৃষক জনগণের বাঁধবন্দি আন্দোলন; উপকূলীয় বাঁধবিরোধী আন্দোলন; বিলডাকাতিয়ার গণআন্দোলন; খুলনা-যশোর নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প পর্যালোচনার দাবিতে গণআন্দোলন।
জনগণ প্রথম থেকেই বলে আসছিল বাঁধ কেটে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব। পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের এ কথা গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে যেসব কর্মকাণ্ড করে, তাতে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
প্রতি বছর সরকার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অন্যদিকে ভবদহর জলাবদ্ধতায় গত বছর যশোর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা যায়, জলাবদ্ধতায় মণিরামপুর, কেশবপুর এবং অভয়নগর উপজেলার ৩৩ ইউনিয়নে এবং পৌরসভার ১৮২টি গ্রামের ২ লাখ ৬৭ হাজার ৫১১ মানুষ পানিবন্দি। এ কারণে ৪৭ হাজার ২৪৪ পরিবারের ৩৩ হাজার কাঁচাপাকা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। মত্স্য খাতের ১২ হাজার ৫১৩ হেক্টর মাছের ঘের ও পুকুরে ১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ১৬ হাজার ৩০৮ হেক্টর জমির ১৪৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হয়। ২৯৪টি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩১ লাখ টাকা, মাধ্যমিকে ৮ লাখ, নলকূপে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থায় ১২৩ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা নষ্ট হয়েছে। এর ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়নি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকার এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের ৭৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ৫ হাজার ১৫৫টি গাছপালার ক্ষতি হয়। সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় ১০ জনের। যা মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার (সূত্র: যুগান্তর)। অতএব অর্থনৈতিক বড় ধরনের ক্ষতি প্রতি বছরই হচ্ছে।
জলাবদ্ধ অঞ্চলের বিয়োগাত্মক পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষাণীয় বিষয় হলো, অন্য কোনো দেশে সফল কোনো প্রকল্পকে, অন্ধভাবে বাস্তবায়ন না করা। বিশেষ করে যেখানে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খ) কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত হতে হবে, তাদের অনুমোদনকৃত প্রকল্প, প্রাকৃতির ভারসাম্যের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ হবে না। গ) প্রকল্প প্রণয়নের সময় জনগণের অভিজ্ঞতাকে কখনো উপেক্ষা করা উচিত নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মতো স্পর্শকাতর পরিবেশে প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত। যেহেতু এ অঞ্চলের পরিবেশ বৈশিষ্ট্য সার্ভিকভাবে উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট মাত্রার অনুসন্ধান করা হয়নি। তাই বৃহদাকারের কোনো অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে যে, এই অঞ্চলের পরিবেশ, জনগণের আর্থসামাজিক মান প্রকল্পের কার্যকারিতার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে; তার ভারসাম্য ও পরস্পরের ওপর যে ইতিবাচক নির্ভরশীলতা রয়েছে, তাকে কোনো ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত করা চলবে না। ঘ) পরিবেশ দুর্যোগ সমাধানের কোনো কার্যকর পন্থা বা উপায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে যখন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো স্থবির হয়ে পড়ে বা কার্যকর পন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তখন সাধারণ কৃষক-জনগণ তাদের নিজস্ব লোকজ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে প্রত্যয়দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে আসে। সমাজসচেতন প্রত্যেক সংস্থার দায়িত্ব জনগণের লোকজ জ্ঞানভিত্তিক এ আন্দোলনকে ধারণ করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এটা সত্য যে, নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের ভিত্তিতে ১৯৯০ সালে বিলডাকাতিয়ায় গণআন্দোলন সংগঠিত করে চার জায়গার পোল্ডার কেটে বিলে জোয়ার-ভাটার বাস্তবায়ন করেন। এবং একসময় টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) পদ্ধতিতে কৃষকরা বছরের একটি সময় নদীতে বাঁধ দিয়ে লবণপানি ঠেকিয়ে চাষাবাদ করতেন। আবাদ শেষে আবার বাঁধ কেটে দিয়ে জোয়ারের পলি তুলে জমি উঁচু করতেন।
জলাবদ্ধতা এ অঞ্চলের মানুষের আন্দোলনের ভিন্ন এক শিক্ষাণীয় বিষয়। বিদেশী-দেশী বিশেষজ্ঞগণ, পরামর্শদাতা কোম্পানি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, খুলনা-যশোর নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে অবশেষে কৃষক জনগণের ধারণাকে উপলব্ধি করতে বাধ্য হতে হয়েছে। এ অঞ্চলের অর্থনীতি সেদিনই সার্থক হবে, যেদিন শেষ হবে ভবদহের কান্না।
(তথ্যসূত্র: সিডিপি-সি-ট্রাক)
লেখক: খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী, কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (সিডিপি)
biplobcdp@yahoo.com






