বাংলাদেশের অনেক জেলা শহর ও উপজেলায় এখন ফুল চাষ হচ্ছে। কিন্তু গদখালী ইউনিয়নের ফুল চাষ একটু অন্য রকম। কারণ অন্য জায়গায় ফুল চাষ করা হয় শৌখিনভাবে। আর গদখালী ইউনিয়নের সব জায়গায় ফুল চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। এখানকার প্রত্যেক চাষী নিজেদের জমিতে বিভিন্ন প্রকারের ফুল চাষ করে সংসার চালান। চাষীরা তাদের জমিতে ধান বা অন্য ফসলের চেয়ে ফুল চাষকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। চাষীদের কথা, ধান চাষের চেয়ে ফুল চাষ করা অধিক লাভজনক। গদখালীতে এত পরিমাণ ফুল চাষ হয় যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে এখান থেকে সিংহভাগ ফুল পাঠানো হয়। ফুল চাষের কারণেই গদখালী ইউনিয়নটির নাম দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে অপরিচিত নয়।

এখানকার প্রত্যেক চাষী ফুল চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে তাদের সমস্যাও আছে অনেক।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় গদখালীর অবস্থান। গদখালী একটি ইউনিয়ন। যশোর শহর থেকে বেনাপোল রুটের ১৮ কিলোমিটার গেলে গদখালীর অবস্থান। যশোর থেকে বেনাপোল রুটের বাসে সরাসরি গদখালী পর্যন্ত যাওয়া যায়। ঝিকরগাছা বাজার ছাড়িয়ে গদখালী বাজার। এটি একটি প্রাচীন জনপদ। গদখালী থেকে পানিসারা দুই কিলোমিটার পথ।

ঝিকরগাছা উপজেলার নিভৃত পল্লী পানিসারা গ্রামের বাসিন্দা শের আলী। বর্ধিষ্ণু কোনো গৃহস্থ পরিবারের সন্তান নন, তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। আর ১০ জন সাধারণ কৃষকের মতোই ছিল তার জীবনযাত্রা। বৃষ্টির পানিনির্ভর প্রাচীন চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে সচ্ছলতা তো দূরের কথা, পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করাও তার জন্য ছিল দুষ্কর।

তখনো এ অঞ্চলে আধুনিক চাষ পদ্ধতির ছোঁয়া লাগেনি। এখানকার চাষীদের মনোভাব ছিল— ভূগর্ভস্থ পানি তুলে চাষাবাদ করলে খোদা নাখোশ হবেন। ফলে চাতকের মতো বৃষ্টির জন্য অধীর প্রতীক্ষায় থাকা ছিল এ এলাকার কৃষকদের কাছে সহজাত। এমনই এক সময়ে ধান, পাট বা রবিশস্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষের এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন শের আলী নামে এক কৃষক, যা এলাকার কৃষককুলের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে। আর এক সময়ের সাধারণ কৃষক শের আলী হয়ে ওঠেন সফলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সাধারণ কৃষক শের আলীর জীবন কীভাবে আমূল বদলে গেল, কোন সে জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় আজ তিনি শুধু নিজ গ্রাম বা জেলা নয়, সারা বাংলাদেশে একজন মডেলে পরিণত হলেন।

১৯৮৩ সালে কলকাতা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গদখালীতে শের আলী প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের চাষ শুরু করেন। শুরুর পথটা মোটেই মসৃণ ছিল না। একে তো নতুন কাজ। তার ওপর আবার এ সম্পর্কে নেই সম্যক ধারণা। তার চেয়ে বড় কথা, শেষমেশ পুঁজি রক্ষা হবে কিনা, সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন। কারণ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আর উত্সব-পার্বণে ফুলের কদর থাকলেও সে সময়ে তার ব্যাপকতা ছিল না। অন্তত যেকোনো উত্সবের অনুষঙ্গ হিসেবে ফুলের যে আবেদন আজ তৈরি হয়েছে, তেমনটি সে সময় ছিল না। ফলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের চাষ করে তার কতটুকু বাজার পাওয়া যাবে, তা নিয়ে ছিল যথেষ্ট সংশয়। কারণ এক বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করতে খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা। রঙিন গ্লাডিওলাসে খরচ পড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বীজ সংগ্রহ, জমির পরিচর্যা, সার, লোকবল সব মিলিয়ে বিস্তর আয়োজন। কিন্তু সে অনুপাতে উৎপাদিত ফুল বিক্রি না হলে একেবারে মাঠে মরা ছাড়া গতি থাকবে না। তার পরও অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই তিনি নামলেন এক নতুন পেশার নিরীক্ষায়।

সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে শের আলী জানান, প্রধান সমস্যাই ছিল ক্রেতা খুঁজে বের করা। কারণ আশপাশের শহর বলতে যশোর ও খুলনাই ভরসা। কিন্তু মফস্বল শহরে কতটুকুইবা ফুলের চাহিদা। অথচ এই কাঁচামাল ত্বরিত সরবরাহ করতে না পারলে একেবারেই মূল্যহীন। কারণ ফুল বড়জোর দুদিন তাজা থাকে। এর পরই শুকিয়ে যেতে থাকে। ফলে সময়মতো তা বিক্রি না হলে পচা মাছের মতোই মূল্যহীন বস্তুতে পরিণত হয়। চোখের সামনে অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় কষ্ট আর কী আছে!

গদখালী, পানিসারা অঞ্চলের ফুল চাষ শুরু হওয়ার পর এ এলাকায় শুধু কৃষিক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটেনি, সৃষ্টি হয়েছে একাধিক পেশাজীবী শ্রেণীর। বিস্তৃত জমিতে আবাদকৃত ফুল তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছে অসংখ্য মানুষ। আবার মালা তৈরির কাজে যুক্ত হয়েছেন বেশকিছু নারী শ্রমিক।

ফুল চাষের মাধ্যমে ঝিকরগাছা উপজেলার কৃষকদের ভাগ্যই শুধু পরিবর্তন হয়নি, কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে অনেক দরিদ্র মানুষ।

সরাসরি ফুল চাষ করে যেমন বিক্রি করেন, তেমনি এখানে ফুলের আড়তসহ বেশকিছু ফড়িয়া ব্যবসায়ীও রয়েছে।

গদখালী পানিসারা এলাকার ফুলচাষীর সংখ্যা এখন সহস্রাধিক। এলাকার বিস্তীর্ণ জমিতে আগে যেখানে ধান বা পাট হতো, এখন সেখানে হয় ফুলের চাষ। অসংখ্য মানুষ ফুলের চাষ করলেও এদের বেশির ভাগেরই ফুল চাষের ওপর কোনো বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নেই। অথচ বছরের পর বছর এখানকার চাষীরা ফুল চাষ করে চলেছেন। কোন ফুল কী পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে, কোন ফুলে কতটুকু সার বা অন্যান্য উপকরণ লাগবে— এসব বিষয় কী করে জানলেন, এমন প্রশ্ন করা হয় ফুলচাষীদের। আর এক্ষেত্রে ফুলচাষীদের সবার উত্তর ছিল প্রায় এক রকম— একজনের কাছ থেকে আরেকজন দেখে শিখেছেন। ফুল চাষের অগ্রপথিক শের আলী এ ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন, ‘পাশাপাশি বাস/ দেখাদেখি চাষ।’ প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষাটাই বড়। তবে তিনি জানালেন, প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ফুলচাষীদের মাঝে নিজের সংগ্রহকৃত ফুলের বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ করেন। ফুলচাষীরাও স্বীকার করেছেন শের আলীর নিঃস্বার্থ এ অবদানের কথা। মূলত ফুল চাষের ব্যাপারে শের আলীর সাফল্য থেকেই এখানকার বেশির ভাগ চাষী উদ্বুদ্ধ হন। আর শের আলীও চাইছিলেন ধান, পাট বা রবিশস্যের চেয়ে অধিক সম্ভাবনাময় ফুল চাষের ব্যাপারে কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠুক। এ চিন্তা থেকে শের আলী তার লব্ধ অভিজ্ঞতা দিয়ে যাকে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করেন ফুল চাষের ব্যাপারে।

গদখালী পানিসারা এলাকায় বর্তমানে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, গাঁদা প্রভৃতি ফুলের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু নানা বর্ণের গোলাপই রয়েছে ১০ প্রজাতির; যার মধ্যে পাপামিলান, ম্যারেন্ডা, আমেরিকান হ্যারি (লাল), ড. বাহওয়া (সাদা), গ্র্যান্ড অপেরা, মাদাম কুরি (হলুদ), পিগালি, সামার হলিডে, রাম্বা প্রভৃতি ফুল রয়েছে। গ্লাডিওলাস রয়েছে দুই রকমের— লাল ও সাদা। তবে লাল গ্লাডিওলাসে মূল্য বেশি। আর গাঁদা ফুলের পাঁচ-সাতটি জাতের চাষ হয়। এর মধ্যে ভারতীয় জাতের বড় সাইজের গাঁদার কদর সবচেয়ে বেশি। এগুলো বিক্রিও হয় বেশি মূল্যে। ফুলের পাশাপাশি অনেকেই আবার দু-তিন একর জমিতে ঝাউকামিনী ও কার্ডফোলিওর চাষ করেন। তোড়া বানাতে এগুলোর প্রয়োজন হয়।

একসময় ঝিকরগাছা উপজেলার দরিদ্রতম গ্রামগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষ্ণচন্দ্রপুর। কিন্তু এ এলাকায় ফুল চাষের প্রসার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দিনে দিনে বদলে গেছে এখানকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র। একসময় গোলপাতা আর খুপড়ি ঘরের মধ্যে নিত্য অভাব-অনটনের সঙ্গে ছিল যাদের বারো মাস বসবাস, সেই অনাহারক্লিষ্ট গ্রামবাসীর অনেকেই এখন সচ্ছল গৃহস্থ। গোলপাতার ছাউনির বদলে এখন সেখানকার প্রায় প্রতিটি ঘর টিনের। সেই সঙ্গে অল্প কিছু ধান-পাট চাষের ওপর নির্ভর করে টেনে-হিঁচড়ে পার করা জীবনে আশার আলো জ্বলেছে ফুল চাষের কল্যাণে। কৃষ্ণচন্দ্রপুর গ্রামের ঘরে ঘরে এখন প্রাচুর্যের ছোঁয়া।

এখানকার একাধিক কৃষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, রঙিন গ্লাডিওলাসের পেছনে খরচ হয় সবচেয়ে বেশি। এক বিঘা জমিতে গ্লাডিওলাস চাষ করতে খরচ হয় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর পরেই রয়েছে গোলাপ। বিঘাপ্রতি গোলাপ চাষে খরচ পড়ে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এদিক থেকে গাঁদা চাষের খরচ অপেক্ষাকৃত কম। এক বিঘা জমিতে গাঁদা ফুলের চাষে খরচ হয় ৫-৬ হাজার টাকা মাত্র। অবশ্য গোলাপ ও গ্লাডিওলাসের তুলনায় গাঁদার বিক্রয়মূল্যও কম।

এক জমিতে যত্ন করে চাষ করলে একটানা ১০ বছর গোলাপ চাষ করা যায়। আর গাদা চার মাস। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ফুল চাষকৃত জমির উর্বরা শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। কৃষকরা জানালেন, ফুল চাষকৃত জমিতে অন্য যেকোনো ফসলের আবাদ ভালো হয়।

গদখালী পানিসারা এলাকায় কাকডাকা ভোর হতেই শুরু হয়ে যায় ক্রেতাদের আনাগোনা। বিয়ে, জন্মদিনসহ নানা পার্টিতে ফুলের চাহিদা এখন ব্যাপক। ফলে দোকান থেকে ফুল না কিনে অনেকেই চলে আসেন সরাসরি পানিসারায়। একেবারে জমি থেকে তুলে আনা ফুল ও ফুলের তাজা তোড়া পাওয়ার লোভে দিনভর বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা আসেন। তবে আশপাশের লোকজনই বেশি আসে। খুচরো ফুল, গাঁদা ফুলের মালাসহ তোড়া বানিয়ে দেয়ার কাজে রয়েছে বেশকিছু লোক। ৫-১০ টাকা খরচ করলে দৃষ্টিনন্দন ফুলের তোড়া তৈরি করে দেন শ্রমিকরা।

অবশ্য গদখালী পানিসারা অঞ্চলে উৎপাদিত ফুলের বড় বাজারটি রাজধানী ঢাকায়। এখানকার বেশির ভাগ চাষী তাদের উৎপাদিত ফুল বিভিন্ন পরিবহনের কোচ মারফত নিয়মিত পাঠিয়ে দেন ঢাকার নির্ধারিত পাইকারি ক্রেতার কাছে। এছাড়া যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও মফস্বল শহর তো আছেই।

প্রতিদিন ৩ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়। তবে উত্সব-পার্বণের কথা ভিন্ন। ঝিকরগাছা উপজেলার নির্বাসখোলাগ্রামের ফুলচাষী ঝন্টু জানান, ১৪ ফেরুয়ারি ভালোবাসা দিবসে শুধু গোলাপ ফুলই বিক্রি হয় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার। একইভাবে পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারিতেও প্রচুর ফুলের চাহিদা থাকে। দলে দলে লোকজন আসে এসব দিনে যশোরসহ আশপাশের মফস্বল শহর থেকে। দুই পয়সা বাড়তি মূল্যও পাওয়া যায় তখন।

গদখালী বাস স্টপেজে গাড়ি থেকে নামলেই চোখে পড়বে ফুলচাষী কল্যাণ সমিতির সাইনবোর্ড। এ অঞ্চলের ফুলচাষীদের সার্বিক স্বার্থ সংরক্ষণসহ সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা করে ১৯৯৪ সালে ফুলচাষী কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শের আলী ছিলেন সমিতির প্রথম সভাপতি। দীর্ঘদিন তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সমিতির জন্য গদখালী বাজারে পাঁচ শতক জমি বন্দোবস্ত দিয়েছে সরকার। 

ফুল বিক্রি করতে গিয়ে নানা সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছে কৃষকদের। প্রথম সমস্যা ছিল পরিবহনের। নির্দিষ্ট কোনো পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় যে যেভাবে পারেন বিভিন্ন গাড়িতে ফুল তুলে দিতেন। এতে প্রায়ই দেখা যেত সঠিক সময়ে না পৌঁছার কারণে ফুল নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর ছিল বিলপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা। ঢাকার ব্যবসায়ীরা বিল নিয়ে মাসের পর মাস ঘোরাতেন। টাকা-পয়সা পাওয়া যেত না ঠিকমতো। টাকা আদায়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম পর্যন্ত করতে হয়েছে চাষীদের। এমন অসংখ্য সমস্যার আবর্তে কৃষকরা যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই শের আলীসহ অন্য চাষীরা সমিতি করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এর পরই স্থানীয় ফুলচাষীদের সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ফুলচাষী কল্যাণ সমিতি।

এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বর্তমানে ফুলের চাষ হচ্ছে। অসংখ্য মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে এখানকার ফুল চাষের সঙ্গে। কারণ হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম অর্থকরী এ ফুল চাষের অগ্রগতির ব্যাপারে কোনো প্রকার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই ফুলচাষীদের জন্য।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ফুল সংরক্ষণের জন্য রয়েছে হিমাগার। কিন্তু এখানে তা নেই। ফলে আবাদ মৌসুমে বহু টাকার ফুল নষ্ট হয়ে যায় স্রেফ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকার কারণে। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে উৎপাদন অনেক বেশি হয়। চাহিদার তুলনায় বাড়তি এ ফুল পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হন চাষীরা নয়তো ফেলে দিতে হয়। অথচ এই ফুল হিমাগারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে মোটা অংকের আর্থিক লোকসান থেকে বাঁচতে পারতেন এখানকার ফুলচাষীরা। জার্মানি, হল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুল সংরক্ষণের জন্য বিশেষ হিমাগার রয়েছে বলে জানালেন শের আলী। গদখালী-পানিসারা অঞ্চলে যেভাবে দিনকে দিন ফুল চাষের ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে, তাতে এখানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা হিমাগার স্থাপন করা জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী অনেক ফুলচাষী।

চাষীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বড় সাইজের গাঁদা ফুলের কাটিং তারা ভারত থেকে আমদানি করেন। কারণ ভারতীয় গাঁদার সাইজ বড়। ফলে ক্রেতারা সহজেই এ ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হন। দামও পাওয়া যায় বেশি। কলম পদ্ধতির মাধ্যমে এই ভারতীয় গাঁদার চাষ করা হয়। অন্যান্য ফুলের ক্ষেত্রেও ভারতীয় বা বিদেশী জাতের কদর বেশি। গবেষণার মাধ্যমে মনোলোভা এসব ফুলের উন্নত জাত সৃষ্টি করা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। অথচ আমাদের এখানে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই।

এছাড়া অন্য ফসলের মতো ফুলেরও নানা রোগবালাই আছে। অথচ এ সম্পর্কে চাষীদের সম্যক ধারণা নেই। ফলে অনুমাননির্ভর চিকিত্সাই এখানকার কৃষকদের ভরসা। এসব দিক বিবেচনা করে এখানে একটি গবেষণাগার স্থাপনের দাবি তাদের।

গদখালী-পানিসারার ইতিহাস

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ১৬টি গ্রাম নিয়ে পানিসারা ইউনিয়ন গঠিত। আর এখানে ১৯৮৩ সাল থেকে ব্যাপক হারে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ শুরু হলেও একাধিক নার্সারি ছিল বহু আগে থেকেই। এ এলাকায় ফুল চাষে পথিকৃৎ শের আলীর বাবা মৃত আব্দুর রহমানের ‘সর্দার নাসারি’ ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তিনি আদর্শ কৃষক হিসেবে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন।

 

লেখক: উপপরিচালক

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিস