দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক জেলা যশোর। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম প্রশাসনিক জেলা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্ত জেলা শহর। আজ যশোর শহরে যে কেউ প্রবেশ করলেই অনুভব করতে সময় লাগে না। মাগুরা বা ঝিনাইদহ কিংবা বিভাগীয় শহর খুলনা দিয়ে যশোরে প্রবেশমাত্র মহাসড়কগুলো আপনাকে স্বাগত জানাতে মুখিয়ে আছে। এ মহাসড়কই যে কাউকে বুঝিয়ে দেবে যশোর জেলার প্রকৃত অবস্থা। চরম অবহেলিত অবস্থা। যশোর জেলার প্রকৃত অবস্থা। যশোর জেলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজ চরম অবহেলায় ম্রিয়মাণ। দেশে এলাকাভিত্তিক  উন্নয়নে প্রধান নিয়ামক ব্যক্তিপ্রভাব। যশোরবাসীর দুর্ভাগ্য, তারা তাদের উন্নয়নে কোনো ব্যক্তির সহযোগিতা পায়নি, যার প্রভাবে উন্নতি হতে পারে। তবে সময়ের বিবর্তনে অনেকেই উন্নয়নের কারিগর সাজতে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিশেষত্ব হলো, এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বিশ্বের সর্বোচ্চ জনসংখ্যা। ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারে ১৬ কোটি লোকের বাস। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে আমরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দেখালেও জনসংখ্যা তেমন কমাতে পারিনি। গড় পরিসংখ্যানে যশোর কিছুটা এগিয়ে থাকলেও সার্বিক অবস্থা সুখকর নয়। যশোর জেলার মোট আয়তন ২ হাজার ৫৭৮ বর্গকিলোমিটার, যা আটটি উপজেলা, ৯১টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ১ হাজার ৮২টি মৌজায় বিভক্ত করে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। ২০১১ সালে চূড়ান্ত আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী, যশোর জেলার মোট জনসংখ্যা ২৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৭, যার মধ্যে পুরুষ ১৩ লাখ ৮৬ হাজার ২৯৩ ও নারী ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৫৪ জন। এখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনা কম এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ৭২ জনের বাস।

২. বিশ্বায়নের প্রভাবে একুশ শতকের সূচনালগ্নে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে দেশের গ্রাম ও শহরের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া চলছে। দ্রুত বিকাশমান শহরে সভ্যতার অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ফলাফল গ্রামবাংলার জনজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। নগরজীবনের উজ্জ্বল আলোর পাশে গ্রামজীবনের রাজনৈতিকীকরণ, গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থার বিবর্তন, শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারের কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতি, নতুন শ্রমশক্তি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে। যশোরও এ পরিবর্তনের বাইরে নয়। তবে নিরাপত্তার অভাবে ক্রমান্বয়ে সংখ্যালঘুদের দেশান্তরের ফলে সমাজে পরিবর্তন ঘটে চলেছে। উপনিবেশ চিন্তায় আচ্ছন্ন রাজনৈতিক দলগুলো অদূরদর্শিতার কারণে গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনগুলোকে কল্যাণের পথে রাখা যায়নি। জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্য না থাকায় স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও অংশীদারিত্বের মানোভাব গড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক মুক্তিতে জনগণের ভূমিকা গৌণই থেকে যায়।

৩. ১৭৬৯ সালে যশোর জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং ১৭৮১ সালে রাজস্ব সংগ্রহের জন্য একজন কালেক্টর ও পরে শান্তি রক্ষায় একজন ম্যাজিস্ট্রেট পাঠানো হয়। উপনিবেশ সরকার অর্থনৈতিক কারণে জেলা প্রতিষ্ঠা করার প্রশাসনিক কার্যক্রমে অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার হলে সাধারণ মানুষ উজ্জীবিত হয়। গ্রামীণ জনপদের মানুষ প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা নিতে জীবন-জীবিকার সন্ধানে ভৈরব নদের পাড়ে যশোর শহর গড়ে তোলে। জনসংখ্যার বিচারে শহরের মর্যাদা দেয়া কষ্টকর। গ্রাম থেকে সমৃদ্ধ আর শহর থেকে কম বর্ধিষ্ণু হলেও গ্রামের এক শ্রেণীর মানুষ এখানে এসে ভিড় জমাতে শুরু করে। তবে তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এলাকার নিসর্গ অটুট রেখেছিল। নিজের মতো করে পানি ও বনায়নকে গুরুত্ব দিয়ে নিসর্গ সৃষ্টিতে অবদান রাখতে উদ্যোগী ছিল। কালক্রমে অবহেলায় মানবসৃষ্ট নির্মাণগুলো রক্ষা করা যায়নি। পাশাপাশি প্রকৃতি নির্মাণগুলোও ধ্বংস করতে দ্বিধা করেনি।

৪. ভৈরব নদকে কেন্দ্র করে যশোরের জনপদ সৃষ্টি। এককালে প্রমত্তা ভৈরব আজ পূতিগন্ধময় নর্দমা। শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদকে বহতা দেখার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম প্রতিশ্রুতিতে আটকে আছে। একসময়ের তীব্র খরস্রোতা মধু কবির কপোতাক্ষ নদ মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ষাটের দশকে নদের তীরে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও নদী সাশনের কারণে কপোতাক্ষ তার স্বাভাবিক গর্ভ হারিয়ে ফেলে। ফলে কপোতাক্ষের পলি উজানসহ বিলের নিম্নে পড়তে না পেরে তা নদের বুকে জমা হয়। যে কারণে ধীরে ধীরে নদের দলদেশ ভরাট হতে থাকে এবং উজান ও বর্ষান পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে ২০০০ সাল থেকে কপোতাক্ষ অববাহিকার জলাবদ্ধতায় বন্যার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। ফসলের মাঠ থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, প্রতষ্ঠান, বাড়িঘর, হাটবাজার, মসজিদ-মন্দির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। শুধু ভৈরব-কপোতাক্ষ নয়, এ অঞ্চলের অন্যান্য নদী মুক্তেশ্বরী, হরি, শ্রী, টেকা ইত্যাদি এর বাইরে নেই। ফলে এতদাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, শিক্ষাসহ জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

৫. জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার যে শিক্ষা পরিকল্পনার প্রয়োজন, তা দেশেই নেই। যশোরবাসীর জন্য পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা তাই স্বাভাবিকভাবেই অনুপস্থিত। রাষ্ট্র, সমাজ, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, আর্থিক বিন্যাস, ধর্ম সবকিছু সৃষ্টি করে মানুষ। একজনের কাজ অন্যজনের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই বিচ্ছিন্ন করে দেখলে সম্পূর্ণ হয় না। একটা কাজের সঙ্গে অন্য কাজকে যুক্ত করে দেখলে তবেই তার রূপটা ফুটে ওঠে। এটার জন্য সম্পূর্ণ মানুষ প্রয়োজন। সম্পূর্ণ মানুষ তৈরির যে শিক্ষা ব্যবস্থা, তা আমাদের নেই। ফলে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যৌথ সামাজিক উদ্যোগ হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার লাগামহীন বেসরকারীকরণ সমস্যাকে জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে নিয়ে চলছে। কাজের সুযোগের অভাব ও পাঠ্যক্রমে আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এ শিক্ষায় আসতে আগ্রহী নয়। ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের সুযোগ না পেয়ে শিক্ষার্থীরা এক রকম ব্যর্থ হয়ে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। এখান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা সনদ পায় ঠিকই, বাস্তবে ব্যবহারিক শিখতে পারে না। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সনদ বিক্রি হয় বলে জনরব। পরিকল্পনার অভাবে বিদেশগামী অদক্ষদের হার বেশি হওয়ায় নিজে ও দেশকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রাচীন জেলা যশোরে একসময় বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন ছিল। তবে তা পাঠ্যপুস্তকনির্ভর না। নিজ নিজ বৃত্তি অনুসারে সন্তান ও নিকটজনদের শিক্ষা দিত। এখনো যশোর দেশের প্রথম ও বৃহত্তম কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিসিএমসি স্বগর্বে পরিচালিত হচ্ছে।

৬. যশোর জেলা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পনির্ভর জেলা হিসেবে দেশে পরিচিত। খেজুরের গুড়, চিরুনি, যানবাহনের যন্ত্রাংশ তৈরিসহ বর্তমানে নকশি সেলাইয়ের জন্য বিখ্যাত। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কিছু হারিয়ে গেছে এবং হারিয়ে যাওয়ার পথে। এখনো অনেক মানুষ জীবিকার জন্য সম্পৃক্ত। তার পরও ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি। শিল্পের প্রসার না হওয়ায় এখনো অর্ধেক শ্রমশক্তি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। জেলায় পাটকল, টেক্সটাইল মিলের পাশাপাশি ময়দা মিল, ধানকল, টাঠের কল, বিড়ি ফ্যাক্টরি, তেলকল, প্রিন্টিং প্রেস, বেকারি, মোমবাতি ফ্যাক্টরি, ময়দা মিল, হালকা প্রকৌশল শিল্পে নিজেদের মতো করে জেলাসহ দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে চলছে। বর্তমানে নকশি সেলাইয়ের পাশাপাশি বাঁশ, বেত, কাঠের কাজ, কামার, কুমার, জাল তৈরি, করাতকল, ইট ভাঙার মেশিন ইত্যাদি জেলার সর্বত্র কুটির শিল্পের ব্যাংকে প্রসার লক্ষণীয়। দেশের মত্স্য পোনার ৬০ ভাগ সরবরাহকারী ৪০টি হ্যাচারিসহ যশোরবাসীর চাহিদা মেটাতে মাছের খামার, পশুসম্পদ খামার, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামার ভূমিকা রেখে চলছে। যশোরের ফুল এখনো বিশ্ববিখ্যাত। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনের প্রসার ঘটে চলেছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। নিরীহ চাষীদের চাহিদা খুব বেশি নয়। তারা তাদের উৎপাদনের সম্মান চায়, সংরক্ষণের সুযোগ চায়। পৃষ্ঠপোষকতা চায়। দেশের যেকোনো জাতীয় দিবসে যশোর ৩-৪ কোটি টাকার ফুল তুলে দেয় দেশবাসীর হাতে।

৭. বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে কৃষিকে সরিয়ে রেখে কোনো অর্থনীতির কথা বলা অবান্তর বলেই মনে হয়। টেকসই কৃষির জন্য এখনো বিদেশী অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য লক্ষণীয়। সবুজ বিপ্লব বা প্রতি ইঞ্চি জমি আবাদ করার নীতিতে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গিয়ে অনেক ক্ষতি হয়েছে। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে উন্নত জাতের বীজ, সেচ, সার, কীটনাশক ব্যবহারে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা অনেক ক্ষেত্রে সত্যে পরিণত হয়েছে। তাই সুচিন্তিত নীতিমালা নির্ধারণ করে কৃষির উন্নয়নে অগ্রসর হওয়া জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে জাতিকে তার মারাত্মক মূল্য দিতে হবে। শিল্পোন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শুধু ফুল আর সবজি খাতে এগিয়ে থাকা যশোরের কৃষিতে সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। কৃষিভিত্তিক দেশ হিসেবে কৃষিতে সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। ভর্তুকি দিয়ে হলেও কৃষিপণ্যের মূল্যকে লাভজনক অবস্থায় আনতে হবে। সফল অর্থনীতিতে গতিশীল রাখতে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৮. বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের পারাপারে মুখরিত। বেনাপোল কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের সূত্রমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতগামী যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭৩। এ বছর তা ১২ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। শুধু যাত্রী পারাপার নয়, এ স্থলবন্দর দিয়ে স্থলপথে দেশের আমদানি ও রফতানির সিংহভাগ হয়ে থাকে। এ বন্দর থেকে সরকার প্রতি বছর ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে। কিছু যাত্রী সুবিধা বৃদ্ধি ও মালপত্র রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে এ আয় আরো বাড়ানো সম্ভব। প্রায়ই আমাদনিকৃত ও রফতানিযোগ্য মালপত্র যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হওয়ার কথা শোনা যায়। তাই প্রশাসনিক সুবিধা ও অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধি খুবই জরুরি। বন্দরের গুদামে বর্তমান পণ্য ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। স্থানসংকুলান না হওয়ায় অনেক সময় গুদামের বাইরে উন্মুক্ত স্থানে রাখা হয়। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বন্দরে ডিজিটাল বাংলাদেশে এখনো কম্পিউটার ব্যবহার হয় না। এখনো অ্যানালগ পদ্ধতি চালু আছে। সেবার মান বাড়িয়ে রাজস্ব আয়ের সুযোগ সৃষ্টি প্রয়োজন। বেনাপোল বন্দরের কারণে দেশের পঞ্চম রাজস্ব আদায়ের জেলা যশোর। এ জেলার অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে স্থলবন্দরের উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন।

৯. যশোরের বাণিজ্যিক শহর অভয়নগরে উপজেলার নওয়াপাড়া। ভৈরব নদ এখানে সচল থাকায় পাটকল, বস্ত্রকলসহ অন্যান্য বেশকিছু ভারী শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ২০০৪ সালে সরকার নওয়াপাড়াকে নৌবন্দর ঘোষণা করে। অত্যাধুনিক বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণ, নৌপথ ড্রেজিং, ওয়্যারহাউজের সুবিধা বৃদ্ধি, নদীভাঙন রোধে কি ওয়াল নির্মাণ, মালপত্র ওঠানামার জন্য আরসিসি র্যাম্প বা সিঁড়ি নির্মাণ, মালবাহী ট্রাকের জন্য পার্কিং ইয়ার্ড ইত্যাদি ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা পরিকল্পনা মোতাবেক উন্নয়নকাজের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১০ সালের মে মাসে প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়, যা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। ভৈরব নদকে ঘিরে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যের উত্থান তাই গুটিকয়েক লোকের স্বার্থে স্থগিতকৃত নৌবন্দরের উন্নয়ন করা না হলে দেশ ও জাতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এত বাধার পর এখনো দেশের বৃহত্তম সারের মোকাম যশোরের নওয়াপাড়া। মংলা বন্দর থেকে বড় জাহাজের মালপত্র ছোট কার্গো করে নদীপথে নওয়াপাড়া আনা সহজ। তাই এখান থেকে আমদানিকৃত সার, সিমেন্ট, চাল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন শতাধিক বার্জ-কার্গো মালপত্র নামায়। নৌ-রেল-সড়কপথের চমত্কার যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় ব্যবসার প্রসার ঘটে চলেছে। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকায় এ বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারত ও মিয়ানমার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর নির্মাণে এবং ভারী শিল্পগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের উন্নয়নে ব্যক্তির প্রভাব বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ব্যক্তিপ্রভাবের কারণে যশোর প্রশাসনিক বিভাগের মর্যাদা পায়নি। পেয়ে গিয়েছিল খুলনা, যা একসময় যশোর জেলার অংশ ছিল। দেশের প্রাচীনতম পৌরসভার একটা হয়েও যশোর আজ পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের মর্যাদা পায়নি। কয়েক বছর ধরে যশোরে একটা মেডিকেল কলেজ চালু হলেও হাসপাতালটি এখনো যশোরবাসী পায়নি। ব্যক্তিপ্রভাব না পাওয়ার কারণে বঞ্চনার ক্যানভাসটা খুবই লম্বা। যশোরবাসী শুধু ধারাবাহিক উন্নয়নের অংশ পেয়েছে মাত্র। ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেনি। স্বাধীন দেশে এমন ব্যক্তিপ্রভাবের উন্নয়ন কাম্য হতে পারে না। মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। জনগণের স্বার্থে সব ভ্রান্ত নীতি পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। যশোর স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নবৈষম্যের অবসান চায়। দু-চারটা সেক্টরে যশোর এগিয়ে চললেও অনেক জায়গায় পিছিয়ে আছে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে। সরকার এগিয়ে এলে এ বৈষম্যের অবসান হবে।

১০. আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাওয়ার পর থেকে শহরের মানুষের যাত্রা গ্রামের মানুষের জীবনবোধ, চিন্তাভাবনা দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। গ্রামগুলো আর আগের গ্রাম থাকছে না, শহরের চরিত্র ধারণ করছে। একসময় যে যশোর ছেড়ে বাইরে আসত না, এখন সে পৃথিবীর অনেক দেশে চাকরি করছে, অর্থোপার্জন করছে। আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে কঠোর পরিশ্রম করছে। গ্রামগুলো এখন আর চিরায়ত প্রথায় চাষাবাদ করছে না, খাদ্যোৎপাদন করছে না। সবাই বুঝতে পেরেছে, শুধু জমির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা যাবে না। পড়াশোনা শিখতে সবাইকে পড়তে হবে। শিক্ষার জ্ঞান গ্রামীণ জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে, তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। স্বাধীন দেশে এখর আর কারো মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকার সময় নেই। গ্রামের মানুষের মধ্যে আজো যে সম্প্রীতির বন্ধন বিদ্যমান, তা অটুট রেখেই এগিয়ে যেতে হবে।

 

লেখক: সাবেক সভাপতি

ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ