মানবোন্নয়ন লক্ষ্যের বিপরীতে প্রগতি বা অগ্রগতির ধারণা তত্ত্বায়ন ও মূল্যায়নের বিকল্প উপায় হিসেবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বয়ানে সার্বিক কল্যাণ আজকাল বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। গ্রামীণ বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাংশের দুটি গ্রামের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতার আলোকে কৃষি পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার কাঠামো হিসেবে এ গবেষণাপত্রে সামাজিক কল্যাণ ধারণা পরখ করে দেখা হয়েছে। আপাত একই ধরনের দুটি উচ্চমূল্যের রফতানি পণ্যের (বাগদা ও গলদা চিংড়ি) ফলে দুটি গ্রামে মৌলিকভাবে কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন ও সামাজিক কল্যাণগত সুফল এসেছে। এর মধ্যে গলদা উৎপাদনকারী গ্রামে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বাগদা উৎপাদনকারী গ্রামে এসেছে ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তন। উভয় গ্রামেই কল্যাণগত সুফল এমনভাবে এসেছে, যাতে কৃষকের জীবিকা হয়েছে পণ্যায়িত। চলতি গবেষণায় সামাজিক কল্যাণের তাত্ত্বিক, পদ্ধতিগত ও বিশ্লেষণী উপযোগিতা এবং গ্রামীণ অধ্যয়নের আলোকে কৃষি পরিবর্তনের রাজনৈতিক অর্থনীতি আলোচনা করা হয়েছে।
এ গবেষণাপত্রে দুটি স্বতন্ত্র গ্রামে বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষের উত্থানে সেখানে ঘটে যাওয়া কৃষি পরিবর্তন ও কল্যাণের দুটি বিপরীতধর্মী ঘটনা সমীক্ষা উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে প্রথমে দুটি গ্রামেরই চিংড়ি চাষের ঐতিহাসিক বিবর্তন তুলে ধরা হয়। তারপর পর্যালোচনা করা হয় খাদ্যনিরাপত্তা, ভূমি অভিগম্যতা বা মালিকানা এবং শ্রম অংশগ্রহণের পরিবর্তনের বিষয়গুলো। এসব পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট মানুষের বস্তুগত ও সম্পর্কগত কল্যাণের প্রভাবের দিক থেকে এবং নৈর্ব্যক্তিকভাবে তারা কীভাবে এসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, তার আলোকে খতিয়ে দেখা হয়।
প্রাথমিক অবস্থা
সালাবুনিয়া ও বিলপাবলা দুটি গ্রামের অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চলের খুলনা জেলায়। কয়েক প্রজন্ম আগে উভয় গ্রামই গড়ে ওঠে হিন্দু জনগোষ্ঠী দ্বারা, যারা জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে ধান চাষ শুরু করে। পরে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই দুটি গ্রামের অনেক হিন্দু পরিবার জায়গা-জমি বেচে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চলে যায়। বাগদা ও গলদা চাষ প্রবর্তনের আগে দুই গ্রামের কৃষি ও প্রাতিবেশিক অবস্থা প্রায় একই ছিল। সেখানে কেবল আমন উৎপাদন হতো। ক্ষুদ্র, মধ্যম পর্যায়ের জোতদার ও বর্গাচাষীরা নিজেদের খোরাকির জন্য তা করত। শাকসবজি, ডাল ও পাটও উৎপাদন করা হতো নিজেদের ভোগ ও স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য। গবাদি পশুচারণের সুযোগ ছিল গ্রামবাসীর সামষ্টিক ভূমিতে। আশপাশের খাল-বিল ও জলাশয় থেকে ধরা হতো বিভিন্ন ধরনের মাছ। বাগদা ও গলদা চাষ প্রবর্তনের আগে দুটি গ্রামের মধ্যে থাকা বহুমুখী কাঠামোগত সমরূপতার অর্থ হলো পরবর্তীতে ঘটা বিচিত্রতর রূপান্তরের জন্য মূলত দায়ী দুই জনগোষ্ঠীর ভিন্নতর উৎপাদিকাশক্তি।
সালাবুনিয়ায় বাগদা চিংড়ি চাষের ইতিহাস
সালাবুনিয়া খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় অবস্থিত। সেখানে বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝিতে, যখন একজন বড় জমির মালিক ২৮০ হেক্টরের একটি ঘের তৈরি করতে গ্রামটির প্রায় কৃষিজমি ইজারা নেয়। গ্রামবাসী জানায়, তারা প্রাথমিকভাবে এ ইজারা পদ্ধতিতে খুশি ছিল। বর্ষাকালে তারা আমন ধান উৎপাদনের সুযোগ পেত। তবে শুষ্ক মৌসুমে তারা ইজারাদারের কাছ থেকে নগদ অর্থ পেত। ইজারার মেয়াদ শেষ হলে তুলনামূলক বেশি খাজনায় পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী খুলনার এক লোক আলোচ্য ঘের ইজারা নেয়। এ ইজারার মেয়াদ শেষ হলে পুরো একক ঘেরটি তিন বা চার ভাগে ভাগ হয় এবং সেগুলো জমির মালিক দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু সামষ্টিক বা যৌথ ব্যবস্থাপনায় অসন্তোষের জের ধরে এসব বড় বড় ঘের ব্যক্তিচালিত ছোট ছোট প্লটে পরিণত হয়।
২৮০ হেক্টরের ঘেরটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পরই পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরেকটি বড় ঘের নির্মাণে ৬০ হেক্টরের গ্রামের কৃষিজমি ইজারা নেয়। চুক্তির তৃতীয় বছরের পর চেয়ারম্যান অনেক জমির মালিককে বার্ষিক ইজারা ফি দেয়া বন্ধ করে দেয়। যখন জমির মালিকরা ইজারা চুক্তি শেষ করার চেষ্টা চালায়, ইজারাদার তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে এবং জমির নিয়ন্ত্রণ নিতে সহিংসতা চালায়। পরে জমির মালিকরা আরেকটি মামলা করলে ২০০৪ সালে তা নিষ্পন্ন হয়ে তাদের পক্ষে রায় আসে। কিন্তু এ রায়ের পরও স্থানীয় এমপির পৃষ্ঠপোষকতায় ওই জমি আবার ইজারাদার দখল করে। পরবর্তীতে এ জমি দুটি সমষ্টিগতভাবে পরিচালিত ঘেরে পরিণত হয়। আরো পরে সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনায় অসন্তোষের জের ধরে ব্যক্তিচালিত প্লটে পরিণত হয়। কারণ ব্যাপকভাবে খণ্ডিত ভূমি মালিকানা প্রকৃতির অর্থ হলো, শুকনো মৌসুমের শেষে খাল থেকে আর লোনা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রইল না। এ সমস্যা আরো প্রকট হলো এজন্য যে, ওই এলাকায় থাকা পানি নিষ্কাশনী সরকারি খাল গ্রামের কতিপয় বড় ভূমি মালিক কর্তৃক চিংড়ি চাষের জন্য অবৈধভাবে বেদখলের শিকার হয়।
এদিকে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় একটি পোল্ডার বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পুরো এলাকায় প্রলম্বিত সময়ের জন্য লোনা পানি ঢুকে পড়ে এবং এতে লবণাক্ততা সমস্যা আরো প্রকট হয়। ফলে ওই গ্রামের মাটির লবণাক্ততা এতই বাড়ে যে, বর্ষাকালে সফলভাবে ধান উৎপাদন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এখন সেখানে বছরব্যাপী চিংড়ি চাষই একমাত্র বিকল্প উপায়। শুকনো মৌসুমে চারণের জন্য পতিত জমিতে সাধারণের অভিগম্যতা কমা, ধান উৎপাদনের উপজাত হিসেবে খড় ও অন্য পশুখাদ্যের প্রাপ্যতা হ্রাস এবং গৃহপালিত পশুর স্বাস্থ্যে লোনা পানির নেতিবাচক প্রভাবে সেখানে গবাদি পশু উৎপাদন লক্ষণীয় মাত্রায় হ্রাস পায়। সালাবুনিয়ায় নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলিত পানি সবসময় লবণাক্ত। সেক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে পুকুরের পানিই গ্রামবাসীর ভরসা। তবে শুকনো মৌসুমে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বাড়ির পুকুর থেকে পানযোগ্য পানিপ্রাপ্তির অভাবে পরিবারগুলোকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে খাওয়ার পানি আনতে হয়। মাটি ও ভূর্গস্থ পানিতে ব্যাপক লবণাক্ততা থাকায় গাছও ক্ষতির সম্মুখীন। গ্রামের সীমানার মধ্যে কিছু গাছ ছাড়া তেমন কোনো গাছ নেই। অল্প পরিমাণ ছাড়া অধিকাংশ পরিবারই শাকসবজি উৎপাদন করতে পারে না। জরিপে দেখা গেছে, সালাবুনিয়ায় কেবল ১৪ শতাংশ পরিবার ১২ মাসের ধান উৎপাদনে সমর্থ। অথচ আগে সেখানে সবাই ধান চাষ করতে পারত। বিপরীতে মাছ চাষের মাত্রা অনেক বেশি। ৭১ শতাংশ পরিবার চিংড়ি চাষ করে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, চিংড়ি চাষ প্রবর্তনের পর ওই গ্রামের কৃষি প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও নির্ভরশীল মানুষের জীবিকায় পাইকারি রূপান্তর ঘটে।
বিলপাবলায় গলদা চিংড়ি চাষের ইতিহাস
বিলপাবলা খুলনার নয় কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। একসময় ওই গ্রামের ৬৬ শতাংশের অধিক লোকসংখ্যা ছিল হিন্দু। সালাবুনিয়ার মতো এখানেও আনুমানিক অর্ধেক কৃষিজমি পার্শ্ববর্তী শহরাঞ্চল থেকে আসা মুসলিমরা নিজেদের অধিকারে নেয়। বেশির ভাগ মুসলিম অধিবাসীই ছিল দরিদ্র, যারা রাস্তার ধারের জমিতে বসতভিটা নির্মাণের উদ্দেশে ২০০০ সালের প্রথম দিকে অভিবাসন করে। যদিও তাদের মধ্যে খুব স্বল্পসংখ্যকই গলদা চাষ করত। আরো ১৭ শতাংশ মানুষ গলদা চাষে কৃষিজমি ইজারা নিতে বাইরে থেকে বিলপাবলা গ্রামে আসে। তবে গ্রামে তাদের কোনো জমি নেই।
গলদা চাষ শুরুর আগে বিলপাবলা গ্রামের কৃষি একক ফসল আমন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ধানি জমি চিংড়িঘেরে রূপান্তর শুরু হয় ১৯৯২ সালে। ঘেরে গলদা ও কার্পজাতীয় মাছ সারা বছর মজুদ থাকে। বর্ষা মৌসুমে ঘের থাকে বৃষ্টির পানিতে ভরা। ফলে ওই এলাকার বিপুলাংশে কয়েক মাস ধরে প্রচুর গলদা ও অন্য মাছ পাওয়া যায়। বিলপাবলা গ্রামের এ অভিনবত্ব আমন উৎপাদন ব্যাহত করে। কিন্তু আলোচ্য ফসল বোরো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ঘেরের আশপাশে তুলনামূলক উঁচু জমিতে বোরো উৎপাদন হয় এবং প্রতি একরে উৎপাদন দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি হয়। বিক্রি বা পারিবারিক প্রয়োজনে ঘেরসংলগ্ন জমিতে শাকসবজিও উৎপাদন হয়।
১৯৯২ সালের পর থেকে দ্রুতগতিতে ব্যাপক মাত্রায় ঘের নির্মাণ সম্প্রসারণ হয়। এক হিসাব বলছে, ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে ওই গ্রামের আনুমানিক ৯৫ শতাংশ কৃষিজমি দখল করা হয়। চলতি গবেষণার সময় বিলপাবলা গ্রামের ৬৭ শতাংশ স্থায়ী বাসিন্দা উৎপাদক হিসেবে ঘেরভিত্তিক চাষে সরাসরি নিয়োজিত। ২০০০ সালের প্রথম দিকে আসা দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত করা না হলে এ সংখ্যা ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিলপাবলা গ্রামে ঘেরভিত্তিক চাষ ব্যবস্থার প্রবর্তন ভূমি ব্যবহারে ব্যাপক ও গভীরতর পরিবর্তন, শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং গ্রাম কৃষির পণ্যায়ন ঘটিয়েছে।
সালাবুনিয়া ও বিলপাবলায় কল্যাণ ও কৃষি পরিবর্তন
উভয় গ্রামেই ধানভিত্তিক খোরাকি কৃষি থেকে বাণিজ্যিক চিংড়ি বা মাছ চাষ শ্রেণী, লিঙ্গ, শ্রম সম্পর্ক ও সম্পদ অভিগম্যতায় এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। গ্রাম দুটিতে খোরাকি ব্যবস্থার পণ্যায়নের কল্যাণগত সুফল খাদ্যনিরাপত্তা, ভূমির মালিকানা বা অভিগম্যতা, শ্রম ও লৈঙ্গিক সম্পর্কের নিরিখে নিচে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো।
খাদ্যনিরাপত্তা
মৌলিক প্রয়োজনের দিক থেকে খাদ্যনিরাপত্তা মানুষের বস্তুগত কল্যাণের প্রধান নির্ধারক। সালাবুনিয়ায় লবণাক্ততা ভয়াবহ মাত্রায় কৃষি-জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট করেছে, যেখানে বিলপাবলায় সমন্বিত গলদা চাষ পদ্ধতি শস্য নিবিড়তা ও কৃষিবৈচিত্র্য বাড়িয়েছে। উভয় গ্রামেই মাথাপিছু চাল পরিভোগ প্রায় একই পরিমাণ। সালাবুনিয়ায় যেখানে দৈনিক মাথাপিছু চাল পরিভোগ ৫০২ গ্রাম, সেখানে বিলপাবলায় ৪৮৮ গ্রাম। তবে গলদা চাষকারী বিলপাবলায় প্রয়োজনীয় চালের ৮০ দশমিক ২ শতাংশই আসে নিজেদের উৎপাদন থেকে, অন্যদিকে বাগদা চাষকারী সালাবুনিয়ায় ৮৪ শতাংশ চাল বাজার থেকে কিনতে হয়। সালাবুনিয়ার বাসিন্দারা খাদ্যমূল্যের ওঠানামায় সবচেয়ে নাজুক, ২০০৭-০৮ সালে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় যেমনটি হয়েছিল। অবশ্য উভয় গ্রামে প্রায় সমপরিমাণ চাল পরিভোগ আমাদের বলে দেয় যে, বাগদা উৎপাদন থেকে অর্জিত আয় দিয়ে সালাবুনিয়াবাসী চাল উৎপাদনে নিজস্ব ক্ষতি পোষাতে পারে।
ভূমি
ধান থেকে চিংড়ি চাষে উত্তরণ সালাবুনিয়া ও বিলপাবলা উভয় গ্রামেই ভূমির মালিকানা বা অভিগম্যতা সম্পর্ক বদলে দিয়েছে এবং বিবিধ কল্যাণগত সুফল নিয়ে এর রূপান্তর ত্বরান্বিত করেছে একটি পণ্যে। চিংড়ি চাষ শুরুর আগে উভয় গ্রামের পরিবারগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শহুরে অনুপস্থিত জমির মালিক থেকে জমি বর্গা নিত। ধানি জমি থেকে ব্যক্তিচালিত ঘেরে পরিবর্তন বর্গা বা অংশীদারি চুক্তির (উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ খাজনা হিসেবে দেয়া হতো) স্থলে ইজারা চুক্তির (উৎপাদন মৌসুমে একটি স্থির হারে নগদ অর্থে অগ্রিম দিতে হয়) স্থানান্থর করেছে। উভয় গ্রামেই বর্গা প্রথার পতনে ধান চাষের ক্ষেত্রে অনেক পরিবার জমিতে অভিগম্যতা হারিয়েছে।
শ্রম ও লিঙ্গ সম্পর্ক
কৃষক পরিবারের পুনরুৎপাদনের বাজারবহির্ভূত ভিত্তির ভাঙন ও পণ্য সম্পর্কের গভীরতার ফল হলো খোরাকি ব্যবস্থার পণ্যের কেন্দ্রীয় ডায়নামিক। এ প্রক্রিয়া চিংড়ি চাষের আগে কয়েকজন সালাবুনিয়াবাসীর বর্ণনায়ও স্পষ্ট। তাদের ভাষ্য, ‘আমরা আগে সবকিছু উৎপাদন করতাম, এখন প্রতিটি পণ্যই কিনতে হয়।’ নিজেদের খোরাকির প্রয়োজনগুলো মেটাতে অসমর্থ ক্ষুদ্র উৎপাদক বা চাষী বেঁচে থাকার জন্য অবশ্যই নিজেদের শ্রমশক্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয় এবং তা করতে গিয়ে তারা পরিণত হয়েছে শ্রমিকশ্রেণীতে। এ প্রক্রিয়ার ফলে উভয় গ্রামেই পূর্বতন কৃষক পণ্যায়িত শ্রম সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে। উপরন্তু সামাজিক কল্যাণের সব মাত্রায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধরনের উত্থান ঘটেছে।
এসব প্রভাব সবচেয়ে তীব্রভাবে স্পষ্ট সালাবুনিয়ায়, যেখানে খাদ্য সরবরাহে বাজারের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা ধানের বিনিময়ে শ্রমদানের জন্য নিজস্ব জেলার ভেতর কিংবা জেলার বাইরে বিপুলসংখ্যক পুরুষের অভিগমন ঘটিয়েছে, যে ধান ওইসব পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা আংশিকভাবে নিশ্চিতে সমর্থ। অভিবাসী পুরুষের পরিবারের ক্ষেত্রে এটা ঘেরে বিপুল নারীর যুক্ততায় পর্যবসিত হয়েছে, যেটা আগে ছিল অনেকটা প্রথানুগ। প্রায় নগদভিত্তিক একটি অর্থনীতির উত্থানও সালাবুনিয়ায় নারীদের মজুরিভিত্তিক কর্মনিয়োজনে বাধ্য করেছে।
সালাবুনিয়ায় ধান চাষ ধ্বংসে শ্রম বিক্রির বিষয়টি সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও এটি না বললে নয় যে, সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্য চিংড়ি চাষ বরং সীমিত কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে বছরে একবার ঘেরের আইল মেরামত, অনুপস্থিত জমির মালিকের হয়ে ঘের পাহারা ও পরিচালনা এবং বড় ঘের থেকে জলজ আগাছা পরিষ্কার করা। প্রথম কাজটি সারা হয় নারী-পুরুষ নৈমিত্তিক শ্রমিক দিয়ে। দ্বিতীয় কাজের জন্য স্থায়ী পুরুষ শ্রমিক ভাড়া করা হয়। আর তৃতীয় কাজটি এককভাবে নারীদের দ্বারা করানো হয়। স্থানীয়দের মতে, ধান চাষের বিলুপ্তি সালাবুনিয়ায় কৃষি শ্রমিকের (প্রধানত পুরুষ) চাহিদার পতন ঘটিয়েছে, অন্যদিকে যেকোনো সুযোগে কাজ করতে প্রস্তুত বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করেছে। ফলে দক্ষিণপশ্চিমাংশের চিংড়ি চাষ আধিক্য এলাকায় বাংলাদেশের অন্য যেকোনো গ্রামীণ এলাকার চেয়ে শ্রমবাজারে নারী অংশগ্রহণ বেশি। সালাবুনিয়ায় নারীদের সাংঘাতিক মাত্রার নিম্নমজুরিই (দিনে মাথাপিছু মজুরি হার মাত্র দশমিক ৯১ মার্কিন ডলার) হলো সেখানে আপেক্ষিক নারী শ্রমিক উদ্বৃত্ত থাকার পরিণাম।
বিপরীতে বিলবাপলায় সমন্বিত গলদা চাষের ঘেরের বৃদ্ধিসহ কৃষিজমির বৈচিত্র্যায়ণ ও নিবিড়তা পরিবারগুলোকে নিজেদের ভোগ ও স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য তাত্পর্যপূর্ণ পরিমাণ ধান, মাছ ও শাকসবজি উৎপাদনের সুযোগ করে দিয়েছে। উপরন্তু বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের গলদা রফতানির সুযোগ তো রয়েছেই। এ জটিল চাষ ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবস্থাপনা বিপুল গৃহশ্রমিকের চাহিদা সৃষ্টি করেছে। বাগদা চিংড়ির চেয়ে গৃহস্থ শ্রমে দিনে ৫৪ শতাংশ বাড়তি শ্রমিক দরকার হয়। ফলে গলদা চাষ বাগদার চেয়ে অধিক নারীকে সংযুক্ত করতে পারে এবং বাগদা চাষকারী গ্রামের চেয়ে গলদা চাষকারী গ্রামে শ্রমবাজারে নারীর অন্তর্ভুক্তি তুলনামূলক কম ব্যাপক। বিলপাবলায় নারী শ্রমিকের দৈনিক ২ দশমিক ১৮ ডলারের গড় মজুরি হারেই (সালাবুনিয়ার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি) সেখানে মজুরি শ্রমিকের আপেক্ষিক ঘাটতির বিষয়টি প্রতিফলিত হয়।
উভয় গ্রামে পূর্ণমাত্রায় অধিক হারে নারীরা কাজে অংগ্রহণ করতে ইচ্ছুক এবং নিজস্ব ঘেরে চিংড়ি চাষের ওপর তাদের বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ পর্যবেক্ষণ বলে যে, নতুন সুযোগ গ্রহণে নিজেদের পছন্দের চেয়ে সম্পদের অভাব কাটাতে চিংড়ি চাষে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। অবশ্য ধান থেকে চিংড়ি চাষে উত্তরণ শস্য ও সম্পদ উৎপাদন (গবাদি পশু, ধান, হাঁস-মুরগি) কমিয়েছে, যেগুলো উৎপাদনে নারীদের তাত্পর্যজনক নিয়ন্ত্রণ ছিল। এসবের স্থান দখল করেছে পুরুষের আধিপত্য থাকা বিষয়গুলোর, যেমন— বাগদা, গলদা, মাছ ও জমি ইজারার খাজনা। এভাবে উভয় গ্রামের নারী কর্মসংস্থানের সিদ্ধান্তগুলো পরস্ফুিট হয়।
উভয় গ্রামে পূর্বতন ধান চাষকারী কৃষকের শ্রেণী চরিত্রে এসেছে পরিবর্তন। এ প্রাথমিক পরিবর্তনে বিলপাবলায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদকে পরিণত হয়েছে। আর বর্গাচাষে অভিগম্যতা হারানোয় এক ছোট গোষ্ঠী পরিণত হয়েছে শ্রমিকশ্রেণীতে। একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে সালবুনিয়ায়ও। তবে এখানে বিপুলসংখ্যক কৃষক পরিণত হয়েছে শ্রমিকশ্রেণীতে এবং প্রাথমিকভাবে সম্পদ ও উৎপাদনের বৃহত্তর অংশ অধিকার করে বাইরে থেকা আসা অভিবাসীদের এক ছোট দল রূপান্তর হয়েছে পুঁজিবাদী অভিজাতে। একই ধরনের কোনো পুঁজিপতিশ্রেণী বিলপাবলায় গলদা চাষে যুক্ত হয়নি, যেখানে জটিল সমন্বিত চাষ ব্যবস্থা সে ধরনের আয়োজন সৃষ্টি হতে দেয়নি। সামান্য ভিন্নতা নিয়ে উভয় গ্রামেই ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদকশ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে।
বস্তুগত (ধানের তুলনায় উচ্চ আয়, পরিবারগুলোর মধ্যে উচ্চমাত্রার খাদ্যনিরাপত্তা, শ্রমের উচ্চচাহিদা ও শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তির অনুকূল শর্ত), সম্পর্কগত (গ্রামের মধ্যে আপেক্ষিকভাবে সম্পদের সমতাপূর্ণ বণ্টন ও কর্তাশর্তারূপে নারীর উত্থান), নৈর্ব্যক্তিক (ধান চাষের ক্ষমতা বজায় রাখা, যেটি বাংলাদেশে কল্যাণের কেন্দ্রীয় বিষয়) তিন মাত্রার দিক থেকে বিলপাবলায় জনগোষ্ঠীর সামাজিক কল্যাণের প্রভাব ইতিবাচক।
অন্যদিকে ধান চাষ ব্যবস্থার চেয়ে বাগদা চিংড়ি চাষে পরিবারগুলোর বেশি আয় সত্ত্বেও সালাবুনিয়ায় সার্বিক সামাজিক কল্যাণের অবস্থা উল্লেখজনকভাবে খারাপ হয়েছে। এ বস্তুগত অর্জন চিংড়ি ছাড়া অন্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা হ্রাসের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক খাদ্য অনিরাপত্তা ও শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নারীর প্রতিকূল শর্ত দ্বারা ম্লান হয়ে গেছে। কল্যাণের সম্পর্কগত মাত্রা কাঠামোগত (এবং শারীরিক) সহিংসতার বিপুলতা দ্বারা ছেয়ে যায়, যেটি শুরু হয় জমি দখলের অসংখ্য উদাহরণের মাধ্যমে। বেদখলকৃত জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সামষ্টিক প্রচেষ্টার চূড়ান্ত সাফল্য ও কর্মসংস্থানের অবস্থা পরিবর্তনে যুক্ত নারীর কর্তাশর্তার কিছুটা উন্নতিতে চিংড়ি চাষের কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্ট। গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দার ভাষ্যে, নৈর্ব্যক্তিক কল্যাণের সার্বিক প্রভাব অবশ্য নেতিবাচক। ধান ও অন্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা হারানোয় তারা ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন ও অসন্তুষ্ট। জমি জোরপূর্বক দখলে তাদের রয়েছে ক্ষোভ। সর্বোপরি ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তারা হতাশ।
লেখক: গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞানী; মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারাল, ফুড অ্যান্ড রিসোর্চ ইকোনমিকসের শিক্ষক
সংক্ষেপে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির






