বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম প্রান্তের জনপদ খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক অবস্থানগত কারণে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এতদঞ্চলে উদ্যোক্তা শ্রেণীর গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সেখানকার ভূরাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। অঞ্চলটি একাধারে উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতির ও প্রতিবেশী দেশ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত শিল্প বাণিজ্য অর্থনীতি দ্বারা বেষ্টিত। উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে সুন্দরবন একাধারে প্রাকৃতিক নিরাপত্তা সুরক্ষা আবার প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন মধু, কাঠ ,প্রাণিসম্পদ, মত্স্য) সমৃদ্ধ । সমুদ্রবন্দর হিসেবে মংলা এতদঞ্চলের তথা গোটা দেশের বহির্বাণিজ্য ব্যবস্থার গেটওয়ের ভূমিকায়। ব্রিটিশ ভারতে একসময়কার বর্তমানে বাংলা রাজ্যের রাজধানী, বন্দর ও শিল্পনগরী কলকাতাকেন্দ্রিক নৌ ও স্থলপথে গড়ে ওঠা শিল্প-কলকারখানা ও তত্সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য সূত্রে এতদঞ্চলে বিশেষ করে সাতক্ষীরা, যশোর ও কুষ্টিয়ায় উদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে ওঠার পেছনে প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে।
১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে ভারতবর্ষের শাসনভার চলে যাওয়ার আগে এতদঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প উদ্যোগের তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় মেলে না। তবে আবহমানকাল হতে সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূল অঞ্চল হিসেবে এতদঞ্চলে গৃহনির্মাণসামগ্রী হিসেবে সুন্দরবনের গোলপাতাসহ কাঠ সরবরাহ সূত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য, মত্স্য আহরণ ও বিপণন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় ও ধান/ফসল ক্রয়-বিক্রয় সূত্রে নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগের বিক্ষিপ্ত উদ্যোক্তা শ্রেণী বিদ্যমান ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে মূলত ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে কলকাতা ও তার আশপাশে গড়ে ওঠা শিল্প-কলকারখানা (১৯০৭ সালে নড়াইল ম্যাচ ও মনোরমা ক্যান্ডেল ফ্যাক্টরি, বেঙ্গল বাটন ফ্যাক্টরি, ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়ায় মোহিনী মিলস) এবং সে সুবাদে আমদানি-রফতানি ব্যবসা-বাণিজ্য উদ্যোক্তা শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। ভারত বিভাগের পর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এতদঞ্চলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় খুলনা শিপইয়ার্ড (১৯৬০), দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি (১৯৫৬), নিউজপ্রিন্ট (১৯৫৯) ও হার্ডবোর্ড মিল (১৯৬৫) বেশ কয়েকটি জুট মিল এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পনগরী গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে এতদঞ্চলে মত্স্য চাষসহ কৃষিজাত শিল্পোদ্যোগ প্রাধান্য বিস্তার করে এবং দু-একটি বৃহৎ ব্যক্তিগত উদ্যোক্তা শ্রেণী শিল্প-কলকারখানা ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে চলছে।
জাতীয়তাবাদী স্বপ্নদ্রষ্টা বিজ্ঞানী, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪) বর্তমান খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার ও তদানীন্তন যশোর জেলার অন্তর্গত রাড়ুলি গ্রামে আগস্টে জন্মগ্রহণ করেন। বিজ্ঞানজগতের বাইরে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের বিশেষ আগ্রহ ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তিনি মাতৃভাষার মাধ্যমে শিল্পকলা ও বিজ্ঞানচর্চায় উদ্যোগী ও অনুরাগী ছিলেন। তিনি বাংলা ভাষায় প্রচুর লিখেছেন এবং অন্যদেরও মাতৃভাষায় লেখার জন্য উত্সাহিত করেছেন। একজন জাতীয়তাবাদী হিসেবে তিনি আরো চেয়েছিলেন যে, শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে বাঙালিরা আরো এগিয়ে আসুক। বাঙালিদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোন্নতি বিধানের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি নিজ গৃহে নানা রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা গড়ে তোলেন। ১৯০১ সালে এটি কলকাতার মানিকতলায় ৪৫ একর জমির ওপর ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড’ নামে একটা রাসায়নিক দ্রব্য ও ওষুধ প্রস্তুতের কারখানা হিসেবে স্থানান্তরিত হয়। এটি ছিল বাঙালিদের দ্বারা স্থাপিত ও পরিচালিত অগ্রগামী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৯২৮-এ তার অর্থ সাহায্যে ও উদ্যোগে ‘ইন্ডিয়া কেমিক্যাল সোসাইটি’ স্থাপিত হয়। সমাজ সংস্কারের প্রতিও তার আগ্রহ ছিল।
ভারতের প্রখ্যাত সুতা ব্যবসায়ী মোহিনী মোহন চক্রবর্তী ব্যবসার কাজে বেশ কয়েকবার কুষ্টিয়ায় এসেছিলেন। নদীপথে নিরাপদ যাতায়াত আর উন্নত রেল যোগাযোগের কারণে তিনি কুষ্টিয়ার বড় স্টেশনসংলগ্ন জায়গায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহযোগে একটি সুতা মিল স্থাপনের উদ্যোগ নেন। ১৯০৮ সালে মিলপাড়া এলাকায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত হয় মোহিনী মিল। সে সময় সুদূর ইংল্যান্ড থেকে পিতলের হ্যান্ডলুম মেশিন আর পিতলের তৈরি প্রায় ২০০ তাত আমদানি করে বসানো হয়েছিল। এ সময় ভারতবর্ষের কয়েকটি জায়গায় এ ধরনের আধুনিক সুতার কলের মধ্যে মোহিনী মিল ছিল অন্যতম। এখানে প্রায় ৩০০ শ্রমিক কাজ করতেন। এ মিলে উৎপাদিত সুতা ভারতবর্ষের সব প্রদেশ ছাড়াও বার্মা ও শ্রীলংকায় যেত। সে সময় কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রকল মোহিনী মিল ছিল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।
প্রতিদিন কুষ্টিয়া বড় স্টেশনে ভারতের শিয়ালদহ থেকে কয়েকটি বগি রিজার্ভ আসত মোহিনী মিলের সুতা নেয়ার জন্য। আবার বড়বাজার গড়াই নদীর ঘাট থেকে বড় বড় নৌকায় সুতা যেত দেশের বিভিন্ন জায়গায়। পাবনা, শাহজাদপুর, গাজীপুর, নাটোরসহ দেশের প্রায় সব এলাকা থেকে তাতিরা এখানে আসতেন সুতা কিনতে। মোহিনী মিলের এ স্বর্ণযুগ একটানা ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত চলে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ২৭ নং আদেশবলে মিলটি জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ বস্ত্র শিল্প করপোরেশনের পরিচালনায় ন্যস্ত করা হয়। বর্তমানে মিলটির মালিকানা হস্তান্তর আলো-আঁধারিতে রয়েছে।
মুসলমানদের মধ্যে প্রথম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মখদুমি লাইব্রেরি (১৯১১) এবং মানবসেবাধর্মী আহছানিয়া মিশনের (১৯৩৫) প্রতিষ্ঠাতা সাতক্ষীরার খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (১৮৭৩-১৯৬৫) সমকালীন সমাজের সার্বিক উন্নয়ন প্রয়াস প্রচেষ্টায় ছিলেন নিবেদিত নিষ্ঠাবান। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ ‘বাংলাপিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক প্রফেসর সিরাজুল ইসলামের অভিমত:
‘বর্তমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক যে অবস্থান তার প্রেক্ষাপট, ভাবদর্শন, নৈতিক ভিত্তি, আদর্শিক অবয়ব নির্মিত হয়েছিল উনিশ ও বিশ শতকে। সে সময় যেসব চিন্তানায়ক, কর্মসাধক ও সমাজ সংস্কারক তাদের মেধা ও ব্যবস্থাপনা শক্তি, শারীরিক ও মানসিক শ্রম নিবেদন করে একটি মুক্তবুদ্ধি ও সৃজনশীল সমাজজীবন আদর্শ নির্মাণ করে গেছেন খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা তাদের অন্যতম একজন। অবিভক্ত ভারতবর্ষের ব্রিটিশরাজের শেষ প্রান্তিকে আসাম ও বাংলার শিক্ষা বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে এতদঞ্চলের জনশিক্ষা বিস্তার এবং একটি সবল কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন সমাজ গঠনে তার ছিল নিরলস প্রয়াস। মানবতাবাদী এ শিক্ষা প্রশাসক সমাজের অভ্যন্তরে অবসাদ অপচিন্তা ও অন্তর্ঘাতের সমস্যাবলির প্রতিও দিয়েছিলেন দৃষ্টি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে স্রষ্টার সব সৃষ্টির প্রতি সেবার আদর্শ জাগিয়ে তুলতে এবং একটি ইতিবাচক মনোভাব পোষণের দ্বারা মানবতাবাদী আদর্শ ও সেবার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে সুপ্ত সমাজকে সচকিত করতে তিনি নিজে কলম ধরেছিলেন, অন্যের রচনা প্রকাশ এর সুযোগ অবারিত করতে প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন এবং ভক্তদের আত্মিক উত্কর্ষতা অর্জনে প্রেরণা, পরামর্শ প্রদান এবং পথ প্রদর্শনে ছিলেন আমৃত্যু আন্তরিক। তার সমাজ ভাবনার মহৎ কীর্তি ও ফসল আহ্ছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা। এ মিশনের মাধ্যমে তিনি তার সমাজভাবনা ও সর্বজীবের সেবাকর্ম ও ধর্মকে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালে সুন্দরবন সন্নিকটবর্তী অবহেলিত অজ পাড়াগায় নিদারুণ দরিদ্র পরিবেশে গড়ে তোলা তার আহ্ছানিয়া মিশন কালপরিক্রমায় এখন দেশ-বিদেশে সুপরিচিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।’
বিশিষ্ট শিল্পপতি, শিল্পোদ্যোক্তা ও সমাজসেবক শেখ আকিজউদ্দীন (১৯২৯-২০০৬) খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার মধ্যডাঙ্গা (বেজেরডাঙ্গা) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তার কাছে মাটির ব্যাংকে জমানো ১৭ টাকা নিয়ে তিনি এক কাপড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। মানুষ হয়ে বাড়ি ফিরবেন, এই ছিল তার পণ। গভীর রাতে শিয়ালদহ স্টেশনে এসে নেমে পড়ে আকিজ দেখে অসংখ্য লোক প্লাটফরমের ওপর কাগজ বিছিয়ে শুয়ে আছে। এখান থেকে আকিজ জীবনের প্রথম পাঠ নেন। স্টেশনের এ প্লাটফরমই হয় তার সেই নতুন জীবনের আশ্রয়। এক পয়সায় কেনা খবরের কাগজ বিছিয়ে মাথার নিচে ইট দিয়ে শুয়ে থাকা। দৃঢ় কঠিন জীবন, কিন্তু আকিজ স্বপ্ন দেখেছিল এক অসামান্য জীবন প্রত্যয়ের। হাতের টাকা কয়টি কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেই চিন্তা। পিতার সঙ্গে ব্যবসার কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তার। সেই চিন্তাটা তার মাথায় খেলছিল। বড় বাজারের রামলোচন স্ট্রিটের এক জায়গায় কমলালেবুর নিলামের ডাকে অংশ নেন এবং আড়াই টাকা দিয়ে চার ঝুড়ি কমলা ক্রয় করেন। নির্মাণাধীন হাওড়া ব্রিজকে আকিজউদ্দিন তার কমলা বিক্রির উপযুক্ত ক্ষেত্র মনে করেন। আকিজউদ্দিনের এই ছিল কলকাতাজীবনের প্রথম ব্যবসা। সেদিন তাকে কুলির মজুরি দিতে হয়েছিল দুই পয়সা, পুলিশকে এক পয়সা। সে সময় একটা নিয়ম ছিল, টহলদার পুলিশকে প্রতি ৪ ঘণ্টায় ফুটপাতে ব্যবসা করার জন্য এক পয়সা ঘুষ দিতে হতো। নিয়মটা ছিল অলিখিত। কুলি ও পুলিশকে তিন পয়সা দিয়ে এবং হাতখরচ করেও সেদিনের প্রথম ব্যবসায় আকিজউদ্দিন দশ পয়সা লাভ করেন।
প্রথম দিনের দশ পয়সা লাভ খুব কম ছিল না আকিজউদ্দিনের পক্ষে। কারণ তার নিজের প্রতিদিনের খরচ ছিল দুই পয়সা। তার খাদ্য ছিল ছাতু। দুই পয়সায় কেনা। স্টেশনে ঘুমাতে পয়সা লাগত না। ফলে তার লাভ খারাপ হলো না। এমন লাভ দেখে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসাটি করতে লাগলেন। এভাবে কিছুদিন ব্যবসা করার পর তিনি লক্ষ করেন, তার হাতে প্রায় ৩০০ টাকা জমে গেছে। এভাবে প্রায় আড়াই হাজার টাকা যখন জমেছে, তখন নির্ভীক আকিজউদ্দিন কলকাতায় তার পরিচিত পেশোয়ারের ফল বিক্রেতার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে তার সঙ্গে পেশোয়ারে পাড়ি জমান। পেশোয়ারে তার প্রায় দুই বছর কেটে যায়। পেশোয়ারে স্বল্পকাল অবস্থান করলেও পরবর্তীকালে জীবনে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এমনকি তার এ পেশোয়ারবাসের অভিজ্ঞতা একবার নিজের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছিল এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার সাফল্য লাভের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
পেশোয়ারে ব্যবসা করার পর তার এ মূলধন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। সন্দেহ নেই, তখনকার ৪ হাজার ৫০০ টাকার পুঁজি মানে বেশ বড় ব্যাপার। বড়ো ব্যবসায়ী না হলেও এ পুঁজি দিয়ে সচ্ছল ছোটখাটো ব্যবসায়ী হওয়া সম্ভব ছিল। তিনি পেশোয়ার থেকে বিভিন্ন শহরে ঘুরে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে উপস্থিত হলেন। ১০-১২ দিন দিল্লিতে থাকার পর ট্রেন ধরে সোজা কলকাতায় উপস্থিত হলেন। কলকাতায় এসে তার বাড়ি ফেরার ইচ্ছা উঠে যায়। ব্যবসার পুরনো পরিবেশে তিনি আরেকবার চেষ্টা করলেন। এবার তিনি ব্যবসার ধারা পরিবর্তন করে পিতার পুরনো ব্যবসা ধরলেন। তার পিতা তরকারির ব্যবসা করতেন। তিনি শিয়ালদহ স্টেশনের পাশে নফরবাবু বাজারের রাধারাম বল্লভের আড়ত থেকে বিভিন্ন ধরনের তরকারি কিনে ওই বাজারে বসেই খুচরা বিক্রি করতে শুরু করেন। ব্যবসায় তার প্রচুর লাভ হতে থাকে। এ ব্যবসায় তিনি এক বছর নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৪০ সালে বাড়ি ছাড়ার পর আকিজউদ্দিনের প্রায় চার বছর কেটে গেছে। ১৯৪৫ সালের দিকে তিনি নিজ গ্রাম মধ্যডাঙ্গায় প্রত্যাবর্তন করেন। বাড়ি ফেরার সময় তার কাছে পুঁজি জমেছিল প্রায় ৮ হাজার টাকা। এ পুঁজি ভরসা করেই তিনি বাড়ি ফিরলেন। কিছুদিনের মধ্যেই মা-বাবার মৃত্যুতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল আকিজ। তখন তার বয়স মাত্র ১৯ বছর। সেই বয়সে ১৯৪৮ সালে তিনি বিয়ে করলেন সখিনা খাতুনকে। বিয়ের পর আকিজউদ্দিনের জীবনে বড় রকমের একটা পরিবর্তন আসে। নিজের চিন্তা ও সংকল্পের প্রতি অনড় থাকেন। শুধু সাংসারিক কাজ করে নিজের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে আকিজ নষ্ট করতে চাইতেন না। স্বাধীনচেতা আকিজউদ্দিন নিজের স্বপ্নকে সার্থক করতে চেয়েছিলেন। আর্থিক সামর্থ স্বল্প হলেও তিনি আত্মবিশ্বাসের প্রতি অটল ছিলেন।
১৯৫২ সালে আকিজ প্রথম বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসাটির ধারণা তিনি পেয়েছিলেন নিতাই চন্দ্র দাস নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে। সেই সময়ের বিখ্যাত ‘বিধু’ বিড়ির মালিক বিধুভূষণ ছিলেন তারই এক বন্ধুর বাবা। তার অনুপ্রেরণাতেই আকিজ প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বিড়ির ব্যবসাটিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেন। ধীরে ধীরে বেজেরডাঙ্গা তার নিজ এলাকায় রেলস্টেশনের পাশে একটি মুদি দোকান প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে এ দোকানে তার মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এর মাঝেই ঘটে যায় আরেক দুর্ঘটনা। এক রাতে আকিজের পুরো দোকানটি পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অসীম ধৈর্যশীল আকিজ এতটুকু ভেঙে পড়েননি তাতে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় অচিরেই তিনি গড়ে তোলেন নতুন দোকান। এ সময় তাকে সহায়তা করেন ফুলতলা বাজারের কালা কুণ্ডু। তার সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও নিরলস পরিশ্রমের ফলে কিছুদিনের মধ্যেই মোট মূলধনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ টাকা। এরই পাশাপাশি আকিজ শুরু করেন ধান, পাট, চাল, ডাল, গুড় প্রভৃতির খুচরা ব্যবসা। সব ক্ষেত্রেই আকিজের প্রধান মূলধন ছিল বিশ্বস্ততা। ব্যবসায়ী মহলের সবাই তাকে একবাক্যে বিশ্বাস করতেন।
পরবর্তীকালে ষাটের দশকের দিকে ব্যবসায়িক কারণে চলে আসেন যশোরের সীমান্তবর্তী থানার নাভারণ পুরাতন বাজারে। এখান থেকে বিড়ির ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটান এবং গড়ে তোলেন দেশের সর্ববৃহৎ আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি। নাভারণে আসার প্রথম দিকে ব্যবসা প্রসারে তাকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোজাহার বিশ্বাস।
এভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেন আকিজ। নতুন নতুন উদ্ভাবনী মেধায় তিনি উন্মোচন করেন ব্যবসার নানা দিগন্ত। একে একে গড়ে তোলেন আকিজ তামাক ফ্যাক্টরি, আকিজ নেভিগেশন, আকিজ জুট মিল, আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি, আকিজ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এখন প্রায় ৪০ হাজার কর্মী তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকা রাজস্ব পরিশোধ করেন। ২০১৬ সালে আকিজ শিল্প পরিবারের বার্ষিক টার্নওভার ছিল ৩৬ হাজার কোটি টাকা, এসবের পেছনে রয়েছে তার এবং যোগ্য উত্তরসূরি সন্তানদের সকাল থেকে রাত অবধি অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা।
সেখ আকিজউদ্দিন জীবনের সব শ্রম-সাধনা কেবল নিজকে প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করেননি। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি একজন সফল সমাজসেবক হিসেবে দায়িত্ব পাল করেন। ছোটবেলায় দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের করুণ অবস্থা উপলব্ধি করেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শরিফ হোসেনের সহায়তায় ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আদ্-দ্বীন। বর্তমানে এ সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন মহিলা, শিশু ও চক্ষু হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ সারা দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এমন একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। অক্লান্ত পরিশ্রম, কঠোর অধ্যাবসায়, আপসহীন সততা, সর্বোপরি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা তাকে সফলতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতাই তার পুরো জীবনের নিয়ন্ত্রক। অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞান তিনি সহজেই নিজের জীবনে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষা বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়নি। বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি এক ধরনের অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল, যেমন— রবীন্দ্রনাথেরও জীবনের শুরুতে। মেধা ও প্রতিভার সমন্বয়ে গড়ে তোলা তার প্রতিষ্ঠানে এখন হাজার হাজার শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
সাতক্ষীরার জাতীয় অধ্যাপক এম আর খানের (১৯২৮-২০১৬) মতো মহত্প্রাণ নিজের জন্য নয়, অন্যের কল্যাণে নিবেদন করে গেছেন নিজের সব ধন ও ধ্যান-ধারণাকে। উত্সর্গ করেন নিজের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ ভাবনাকে। এম আর খান আনোয়ারা বেগম ট্রাস্ট ফান্ড এমন এক মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত, শিশুস্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন আর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি উত্সর্গ করেছেন নিজের সঞ্চয়, সম্পদ ও সামর্থ্য। তিনি একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তার একান্ত প্রত্যাশা ছিল, স্থায়িত্ব লাভ করুক জনদরদি এ ফান্ড ও প্রতিষ্ঠান। সাতক্ষীরা তথা দেশের মানুষ পাক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ জীবনযাপনের দিশা। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি দেখেছেন, শিখেছেন ও উপলব্ধি করেছেন মানুষের অসহায়ত্বকে সহায় হয়ে দাঁড়ানোর অনিবার্যতা। ‘দুর্বল মানুষ যদি পার হয় জীবনের অথৈ নদী’ তাতে নিজের কোনো ক্ষতি নেই, বরং বিপদমুক্ত মানুষের কলরবে সাফল্যে ভরবে দেশ ও জাতি। কেন তাই এ পথে পিছিয়ে যাব? রেখেছিলেন এ প্রশ্ন নিজের কাছে, দেশের কাছে।
সাতক্ষীরায় নিজের গ্রাম রসুলপুরকে আদর্শ গ্রাম তথা দারিদ্র্যমুক্ত গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার স্বপ্ন উদ্যোগ দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূয়োদর্শন হিসেবে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। ‘নিজের গ্রামকে আগে দারিদ্রমুক্ত করি’— এ প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ে দীপ্ত বাংলাদেশের সব সচেতন মানুষ তার মতো কর্মবীরের অনুসরণে একযোগে কাজ করতে পারলে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সুদূরপরাহত থাকে না আর।
জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন উদ্যোক্তা যশোরের মোহাম্মদ শরীফ হোসেন (১৯৩৪-২০০৭) ১৯৬৭ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম যশোরে বইমেলা প্রবর্তন করেন। তিনি বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে বইমেলার আয়োজন এবং দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য বই ব্যাংক গড়ে তোলেন। গ্রামাঞ্চলে তিনি সাধারণ মানুষকে ভ্রাম্যমাণ পাঠকেন্দ্রের মাধ্যমে বই পড়তে আগ্রহী করে তোলেন। তিনি ১৯৬৮ সালে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে যশোরে প্রথম নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে গণশিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৯৪ সালে মোহাম্মদ শরীফ হোসেন নিজের বাড়ির সামনে গড়ে তোলেন ‘সন্দীপন’ নামে একটি সমবায়ী, অরাজনৈতিক ও অবাণিজ্যিক সংস্থা। এ কেন্দ্রের মাধ্যমে স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ দর্জিবিজ্ঞানসহ গরিব, অসহায় ও দুস্থ মহিলাদের কর্মোপযোগীকরণে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সন্দীপন কীটনাশকমুক্ত ফসল উৎপাদন করে কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটানোর প্রয়াস চালায়। শরীফ হোসেন দূষিত ফসল থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর জন্যে এ প্রকল্প গড়ে তোলেন। গ্রামে গ্রামে মসজিদে মসজিদে মিটিং করে ফসলদূষণ সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করা হয়। সে কারণে যশোর এখন বাংলাদেশের অন্যতম সবজি উৎপাদন কেন্দ্র, অদূরে গদখালীতে গড়ে উঠেছে ফুল বিপণনের ব্যাপক ব্যবসাকেন্দ্র। তিনি গ্রামীণ লোকদের বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নির্মাণ ও ব্যবহারের শিক্ষাদানে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এ বিষয়ে তিনি এত বেশি প্রচষ্টা চালিয়েছিলেন যে, লোকেরা তাকে ‘পায়খানা অধ্যাপক’ বলে সম্বোধন করে থাকেন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে পথিকৃৎ প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক (১৯৪৫-২০০৮) কুষ্টিয়ার সন্তান। ১৯৯৯ সালের মে মাসে পিডিবির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের আগ পর্যন্ত প্রায় ৩৩ বছর সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালনকালে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে উন্নয়নের প্রবাদপুরুষে পরিণত হন তিনি। একজন বড়মানের সৃজনশীল মানুষ ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ‘পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ ভাবনায় তার দক্ষ প্রশাসনিক প্রজ্ঞা, উদ্যোগ ও উদ্যমকে কৃতজ্ঞচিত্তে দেশবাসী মনে রাখবে বহুদিন। ৬৮ হাজার গ্রামের মানুষের যাতায়াত, যোগাযোগ, তাদের স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানির উত্স-আধার নির্মাণ, হাটবাজার উন্নয়নের দ্বারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়নে তার উদ্ভাবনীশক্তি, দৃষ্টি ও সৃজনশীল কর্মোদ্যোগ ছিল সবার কাছে প্রশংসনীয়। সরকারি কর্মকাঠামোর মধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন দেশের সেরা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর’। বিশ্বব্যাংক ১৯৯৪ সালে ‘Government that works, reforming the public sector’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এলজিইডিকে বাংলাদেশের একটি সফল ও কার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে। বিশ্বব্যাংকের বিশেষ সমীক্ষায় ১৯৯৭ সালে এ সংস্থাকে ‘সরকার অভ্যন্তরেই স্বশাসিত সফল সরকার’ বলে অভিহিত করা হয়। ‘কানেক্টিং বাংলাদেশ’ শব্দটির সঙ্গে আজ এ দেশের অনেকেই পরিচিত। কিন্তু শব্দটিকে এ দেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তনে সফলভাবে প্রয়োগ করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। তার উদ্যোগেই গ্রামের সঙ্গে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা ও জেলা থেকে রাজধানী পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন এবং এভাবে দেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের পথে অনেকখানি এগিয়ে দিয়ে গেছেন। ‘ডিজিটাল’ শব্দটির সঙ্গে বাংলাদেশের অনেকেই আজ পরিচিত। এ দেশের ডিজিটাল টেকনোলজির যাত্রা হয় কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের হাত দিয়ে নব্বইয়ের দশকেই। উন্নয়ন পরিকল্পনার শর্ত হিসেবে দেশে যেকোনো স্থাপনা বা অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে সহজতর করার জন্য জিআইএস (Geographical Information System) চালু করে তিনি নব্বইয়ের দশকে এ দেশের প্রযুক্তিতে আনেন যুগান্তকারী বিপ্লব।
কুষ্টিয়ার বেকার জনস্রোতের দুঃখ-দুর্দশার কথা ও আর্থসামাজিক অবক্ষয়ের ছবি কাছ থেকে উপলব্ধি করেই আলহাজ মজিবর রহমান (জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪৭) ১৯৭৮ সালের ২৩ অক্টোবর শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে কুমারগাড়া বিসিক শিল্পনগরীতে স্থাপন করেন বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে কেবল প্রস্তুতীকরণ কারখানা। হাতেগোনা কয়েকজন লোক নিয়ে ১৯৮০ সালের ২৩ জানুয়ারি বিআরবি কেবল তাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। তবে মূলধনের স্বল্পতা, বিভিন্ন শর্তারোপ এবং অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থার কারণে উৎপাদন শুরুর পর পরই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি বাধাগ্রস্ত হতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতার ধৈর্য ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৮৩ সালে আবারো সামান্য কয়েকজন লোকবল দিয়ে বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজে উৎপাদন শুরু হয়। এরপর বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে সাফল্যের সিঁড়ি পেরোতে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। গুণগত মানসম্পন্ন বৈদ্যুতিক ওয়্যারস অ্যান্ড কেবল কন্ডাক্টর উৎপাদনের কারণে দেশের সর্বত্র এ প্রতিষ্ঠানের নাম ছড়িয়ে পড়ে। বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদন তালিকায় একের পর এক নতুন নতুন পণ্য যোগ হতে থাকে। কুষ্টিয়া চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের পরপর চারবার নির্বাচিত সভাপতি মজিবুর রহমান ছোটকাল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন। ১৯৫৮-৮০ এই দীর্ঘ ২২ বছরে ট্রেডিং ব্যবসা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ ১, ইউনিট-২, ইউনিট-৩, এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ লি., কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্টিজ; বিআরবি পলিমার, বিআরবি ইলেকট্রিক্যাল কোং লি, বিআরবি ডিস্ট্রিবিউশন, বিআরবি ওয়্যার কোং লি., লাভলী হাউজিং লিমিটেড, ইউনিভার্সাল নেটওয়ার্ক কোম্পানি ও প্লাইউড প্রকল্প। এছাড়া আছে কিয়াম ছিরাতুন্নেছা ট্রাস্ট।
উৎপাদনের গুণগত মান ও সফলতার নিদর্শনস্বরূপ বিআরবি কেবলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠান ১৯৯৭ সালে শেরেবাংলা জাতীয় শিল্প একাডেমি স্বর্ণ পদক, ১৯৯৭-৯৮ জাতীয় রফতানি ট্রফি স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ এডুকেশন স্কলারশিপ ট্রাস্ট স্বর্ণপদক, ২০০১ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী জাতীয় পুরস্কার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৌরবময় আর্ক অবের দশম গোল্ডেন আমেরিকা অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান






