বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জার্মান ওয়াচের ২০১৭-এর প্রতিবেদনমতে, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশ ১৮৫ বার চরম বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছে, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বিরূপ আবহাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর গড়ে জিডিপির প্রায় ১.৮% হারায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ২% হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, প্রায় ৩২% ভূমি, ২৬.৭১% মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার শিকার এবং এর প্রধান শিকার হয় মূলত দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জনগণ। সাম্প্রতিক একটি গবেষণার তথ্যমতে, গত ৩০ বছরে বঙ্গোপসাগর ও সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর পানির উচ্চতা বাড়ার হিসাব ধরে এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ শতকের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা এক মিটার বাড়লে দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪ শতাংশ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ জনগণ এ উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে (জিডিপি) উপকূল অঞ্চলের অবদান প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ। ২০০৯-১৪ সময়কালে ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোয় বাংলাদেশের মোট খানার ২৫.৫১% ক্ষতিগ্রস্ত (বিবিএসের জরিপ, ২০১৫)। একসময়ের খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার বলে খ্যাত বরিশালসহ যশোর, খুলনা, বাগেরহাট জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিকভাবে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা-১১(গ)তে ২০২০-এর মধ্যে সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবেলায় কার্যকর নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সব পর্যায়ে সামগ্রিক দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ‘সেনডাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশান’-এ ২০১৫-৩০ সময়কালের মধ্যে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোয় দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন ও কার্যকর সাড়া প্রদানে দুর্যোগ-পূর্ববর্তী প্রস্তুতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে মূলত দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২.৫ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে মৃতের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও এখনো দুর্যোগের ঝুঁকি বিদ্যমান, বিশেষ করে যথাযথভাবে তা চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের আগে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলো এবং গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত ও স্থানীয় ভাষায় জনগণকে ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য জানানোর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, পোল্ডার, আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করার পাশাপাশি খানা বা পরিবারভিত্তিক দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্মাণ জরুরি। উল্লেখ্য, উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ হাজারটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৩ হাজার ৭৫১টি বিদ্যমান। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সম্পদের জোগান না থাকা, কোনো কোনো ইউনিয়নে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম-দুর্নীতি ও বিভিন্ন সরকারের সময় নির্মিত অধিকাংশ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি করায় এবং যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ব্যবহার অনুপযোগী এবং কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছতে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের প্রায় দু-তিন কিলোমিটার কাঁচা ও ভাঙা রাস্তা অতিক্রম করতে হয় (টিআইবি, ২০১৭)।

বাংলাদেশে গত ২৫ বছরে ঘূর্ণিঝড়ের হারের ক্রমবৃদ্ধি লক্ষ্যণীয়, ১৬ বছরে (১৯৯১-২০০৬) মাত্র ছয়টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও পরবর্তী এক দশকে (২০০৭-১৬) পাঁচটি ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস, আইলাসহ ৪৭৮টি মাঝারি ও বড় জলোচ্ছ্বাস এবং বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানই এমন যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সমুদ্রের ফুঁসে ওঠা রাগকে সুন্দরবন বরাবরই মাথা পেতে নিয়ে উপকূলীয় পাঁচ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় রক্ষাকবচ হিসেবে অনন্য অবদান রাখছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা রোধে কিংবা জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা রোধে প্রতিরোধক হিসাবে শ্বাসমূলীয় বন এক ধরনের প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করে। আশঙ্কার বিষয়, ইউনেসকোর প্রতিবেদনে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ভাটিতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ায় সুন্দরী গাছের আগা মরে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। পাশাপাশি উপকূল অঞ্চলে বঙ্গোপসাগর থেকে সুন্দরবনে ঢোকা লোনা পানির প্রভাব কাটানোর জন্য নদ-নদীতে মিঠা পানির যে প্রবাহ থাকা দরকার, মে-নভেম্বর পর্যন্ত তা না থাকায় সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরবনের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মত্স্যসম্পদ, নির্মাণ ও জ্বালানি কাঠ এবং অন্যান্য অবদান বিবেচনায় সুন্দরবনের মতো শ্বাসমূলীয় বনের আর্থিক অবদান হেক্টরপ্রতি কমপক্ষে ৬১ হাজার ডলার (ওয়াইল্ড নেচার সায়েন্স, ভলিউম-২৯৭, আগস্ট ২০০২:৯৫০-৯৫৩)। এছাড়া সুন্দরবনের কাছে সমুদ্রতীরের মত্স্য চাষ এবং জ্বালানি কাঠ, গোলাপাতার ওপর নির্ভর করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী বেঁচে থাকে এবং বড় আকারে স্থাপিত মত্স্য খামারের জন্য সরবরাহকৃত পোনার প্রধান উত্স শ্বাসমূলীয় বনের ভেতরে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাল, নালা।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে যশোার ও চুয়াডাঙ্গাও খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে ২০ শতাংশ আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে; বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে এসব এলাকার ৮০ লাখ একর ফসলি জমি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষা অনুসারে, উপকূলীয় অঞ্চলের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, বরগুনা, বরিশাল, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে ব্যাপকভাবে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত। দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪৩ লাখ একর জমির মাটি লবণাক্ত; নদীগুলোর ৫৬% মারাত্মক লবণাক্ততার কবলে। এর ফলে আয় কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্যের হার এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, লবণাক্ততার ফলে মানুষের জীবন-জীবিকা, জনস্বাস্থ্যসহ কৃষি, মত্স্য চাষ, অবকাঠামো, উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানসহ পারিবারিক ও বাণিজ্যিক কাজে নিরাপদ পানির আশু ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু লবণাক্ততার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে ফসলের জমি হারিয়ে যাচ্ছে এবং খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, লবণাক্ততার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে, যদি শ্বাসমূলীয় বনের আয়তন ১০% বৃদ্ধি পায়, তাহলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবনহানির আশঙ্কা প্রায় ১৩% হ্রাস পায় এবং গৃহপালিত প্রাণী যেমন গরু, ছাগলের প্রাণহানির আশঙ্কা যথাক্রমে ৭% ও ২.২৩% হ্রাস পায় (দাস, ২০০৭)। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হবে। তাই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবন মায়ের মতো আগলে না রাখলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো, তার হিসাব জরুরি। উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমির প্রয়োজন হলেও নির্বিচারে বন নিধনের ফলে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়েছে। চিংড়িঘেরের নামে অবৈধভাবে সুন্দরবনের বাফার জোনের ভেতরের বনভূমি দখলের কারণে ২০০০-১০ সময়কালে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর বন (দক্ষিণাঞ্চলের মোট ভূমির প্রায় ৮%) হারিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা মাত্র ১০০-এর কাছাকাছি নেমে আসার খবর প্রকাশ হয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে বাঘের সংখ্যা কমছে। বর্তমান প্রধান বন সংরক্ষকের তথ্যানুযায়ী, ‘সুন্দরবনের পাশের এলাকার বেশকিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, বন বিভাগের নিচু স্তরের কিছু কর্মকর্তাসহ অনেকেই বাঘ পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে ইন্টারপোল থেকে তথ্য দেয়া হয়েছে।’

এর মাঝে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবনের নয় কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করায় সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় সুন্দরবনের বাফার জোনের মধ্যে রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ, ইসিএ এলাকায় প্রায় ২০০টি শিল্প ও প্রকল্পকে পরিবেশের প্রাথমিক (অবস্থানগত) ও চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়ার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। ঝড়-দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করলে সুন্দরবনের ক্ষেত্রে এ অবদান অনেক বেশি হবে, যা কয়লা বিদ্যুেকন্দ্রের লাভ-ক্ষতির হিসাব বা ইআইএ প্রতিবেদনে নেই। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তত্কালীন প্রধান বন সংরক্ষক কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক পত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং Landscape Zone-এ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের Royal Bengal Tiger তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।’ সমস্যাটা হচ্ছে, প্রায়ই আমাদের নীতিনির্ধারকরা কোনো প্রকল্পের লাভ-লোকসান হিসাব করতে আর্থিক ব্যয়কেই চোখে দেখেন, কিন্তু পরোক্ষ ক্ষতি তারা বিবেচনা করেন না। কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করা হলে ব্যাপকভাবে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি করবে, হাজার হাজার মানুষের মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়বে এবং জলবাযু পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় অভিযোজন তহবিলের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হবে, যা কাম্য নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন অব কনজার্ভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে সুন্দরবন এবং এর সম্পদের ক্ষতি করবে না, এমন যথাযথ স্থানে সরিয়ে নিতে সুপারিশ করলেও সরকার অনড় অবস্থানে থাকায় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবনকে সুরক্ষা প্রদানে কয়লা বিদ্যুেকন্দ্রসহ এর আশপাশের সব ধরনের স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকাকে সুরক্ষা প্রদানে কমিউনিটিভিত্তিক অভিযোজন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে; স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পানি ব্যবস্থাাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, জোয়ার-ভাটা হয় এমন নদ-নদীগুলোর ক্ষেত্রে জোয়ার নদী ব্যবস্থাপনা (Tidal River Management-TRM), যার সফল উদাহরণ বিলবুনিয়া, এর মাধ্যমে পলি ব্যবস্থাপনার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে অক্ষুণ্ন রেখেই স্থানীয় বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করেই অধিক ফসলের ফলন এবং একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব। পাশাপাশি উপকূলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধানের চারা রোপণ, খাওয়ার পানি ও অন্যান্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহারের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, দীঘি খনন ও সংরক্ষণ, ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণ জরুরি। পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সরকার কর্তৃক আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।

সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে একসময়ের শিল্পসমৃদ্ধ খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সম্পদ একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও অভিশাপ। জাতীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের সম্পদ যদি দেশের কাজে ব্যবহার করার দক্ষিণাঞ্চলের টেকসই সমৃদ্ধি নির্ভর করছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্থানীয় পর্যায় হতে ধাপে ধাপে সংলাপ ও মতামত গ্রহণের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলকে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করার বিকল্প নেই। দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই করে এ অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জকে কার্যকরভাবে মোকাবেলায় জাতীয় ও স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু অভিযোজনকে সমন্বিত করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

 

লেখক: জলবায়ু অভিযোজন ও অর্থায়নে সুশাসন বিশ্লেষক