বিশ্বব্যাপী জৈব পরিবেশ রক্ষার সম্মিলিত প্রয়াস রামসার কনভেনশন ও ন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের ঘোষণা অনুসারে সমুদ্র উপকূলবর্তী সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র খানিকটা ভঙ্গুর। বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত এ বনের ভেতর দিয়ে নদী, ছোট খাল ও খাঁড়িগুলো এমনভাবে চলে গেছে, যা অনেকটা জালের মতো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। সুন্দরবনের ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের মধ্যে ম্যানগ্রোভ বনের আয়তন ৩ হাজার ৯৫৬ বর্গকিলোমিটার আর ১ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে জলাধার। প্রাকৃতিক সম্পদ, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের দিক দিয়েও সমৃদ্ধ এ বনভূমি। ৬৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২০০ প্রজাতির মাছ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৩ প্রজাতির পাখি, ৫১ প্রজাতির সরীসৃপ, আট প্রজাতির উভচর প্রাণীসহ নানা ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণীর বসতি এখানে (চৌধুরী ২০০৩)। পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের জীবনযাপনের জন্য নানাভাবে এ বনের ওপর নির্ভরশীল। দুই লাখেরও বেশি মানুষ প্রতিদিন তাদের জীবকার প্রয়োজনে সুন্দরবনে যাতায়াত করে। এক লাখেরও বেশি অপ্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে এ বনের ওপর। এদের সবার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উত্স সুন্দরবন। জীবিকা নির্বাহের জন্য এ বন থেকে কাঠ সংগ্রহের কাজ করে প্রায় ২২ শতাংশ লোক। মধু থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল ও রসদ সংগ্রহের সঙ্গে জড়িতদের সংখ্যা ৫ শতাংশ। মাছ ধরা ও নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে জড়িত লোকের সংখ্যা প্রায় ৬৯ শতাংশ। বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে, এমন ৩৮ শতাংশ লোক খাবার ক্রয় বাবদ আয়ের ৭১ থেকে ৭৫ শতাংশ ব্যয় করে। কাঠ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের বস্তু সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত, এমন ৩৩ শতাংশ মানুষ খাবারের ক্ষেত্রে ব্যয় করে আয়ের ৭৬-৮০ শতাংশ। মাছ ধরা থেকে শুরু করে এ ধরনের পেশার সঙ্গে জড়িত ৫০ শতাংশ মানুষ তাদের আয়ের ৬১-৬৫ শতাংশ অর্থই খরচ করে খাবার ক্রয় করতে। আর এ পরিসংখ্যান সুন্দরবনকে ঘিরে জীবিকা নির্ভর করে, এমন মানুষের দরিদ্রতার চিত্রই তুলে ধরে (উদ্দীন ও অন্যান্য গবেষক ২০১৩)। এদিকে জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল ৮৪-৮৯ শতাংশ মানুষ তাদের আয়ের ৫ শতাংশ অর্থ স্বাস্থ্য সুরক্ষায়, ৪০-৬৮ শতাংশ আয়ের ৫-১০ শতাংশ বাসভবন মেরামতের কাজে ও ৫৫-৭৫ শতাংশ মানুষ আয়ের ৫-৭ শতাংশ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড যেমন— ছেলেমেয়ের বিয়ে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে খরচ করে। বলা বাহুল্য, সুন্দরবনকে ঘিরে অনেক ধরনের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল এবং তাদের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয় (চৌধুরী ২০০৩, ২০১২, উদ্দীন ও অন্যান্য গবেষক ২০১৩)।

বিভিন্ন গবেষণা ও ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় (বিশ্বাস ও অন্যান্য গবেষক ২০০৭, চৌধুরী ২০০৩, ২০০৯, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৭; চৌধুরী অ্যান্ড আকবর ২০১৫ ইত্যাদি), নানা ধরনের পরিবেশগত হুমকি যেমন— ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন, পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমি ক্ষয়, নদীতে পলি জমা, উপরিভাগে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, তেলের ট্যাংকার ডুবি, শিল্পায়ন ইত্যাদি কারণে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্যের পরিবর্তন ঘটছে। আগে যেসব এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণ কম ছিল, এখন সেসব জায়গায় এর পরিমাণ বাড়ার কারণে লবণাক্ততা সহনশীল উদ্ভিদ যেমন— গরান, গেওয়াজাতীয় গাছের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। বিপরীতে কমে যাচ্ছে কম লবণাক্ততা সহনশীল উদ্ভিদ যেমন— সুন্দরী, পশুর গাছের সংখ্যা। একইভাবে প্রাণিবৈচিত্র্য কমছে।

কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান (কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র, সিমেন্ট শিল্প, এলপিজি গ্যাস কারখানা ইত্যাদি) ও শস্য সংরক্ষণকাজে নির্মিত বায়ুনিরোধক ঘর বা সাইলো ধরনের বড় বড় অবকাঠামো সুন্দরবন থেকে মাত্র ১০-১৫ কিলোমিটার দূরত্বে নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের কার্যক্রম শুরুর পর সুন্দরবন থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার দূরে মংলায় শিল্পায়নের গতি খুব দ্রুত হারে বাড়ছে। নতুন নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি ছোটবড় জাহাজ, কার্গো, লঞ্চ ও বিভিন্ন ধরনের জলযানের মাধ্যমে সুন্দরবনের পশুর ও এর সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন নদী ও খালের ওপর দিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। পণ্য বহন ও খালাস থেকে শুরু করে গোটা পরিবহন প্রক্রিয়ায় পানির উপরিভাগে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, মাছের আবাসস্থল, প্রাণিকুলের স্বাভাবিক বিচরণ, গতিবিধি, খাদ্য শৃঙ্খল, উদ্ভিদ, প্রাণিবৈচিত্র্যসহ সুন্দরবন ও এর আশপাশের বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। অনেক গবেষক সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় বিভিন্ন ধরনের বিষয়ের ওপর গবেষণা করেছেন, যেমন— পরিবেশগত প্রভাব, উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য, জল ও মাটির গুণগত মান, খাদ্য শৃঙ্খল, কার্গো দুর্ঘটনায় তেল ছড়িয়ে পড়ার পরবর্তী অবস্থা, লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। তবে সুন্দরবন থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার দূরত্বে বড় ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা প্রতিষ্ঠা ও শিল্পায়নের ফলে এ অঞ্চলের প্রাণিকুল (বাঘ, হরিণ, কুমির, ডলফিন ও অন্যান্য মাছ) এবং উদ্ভিদবৈচিত্র্য, উপকূল অঞ্চল ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তার ওপর ভিত্তি করে কোনো পরিমাণগত তথ্য ও গবেষণাপত্রের খোঁজ মেলে না। এ অবস্থায় প্রায় দুই বছর ধরে সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণিজীবন, মানুষের জীবনযাত্রার মান, ধরন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিভিন্ন ধরনের তথ্যানুসন্ধানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। সুন্দরবন থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত এলাকাগুলোর শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে অদূরভবিষ্যতে এ অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র, বিশেষ করে বাঘ এবং অন্যান্য প্রাণিকুল ও তাদের আবাসস্থল কতটুকু সুরক্ষিত থাকবে, তার ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

সুন্দরবনের করমজল থেকে ২০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ও দূরবর্তী এলাকা ধরে বাগেরহাটের মংলা ও রামপাল উপজেলার ওপর গবেষণাটি করা হয়। তাতে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত দূষিত বর্জ্য পশুর নদী ও এর সংযুক্ত খালের পানিতে মিশে এলাকার অভ্যন্তরীণ জমি (ভূপৃষ্ঠের দুই থেকে মাটির ছয় ইঞ্চি গভীরে) দূষিত করছে। জাহাজের মাধ্যমে পণ্য আনা-নেয়ার কারণে দূষণের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। যেখানে সেখানে ও দ্রুতগতিতে শিল্পায়নের ফলে সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ইকোসিস্টেমের পরিবর্তন ঘটছে।

আমেরিকান পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন ১৯৮৯ অনুসারে প্রতি লিটার পানিতে ১০ মিলিগ্রাম তেলের উপস্থিতি জলজ জীবনের জন্য প্রাণঘাতী। সুন্দরবনের শিল্প এলাকার পানি ও মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে অনেক বেশি পরিমাণ তেলের উপস্থিতি রয়েছে। রেকর্ড পরিমাণ এসপিএম, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সালফার অক্সাইডের উপস্থিতি নির্দেশ করে, শিল্পায়নের ফলে সুন্দরবন এলাকার পানি ও মাটিতে এ উপাদানগুলোর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এছাড়া সুন্দরবনের যে এলাকাগুলো ঘিরে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে, তাতে দেখা গেছে, শিল্পায়নের ফলে সেখানের মাটি, পানি ও বাতাস শিল্প বর্জ্য দ্বারা দূষিত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে পশুর নদী ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খাল এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল।

গবেষণাটি পরিচালনার সময় লক্ষ করা যায়, শিল্প দূষণের ফলে বিভিন্নভাবে এ অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য প্রভাবিত ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পঅঞ্চলের পানি ও মাটির ভৌত রাসায়নিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ত পানির শাপলা ও ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বীজজাত চারাগুলো অঙ্কুরিত না হয়ে পচে যাচ্ছে। ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের পাশাপাশি সুন্দরী গাছের বীজ রয়েছে এর মধ্যে; যেগুলো অঙ্কুরিত না হয়ে কালচে হয়ে পড়ে রয়েছে। অঙ্কুরিত না হয়ে নষ্ট হয়েছে, এমন বীজের সংখ্যা ৭০ শতাংশ। বিপরীতে শিল্পায়নের প্রভাব পড়েনি, এমন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শতভাগ সুন্দরী গাছের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে চারা জন্মেছে। এছাড়া শিল্প দূষিত অঞ্চলে যেখানে মাত্র ১৪-২০ প্রজাতির মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেখানে দূষণমুক্ত এলাকায় রয়েছে ২৭-৩৩ প্রজাতির মাছ। বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে, এমন মাছ যেমন বাগদা, পারসে প্রজনন ঋতুতে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ ডিম ছাড়ে, সেখানে সুন্দরবনের অন্য অংশে দূষণমুক্ত বিশুদ্ধ পানিতে এ-জাতীয় মাছের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরিমাণ ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৮ হাজার ৭০০। যদিও ২০১০ সাল-পূর্ববর্তী গবেষণায় সংখ্যাটি ছিল ৬ হাজার ৮০০ থেকে ৯ হাজার ৬০০। তবে বর্তমান গবেষণাটি তুলে ধরে সুন্দরবন অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্পায়ন ও এর প্রভাব মাছের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়ায় প্রগাঢ় হুমকি হিসেবে কাজ করছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে আরো জানা যায়, সাধারণ এলাকাগুলোর তুলনায় শিল্পাঞ্চলগুলোয় কাঁকড়া, শামুকের সংখ্যা কমে গেছে। প্রভাবিত হয়েছে পাখির জীবনবৈচিত্র্যও। শিল্পায়নের ফলে ওই অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সংখ্যাও কমেছে। একই অবস্থা ডলফিন, কুমির, বন্য শুয়োর ও হরিণের ক্ষেত্রেও। পক্ষান্তরে ২০১০ সালের গবেষণায় দেখা যায়, সুন্দরবনের যে এলাকাগুলোয় শিল্প-কারখানা বা কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, সেসব অঞ্চলে এদের সংখ্যাটা বেশি। তাছাড়া পশুর নদী ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খাল, খাঁড়ি এবং চর এলাকায় গবেষণাটি পরিচালনার সময় মাত্র তিনটি বাঘের পায়ের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে ২০১০ সালের আগে একই অঞ্চলের ওপর করা গবেষণায় ১২টি বাঘের পায়ের চিহ্নের হদিস মেলে। আর শিল্পয়ানমুক্ত এলাকায় সংখ্যাটা ছিল ১৫। এতে প্রতীয়মান হয়, সুন্দরবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্পায়ন, পণ্য আনা-নেয়ার প্রক্রিয়া ইত্যাদির ফলে পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তার ফলে বাঘের বসতি ও অবাধ বিচরণ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পশুর নদী ও এর সংযুক্ত প্রণালিগুলো জোয়ার-ভাটাবহুল। তাছাড়া এ অঞ্চলের শিল্প-কারখানাগুলোর বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা সরাসরি এ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত পশুর নদীর সঙ্গে মিলেছে মইদাড়া, মংলা, চুনকুড়ি, ঘাষিয়াখালী, বিছনা, গনা, কুমারখালী, দাগুরা ও ইছামতি। এ নদীগুলোর সঙ্গে আবার সংযুক্ত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ছোটবড় খাল ও খাঁড়ি, যা অনেকটা জালের মতো ছড়িয়ে আছে। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আমদানিকৃত কাঁচামাল, কয়লা, তেলসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী পশুর নদীর ওপর দিয়ে বিভিন্ন ধরনের নৌযানে করে পরিবহন করা হয়। তাছাড়া দেখা যায়, কোনো জায়গায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কলকারখানা তৈরির উদ্দেশ্যে জমি ক্রয়ের পর এর আশপাশের ছোট খাল, জলাভূমিগুলো ভরাট করে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। এতে বাধাগ্রস্ত হয় নদীর স্বাভাবিক গতিবিধি। এ ধারাবাহিকতায় শিল্পায়ন বৃদ্ধির ফলে পশুর নদীর সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য নদী, খাল ও এর সঙ্গে সংযুক্ত ছোট খাঁড়িগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ১৯৭৮ ও ১৯৯৮ সালে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পশুর নদী ও এর সংযোগ নদীগুলোর স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। অথচ ২০১৭ সালের মানচিত্রে পশুর নদীর সঙ্গে সংযুক্ত চ্যানেলগুলোর সংকীর্ণ অবস্থার চিত্রই দেখি আমরা। স্রোতের স্বাভাবিক গতিবিধি, জোয়ার-ভাটা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পশুর নদী ও এর সংযোগ নদীতে পলি জমার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় জাহাজগুলো হারবারিয়া থেকে মংলা বন্দরে ভিড়তে পারছে না। পানির স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ফলে পশুর ও এর সংযোগ নদীতে পলি পড়ার পরিমাণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে নদীতে পলি জমে দুই তীরে স্রোতের প্রবাহ বাড়ছে। ফলে পশুর নদীর দুই তীরের পাড় ভেঙে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। পাঁচ বছর ধরে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের প্রস্তাবিত এলাকাগুলোর মধ্যে করমজলের ১৩০ থেকে ৩৬০ মিটার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের ঘটনা ঘটেছে।

সুতরাং শিল্প দূষণকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কার্যাক্রম পরিচালনা করা জরুরি, যার মাধ্যমে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কনভেনশন যেমন— রামসা, ইউনেস্কো, বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি কনভেনশন নির্ধারিত নীতিমালাগুলো সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে যে, এ অঞ্চলকে ঘিরে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবে না, যা সুন্দরবনের নাজুক বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রভাবিত করতে পারে। সুন্দরবন ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাকৃতিক, জৈবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করার পর শিল্পায়নের পরিণতি নেতিবাচক ও অপরিবর্তনীয় হিসেবেই প্রতীয়মান হয়, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখলে সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার জলবায়ু, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, ভূমি ব্যবহারের ধরন, বায়ু ও পানির গুণ-মান, উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য, জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে নদীভাঙনের পরিমাণ বৃদ্ধি, শব্দদূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, মত্স্যবৈচিত্র্যের হ্রাস ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংসের পরিণতি বিপজ্জনক হতে পারে। যার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভূমিহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র, শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা ও গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুদায়নের ফলে নতুন কিছু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসায়িক সুবিধা বাড়বে। তবে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী শিল্পোন্নয়ন থেকে প্রাপ্ত সুবিধার চেয়ে পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের মাত্রা অনেক বেশি হবে। তাই সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পরিবেশ, প্রকৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, অঞ্চলটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযোগী নয়। আইইসি ও ইআইএর ভিত্তিতে সুন্দরবনকে ঘিরে শিল্পায়ন এ অঞ্চলের নাজুক বাস্তুতন্ত্র, জীব ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যের ওপর আঘাত হিসেবে কাজ করবে। এ অবস্থায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পোন্নয়ন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে তা বের করে আনা প্রয়োজন। অন্যথায় সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও বাফার জোন শিল্প দূষণের মাধ্যমে হুমকির সম্মুখীন হবে।

 

লেখক: অধ্যাপক, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

সংক্ষেপে ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস