বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার ভেতর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে পাঁচটি নদীর অববাহিকা আছে। যথা— ইছামতী, বেতনা, কপোতাক্ষ, শ্রীনদী ও পশুর। ইছামতী সীমান্ত নদী, যার প্রবাহ ভারতের নদীয়া এবং উত্তর চব্বিশ পরগনা থেকেও আসে। ভৈরব নদের একটি শাখা বেতনা নদী মহেশপুরের বিলগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করে আবার বাংলাদেশের শার্শা উপজেলায় প্রবেশ করেছে। বর্তমানে এ নদীর প্রবাহ শীতকালে ভারতে আটকে দেয়ায় এটি কেবল শার্শা উপজেলার বিলের পানি সংগ্রহ করে। ভাটিতে এ নদী খোলপেটুয়া নামে প্রবাহিত হয়ে কপোতাক্ষের সঙ্গে গিয়ে মেশে। কপোতাক্ষ নদের পূর্বে শ্রীনদী ভৈরবের শাখা হিসেবে যশোর শহরের কাছ থেকে মুক্তেশ্বরী, তারপর টেকা ও এর পর শ্রীনদী নামে ভাটিতে প্রবাহিত হতো। বর্তমানে উজান থেকে এর কোনো প্রবাহ আসে না। দক্ষিণে এ নদী ভদ্রা হয়ে শিবসার সঙ্গে মিশে সাগরে পতিত হয়। খুলনা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদ উত্তরে আফরা খাল ও দক্ষিণে নবগঙ্গা নদীর মাধ্যমে মাগুরা, ঝিনাইদহ, যশোর ও নড়াইল জেলার বিলের পানি সংগ্রহ করায় এটি সারা বছরই নাব্য থাকে ও পশুর নামে সাগরে পতিত হয়।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সমস্যায় নিমজ্জিত কপোতাক্ষ নদের উত্স চৌগাছার তাহিরপুরে, ভৈরব নদের শাখা হিসেবে। কপোতাক্ষ এখানে ভৈরবের সবটুকু প্রবাহই নিজের পথে নিয়ে যায়। তবে ভৈরব দর্শনার কাছে তার মূল উত্স মাথাভাঙ্গা নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বর্তমানে একটি মৃত নদ। ভৈরব নদ জীবননগর ও কোটচাঁদপুর এলাকার যে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে কপোতাক্ষ নদ, তা গ্রহণ করে ভাটিতে নিয়ে যায়। এ এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বছরে গড়ে ১ হাজার ৬৫০ মিলিমিটার, যা অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক কম (সারা দেশের গড় ২ হাজার ৩০০ মিলিমিটার)। কপোতাক্ষ তার প্রবাহপথে চৌগাছা, ঝিকরগাছা, মণিরামপুর, কেশবপুর, কলারোয়া, তালা, পাইকগাছা, আশাশুনি ও কয়রা এলাকার জলাভূমির পানি গ্রহণ করে গাবুরার কাছে খোলপেটুয়া নদীর সঙ্গে মেশে ও তারপর আরপাঙ্গাশিয়া নামে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবাহিত হয়ে মোহনার কাছে মালঞ্চ নামে সাগরে গিয়ে পড়ে। তবে পাইকগাছায় এসে এর মূল প্রবাহ এখন হারিয়া নদী হয়ে শিবসা নদীপথে চলে যায়। কপোতাক্ষ নদের দৈর্ঘ্য তাহিরপুর থেকে ঝিকরগাছা ৪০ কিলোমিটার, ঝিকরগাছা থেকে পাটকেলঘাটা ৬০ কিলোমিটার, পাটকেলঘাটা থেকে গাবুরা ৮০ কিলোমিটার।
সুদূর অতীতে (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী) ভৈরব নদ টলেমি বর্ণিত গঙ্গা নদীর পাঁচটি শাখা নদীর একটি ছিল। এগুলো হলো— পশ্চিম থেকে পূর্বে ভাগিরথী, ভৈরব, কালীগঙ্গা, ভুবনেশ্বর ও গঙ্গা। গঙ্গা নদী ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলে গঙ্গা নামেই সন্দ্বীপের উত্তর দিয়ে সাগরে গিয়ে মিশত। দুই হাজার বছরে আগে গঙ্গা নদীর মূল প্রবাহ তার শাখাগুলোর কোনো একটি ধারায় গতি পরিবর্তন করেছে এবং শাখাগুলোও বিভিন্ন উপশাখার মাধ্যমে নদীর জাল বিস্তার করে গেছে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ মিলিতভাবে বঙ্গীয় সমতলের ওপর বছরে গড়ে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন টন পলি এনে ভূমির উচ্চতা বাড়িয়েছে ও সাগরে বদ্বীপের প্রসার বাড়িয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে ভৈরব নদ আখেরীগঞ্জের কাছে উত্পন্ন গঙ্গার শাখা নদী জলঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হতো। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে ভৈরব তার আদি প্রবাহ হারিয়ে ফেলে। ওই সময় থেকে ক্রমে মাথাভাঙ্গাই এ অঞ্চলের মূল নদী হয়ে বর্তমানে দর্শনা হয়ে ভারতে প্রবেশ করে চূর্ণী নামে ভাগিরথীতে গিয়ে মিশেছে। দর্শনার ভাটিতে এর শাখা হিসেবে ভৈরবের যে অস্তিত্ব ছিল, তা ১৮৬১ সালের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে নির্মাণের পর ক্রমে মিলিয়ে যেতে থাকে। ভারতে প্রবেশের পর মাঝদিয়ার কাছে মাথাভাঙ্গার একটি শাখা ইছামতী নামে বেরিয়ে সীমান্তের পথে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণে সাতক্ষীরা জেলার পশ্চিম সীমানা দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার বর্তমান জলাবদ্ধতাপূর্ণ এলাকাটি পূর্বে জোয়ার-ভাটা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে তত্কালীন ওয়াপদা উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের নামে নদীগুলোর তীর দিয়ে অনেক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে, যার ফলে দুই নদীর মধ্যবর্তী এলাকাগুলো জোয়ারের পানি থেকে মুক্ত হয়ে বৃষ্টির পানিতে ধৌত হয়ে ধান উৎপাদনের উপযোগী হয়। এর পর খুলনা, সাতক্ষীরা ও যশোরের এ এলাকাগুলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে সমৃদ্ধি লাভ করতে থাকে। ওই সময় কপোতাক্ষ নদ যশোর বেনাপোল সড়কের ঝিকরগাছা পর্যন্ত নাব্য ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সাল থেকে ভারত ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গা নদীর পানি সরিয়ে নিতে থাকলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রবাহিত গড়াই নদীর পানি কমে যায়, ফলে এ অঞ্চলে মিষ্টি পানির অভাবে লবণাক্ততা ও জোয়ারের প্রভাব উজানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এর পর সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্যাপক হারে খাল খনন কর্মসূচি চলায় এর আশপাশের সব বিল ও জলাভূমির পানি নিষ্কাশিত হয়ে শুকিয়ে যায়, ফলে শুকনা মৌসুমে কপোতাক্ষ নদের তলানি প্রবাহও কমে যায়। আশির দশক থেকে বাংলাদেশে নিচু ও উঁচু সব জমিতে শীতকালে বোরো ধানের আবাদ শুরু হয় এবং অগভীর নলকূপ বসিয়ে পানি তুলে সেচ দেয়া শুরু হয়। এর ফলে বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ নদীই শীতকালে তলানি প্রবাহ হারিয়ে মরে যায়। কপোতাক্ষ নদসহ তার আশপাশের কোদলা, বেতনা, চিত্রা, নবগঙ্গা, বেগবতী, মুক্তেশ্বরী, হরিহর, ভদ্রা, শ্রীনদী ইত্যাদি নদীও এ কারণে মরে যায়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর মরে যাওয়া এবং উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় ভাটি থেকে জোয়ারের প্রকোপ ক্রমে বেড়ে যায়। এর ফলে ভাটির নদীতে ভাঙন বেড়ে যায় এবং জোয়ারের সঙ্গে ওই ভাঙনের পলি উজানে প্রবেশ করে যেখানে নদীতে সরু ব্রিজ বা রেগুলেটর আছে, সেখানে গিয়ে জমা হতে থাকে। এভাবে এ পাঁচ নদী বিশেষ করে বেতনা, কপোতাক্ষ ও শ্রীনদীর তলদেশ উঁচু হতে থাকে। এর ফলে বর্ষার সময় পানি নিষ্কাশিত না হতে পেরে এ তিন নদীর অববাহিকায় মারাত্মক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে থাকে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নব্বইয়ের দশক থেকে শ্রমিক ও ড্রেজারের মাধ্যমে এ নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যাচ্ছে, কিন্তু নদীগুলোর নাব্যতা ও নিষ্কাশন ক্ষমতা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারছে না।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা এখন একটি স্থায়ী রূপ নিয়ে বসেছে। খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার বিশেষ করে কেশবপুর, মণিরামপুর, কলারোয়া, তালা, ও পাইকগাছা এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও চাষের মাঠ যেন অনন্তকালের জন্য পানিতে তলিয়ে গিয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রধান কারণ সমস্যা দূর করার জন্য নিয়োজিত পরামর্শকদের ভুল পরিকল্পনা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিচার-বিবেচনাহীন ড্রেজিং কর্মকাণ্ড। আশির দশক থেকে সৃষ্টি হওয়া এ সমস্যা দূর করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৯৩ সালে খুলনা-যশোর ড্রেনেজ রিহ্যাবিলিটেশন প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পটি ছিল প্রধানত বিল ডাকাতিয়াকে ঘিরে শ্রীনদী অববাহিকার নিষ্কাশন উন্নয়নের কাজে সীমাবদ্ধ। প্রকল্পটি ভুল পরামর্শের কারণে ব্যর্থ হয়। এ সমস্যা দূর করার জন্য স্থানীয় অধিবাসী ১৯৯৭ সালে বিল ভায়নার বেড়িবাঁধ কেটে দেয়, যার ফলে বিল এলাকায় জোয়ারের সঙ্গে পলি প্রবেশ করে জমি কয়েক মিটার উঁচু হয়ে যায়। এ স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০০২ সাল থেকে জোয়ারাধার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিম্নভূমিকে উঁচু ভূমিতে পরিণত করার নতুনভাবে প্রকল্প হাতে নেয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর অববাহিকার জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে কেবল নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতিই নয়, উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ এনে জোয়ারের চাপ কমাতে হবে। যশোর-খুলনার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত শ্রীনদীর ক্ষেত্রে আশপাশের নিচু জমি উঁচু করার জন্য বর্তমানে প্রচলিত জোয়ারাধার ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া দরকার। এ নদীর প্রবাহে সব বাধা ও স্লুইস গেট তুলে দিয়ে কেবল যেসব বিল এলাকাতে পলি পাতনের কাজ চলছে, সেখানে বাঁধ কেটে দিয়ে প্রবাহ প্রবেশপথ উন্মুক্ত করা দরকার। বেতনা নদীর আদি উত্পত্তি যশোরের কেশবপুর উপজেলায় এর প্রবাহপথ অবৈধভাবে দখল হয়ে একেবারেই বুজে গেছে। শীতকালে যশোরের নাভারণ থেকে দক্ষিণে নদীটির ক্ষীণ ধারা থাকে। এ নদীতে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ জোগান দিতে পারলে নদীটিকে ভাটির জোয়ার ও পলির চাপ থেকে মুক্ত করে বাঁচানো যাবে। তবে এ নদীর প্রবাহপথের সব অবৈধ দখল তুলে, সংকীর্ণ সেতু ও স্লুইস গেট সরিয়ে নদীকে তার প্রবাহের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
কপোতাক্ষ নদের নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পরামর্শকরা যে উপর্যুপরি ড্রেজিং করার পরিকল্পনা দিয়ে যাচ্ছে তা ভুল। এ ড্রেজিং ভাটি থেকে শুরু করতে হয়, না হলে উজানের দিকে কাজ এগোতে এগোতে ভাটির অংশ আবার পলি পড়ে বদ্ধ হয়ে যায়। কপোতাক্ষ নদের অববাহিকার জলাবদ্ধতা দূর করতে প্রয়োজন ছিল এলাকার আঁকাবাঁকা নিষ্কাশন পথগুলোকে লুপকাটের মাধ্যমে সোজা করে দেয়া। যখন একটি এলাকা ভাটির এলাকা থেকে নিচু হয়ে যায়, তখন নদীর আঁকাবাঁকা পথ ওই এলাকাকে যথাযথভাবে নিষ্কাশন করতে পারে না, তখন লুপকাটের মাধ্যমে পথকে সোজা করে দিতে হয়। কিন্তু পরামর্শকদের ভুল পরিকল্পনা সত্ত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড বারবার একই পরামর্শক নিয়োগ করছে এবং একইভাবে বিচার-বিবেচনাহীন ড্রেজিং করেছে; যার ফলে কপোতাক্ষ নদের রূপই বদলে গেছে। এখন কপোতাক্ষ নদের কেশবপুরের ত্রিমোহনী থেকে পাইকগাছার হরিদাখালী পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ ভরাট হয়ে গেছে ও পুরো এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে।
কপোতাক্ষ নদের উজানে ভৈরব নদীতে মিষ্টি পানির প্রবাহ এনে ভাটির উজানমুখী পলির চাপ থেকে মুক্ত করতে হবে। মাথাভাঙ্গা নদীতে ব্যারেজ নির্মাণ করে ও জিকে প্রকল্পের নিষ্কাশনপথ ঘুরিয়ে শিরিষ কাট দিয়ে মিষ্টি পানির প্রবাহ আনা সম্ভব। একই সঙ্গে এর প্রবাহপথের সব অবৈধ দখল, মাটির বাঁধ, সংকীর্ণ সেতু ও স্লুইস গেট তুলে সরিয়ে দিতে হবে। এর পর কপোতাক্ষ নদের যাত্রাপথে বাঁকড়া, মশ্বিমনগর, ত্রিমোহনী, সাগরদাঁড়ী, ধানদিয়া, খলিশাখালী ও মাগুরা-জালালপুরের আটটি বাঁক (লুপ) কাটা অত্যন্ত জরুরি। লুপ কাটার ফলে সৃষ্ট বাঁওড়গুলোতে জমি হারানোদের পুনর্বাসন করা সম্ভর। এর পরও কিছু নিম্নভূমি এলাকায় বিল ডাকাতিয়ার মতো পুকুর কেটে মিষ্টি পানির মাছ চাষ করে সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান করা যেতে পারে।
লেখক: প্রকৌশলী
চেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট






