দক্ষিণপশ্চিম বাংলাদেশে (উপকূলীয় জেলায় বিশেষত) লবণাক্ততা যে একটা বড় সমস্যা, সে কথা সবাই বলেন। এর কি ধরনের প্রভাব, বিশেষত কুপ্রভাব, কৃষিতে পড়ছে বা পড়তে পারে তা, নিয়েও অনেকে বলেন। সমস্যা হলো এসব সাধারণভাবে সঠিক হলেও এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা যা হয়েছে, তা অনেকটাই স্থানীয় ভিত্তিক, একটা মৌজা, কি একটা উপজেলার অবস্থা নিয়ে। সে পানিতে হোক বা জমিতে হোক, লবণাক্ততা কতটুকু বেড়েছে, কত জায়গায় তা দেখা যাচ্ছে, সে সম্পর্কে সাম্প্রতিক তথ্য কিন্তু খুব একটা নেই। আমরা গত কয়েক দশকে লবণাক্ততা কি রকম বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে কেমন বাড়তে পারে, তা নিয়ে প্রথমে আলোচনা করব। একই সঙ্গে আমরা কি কারণে লবণাক্ততা দেখা যাচ্ছে বা বাড়ছে তাও উল্লেখ করব। এর পর আমরা আলোচনা করব কৃষিতে লবণাক্ততা বাড়ার কি প্রভাব পড়ছে এবং পড়তে পারে। এর পরই আসবে এ প্রভাব মোকাবেলার জন্য চাষীরা কি করছেন, অন্যরা কিভাবে সহায়তা দিচ্ছেন বা দিচ্ছেন না সে প্রসঙ্গে। সবশেষে লবণাক্ত সমস্যা মোকাবেলার জন্য আর কি করা যেতে পারে, তা কিছুটা আলোচনা হবে। তবে সবকিছুর আগে লবণাক্ততা পরিমাপের পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলা দরকার।

লবণাক্ততা সাধারণত দুভাবে মাপার চেষ্টা করা হয়। তবে দুটোই একটা থেকে আরেকটায় সহজে পরিবর্তন করা যায়। আমরা যদিও এখন বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি দেব, ব্যবহারিক পর্যায়ে তার তাত্পর্য নিয়েই আমাদের মূল বিষয়ে যেতে হবে। যদি বলা হয় ২-৪ ডেসিসিমেন/মিটার লবণাক্ততা, এর অর্থ লবণাক্ততা অতি সামান্য। আমরা যদি ব্যবহারিক হিসাব ধরি, তবে লবণাক্ততাকে অতি সামান্য, মাঝারি ও উঁচু মাত্রাভাবে ভাগ করতে পারি। মাঝারি ও উঁচু মাত্রার লবণাক্ততা মানুষের ব্যবহার উপযোগী নয়। ১৯৭৩, ২০০০ ও ২০০৯ সালে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশে জমির লবণাক্ততা মাপ করে এ হিসাব অনুযায়ী ১৯৭৩ সালে মোটামুটি ১২০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততা ছিল মাঝারি থেকে উঁচু মাত্রায়। ২০০০ সালে তা বেড়ে হয় ৪২৪ হাজার হেক্টর এবং ২০০৯ সালে ৪৫৪ হাজার হেক্টর। এটা প্রতীয়মান যে, সময়ের সঙ্গে মাঝারি ও উঁচু মাত্রার লবণাক্ততা ক্রমে বেড়েছে।

এ লবণাক্ততার মাত্রা স্থানভেদে এক নয়। মূল লবণাক্ততা-দূষণে ভুগছে খুলনা ও বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী এবং বরগুনা। অন্যান্য জেলায় অন্তত ২০০৯ পর্যন্ত লবণাক্ততার প্রকোপ কম ছিল।

আমাদের হাতে ২০০৯-এর পর সার্বিক লবণাক্ততা পরিস্থিতি নিয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই। তবে ধরে নেয়া যেতে পারে যে, তার পরের আট বছরে নিঃসন্দেহে লবণাক্ততা আরো বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালে খুলনায় লবণাক্ততার আধিক্য দেখা যায়, যদিও ২০১২ সালে তা কিছুটা কমে গেছে বলে মনে হয়।

লবণাক্ততা বিভিন্ন কারণে কমতে বা বাড়তে পারে। বৃষ্টি যত বেশি হবে বা উত্তর দিক থেকে আসা নদীর প্রবাহ যত বেশি হবে, ততই জমি ও লবণাক্ততা কমবে আবার যদি জলোচ্ছ্বাস বা সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ে, তাহলে ও লবণাক্ততা বাড়বে। ফলে সাধারণভাবে শুকনো মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি-মে) লবণাক্ততা, বিশেষ করে নদীর পানির লবণাক্ততা বাড়ে। তবে এটা ও ঠিক যে আমরা আগে যা দেখেছি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব জায়গায় লবণাক্ততার পরিমাণ এক নয়। যেমন বরিশাল জেলার উত্তর ভাগে বর্তমান লবণাক্ততা তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে এটাও হিসেবে নিতে হবে যে, বিশেষ করে জমিতে তার উপরিভাগে লবণাক্ততা বেশি, জমির গভীরে (১৫ সেমির বেশি) লবণাক্ততা কম।

উঁচু মাত্রার লবণাক্ততা প্রায় সব ফসলের ফলনের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং সামান্য বা মাঝারি লবণাক্ততার কি ফসল ভালোভাবে ফলানো যায়, সেটা বুঝতে হবে এবং এক্ষেত্রে ঋতুভেদে তফাত আছে।

লবণাক্ততা বাড়লে কোনো কোনো জমি বিশেষ ফসল চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, আর যেসব জায়গায় চাষ হয়, সেখানে ফলন কমে। চাষীদের জিজ্ঞাসা করলে প্রায় সবাই ফলন কমার কথা বলেন। এছাড়া তারা ফসলের আকার ছোট হওয়ার কথা বলেন। সাধারণত সবজি ধরনের ফসল যা রবি মৌসুমে চাষ হয় এবং যে সময় লবণাক্ততা বেশি থাকে, সে সময়ই এ ক্ষতি হয়। মনে রাখতে হবে যে, বর্ষা মৌসুমে যখন লবণ জমি থেকে ধুয়ে যায়, তখন রোপা আমন চাষে তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে বোরো আবাদের ব্যাপারে সমস্যা আছে। এর ফলে মাঝারি বা তার বেশি লবণাক্ততার ক্ষেত্রেত বটেই, এমনকি খানিকটা লবণাক্ততার ক্ষেত্রেও চাষীরা বোরো চাষে নিরুত্সাহ থাকেন। আমরা যদি চাষীদের ফসলবিন্যাস দেখি, তাহলে দেখব যে, একেবারেই লবণাক্ততা নেই কেবল এ রকম জমিতেই বোরো আবাদ হয়। রোপা আমন আবাদ হয় সব ক্ষেত্রেই, কারণ সে সময় জমিতে লবণাক্ততা থাকে না।

এখানে একটা কথা হয়তো উঠবে যে, এরই মধ্যে বিজ্ঞানীরা লবণাক্ততাসহিষ্ণু কিছু ধান উদ্ভাবন করেছেন, যেমন বিআর-৪৭। বলা হয় জীবনচক্রের প্রথম দিকে এ ধান যথেষ্ট লবণাক্ততাসহিষ্ণু। সমস্যা হলো পুরো জীবনচক্রের হিসাব ধরলে কিন্তু তা ততটা সহিষ্ণু নয়। আরো বড় কথা হলো, বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ ফল কতটুকু চাষীদের কাছে পৌঁছেছে বা আদৌ পৌঁছেছে কিনা, তা মূলত অজানা।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ভবিষ্যতে কী হতে পারে, তা একটু বোঝা দরকার। আমরা আগেই বলেছি, মূলত দুটো কারণে লবণাক্ততার ওঠানামা হয় এবং উত্তর দিক থেকে নদীর স্বাদু পানির প্রবাহ কতটুকু কমছে বা বাড়ছে এবং দুই. বৃষ্টিপাতের অবস্থা কী? ভবিষ্যতের কথা বলতে গেলে আমাদের ৩ নম্বর আরেকটি বিষয়ে নজর দিতে হবে, তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও সে কারণে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির প্রভাব।

উত্তরের নদীর প্রবাহে স্বাদু পানির প্রবাহ ভবিষ্যতে বাড়ার সম্ভাবনা গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মোটামুটিভাবে নেই বললেই চলে। বৃষ্টিপাত ভবিষ্যতে বেশি কী কম হবে, বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, তা বর্তমান তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অনিশ্চিত।

জলবায়ু পরিবর্তনের দুটি তাত্ক্ষণিক ব্যাপার আছে। এক. বৃষ্টিপাতের কথা যা বলা হয়েছে, তা অনিশ্চিত। দুই. সাধারণভাবে সব ঋতুতেই তাপমাত্রা বাড়বে। এর অর্থ বাষ্পীভবন বাড়বে, জমির শুকনোভাব বাড়বে, ফলে লবণাক্ততা শেষমেশ বাড়বে। ভাগ্যক্রমে যদি একই সময় বৃষ্টি বাড়ে, তাহলে হয়তো লবণাক্ততা কমবে; কিন্তু তা নিশ্চিত নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরের পানির উচ্চতা বাড়া এবং ঘন ঘন এবং ক্রমে শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস ঘটার সম্ভাবনা মোটামুটি অবধারিত। সাগরের পানি যত ফুলবে, ততই উপকূলীয় এলাকা সাধারণভাবে স্থায়ীভাবে ডুবে যাবে, যদি না সে এলাকা বেড়িবাঁধ দিয়ে সুরক্ষিত না থাকে। সাধারণভাবে যে এলাকা ডুবে যাবে, তা আর অন্তত ফসল কৃষির জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে সাগরের উচ্চতা যত বাড়বে, উপকূলীয় নদী, খাঁড়ি ও তার আশপাশের জমির লবণাক্ততা তত বাড়বে। কতটুকু বাড়বে তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা আছে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কোন বৈশ্বিক মডেল ব্যবহার করে হিসাব কষা হয়েছে, তার ওপর এ ফলাফল নির্ভর করে।

এক হিসাবে যেমন বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় প্লাবন ভূমির স্বল্প লবণাক্ত জমি বর্তমানের ৪৩-৫৯ শতাংশে বাড়বে, কিন্তু তুলনামূলক বেশি লবণাক্ত জমির বর্তমানের ২৯-৩৮ শতাংশে বাড়বে। অন্য এক হিসাবে বলা হয়েছে, লবণাক্ততার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার চাইতে বছর/ঋতুভেদে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পাবে। তবে সাধারণভাবে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়বে। এর ফলে বিশেষ করে আগে যা উল্লেখ করা হয়েছে, রবি ফসল ও বোরো ধানের চাষের সম্ভাবনা থাকবে না।

উপরোক্ত অবস্থায় অবশ্যই লবণাক্ততা বিশেষত উঁচু মাত্রায় লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের জাতের প্রয়োজন হবে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হবে কিনা বলা যাবে না। আরো বড় কথা হলো, চাষীরা কী চান তা বুঝতে হবে। এরই মধ্যে যেসব লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন, তা কতটুকু চাষীরা গ্রহণ করেছেন বা করেননি এবং কেন, তা বুঝতে হবে। এ ব্যাপারটি মনে হয় এখনো বিশেষ নজরে আনা হয়নি।

আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, যা হলো কেবল ফসল কৃষির কথা বললে চলবে না, মাছ ও প্রাণী কৃষি নিয়েও ভাবতে হবে। এদিকে আমরা তেমন নজর দেই না। মাছের ক্ষেত্রে সামাজিক অসাম্যের ব্যাপার ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে আগেই হুঁশিয়ার থাকতে হবে।

 

লেখক: সাবেক গবেষণা পরিচালক, বিআইডিএস