খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যে সময়টায় মানুষ অবাক বিস্ময়ে টেলিভিশন দেখত। প্রযুক্তির কল্যাণে ছোট্ট একটা ইলেকট্রনিক বাক্সের মধ্যেই ঢুকে পড়ছে মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা, প্রকৃতি অর্থাৎ পুরো বিশ্বই! এসব আবার নড়াচড়া করছে, চলছে, কথাও বলছে। তাই কেউ কেউ তখন দূরদর্শন বাক্সকে মনে করত ‘জাদুর বাক্স’। প্রযুক্তির মাধ্যমে টেলিভিশন এক মুহূর্তেই পুরো বিশ্বকে এনে হাজির করে। সকালে তাই ঘুম থেকে উঠে কেউ টেলিভিশন খুলে বসে দেশ-বিদেশের খবর কিংবা আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান দেখার জন্য। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেও পুরো বিশ্বের খবর নিতে অনেকে টেলিভিশন খোলে। তবে সময় বদলেছে। বেড়েছে প্রতিযোগী। বর্তমান শতাব্দীর শুরুর দিকে জনপ্রিয়তা পেয়েছে সেলফোন ও কম্পিউটার। ইন্টারনেটের ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ায় তরুণ-তরুণীরা এখন আধুনিক ডিভাইসকেই বেছে নিচ্ছে। ফলে বয়সভেদে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে টেলিভিশন ব্যবহারের তারতম্য। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে নতুন নতুন ফিচার নিয়ে হাজির হচ্ছে টেলিভিশন কোম্পানিগুলোও। প্রযুক্তির প্রায় সবকিছু একসঙ্গে পেয়ে সহজেই তা গ্রহণ করছে গ্রাহক।

বড় কোনো জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান, ক্রিকেট বা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন হলে বিশ্ববাসীর বড় অবলম্বন টেলিভিশন। আমাদের দেশেও এর ব্যত্যয় ঘটে না। এবারো ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে টেলিভিশনের পর্দায় ভিড় করছে সব শ্রেণী-পেশার দর্শক। আর এখন নাগরিক জীবন থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবনেও টেলিভিশন নিত্যদিনের উপকরণে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই মিলবে এ দূরদর্শন। ধনী, মধ্যবিত্ত, গরিব কিংবা বস্তিবাসীর ঘরেও এখন খুব দরকারি পণ্য একটি টেলিভিশন। ঘরের শোভাবর্ধন কিংবা প্রয়োজনীয় আসবাবের মতো এটি ড্রইংরুম বা বসার ঘরে জায়গা করে নিয়েছে। এমনকি যাদের একটি মাত্র ঘর, তারাও কোনো এক কোণে ঠিকই টেলিভিশন রেখেছে। নিয়ম করে দিনের কোনো না কোনো অংশে তারা টেলিভিশন দেখে বিনোদনের জন্য। যদিও বিশেজ্ঞরা বলছেন, সেলফোন যত বেশি সহজলভ্য হবে টেলিভিশনের আবেদন তত কমবে। আমাদের দেশে অবশ্য তেমন পরিস্থিতি এত দ্রুত হবে না।

সম্প্রতি অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ শফিকুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন সপ্তাহে টেলিভিশনে ভালো কোনো অনুষ্ঠান দেখতে পাশের গ্রামে চলে যেতাম। কারণ আমাদের গ্রামে কোনো বাড়িতেই তখন টেলিভিশন ছিল না। বাংলা ছায়াছাবি বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান সাদা-কালো টিভিতে দেখেও প্রচণ্ড মজা পেতাম। এর জন্য মা-বাবার হাতে কত যে মার খেয়েছি। আর এখন তো ঘরে ঘরে টিভি। এক বাড়ির মধ্যেই দেখা যাচ্ছে তিনটি শরিক থাকলে প্রত্যেকের ঘরে আলাদা টেলিভিশন। এর বাইরেও টিভি অনুষ্ঠান কিংবা খবর দেখতে চাইলে সেলফোনেও দেখা সম্ভব হচ্ছে।

সেলফোনের যুগে টেলিভিশনের আবেদন কমছে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক ড. এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, মূলত সেলফোন নয়, ওটিটি কনটেন্টগুলো টেলিভিশনের আবেদন কমিয়ে ফেলছে। এর প্রধান কারণ ব্যক্তি নিজের সুবিধামতো সার্ভিস নিতে পারছে, যা টেলিভিশনে সম্ভব নয়। দেখা যায়, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান রাত ৮টায়, এক্ষেত্রে ঠিক ওই সময়েই টিভির সামনে বসতে হবে। কিন্তু সেলফোন সে সেবাটা যেকোনো জায়গায় গ্রহণের সুযোগ করে দিচ্ছে। এছাড়া টিভির আবেদন কমার আরেকটা কারণ হলো অতিমাত্রায় বিজ্ঞাপন। বিরক্তির কারণে মানুষ এখন কম টিভি অনুষ্ঠান দেখে।

তথ্য অবশ্য বলছে, টিভি দেখার প্রবণতা কমলেও দেশে টেলিভিশনের চাহিদা তো কমেইনি, বরং বেড়েছে। বিদেশের বাজারেও বাংলাদেশে তৈরি এ পণ্যের রফতানি বাড়ছে। দেশের বাইরে নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করার পাশাপাশি টেলিভিশনকে স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহের যুগে আরো উপযোগী করতেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জোর দিচ্ছে। এরই মধ্যে ওয়েব কনটেন্ট টেলিভিশনে দেখার ব্যবস্থা, আকর্ষণীয় গেমসহ নানা প্রযুক্তিগত সুবিধা সংযোজন করেছে কোম্পানিগুলো। বাজারে যেসব ব্র্যান্ডের টেলিভিশন রয়েছে তাদের সবারই কম-বেশি ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি অফার রয়েছে ক্রেতার জন্য। যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা পুরো নষ্ট হয়ে গেলেও একটা সময় পর্যন্ত ক্রেতা বিনামূল্যে কিংবা নামমাত্র মূল্যে টেলিভিশন পরিবর্তনের সুযোগ পায়। ক্রেতা আকর্ষণে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর এ অফারও বেশ কাজে লাগে।

সেলফোন ছোট বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক আর টিভি বড় পরিসরের উল্লেখ করে বাংলাদেশী টেলিভিশন ব্র্যান্ড ভিশনের উৎপাদক ও পরিবেশক আরএফএল ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের ব্র্যান্ড ম্যানেজার (মার্কেটিং) শেখ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্বায়নের এ যুগে সেলফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো প্রতিনিয়তই আধুনিক হচ্ছে। সেখানে টেলিভিশন আসলেই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। সেলফোনসহ ছোট ডিভাইসগুলোতে বিনোদনের ক্ষেত্রটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কিন্তু একটু বড় পরিসরে বিনোদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী গণমাধ্যম টেলিভিশন। পরিবারের সবাই বা অনেক মানুষ একসঙ্গে কোনো অনুষ্ঠান, সিনেমা বা খেলা দেখার জন্য টেলিভিশনের বিকল্প নেই। বিশেষ করে যেকোনো খেলা বা বিশ্বকাপের মতো আসর বেশির ভাগ মানুষ পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে উপভোগ করতে চায়। এসব বিবেচনায় টেলিভিশনের চাহিদা কখনো কমতে পারে না। বর্তমানে টেলিভিশন বিলাসপণ্য নয়, এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। একটি বাসার সৌন্দর্য বাড়াতেও সমাদর পাচ্ছে টেলিভিশন। এছাড়া সেলফোন অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ায় গোপনীয়তা সম্পর্কিত বিষয় থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে টিভি একটি সর্বজনীন বিষয়।

সেলফোনের যুগে ভোক্তার চাহিদা পূরণে টেলিভিশনে কী নতুনত্ব এসেছে জানতে চাইলে ইলেকেট্রা মার্ট গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা সবগু মডেলেই নতুন নতুন ফিচার নিয়ে আসছি, স্মার্ট টিভি, অ্যান্ড্রয়েড টিভি ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া সেলফোন-কম্পিউটারের যুগে টেলিভিশন কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশে টিভি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অ্যান্ড্রয়েড ইলেভেন ভার্সন সংযোজন করেছে। এছাড়া ভয়েস কন্ট্রোল প্রযুক্তি, গুগল সার্টিফায়েড ভয়েস সিস্টেম ও রেডিয়েশনের কারণে যাতে মানুষের চোখের ক্ষতি না হয় সেদিক বিবেচনায় ফিচার আপডেট করেছে। এখন আমরা জিরো এক্স রেডিয়েশন প্রযুক্তিও ব্যবহার করছি। তাই বিশ্বাস করি, সেলফোন যতই গ্রাহক জনপ্রিয়তা পাক না কেন, টিভির চাহিদা রয়েই যাবে।

বর্তমান সময়ে টিভির চাহিদার বিষয়ে র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর একরাম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সেলফোন-কম্পিউটার এবং এ-সংক্রান্ত ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের ব্যবহার বাড়লেও টেলিভিশনের আবেদন এখনো আগের মতোই রয়েছে। বিদেশী বিভিন্ন ব্র্যান্ডসহ আমাদের দেশীয় ব্র্যান্ডের টিভিতে সমসাময়িক টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট হওয়ার কারণে ক্রেতার কাছে তা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে টিভির ব্যবহারযোগ্যতা শুধু ঘরের এন্টারটেইনমেন্ট নয়, বরং করপোরেট কোম্পানিগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট হিসেবে দিন দিন চাহিদা বাড়ছে। আমাদের ফোর-কে ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল ডিসপ্লে রয়েছে, যা টাচস্ক্রিনসহ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমসংবলিত। তাই আলাদাভাবে কোনো কম্পিউটার ব্যবহার করার প্রয়োজন হচ্ছে না। করপোরেট অফিসে বা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ক্লাসরুমে প্রজেক্টরের পরিবর্তে এ ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল ডিসপ্লে ও এলইডি টিভির ব্যবহার হচ্ছে। এ জায়গাগুলো কখনো সেলফোন দখল করতে পারবে না। সেলফোন মানুষকে তাদের সামাজিক সংযুক্তি থেকে বিছিন্ন করে ফেলছে। কিন্তু টিভি এর বিপরীত, এটি মানুষকে যুক্ত করে।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের (পিএলসি) সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অ্যান্ড সিবিও (টেলিভিশন) প্রকৌশলী মোস্তফা নাহিদ হোসেন বলেন, টেলিভিশন এমন একটি দূরদর্শন মাধ্যম, যা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ এটি পরিবারের সবাইকে সংযুক্ত করে। সবাইকে একসঙ্গে যেকোনো টিভি প্রোগ্রাম বা ভালো কোনো ভিডিও কনটেন্ট উপভোগের সুযোগ করে দেয়। সেলফোনে এখন খেলা দেখা সম্ভব হলেও পরিবার বা বন্ধুবান্ধব মিলে দেখার মতো আনন্দ পাওয়া যায় না। টেলিভিশন এখন একটা আবেগ ও অভ্যাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই টেলিভিশনের যে চাহিদা বা গ্রাহকপ্রিয়তা রয়েছে, তা সবসময়ই থাকবে। তবে এর জন্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির নতুন নতুন ভার্সন সংযুক্ত করা জরুরি। নতুবা একসময় ঠিকই সেলফোন-কম্পিউটার বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের সঙ্গে টিকতে না পেরে টিভি তার গ্রহকপ্রিয়তায় পিছিয়ে পড়বে।