দেশীয় টেলিভিশন কোম্পানিগুলোর মার্কেট শেয়ার সম্পর্কে ধারণা চাচ্ছি।

বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারের প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ শেয়ার হচ্ছে দেশীয় ব্র্যান্ডের। এর মধ্যে টেলিভিশন প্রায় ৪৫ শতাংশের অংশীদার। দেশীয় কোম্পানির তৈরি ব্র্যান্ডের বাজার শেয়ার ৪০ শতাংশ এবং সংযোজনকারী দেশী ব্র্যান্ডের শেয়ার ৬০ শতাংশ। দেশের বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক ক্রেতার ক্ষেত্রে বিদেশী ব্র্যান্ডের ঝোঁক থাকলেও বিস্তৃত শহরাঞ্চল ও গ্রামের ক্রেতাদের কাছে দেশী ব্র্যান্ড বেশি জনপ্রিয়। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশী ও বিদেশী টিভির বাজার সম্মিলিতভাবে ২০২৫ সাল নাগাদ ৬৫০ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৯০০ মিলিয়ন ইউএস ডলারে পৌঁছবে।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে টেলিভিশনের চাহিদা কেমন বেড়েছে? গত বিশ্বকাপ মৌসুমের সঙ্গে তুলনা করলে কেমন পরিস্থিতি দেখছেন?

বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকসের বাজারের প্রায় ৩৫ শতাংশ টেলিভিশনের দখলে, যা অংকের হিসেবে বর্তমানে ৩৮৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। একই সঙ্গে বাঙালি উৎসবপ্রবণ জাতি। তাই টেলিভিশনের এ বাজার ক্রিকেট-ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাড়ে। আগের সব বিশ্বকাপে আমরা দেখেছি টেলিভিশন ও হোম এন্টারটেইনমেন্ট পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।

২০১৮-এর বিশ্বকাপে আমরা বাংলাদেশে সর্বপ্রথম টিভির এক্সচেঞ্জ অফার দিয়েছিলাম এবং আমরা দেখেছি পুরনো সিআরটি টিভি এক্সচেঞ্জ করে ক্রেতা সনি ও র্যাংগসের নতুন সব এলইডি টিভির মডেল কিনেছে।

এখনকার টেলিভিশনে নতুন নতুন টেকনোলজি এসেছে। সহজলভ্য ইন্টারনেট থাকায়, উন্নয়নশীল এ দেশের জনগণ এখন নতুন টেকনোলজির ব্যবহারকে সহজেই আয়ত্ত করে নেয়। ফলে নতুন মডেলের টিভির বাজার চাহিদা বেড়েছে। আমাদের সনির গুগল টিভি, ওএলইডি, এলজির ওএলইডি, ন্যানোসেল ও ইউইচডি টিভির; র্যাংগসের ফ্রেমলেস ভয়েস কন্ট্রোল অ্যান্ড্রয়েড স্মার্ট টিভির ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে।

মোবাইল, কম্পিউটারসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের যুগে টেলিভিশনের আবেদন কতটুকু?

আসলে মোবাইল-কম্পিউটার এবং এ-সংক্রান্ত ইলেকট্রনিস ডিভাইসের ব্যবহার বাড়লেও টেলিভিশনের আবেদন এখনো আগের মতোই। বিদেশী বিভিন্ন ব্র্যান্ডসহ আমাদের দেশীয় ব্র্যান্ডের টিভিতে সমসাময়িক টেকনোলজিকাল ডেভেলপমেন্ট হওয়ার কারণে বাজারে ক্রেতার কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে টিভির ব্যবহারযোগ্যতা শুধু ঘরের এন্টারটেইনমেন্ট নয়, বরং করপোরেট কোম্পানিগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট হিসেবে দিন দিন বাড়ছে। আমাদের ফোর কে ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল ডিসপ্লে রয়েছে, যা টাচস্ক্রিনসহ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমসংবলিত। তাই আলাদাভাবে কোনো কম্পিউটার  ব্যবহার করার প্রয়োজন হচ্ছে না। করপোরেট অফিসে বা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ক্লাসরুমে প্রজেক্টরের পরিবর্তে এ ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং এলইডি টিভির ব্যবহার হচ্ছে। আমরা খুবই আনন্দিত যে দেশের অন্যতম ডিজিটাল কমিউনিকেশন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, বাংলালিংকের ওটিটি প্লাটফর্ম টফির সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে। ফলে র্যাংগস টিভির গ্রাহক টিভিতে প্রি-ইনস্টলড টফি অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো লাইভ বা সরাসরি উপভোগ করতে পারবে খুবই সহজে।

বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে দেশীয় কোম্পানির প্রতিযোগিতার চিত্রটি বর্তমানে কেমন? প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?

বর্তমানে সরকারের ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ প্রচেষ্টা ও দেশীয় শিল্প বিকাশে প্রদত্ত বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা থাকায় আমদানিনির্ভর বিদেশী ব্র্যান্ডের জন্য বাজার অনেকটা প্রতিযোগিতামূলক। একই সঙ্গে যেসব দেশী ব্র্যান্ড উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে, তারাই মূলত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে। বিদেশী ব্র্যান্ডের মধ্যে সনি ১৯৮৭ সাল থেকেই বাংলাদেশে টিভি সংযোজন করছে। পরবর্তী সময়ে স্যামস্যাং, এলজি, প্যানাসনিক ইত্যাদি বিদেশী ব্র্যান্ডও দেশে সংযোজন করা হচ্ছে। দেশীয় ব্র্যান্ডের মধ্যে হাতেগোনা দুই-তিনটি ব্র্যান্ডই শুধু টিভি উৎপাদন করছে। বাকিরা সংযোজনকারী হিসেবে কাজ করছে। এখন বেসিক, স্মার্ট, অ্যান্ড্রয়েড ইত্যাদি ধরনের টিভি উৎপাদন হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক স্থাপন করা হচ্ছে, তাতে বিদেশী ব্র্যান্ডের উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ হলে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়া যাবে।

টেলিভিশন শিল্পে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ কতটা জরুরি? এ জায়গায় দেশীয় কোম্পানিগুলো কতটুকু এগিয়েছে?

এখন আমদানীকৃত বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর মতো দেশীয় ব্র্যান্ডের এলইডি টেলিভিশনেও ফোরকে, স্মার্ট, অ্যান্ড্রয়েড, গুগল টিভি, ভয়েস কন্ট্রোল ইত্যাদি টেকনোলজিসমৃদ্ধ টিভি উৎপাদন এবং সংযোজিত হয়। তাই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো ধীরে ধীরে বাজারের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নিচ্ছে। তাছাড়াও খুব প্রতিযোগিতামূলক দামে এসব পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।

তবে আমরা এখনো সব যন্ত্রাংশ দেশে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারিনি। তাই সরকারকে টেলিভিশন শিল্পবান্ধব আমদানি নীতি অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে খুচরা যন্ত্রাংশের জন্য শুল্কমুক্ত আমদানি নীতি, দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ প্রণোদনাস্বরূপ। এছাড়া সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কের হার কমানো যেতে পারে। দেশের সব নির্মিতব্য হাইটেক সিটিতে টিভির উৎপাদনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক  বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক ছাড় নিশ্চিত করা হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। এছাড়াও উৎপাদনের পরিমাণ ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে কর ছাড়ের সুযোগ দিলে এ প্রবৃদ্ধি আরো বাড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি।

টেলিভিশন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইলেকট্রনিকস দ্রুত বর্ধনশীল একটি খাত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে ইলেকট্রনিকস এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরো তিন হাজার ২০০টিরও বেশি ব্যবসা চালু রয়েছে। প্রতি বছর এ খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১৫-১৮ শতাংশ হারে। একই সঙ্গে যা প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এত বড় খাত হওয়ার পরও দেশের কোনো প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। চিপ ও খুচরা পার্টসের জন্য আমাদের এখনো চীনসহ বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ কারণে কভিড-১৯, লকডাউন ও বর্তমানের ইউএসডি ঘাটতির মতো সমস্যার ক্ষেত্রে আমদানিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বাজারে পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি সৃষ্টি করেছে। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না বলে দামের তারতম্য সৃষ্টি হয়। তাই দেশীয় শিল্প বিকাশে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা নিশ্চিত করলেই হবে না, দক্ষ জনবল তৈরি ও অন্য দেশের প্রতি নির্ভরতা কমানো যায়, এমন শিল্প বিকাশে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দিতে হবে।