বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন শন ম্যাকব্রাইড। একাধারে তিনি সামরিক বাহিনীর সদস্য, ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ। জীবনের একপর্যায়ে তিনি শান্তির জন্য কাজ করেছেন। সে কারণে পেয়েছেন নোবেল পুরস্কারসহ নানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

শন ম্যাকব্রাইডের জন্ম ১৯০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি। আইরিশ হলেও তার জন্ম ফ্রান্সের প্যারিসে। তার পিতা ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। ফ্রান্সে জন্ম ও বড় হওয়ার কারণে তার প্রথম ভাষা ছিল ফরাসি আর বাকি জীবন তার ইংরেজি উচ্চারণে ফরাসির টান লক্ষ করা গিয়েছে। ১৯১৬ সালে ইংরেজ সেনাবাহিনী তার বাবাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যায়। এরপর তাকে মাউন্ট সেন্ট বেনেডিক্টস স্কুলে পাঠানো হয়।

১৯১৮ সালে আইরিশ জেনারেল ইলেকশনের সময় ম্যাকব্রাইড রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পরের বছর তিনি নিজের বয়স ভাঁড়িয়ে আইরিশ ভলান্টিয়ার দলে যোগদান করেন। এ দলটি আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির হয়ে আইরিশ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল। তিনি ১৯২১ সালের অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন।

এরপর ম্যাকব্রাইড আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনে পড়াশোনা করার সময় তিনি আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯২৫ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯২৭ সালে তিনি আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের পরিচালক নিযুক্ত হন। এর আগে তিনি প্যারিস ও লন্ডনে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ১৯২০ সালের দিকের কিছু সাংকেতিক বার্তা থেকে বোঝা যায় শন ম্যাকব্রাইড এ সময় গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি গ্রেট ব্রিটেন থেকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিকে নানা ধরনের তথ্য প্রদান করতেন।

ডাবলিনে আসার পর পরই তিনি কেভিন ও’হিগিনসের হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হন। ব্রায়ান কুপারের সাক্ষ্যের দ্বারা তিনি অভিযোগমুক্ত হন কিন্তু এ সময়ই আবার তার বিরুদ্ধে নাশকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয় এবং মাউন্টজয় কারাগারে অন্তরীণ করা হয়। ১৯৩৬ সালে আইআরএর চিফ অব স্টাফ মস টমিকে কারাগারে নেয়া হয়। তিনি মূলত ম্যাকব্রাইডের স্থানে অন্তরীণ হন। টম ব্যারিকে চিফ অব স্টাফ করা হয়। পরের বছর ম্যাকব্রাইডকে বারে ডাকা হয় এবং তিনি আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি চার্লি কার্নিসের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরোধিতা করেন। ১৯৪৬ সালে শন ম্যাককগির মৃত্যুর তদন্তের সময় তিনি জানিয়েছিলেন পোর্তলুইসের কারাগারে কোনো মানুষ থাকতে পারে না।

এ বছরই ম্যাকব্রাইডের জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি রিপাবলিকান/সোশ্যালিস্ট ঘরানার ক্ল্যান না পোবল্যাকটা শুরু করেন। এর অর্থ দাঁড়ায় প্রজাতন্ত্রের সন্তান। তিনি চেয়েছিলেন এ দলটি একদিন আয়ারল্যান্ডের মূল দল ফিয়াননা ফেইলের জায়গা নিতে পারবে। ডাবলিন কান্ট্রি কনস্টিটুয়েন্সিতে তিনি ১৯৪৭ সালে একটি বাই-ইলেকশনে জয়লাভ করেন। তবে তার উত্থান খুব দ্রুত হয়নি। বেশ সময় লেগেছিল। বলা চলে ধীরে ধীরে তিনি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ওপরে উঠেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের রাজনীতির পর তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আসেন।

১৯২৯ সালে লিগ অ্যাগেইনস্ট ইম্পেরিয়ালিজমের সেক্রেটারি হন শন ম্যাকব্রাইড। আন্তর্জাতিক জুরি কমিশনে তিনি ছিলেন জেনারেল। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। জেনেভায় ইন্টারন্যাশনাল পিস ব্যুরোর চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ১৯৬৮-৭৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৫ সালে এর প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন অর্গানাইজেশন ফর ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কোঅপারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। অর্গানাইজেশন অব আফ্রিকান ইউনিটির হয়ে তিনি কাজ করেছেন। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে তার কাজ সুবিদিত। শান্তি ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৭৪ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে তিনি লেনিন শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮০ সালে লাভ করেন ইউনেস্কো সিলভার মেডেল ফর সার্ভিস।

তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাকব্রাইডের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে কাজ করার সময়কাল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান হিসেবে ম্যাকব্রাইড ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ সফর করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এ কমিটির কাজ ছিল বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার তদন্ত করা। বাংলাদেশে এসে ম্যাকব্রাইড তত্কালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন। ম্যাকব্রাইডকে বলা হয়েছিল, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে শন ম্যাকব্রাইড মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতি অবজ্ঞার ফলে বর্তমান দুনিয়ায় গুরুতর অপরাধের জন্য প্রাপ্য শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার ঝোঁক দেখা দিয়েছে।’ তিনি মনে করেন এ ধরনের শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া ক্ষতিকর। এ হত্যাকাণ্ডগুলোর উপযুক্ত তদন্ত না হওয়ায় তিনি সরকারকে ভর্ত্সনা করেন। পরবর্তী সময়ে ম্যাকব্রাইড বলেছিলেন তাকে তদন্তের আশ্বাস দেয়া হয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। আশ্বাস বাস্তবায়নের অনীহার কারণ অনুসন্ধান করবেন বলে জানিয়েছিলেন ম্যাকব্রাইড।

সর্বইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের আয়োজনে বঙ্গবন্ধুর ৬২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৮২ সালে শন ম্যাকব্রাইড লন্ডনের ব্র্যাডি সেন্টারে প্রথম মেমোরিয়াল লেকচার দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সম্ভবত মানব ইতিহাসের এমন এক পর্যায়ে রয়েছি যখন সারা বিশ্বে আদর্শ ও নীতিবোধ প্রায় নেই বললেই চলে এবং হূদয়হীনতা ও পাশবিক শক্তি আধিপত্য স্থাপন করেছে। আমাদের ইতিহাসে তার অনেক প্রমাণ রয়েছে। শেখ মুজিবের হূদয়বিদারক হত্যা তার মধ্যে অন্যতম। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বে আদর্শবাদ, নীতিবোধ ও মানবতাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা বাঞ্ছনীয় ও অবশ্য কর্তব্য। অতএব আপনাদের মহান নেতা শেখ মুজিবের তর্পণের জন্য সমবেত হয়ে আপনারা একটি জরুরি কর্তব্য পালন করছেন।’

এ সময় ম্যাকব্রাইড শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতা শুধু পতাকা পরিবর্তন অথবা দেশের নতুন নাম বোঝায় না। তার দৃষ্টিতে স্বাধীনতার অর্থ হলো সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও আদর্শবাদ।’ যে চারটি আদর্শ (গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র) বঙ্গবন্ধুর নীতি ও কার্যাবলিকে প্রভাবিত করেছিল তার উল্লেখ করে মি. ম্যাকব্রাইড বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতা অর্থহীন হবে যদি জনগণ প্রাণধারণের স্বাধীনতা, অভুক্ত না থাকার ও রুজিরোজগারের স্বাধীনতা এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পদের অংশীদার হওয়ার স্বাধীনতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। কাজেই তিনি ছিলেন মূলত একজন সমাজতান্ত্রিক এবং একই সঙ্গে উৎসাহী জাতীয়তাবাদী। কারণ তিনি বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার এবং নিরাপত্তা বিধানের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। তারই সৃষ্ট রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হবে, এ সম্বন্ধে তিনি দৃঢপ্রতিজ্ঞ ছিলেন। এটা জানা কথা, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অথবা স্বৈরাচারী প্রশাসন বাংলাদেশের নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রাখবে। সুতরাং তিনি তার চার মূলনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন।’

শন ম্যাকব্রাইড মারা যান ডাবলিনে, ১৯৮৮ সালের ১৫ জানুয়ারি।

 

আসরার আবেদিন