২০ মার্চ ১৯৮২ সালে কমিশন অব এনকোয়ারি একটি প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরি করে। এ রিপোর্ট নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা মুখবন্ধসহ পুস্তিকা আকারে, লেখক আবদুল মতিনের লন্ডনের প্রকাশনী সংস্থা ‘রেডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস’ থেকে প্রকাশিত হয়। এ পুস্তিকা থেকে মুখবন্ধ, তদন্ত প্রতিবেদন ও পরিশিষ্ট এখানে অনূদিত হলো। অনুবাদ করেছেন ইসফানদিয়র আরিওন, মাহমুদুর রহমান ও শর্মিলা সিনড্রেলা

ভূমিকা

আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আমাদের পরিবারের সদস্যরা এবং আমার পিতার চারজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচরকে যথাক্রমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর হত্যা করা হয়। শেখ মুজিব গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্থপতি এবং তিনি ও তার সহচররা সবাই ছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা লড়াই করেছিলেন। তাদের এ লক্ষ্যকে ভণ্ডুল করে সাম্প্রদায়িক একটা দেশ প্রতিষ্ঠা করা ছিল হত্যাকারী ও তাদের ষড়যন্ত্রকারী দোসরদের উদ্দেশ্য।

                তাদের মৃত্যু একটি অভ্যুত্থানের অংশ ছিল, যা একটি সদ্য-স্বাধীন দেশে গণতন্ত্রের অবসানের ইঙ্গিত দেয় ও সামরিক শাসনের সূচনা করে। স্পষ্টত দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল এ হত্যাযজ্ঞ। আর এভাবে ঢাকার শাসকগোষ্ঠীর একের পর এক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও হত্যাকারীদের কাউকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হওয়ার পরের বছরগুলোতে তারা ও তাদের অনুসারী ষড়যন্ত্রকারী দোসররা সরকারের কাছ থেকে নিরাপত্তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসে নিয়োগ দেয়া হয়। আর অন্যদের দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন করা হয়। এভাবে অপরাধীরা পুরস্কৃত হয়েছিল।

                বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সন্তোষজনক কোনো উত্তর না পেয়ে ব্রিটেনে অবস্থানরত নিহতদের পরিবার ও তাদের গণতন্ত্রমনা সমর্থকরা বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারকে নিধন এবং জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিনা বিচারে আটক করে হত্যার করার বিষয়টি আর বিচারবহির্ভূত না রেখে তা তদন্ত করার লক্ষ্যে বিশিষ্ট আইনজীবীদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই আইনজীবীদের নাম ও তাদের যশ-খ্যাতির বলেই তদন্তটি আইনি সুবিচারের সর্বোচ্চ মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। সন্ত্রাস ও আইনের শাসনের অপব্যবহার সাত বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে ব্যাহত করছে। আমরা আশা করছি, তাদের তদন্তে এসব উঠে আসবে যা বৈশ্বিক বিবেককে নাড়িয়ে দেবে।

                যেসব সরকার ও জনগণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে লালন করে তাদের দায়িত্ব হলো বিশ্বের সর্বত্র জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সমর্থন করা এবং যখন তা লঙ্ঘিত হয় তখন সম্ভাব্য সর্বপ্রকারে তার প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করা। বিদেশের সরকার ও তাদের জনগণের বদান্যতার ওপরই মূলত ঢাকার এ সামরিক জান্তা নির্ভরশীল। বাংলাদেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হিসেবে হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে আন্তর্জাতিক জনমত তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সাহায্য করবে।

 

শেখ হাসিনা

সভাপতি

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

লন্ডন

৩ নভেম্বর ১৯৮২

 

১.             স্যার টমাস উইলিয়ামস, কিউসি, এমপি; মি. সন ম্যাকব্রাইড এসসি; মি. জেফ্রি টমাস কিউসি, এমপি এবং মি. অব্রে রোজকে সদস্য করে ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি তৈরি করা হয়। এ কমিটির উদ্দেশ্য ছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ড ও এরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের পর আইন ও বিচারিক ব্যবস্থা অনুসৃত না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা।

২.            নিষ্পত্তির সময় তদন্ত কমিশনের সদস্যদের হাতে বাংলাদেশের নানা ঘটনা, গণবিবৃতি ও দলিল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ মিশনের ১৯৭৭ সালের তদন্ত প্রতিবেদনসহ অন্যান্য নানা দলিল ছিল, যা সত্যতা নিরূপণের জন্য তাদের কাজে প্রয়োজন হয়েছিল।

৩.            এ প্রতিবেদনে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের ২২ সদস্যের হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। নিহতদের মধ্যে চার বছর বয়সী এক কন্যাশিশু ও শেখ মুজিবুর রহমানের তিন বছর বয়সী এক নাতিসহ অন্যান্য আত্মীয়, অতিথি ও গৃহকর্মীরা ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করা ও গণবিবৃতির নিরিখে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

৪.            হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা একটি সরকারি অধ্যাদেশবলে ইনডেমনিটি লাভ করেন। এ অধ্যাদেশ অনুসারে জড়িতদের কোনো রকম আইনের আওতায় না আনার বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন, একটি পুলিশ কেস রেজিস্ট্রি এবং সরকারের তরফ থেকে এ কমিশনের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ ও পুলিশি পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার কথাও এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫.            বাংলাদেশ গেজেটে বলা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিদেশে নানা কূটনৈতিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

৬.           অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকৃত ১৯৭৭ সালের এপ্রিলের বাংলাদেশ মিশনের রিপোর্টকে এ কমিশন আমলে নেয় এবং কমিশনের এক সদস্যের কাছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন আইন তার নিজের পথে চলবে। আইন তার নিজের গতিতে চলার মতো দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ না পেয়ে কমিশন তার একজন সদস্যকে বাংলাদেশে প্রেরণ করে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে লন্ডন হাইকমিশনে মি. জেফরি টমাস ও তার একজন সহকারীর জন্য ভিসার আবেদন করা হয়। কিন্তু মি. টমাস ও তার সহকারীর ভিসা না দেয়ার কারণে এ ভ্রমণ সম্ভব হয়নি। কমিশন বা এর সচিবকে কোনো প্রত্যাখ্যানপত্র দেয়া হয়নি। হাইকমিশনে বহুবার চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করার পরেও প্রস্তাবিত এ পরিদর্শন সম্পর্কে কোনো প্রত্যুত্তর দেয়া হয়নি।

৭.            কমিশন যে প্রাথমিক উপসংহারে পৌঁছে তা হলো—

                ক.           আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিকভাবে চলতে

                                দেয়া হয়নি।

                খ.            দেখা গিয়েছে এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার দায়

                                সিংহভাগই সরকারের।

                গ.            এ বাধাগুলোর নিষ্পত্তি করে আইন ও বিচারিক

                                প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে হবে।

 

লন্ডন

২০ মার্চ ১৯৮২

 

তদন্ত কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্ট

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম (উপরাষ্ট্রপতি), তাজউদ্দীন আহমদ (প্রথম প্রধানমন্ত্রী), এম মনসুর আলী (প্রধানমন্ত্রী) ও কামারুজ্জামান (শিল্পমন্ত্রী ও দলের সাবেক সভাপতি)—এ জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিনা বিচারে আটকে রেখে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর হত্যা করার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসতে যেসব পরিস্থিতি আইন ও বিচারকার্যকে বিঘ্নিত করছে সেগুলোর তদন্ত করতে ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এ তদন্ত কমিশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়।

হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং নিহত প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতির সন্তান যথাক্রমে এম সেলিম ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কিউসি এমপি স্যার টমাস উইলিয়ামস ওই কমিশনটি গঠনের উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জনসভায় এ আহ্বান বিপুল সমর্থন লাভ করে। কিউসি এমপি স্যার টমাস উইলিয়ামসের সভাপতিত্বে ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হাউজ অব কমন্সের একজন সদস্যের সভাকক্ষে ওই কমিশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এসসি শিন ম্যাকব্রাইড, কিউসি এমপি জেফরি টমাস ও আইনজীবী অব্রে রোজ উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে একই দিন অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কমিশনটির গঠন ও তার নির্দেশনাবলি বিবৃতির আকারে ঘোষণা করা হয় (সংযুক্তি ক)।

কমিশনটি ক) ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা খ) জনসম্মুখে যারা এ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে তাদের ও গ) এসব বিষয়ে সরকার যেসব পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণের অনুসন্ধানে প্রতিটি সদস্যের কাছে প্রেরিত দলিলপত্রাদি পরীক্ষা করতে শুরু করে।

কাগজপত্রাদি পরীক্ষা করা সাপেক্ষে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো উঠে আসে:

এক. ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৩২ নং সড়কের নিজ বাসভবনে খুব ভোরে পরিবারের নিম্নোক্ত সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়:

        ১. শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা

        ২. শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামাল

        ৩. শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় ছেলে শেখ জামাল

        ৪. শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শেখ রাসেল (বয়স ৯)

        ৫. শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা আহমেদ খুকু

        ৬. শেখ জামালের স্ত্রী পারভিন কামাল (রোজী) এবং

        ৭. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাই শেখ নাসের।

দুই. ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর একই সময়ে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গ নিহত হন:

        ১. শেখ মুজিবুর রহমানের শ্যালক, শক্তি, সেচ ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত

        ২. সেরনিয়াবাতের কন্যা মিস বেবী (বয়স ৪)

        ৩. পুত্র আরিফ

        ৪. নাতি বাবু (বয়স ৩)

        ৫. বেড়াতে আসা এক ভাইপো

        ৬. তিনজন মেহমান

        ৭. চারজন ভৃত্য

        ৮. বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ও তত্কালীন ক্ষমতাসীন দলের সম্পাদকদের একজন শেখ ফজলুল হক মণি

        ৯. বেগম ফজলুল হক মণি (শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তানসম্ভবা ভাইঝি)।

তিন. ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিম্নোক্ত জাতীয় নেতারা নিহত হন:

        ১. সৈয়দ নজরুল ইসলাম (সাবেক উপরাষ্ট্রপতি)

        ২. তাজউদ্দীন আহমদ (প্রথম প্রধানমন্ত্রী)

        ৩. এম মনসুর আলী (সাবেক প্রধানমন্ত্রী)

        ৪. এএইচকিউ কামারুজ্জামান (সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও দলের সাবেক সভাপতি)।

চার. সেনাবাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের নেতৃত্বে অল্পসংখ্যক অফিসারের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞগুলো সংঘটিত হয়েছে।

পাঁচ. ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে ব্যাংককে বিমানযোগে প্রস্থানের জন্য যেসব আর্মি অফিসার আলাপ-আলোচনা করেছিলেন তাদের তালিকা থেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নাম পাওয়া যেতে পারে। তাদের দেশত্যাগের পর একটি অভ্যুত্থান হয়েছিল যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিপক্ষে ছিল। বাংলাদেশ থেকে যারা ব্যাংককে যাচ্ছিল তাদের মধ্যে ছিল:

             ১) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক

             ২) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুর রশীদ।

ছয়.     আপাতত নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের অভ্যুত্থানটির নেতা বলে মনে হচ্ছে:

             ১) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক

             ২) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুর রশীদ

             ৩) মেজর শরিফুল হক (ডালিম)।

সাত.   লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক ব্যাংককে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, এএইচকিউ কামরুজ্জামানকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। ১৯৭৬ সালের ৩০ মে ‘লন্ডন সানডে টাইমসে’ প্রকাশিত একটি সাংবাদিক সাক্ষাত্কারে এবং ১৯৭৬ সালের ২ আগস্টে একটি টিভি সাক্ষাত্কারেও একই স্বীকারোক্তি পুনরায় এসেছে।

আট.   ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে ঐতিহাসিক পরিবর্তনটি সম্পাদনের জন্য এবং সামরিক আইন জারি করার ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কাজে বা বিষয়ে বা তা সংঘটিত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাকে রক্ষাকল্পে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘দি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫’ শিরোনামে একটি অধ্যাদেশ জারি করে (সংযুক্তি খ)।

নয়.     ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবর্তনে এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে সামরিক শাসন জারি করতে এ প্রত্যয়নপত্রে উল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কাজে বা বিষয়ে বা তা সংঘটিত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে বা তা কার্যে রূপান্তর করতে কোনো কর্মকাণ্ড বা পদক্ষেপ গৃহীত হলে তা-ই এরূপ সরকারের পরিবর্তনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা তার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বা তা কার্যে রূপান্তর করতে গৃহীত প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড বা পদক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে’ এ মর্মে অধ্যাদেশের অনুকূলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারীকৃত একটি প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন। এরূপ প্রত্যয়নপত্র তাতে উল্লিখিত কোনো বিষয়ের অকাট্য প্রমাণ বলে গণ্য হবে। এমন কোনো প্রত্যয়নপত্র জারি হয়েছে বলে জানা যায় না।

দশ.     ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর সরকার গ্যাজেট নং ৭৬৮-এর বরাতে একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিম্নলিখিত শর্তসাপেক্ষে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি জুডিশিয়াল তদন্ত কমিশন গঠন করে:

             নং ৭৬৮ আইন—সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে হত্যা করার বিষয়টি আশু তদন্ত করতে এতদ্বারা তিন সদস্যবিশিষ্ট জুডিশিয়াল তদন্ত কমিশন গঠিত হলো। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের (হাইকোর্ট বিভাগ) বিচারপতি কেএম সোবহান, বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেনকে সদস্য করে সুপ্রিম কোর্ট আপিলেত ডিভিশনের বিচারপতি আহসানুদ্দীন চৌধুরীকে ওই কমিশনের প্রধান করা হয়।

এগারো.                ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে ঢাকার লালবাগ থানায় একটি পুলিশ কেস নিবন্ধন করা হয়। মনে হয়, কিছু বিষয় তদন্ত করার পর তা সিআইডিকে অর্পণ করা হয়।

বারো.    ছয় বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নামে কোনো আইনি ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।

তেরো.   ওই জুডিশিয়াল তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য শন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি মিশন বাংলাদেশ ভ্রমণ করে। তিনি তত্কালীন রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জেলহত্যা বিষয়ে আলোচনা করেন। তাকে অবহিত করা হয়, আইনকে নিজের গতিতে চলতে দেয়া হবে। মিশনটির একটি প্রতিবেদন সংযুক্তি ৪-এ যুক্ত করা হয়েছে।

চৌদ্দ.    অতঃপর দেখা যায়, হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিম্নোক্ত অফিসাররা ১৯৭৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ে ব্যাংককের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার প্রাক্কালে তাদের ওপর বিভিন্ন কূটনৈতিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়:

             ১. লেফটেন্যান্ট কর্নেল শরিফুল হক (আগে মেজর) (ডালিম)

             ২. লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজ পাশা

             ৩. মেজর মহিউদ্দীন

             ৪. মেজর শাহরিয়ার

             ৫. মেজর বজলুল হুদা

             ৬. মেজর রশীদ চৌধুরী

             ৭. মেজর নূর

             ৮. মেজর শরীফুল হুসাইন

             ৯. ক্যাপ্টেন কিসমত হুসেন

             ১০. লেফটেন্যান্ট খায়রুজ্জামান

             ১১. লেফটেন্যান্ট আবদুল মজিদ।

পনেরো. বাংলাদেশ গ্যাজেটে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কূটনৈতিক মিশনের পদগুলোতে স্থায়ী করা হয়েছে বলে মনে হয়।

ষোলো. উপর্যুক্ত ঘটনাপঞ্জি ও অবস্থা বিবেচনাপূর্বক ওই কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওপরে বর্ণিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা কোথায় তা সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করতে কমিশনের একজন সদস্যের ঢাকায় যাওয়া আবশ্যক।

সতেরো. সদস্যদের মধ্য থেকে জেফরি টমাস কিউসিকে একজন সাহায্যকারীসহ ১৩ জানুয়ারি ১৯৮১ তারিখে সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করতে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাদের দুজনকে বাংলাদেশ ভ্রমণের জন্য ভিসা দিতে কমিশনের সচিব আইনজীবী অব্রে রোজ একটি আবেদন করেন।

আঠারো. বাংলাদেশ ভ্রমণে যেতে সদস্যদের সময়মতো ভিসা প্রদান করা হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি স্থগিত করে রাখে।

উনিশ.   ১৯৮১ সালের ১৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ওই দুজন সদস্য যেন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে করে বাংলাদেশে যেতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে ওইদিন সকালবেলায় যখন জরুরি ভিত্তিতে অনুরোধ করা হলো তখন লন্ডনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস অবহিত করে যে, ওই দিন অপরাহ্নেই সম্ভাব্য ভ্রমণকারীদের ভিসা ও পাসপোর্ট প্রদান করা হবে। এরপর যথাসময়ে কল করা হলে বলা হয়, কনসুলার বিভাগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

বিশ.    পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চিত করে, ঢাকায় ভ্রমণের অনুমতি প্রদানপূর্বক জেফরি টমাসকে তারা কোনো ভিসা দিতে পারবেন না। তদন্ত কমিশনের সচিব নিশ্চিত করেন, লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাসকে কয়েকবার চিঠি প্রেরণ, টেলিফোনে কল করা ও সেখানে গিয়ে দেখা করা সত্ত্বেও তাকে দূতাবাস থেকে ভিসা রিফিউজের কোনো কারণ দর্শানো হয়নি বা কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।

             ওপরে বর্ণিত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলোয় উপনীত হওয়া গেছে—

             ক) আইন ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়নি।

             খ) এ প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদানের জন্য সরকারকেই দায়ী মনে হচ্ছে।

             গ) এ বাধাগুলো দূর হওয়া জরুরি এবং আইন ও বিচার বিভাগকে নিজ নিজ গতিতে চলতে দেয়া উচিত।

 

তারিখ: ২০ মার্চ ১৯৮২

তদন্ত কমিশনের ঠিকানা: ১৪-১৮ হাই হলবর্ন, লন্ডন ডব্লিউসি১


বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব ও তার পরিবার এবং নভেম্বরে কারাগারে চার নেতা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করবে কমিশন অব জুরিস্ট

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের এবং ১৯৭৫ সালের ২/৩ নভেম্বর জেলের ভেতরে চারজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার ব্যর্থতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে।

শেখ মুজিব এবং অন্য ভিক্টিমদের পরিবারের সদস্যদের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে এবং এ বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের সমর্থনে ঠিক যেমনটা ব্রিটেন, ইউরোপ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাবলিক মিটিংয়ে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেই অনুসারে কিউসি এমপি স্যার টমাস উইলিয়ামসকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে মি. শন ম্যাকব্রাইড, এসসি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী, মিস্টার জেফ্রি টমাস কিউসি এমপি, সঙ্গে সেক্রেটারি হিসেবে থাকবেন মিস্টার অব্রে রোজ। তারা সেই সব পরিস্থিতির তদন্ত করবেন যেগুলোর কারণে এ মামলার আইন ও বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ওই কমিটির সদস্যরা লন্ডনে সমবেত হন এবং সম্মত হন যে তারা এ ঘটনার তদন্তে পদক্ষেপ নেবেন এবং এ গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য যে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তার সঙ্গে জড়িত আইনি বিষয়গুলোর মূল্যায়ন করবেন। এ ঘটনায় খুব দ্রুতই বাংলাদেশ সফরের প্রত্যাশাও করছেন কমিটির সদস্যরা।

টমাস উইলিয়ামস

১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮০


অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ সফরের প্রতিবেদনের অংশবিশেষ (৪-১২ এপ্রিল ১৯৭৭)

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সফরের সময়ে প্রতিনিধিরা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারেন যে তাদের সমবেত হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। ১৯৭৫ সালের ২/৩ নভেম্বরে ঘটা একটা ঘটনার তদন্তের জন্য ওই কমিশন গঠন করা হয়। ওই ঘটনায় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ভেতরে শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে কাছের চারজন সহযোগীকে হত্যা করা হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ওই কমিশন গঠন করা হয়েছিল জেলের ঘটনার তদন্ত করার জন্য, সেই সঙ্গে পুরো পরিস্থিতি তদন্ত করার জন্য; যার কারণে কিছু অপরাধী দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়।

যদি কমিশন ওই ঘটনার তদন্ত করতে পারত এবং যেন আর এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য জনসম্মুখে কোনো সুপারিশ দিত, তাহলে বাংলাদেশের জেলের ভেতরে যেসব রাজনৈতিক বন্দি রয়েছে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে যারা চিন্তিত তাদের জন্য সেটা একটি বড় বিষয় হতো।

স্বাধীনতার ঘোষণা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গ্রেফতার হওয়ার আগেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন মধ্যরাতে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ইপিআর ট্রান্সমিটারে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় স্বাধীনতার ঘোষণাবাহী বঙ্গবন্ধুর বার্তা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়।

ঘোষণায় তিনি বলেন,

‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উত্খাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।’