১৯৮০ সালের ২০ জানুয়ারি কনওয়ে হলে বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে সেলিম ভাই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেলিম ভাই চাচ্ছিলেন আমি সাংগঠনিক পদটা গ্রহণ করি। সভায় উপস্থিত বেশির ভাগ সদস্যই এ ব্যাপারে সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে একমত হলেন। কিন্তু আমি ও খোকা চাচা এ নির্বাচনের আগে থেকে স্থির করেছিলাম এই কমিটিতে আমরা কোনো পদে থাকব না। কেবল কার্যকরী পরিষদের সদস্য থেকে কাজ করে যাব। সহসভাপতি পদে মিসেস নূরজাহান মুরশেদ, আব্দুল মতিন, ব্রিটিশ শ্রমিক দলীয় সাবেক এমপি মাইকেল বার্নস, পশ্চিম জার্মানির অনিল দাসগুপ্ত নির্বাচিত হন। এছাড়া ব্রিটিশ শ্রমিক দলীয় এমপি স্ট্যান নিউএন্স, আলফ লোমাসকে সহসভাপতি পদে মনোনীত করা হয়। এ ব্যাপারে তাদের সম্মতি পেলেই এ মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে। সভাপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে সেই প্রস্তাব আসতেই আমি স্যার টমাস উইলিয়ামসের নাম প্রস্তাব করি। সভায় এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। আগরতলা মামলার সুবাদে লন্ডনের বাঙালি মহলে টমাস উইলিয়ামস বেশ পরিচিত ছিলেন। কিন্তু মামলার পরে উনার সঙ্গে বাঙালিদের যোগাযোগ কমতে থাকে। বর্তমানে কয়েক বছর ধরে এখানকার বাঙালিদের সঙ্গে মোটেই যোগাযোগ ছিল না। টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে যোগাযোগ করা ও তার সম্মতি নেয়ার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। 

সভাপতি পদে স্যার টমাস উইলিয়ামসের নাম প্রস্তাব করার পেছনে কারণ ছিল গত বছরের মাঝামাঝির একটি ঘটনা। ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি একদিন খোকা চাচার বাসায় রেহানা ও আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। জিয়া সরকার যে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করেছে সে কথা উঠতেই রেহানা হঠাৎ করে খোকা চাচা ও আমাকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, ‘টমাস উইলিয়ামসকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলা করা যায় না?’ রেহানার মুখে এ কথা শুনে আমি যেমন অবাক হলাম, তেমনি খুশি হলাম। অবাক হলাম এই ভেবে যে তথাকথিত আগরতলা মামলার বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বিশিষ্ট এই কৌঁসুলির নাম রেহানা কীভাবে এখনো মনে রেখেছে। খুশি হলাম এই ভেবে যে বিদেশের মাটিতে বসেও আমরা যে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে একটা কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারি সে কথা রেহানার মুখ দিয়ে প্রথম বের হলো।

...ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে একদিন বিকেলে আমি বাসার দরজা খুলে প্রবেশ করা মাত্র রেহানা প্রায় চিত্কার করে বলল, ‘স্যার টমাস ইউলিয়ামস ফোন করেছেন, জলদি ধরো।’ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে একটি গম্ভীর গলা ভেসে এল, ‘তুমি বেশ কয়েকদিন আগে ফোন করে মেসেজ রেখেছিলে, কিন্তু যেহেতু আমি দেশের বাইরে ছিলাম সেহেতু তোমার ফোনের উত্তর সময়মতো দিতে পারিনি বলে আমি দুঃখিত।’ এরপর সৌজন্যমূলক কিছু কথাবার্তার পর উনি রেহানা ও আমাকে একদিন ‘হাউস অব কমন্সে’ আসার আমন্ত্রণ জানালেন।

...রেহানা ও আমি ঠিক করলাম যেদিন আমরা স্যার টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে দেখা করতে যাব সেদিন সেলিম ভাইকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। এর মধ্যে আমি টমাস উইলিয়ামসের সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিলাম। নির্দিষ্ট দিনে আমরা তিনজন হাউস অব কমন্সের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম।...আমার চিন্তা হলো আমি তো স্যার টমাস উইলিয়ামসকে আগে দেখিনি, তাই উনাকে কীভাবে চিনব। এ কথা সেলিম ভাইকে বলতেই উনি জানালেন যে উনিও একই কথা ভাবছেন। রেহানাকে আমাদের চিন্তার কথা বলতেই রেহানা বলল, ‘আমি খুব ছোটবেলায় একবার কি দুবার ঢাকায় উনাকে দেখেছি। তাও আশা করি উনাকে দেখলে চিনতে পারব।’ রেহানার স্মরণশক্তি ওর বাবার মতোই প্রখর। একবার কাউকে দেখলে সহজে ভোলে না।...আমরা রেহানার স্মরণশক্তির ওপর আস্থা রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম স্যার টমাস উইলিয়ামসের জন্য। লক্ষ করলাম এমপিরা যে দরজা দিয়ে হলে আসেন সেখানে বয়স্ক, সুন্দর এক ভদ্রলোক দরজা খুলে ভেতরে আসতেই রেহানা বলে উঠল উনিই বোধ হয় স্যার টমাস উইলিয়ামস হবেন। মজা হলো স্যার টমাস উইলিয়ামস আমাদের চেনেন না। দেখলাম উনি হলের চারদিক দর্শনার্থীদের দিকে তাকিয়ে বোধ হয় আমাদের খুঁজছেন। রেহানার কথামতো আমরা এগিয়ে গিয়ে আমাদের পরিচয় দিলাম। উনি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের এখানে আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?’ আমি বললাম, ‘না আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি।’ উনি বললেন, ‘চলো তোমাদের নিয়ে পাশের ক্যান্টিনে বসি, সেখানে বসে তোমাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে।’ আমরা তাকে অনুসরণ করে ক্যান্টিনে গিয়ে বসলাম। উনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়ে ঢাকায় উনার অবস্থানকালের বেশকিছু স্মৃতিচারণ করলেন।

আরো কিছু কথাবার্তার পর আমরা আমাদের কাজের কথা শুরু করলাম। আমরা তাকে জানালাম যে এখানে সম্প্রতি ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠিত হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রচার করা। কয়েক বছর আগে দেশেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রচারের জন্য বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠিত হয়েছে। সেখানে পেশাজীবী মানুষ যেমন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কবি-সাহিত্যিকগণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। কিছুদিন আগে এ নবগঠিত ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সম্মেলন লন্ডনে হয়েছে। এ সম্মেলনে পরিষদের সভাপতি পদের জন্য যে আমরা উনাকে মনোনীত করেছি তাও উনাকে জানালাম। আমরা স্যার টমাসকে বললাম আমাদের এ মনোনয়নে সম্মতি দিলে আমরা বাধিত হব। সেলিম ভাই উনাকে আরো জানালেন যে লর্ড ব্রকওয়ে এবং শেখ হাসিনা এ প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক এবং উপদেষ্টা পরিষদে ড. কামাল হোসেনসহ এখানকার

বাঙালি সমাজের অনেক গুণীজন আছেন। সবশেষে সেলিম ভাই এও জানালেন এ পরিষদে বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিশিষ্ট সদস্য আছেন। আরো বললেন, উনি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং আমি কার্যকরী পরিষদের সদস্য। উনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবেগে আপ্লুত হয়ে বললেন, ‘সেই কতকাল আগে ১৯৬৮ সালে আমি ঢাকা গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করতে। তারপর এল ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। তখনো আমি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম। সে তো প্রায় দশ বছর আগের কথা। তোমরা বাঙালিরা এখনো আমাকে মনে রেখেছ!’ একটু থেমে উনি বললেন, উনি নিজে একজন বঙ্গবন্ধুর অনুরাগী এবং ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব উনি সানন্দে গ্রহণ করেন। আমরা স্যার টমাস উইলিয়ামসের কথা শুনে সবাই খুব আনন্দিত হলাম এবং উনাকে ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতির পদ অলংকৃত করার জন্য ধন্যবাদ জানালাম।...

স্যার টমাস উইলিয়ামস ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতির পদ গ্রহণ করতে রাজি হয়েছেন—এ সংবাদ কয়েকদিন পর কার্যকরী পরিষদের সভায় জানাতেই সবাই ভীষণ আনন্দিত হলো। আগেই ঠিক হয়েছিল ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদ প্রাথমিক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন (১৭ মার্চ), মৃত্যু দিবস (১৫ আগস্ট) ও জেলহত্যা দিবস (৩ নভেম্বর) বিশেষভাবে পালন করবে। তাছাড়া স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসগুলো যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা করবে।...বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চে আলোচনা সভা করার ব্যাপারে হাউজ অব কমন্সে স্যার টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে একদিন আলাপ করতেই উনি বললেন, ১৭ মার্চ আলোচনা সভা করার আইডিয়াটা চমত্কার। কারণ এখন হাউজ অব কমন্সে অধিবেশন চলছে এবং এই অধিবেশনকালের মধ্যেই ১৭ মার্চ পড়বে। সেজন্য হাউজ অব কমন্সের একটি কমিটি রুমে আলোচনা সভার আয়োজন করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর অনুরাগী ও ঘনিষ্ঠ এমপিরাও সভায় উপস্থিত থাকতে ও বক্তব্য রাখতে আগ্রহী হবেন। উনি প্রস্তাব করলেন ১৭ মার্চের সন্ধ্যার দিকে হাউজ অব কমন্সের কমিটি রুমে আলোচনা সভা অনুষ্ঠানের কথা। কমিটি রুম পাওয়ার ব্যাপারে উনি দায়িত্ব নেবেন এবং উনার কয়েকজন এমপি বন্ধু যারা ঘনিষ্ঠভাবে বঙ্গবন্ধুকে জানতেন তাদেরও এ আলোচনা সভায় আসতে অনুরোধ করবেন। সেলিম ভাই ও আমি বঙ্গবন্ধু পরিষদের কার্যকরী কমিটির পরবর্তী সভায় স্যার টমাস উইলিয়ামসের প্রস্তাবটা উত্থাপন করতেই সবাই খুব খুশি হলো। এই প্রথম বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী হাউজ অব কমন্সে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।...

১৭ মার্চ ১৯৮০ সন্ধ্যা ৬টার সময় হাউজ অব কমন্সের কমিটি রুমে স্যার টমাস উইলিয়ামসের সভাপতিত্বে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা শুরু হলো। হলটি বেশ বড় হওয়ায় দর্শক শ্রোতার উপস্থিতি ছিল অনেক। দিনটি একটি কাজের দিন হওয়ায় অনেকে অফিস থেকে সরাসরি এই সভায় চলে এসেছেন। দেখলাম বেশ কজন ব্রিটিশ এমপিও উপস্থিত হয়েছেন। এদের পক্ষ থেকে জুলিয়াস সিলভারম্যান বক্তব্য রাখেন। সভাপতির ভাষণে স্যার টমাস উইলিয়ামস বলেন, ‘আমার মতো আপনারাও এটা অনুভব করছেন যে আজকের এ সভার মাধ্যমে একজন মহান ব্যক্তিকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারায় এ সভাটি বাস্তবিক পক্ষেই সময়োপযোগী ও ফলপ্রসূ হয়েছে। আমাকে আপনাদের এ নতুন সমিতির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে যে সম্মান দেখিয়েছেন তাতে আমি খুবই গর্ববোধ করছি। এ সমিতির সেবা করতে গিয়ে আমাকে যা কিছুই করতে হবে তা আমি অত্যন্ত আনন্দচিত্তে ও গর্বের সঙ্গেই করব। আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি এবং আমি বিশ্বাসও করি যে শেখ মুজিব আমার বন্ধু ছিলেন। আমি তাকে জানতে পেরে, বিশেষ করে তার জন্য এবং তার সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত। আমার এই কথা ভাবতে ভালো লাগে যে আমি যখন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ছিলাম তখন অনেকের সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, যারা সবাই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আমার সাথি ছিল। শুধু তাই নয় আজকের যে বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশের শুরু থেকেই তারা আমার সঙ্গে ছিল। আজকের এ সন্ধ্যায় সভার কার্যক্রম শুরু করার সময় আমি আপনাদের বলেছিলাম যে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার যখন প্রথম দেখা হয় তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তার আরাধ্য কাজ অসমাপ্ত রেখে তিনি মারা যাবেন, এ কথা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তার এ বিশ্বাস হয়তো পুরোপুরি পূর্ণ হয়নি, কিন্তু এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে এবং যতদিন বাংলাদেশ বিশ্বের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে, ততদিন তার মৃত্যু নেই। তার দৈহিক মৃত্যু তার নিজ পরিবারের জন্য ছিল বেদনাদায়ক, তার বন্ধুদের জন্য ছিল দুঃখজনক, কিন্তু তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি বেদনা ও দুঃখের ছিল বাংলাদেশের জন্য, যে বাংলাদেশ তার মৃত্যুতে গভীর দুঃখ-দুর্দশায় নিমজ্জিত হয়েছিল। কিন্তু দুঃখ-দুর্দশা হলো একটি জাতির জাগরণের অংশ। এ কথা বঙ্গবন্ধুর বেলায় সত্য যে তিনি যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সে আন্দোলনের বীজ শহীদের রক্ত এবং আত্মত্যাগ দিয়ে সূচিত হয়েছিল। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই, কেননা আজকের এ দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও বাংলাদেশ আবার যখন জেগে উঠবে, জাতিসত্তার পূর্ণতা পাবে, তখন তার আত্মা আমাদের মাঝে ফিরে এসে বলবে, “তোমরা যদি আমার স্মৃতিচিহ্ন চাও তবে তোমাদের চারদিকে তাকাও।” একজন মহান ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। এবং আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি। আগামী দিনগুলোতে তার স্মৃতি আমাদের মধ্যে জাগরূক হয়ে থাকবে এবং তা আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। আমি আশা করি, যে স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তার মৃত্যু নেই। আমি এ কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই যে অনেক স্বনামধন্য সংসদ সদস্য এ সভায় আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারণে তারা আসতে পারেননি। তবে তারা সমিতির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করেছেন। তারা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, লিবারেল পার্টির চিফ হুইপ এলেন বিথ, লিবারেল পার্টির সাবেক নেতা জো গ্রিমন্ড এবং বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বকারী দলের অন্যতম নেতা জন হান্ট।’ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে টমাস উইলিয়ামসের এই সুন্দর বক্তব্য সভায় উপস্থিত সবাইকে মোহিত করল।

...১৯৮০-এর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে হাসিনা আপা উনার ছেলে জয় ও মেয়ে পুতুলকে নিয়ে দিল্লি থেকে লন্ডনে এলেন।...জুন মাসের মাঝামাঝি একদিন স্যার টমাস উইলিয়ামস হাসিনা আপাকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আমন্ত্রণ জানালেন এবং বললেন যে হাসিনা আপাকে পার্লামেন্ট বিল্ডিং ঘুরিয়ে দেখাবেন। হাসিনা আপা ও আমি নির্ধারিত দিনে গেলাম স্যার টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে দেখা করতে। পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করতেই আমাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন স্যার টমাস উইলিয়ামস। পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ে প্রথম প্রবেশদ্বারে লবিতে যে বিশাল কতগুলো ছবি টাঙানো আছে সেই ছবিগুলো কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বা কোন দেশের রাজা বা জনগণের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে উপহার দেয়া হয়েছে তার বর্ণনা সুন্দরভাবে স্যার টমাস উইলিয়ামস হাসিনা আপাকে দিতে লাগলেন।

...নানান তথ্যবহুল ঘটনা শোনার পর আমরা ক্যান্টিনে প্রবেশ করলাম চা খাবার জন্য। চা খেতে খেতে হাসিনা আপা বঙ্গবন্ধু হত্যার তদন্ত কমিশন গঠন করার দায়িত্ব নিতে স্যার টমাস উইলিয়ামসকে অনুরোধ করলেন। যেহেতু দেশে খুনিদের দোসররা ক্ষমতাসীন এবং তারা অধ্যাদেশ জারি করেছে যে ১৫ আগস্টে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের হত্যার বিচার করা যাবে না। এই অমানবিক আইনের জন্য দেশে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাচ্ছে না। সেহেতু হাসিনা আপা চাচ্ছেন লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন করে ১৫ আগস্ট ও পরবর্তীকালে ৩ নভেম্বর জাতীয় নেতাদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যবস্থা করা হোক। স্যার টমাস উইলিয়ামস এ প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বললেন, ‘আমি মনে করি এ জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়ার প্রয়োজন আছে। দেশে এই মুহূর্তে না পারলেও আমরা বিদেশে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে এর বিচারের পক্ষে বিশ্ববিবেক জাগ্রত করতে পারি। আমি নিশ্চয়ই এই দায়িত্ব পালন করতে রাজি আছি।’ এরপর উনি তদন্ত কমিশন কীভাবে গঠন করা যায় সে বিষয়ে আলাপ করলেন। কথায় কথায় হাসিনা আপা বললেন যে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে এ ব্যাপারে হাসিনা আপার আলাপ হয়েছে। উনি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন। ঠিক হলো অল্প কিছুদিনের মধ্যে কামাল হোসেন স্যার টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে বসে তদন্ত কমিশনের প্রাথমিক রূপরেখা নির্ধারণ করবেন।

কিছুদিন পর স্যার টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে হাসিনা আপা এক বৈঠকে বসেন এবং সেখানে স্থির হয় যে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ কর্তৃক আয়োজিত এক জনসভায় হাসিনা আপা আনুষ্ঠানিকভাবে স্যার টমাস উইলিয়ামসের তদন্ত কমিশন গঠনের জন্য অনুরোধ করবেন। সেই মিটিংয়ে উপস্থিত থেকে হাসিনা আপার অনুরোধ রক্ষা করে স্যার টমাস উইলিয়ামস বক্তব্য রাখবেন।

...দেড় মাসব্যাপী প্রচারাভিযানের পর এল ১৬ আগস্ট। বিকালে মিটিংয়ে যাবার জন্য খোকা চাচার গাড়িতে হাসিনা আপা ওঠেন। তার পেছনে সুলতান ভাই ও হাসেম সাহেবের গাড়ি। রেহানা ববিকে কোলে নিয়ে বিদায় জানানোর সময় আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলল, ‘হাসিনা আপাকে তোমার হাতে দিলাম, দেখো যেন হাসিনা আপার কোনো বিপদ না হয়।’ কথা শুনে আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। গাড়িতে যেতে যেতে ভাবলাম রেহানা কি কোনো বিপদের আশঙ্কা করছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর রাজাকার আলবদরদের কিছু নেতা বাংলাদেশ থেকে এসে পূর্ব লন্ডনে আত্মগোপন করেছিল। ’৭৫-এর পর সরকারি মদদ পেয়ে এরা বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের সভা সমিতিতে এরা হট্টগোল বাধানোর চেষ্টা করত। কিন্তু পরে আওয়ামী লীগের প্রতি স্থানীয় বাঙালিদের সমর্থন দেখে এরা চুপ হয়ে যায়। হাসিনা আপার মিটিংয়ে তত্কালীন জিয়া সরকারের সমর্থক ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যেন কোনো রকম গোলযোগ সৃষ্টি না করতে পারে সেজন্য আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ থেকে বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে এই মিটিংয়ের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। যদিও গোলযোগের এ আশঙ্কা খুবই কম ছিল তথাপি এ দেশের নিয়ম অনুযায়ী আওয়ামী লীগের নেতারাই এ জনসভা অনুষ্ঠানের কথা আগেই পুলিশকে অবহিত করে রেখেছিল। বেশ কজন ব্রিটিশ এমপি এই মিটিংয়ে আসবেন শুনে পুলিশ কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়ে দিলেন যে নিয়মমাফিক দুএকজন পুলিশ সেখানে থাকবে। আমার বাসা থেকে মিটিংয়ের হলে পৌঁছাতে পৌনে এক ঘণ্টা সময় লাগে। সভাস্থলে পৌঁছে দেখলাম মিটিংয়ে প্রচুর লোক, তিল ধারণের স্থান নেই। মিটিং শুরু হলো সুশৃঙ্খলভাবে। কিন্তু মিটিংয়ের এ শান্ত অবস্থা সত্ত্বেও আমার মনে কেবলই বিদায়ের সময় রেহানার বলা কথাগুলো মনে হতে লাগল। আমি মিটিংয়ের একদম পেছনে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে লাগলাম। বেশ কজন স্থানীয় আওয়ামী লীগের বক্তা বক্তৃতা করলেন এবং দুজন বাংলাদেশ থেকে আগত আওয়ামী লীগের এমপিও বক্তব্য রাখলেন।

তারপর এল হাসিনা আপার পালা। এটা পঁচাত্তর-উত্তর হাসিনা আপার প্রথম কোনো জনসভায় বক্তৃতা করা। হাসিনা আপা বাংলাদেশের সামরিক সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ, ইতিহাস বিকৃতি, রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি সুপরিকল্পিতভাবে বিনষ্ট করা এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানো সম্বন্ধে বক্তব্য রাখলেন। উনি বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলছিল তার কথাও উল্লেখ করেন। হাসিনা আপা ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। দেখলাম শ্রোতাদের মধ্যেও এর প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বিশেষভাবে প্রবাসী বাঙালি মহিলাদের প্রায় সবারই চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে। বক্তৃতার শেষ অংশে হাসিনা আপা বললেন, ‘আমি বাংলার আপামর জনসাধারণের কাছে, বিশ্বমানবতার কাছে বিচার চাই—কেন আমরা মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত, কেন আজ আমি ভাইহারা? আমি আপনাদের কাছে বিচার চাই, বিচার চাই বিশ্ববাসীর কাছে, এত খুনের বিচার হয়, তবে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার কেন হচ্ছে না? হত্যাকারীরা আজ প্রকাশ্য দিবালোকে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই হত্যাকারীরা কেবল বাংলাদেশের জনগণের জন্যই যে হুমকিস্বরূপ তা নয়, সমগ্র বিশ্বের গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমিকদের প্রতিও হুমকিস্বরূপ। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান কৌঁসুলি স্যার টমাস উইলিয়ামসকে আমি অনুরোধ করব ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তদন্ত করার জন্য। আমি চাই খুনিদের বিচার হোক।’

তার পরই ছিল স্যার টমাস উইলিয়ামসের বক্তৃতা। প্রধান বক্তার ভাষণে স্যার টমাস উইলিয়ামস বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার হত্যাকারীদের আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করার ব্যাপারে উপযুক্ত কর্মপন্থা গ্রহণ করবেন বলে শেখ হাসিনাকে প্রতিশ্রুতি দেন।

...১৫ আগস্টের মিটিং-এ প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্যার টমাস উইলিয়ামস তদন্ত কমিশন গঠন করার কাজে হাত দেন। তদন্ত কমিশনের সদস্য হিসেবে উনি প্রথমেই মনোনীত করেন নেবেল প্রাইজ বিজয়ী বিখ্যাত আইরিশ কৌঁসুলি সন ম্যাকব্রাইডকে। সন ম্যাকব্রাইড ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু এবং চার জাতীয় নেতা হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে আইনগত কোনো বাধা আছে কিনা সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করাও সন ম্যাকব্রাইডের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ১৯৭৭ সালে সন ম্যাকব্রাইড নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডগুলির তদন্তে এসে আলোচনা করেন তত্কালীন বাংলাদেশের সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। সে সময় জিয়াউর রহমান ম্যাকব্রাইডকে এই হত্যাকাণ্ডসমূহের বিচারের বিষয়ে এই বলে আশ্বাস দেন ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে অগ্রসর হবে।’ এরপর বেশ কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচারের ব্যাপারে কিছুই করা হয় নাই। বরং তত্কালীন সরকার জঘন্য এই হত্যাকাণ্ডগুলির সাথে যারা সরাসরি জড়িত ছিল, তাদের সকলকে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে উচ্চপদে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করে। এদের বাংলাদেশ মিশনে নিয়োগ দেয়ার কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়। স্যার টমাস উইলিয়ামস ভেবেছিলেন যে, সন ম্যাকব্রাইড যেহেতু এই সকল নৃশংস হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত আছেন সেহেতু উনাকে তদন্ত কমিশনের সদস্য মনোনীত করলে এই তদন্ত কমিশনের উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়ক হবে।

কমিশনের অপর একজন সদস্য হিসেবে স্যার টমাস উইলিয়ামস মনোনীত করলেন জেফ্রি টমাস কিউ. সি এমপিকে। জেফ্রি টমাস ছিলেন লেবার পার্টির আইন বিষয়ক মুখপাত্র। ব্রিটেনে আইনমন্ত্রীর পদ না থাকায় আইন বিষয়ক মুখপাত্রই আইন ও বিচার বিষয়কমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে থাকেন। স্যার টমাস উইলিয়ামস এবং জেফ্রি টমাস উভয়ে কিউ. সি এবং লেবার পার্টির এমপি। স্যার টমাস উইলিয়ামস জেফ্রি টমাসকে তদন্ত কমিশনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এই ভেবে যে, জেফ্রি টমাস তার আইন বিষয়ক মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এই কমিশনকে শক্তিশালী করে তুলতে পারবেন।

তদন্ত কমিশনের ব্যাপারে পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী স্যার টমাস উইলিয়ামস হাসিনা আপা ও কামাল হোসেনকে ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টায় আলোচনা করার জন্য হাউস অফ কমন্সে আসতে অনুরোধ করলেন। উনি জানালেন যে, এই আলোচনায় জেফ্রি টমাস, কনজারভেটিভ পার্টির আইন বিষয়ক মুখপাত্র ও কয়েকজন এমপি উপস্থিত থাকবেন। স্যার টমাস উইলিয়ামস আরো জানান যে, লন্ডনের এক বিখ্যাত সলিসিটার ফার্মের প্রধান অব্রে রোজও উপস্থিত থাকবেন। ব্রিটেনে সাধারণত ব্যারিস্টার অথবা কিউ. সিগণ কোনো না কোনো সলিসিটার ফার্মের মাধ্যমে মক্কেলের সাথে যোগাযোগ করেন। এই সলিসিটার ফার্মগুলো নির্দিষ্ট ব্যারিস্টার অথবা ব্যারিস্টারগণের পক্ষে যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করে থাকে। এমনকি ব্যারিস্টার অথবা কিউ. সিগণের পক্ষ হয়ে মক্কেলের সাথে ফি-ও ঠিক করে থাকে। এই জন্য ব্রিটেনে একজন ব্যারিস্টার অথবা কিউ. সি আইন বিষয়ক কার্য সম্পাদনে এই সলিসিটার ফার্মগুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করে।...

১৯ সেপ্টেম্বর লন্ডনের হাউস অফ কমন্সের নিকটবর্তী কুন্দন রেস্টুরেন্টে বিকেলে এক সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়। এই সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজনে স্যার টমাস উইলিয়ামসকে সাহায্য করে যুক্তরাজ্যের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। এই কমিশন গঠন ও তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে দেয়ার প্রস্তুতি এখানকার বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের মাঝে ভীষণ সাড়া জাগায়। হাসিনা আপা ও রেহানাকে দেখলাম প্রচণ্ড উৎসাহী। মনে হলো এই দু’জনের এতদিনের প্রাণের দাবি অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার এবং চার জাতীয় নেতার হত্যার বিচারের একটা ব্যবস্থা হতে যাচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পেরে এরা দুজনেই কিছুটা স্বস্তি বোধ করছে। সাংবাদিক সম্মেলনে মূল বক্তব্য দিলেন স্যার টমাস উইলিয়ামস। উনি বললেন, ‘কমিশনের প্রথম কাজ হলো আইনের অবস্থান নির্ধারণ এবং লন্ডন থেকে তা করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে প্রাপ্ত দলিলপত্র ও অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণ যাচাই করা হবে। কমিশনের একজন কিংবা দু’জন সদস্য বাংলাদেশ সফরে যাবেন।’ স্যার টমাস আরও বলেন, ‘কমিশনের দু’টি মূল কর্তব্য হলো (১) আইন তার নিজস্ব গতিতে অগ্রসর হবে বলে জিয়া যে আশ্বাস দিয়েছে তা এখনো পর্যন্ত বাস্তবে পরিণত হয় নি কেন এবং (২) বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের আওতায় হত্যাকারীদের বিচার করা যায় কিনা তা নির্ধারণ করা। তদন্তের পূর্বেই যদি মনে হয় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যেতে পারে সেক্ষেত্রে মামলা দায়ের করার জন্য আমরা বাংলাদেশের এটর্নি জেনারেলকে রাজি করানোর চেষ্টা করব।’ স্যার টমাস আরো বললেন, ‘এটর্নি জেনারেলকে মামলা দায়ের করাতে রাজি করানো সম্ভব না হলে কমিশন বিষয়টি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের নিকট পেশ করবে।’

সন ম্যাকব্রাইড বলেন, ‘আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতি অবজ্ঞার ফলে বর্তমান দুনিয়ায় গুরুতর অপরাধের জন্য প্রাপ্য শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার ঝোঁক দেখা দিয়েছে।’ শেখ মুজিবের হত্যার পর ম্যাকব্রাইড মানসিকভাবে নিদারুণ আহত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও তাদের ছেলেমেয়েদের হত্যা করা হয়। এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য প্রাপ্য শাস্তি এড়িয়ে না যাওয়া দুনিয়ার পক্ষে অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পর্কে কোন রকম তদন্ত না করার জন্য ম্যাকব্রাইড বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালে এ সম্পর্কে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনাকালে তাকে আশ্বাস দেয়া হয়, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে অগ্রসর হবে।’ একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে বলেও তাকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুই করা হয়নি। ম্যাকব্রাইড বলেন, তিনি হত্যাকারীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত কেন কার্যকর করা হয়নি তার কারণ আবিষ্কার করার চেষ্টা করবেন।

...বঙ্গবন্ধু হত্যা তদন্ত কমিশনের পরবর্তী কাজে বেশ কিছু পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কমিশনের দু’জন সদস্যকে বাংলাদেশে যাতায়াতের ভাড়া, সলিসিটার এবং জেফ্রি টমাস কিউ. সির ফি। এজন্য প্রয়োজন দশ হাজার পাউন্ডের মতো। হাসিনা আপা যাওয়ার পর পরই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এ অর্থ যোগাড়ের জন্য। আওয়ামী লীগ ও তার সংগঠন, যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু অনুসারীরা এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করে।...

তদন্ত কমিশনের সদস্যদের প্রথম শ্রেণীর দুটি বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করে ঢাকায় যাতায়াতের জন্য সলিসিটার অব্রে রোজকে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ভিসার জন্য আবেদন করতে বলা হলো। জানুয়ারি ’৮১-র দ্বিতীয় সপ্তাহের একদিন অব্রে রোজ নিজের ও জেফ্রি টমাস কিউ. সি-র জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনে ভিসার আবেদন করলেন। নিয়মমাফিক পরদিন উনাদের দুজনের ঢাকায় যাওয়ার জন্য ভিসা পেয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু পরদিন হাইকমিশন থেকে অব্রে রোজকে জানানো হলো তাদের ভিসার ব্যাপারে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অব্রে রোজ যেন দুদিন পরে এসে ভিসা নিয়ে যান। অব্রে রোজ তাদের কথামত দুদিন পর ভিসা নিতে গেলে তাকে বলা হলো এখনো ঢাকাস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তারা এই দু’জনের ভিসা ইস্যু করার ব্যাপারে কোন নির্দেশ পায় নাই। অব্রে রোজ যেন পরে এসে এ বিষয়ে খোঁজ নেন। এই কথা শুনে আমাদের মনে একটু সন্দেহের সৃষ্টি হলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যা তদন্ত কমিশনের সদস্যদের ঢাকা আগমন যে সামরিক সরকার সহজভাবে মেনে নেবে না সেটি আমরা অনেকেই অনুমান করতে পেরেছিলাম। লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের হাইকমিশনার ছিলেন মিঃ দোহা। আমরা জানতাম তিনি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির লোক এবং উনি জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। ভিসা নিয়ে এহেন কালক্ষেপণ করার মধ্যে আমরা একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পেলাম। আমাদের অনুমানই সত্য প্রমাণিত হলো। হাইকমিশন থেকে জানানো হলো যে, কমিশনের দু’জন সদস্য অব্রে রোজ এবং জেফ্রি টমাসের ভিসার আবেদন নাকচ করা হয়েছে। ভিসার ব্যাপারে অব্রে রোজের আবেদনের দিন থেকে প্রায় প্রতিদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীবৃন্দ অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন। কমিশনের এই দু’জন সদস্যের ভিসা পাওয়া সম্ভব হলো কি হলো না—এ নিয়ে তাদের উদ্বেগের অন্ত ছিল না। ভিসা না পাওয়ার সংবাদে তারা সকলেই ভীষণভাবে হতাশ হয়ে পড়লেন। ইয়র্ক হলে হাসিনা আপার কমিশন গঠনের ঘোষণা থেকে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের এই সকল নেতাকর্মী প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কমিশনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তাদের মনে একটা আশা ছিল এই কমিশন বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে একটা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। সামরিক সরকার কর্তৃক কমিশনের সদস্যদের ভিসা নামঞ্জুরের মাধ্যমে তাদের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, এই সামরিক সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করা সম্ভব হবে না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের এই আন্তর্জাতিক কমিশনের দাবি উপেক্ষা করে সরকার এটাই প্রমাণ করল যে, তারা প্রকৃতই হত্যাকারীদের দোসর।

সুকৌশলে ভিসা নামঞ্জুরের খবর অব্রে রোজকে দেয়া হয় সেদিন হাইকমিশন বন্ধ হওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ আগে। অব্রে রোজ খবর পেয়ে আমাদের কাছে ছুটে আসেন। সেখানে অন্যদের মধ্যে অপেক্ষা করছিলেন জেফ্রি টমাস কিউ, সি ও স্যার টমাস উইলিয়ামস এবং যুক্তরাজ্যের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণ। স্যার টমাস উইলিয়ামস আমাদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ‘আগে থেকেই এই ভিসা নাকচ হওয়ার আভাস আমি পেয়েছিলাম। আজ দুপুরের দিকে আমাকে ঢাকা থেকে ব্রিটিশ হাইকমিশনার ফোন করে জানান যে, আমাকে বাংলাদেশে যাওয়ার ভিসা মঞ্জুর করা হবে না।’ স্যার টমাস আরো জানালেন যে, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনার উনাকে বার বার অনুরোধ করেছেন কমিশনের কোন সদস্য যেন ভিসা ব্যতিরেকে বাংলাদেশে প্রবেশ না করে। কারণ বাংলাদেশ সরকারের এই তদন্ত কমিশনের প্রতি মনোভাব অত্যন্ত বিরূপ। স্যার টমাস উইলিয়ামসের এই কথা শোনার পর আমি বেশ অবাক হলাম। এই জন্য যে স্যার টমাস উইলিয়ামস তো ভিসার জন্য আবেদনই করেন নাই। এই কথাটি টমাস উইলিয়ামসকে বলতেই তিনি বলেন উঠলেন, ‘শফিক, বাংলাদেশ সরকার আমার ভিসার আবেদন মঞ্জুর হবে না একথা জানিয়ে পূর্বাহ্নেই আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।’ তিনি দুঃখ করে বললেন বাংলাদেশ সরকার পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় দেশ যে উনাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। উনি জানালেন প্রথম দেশটি হলো চিলি। উনি আরো দুঃখ করে বললেন, বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উনার ভালোবাসা অনেক দিনের। সেজন্যই উনি তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান আসামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ্য আইনজীবী হিসেবে ঢাকা আগমন করেন এবং পরবর্তীকালে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ উনাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ উনাকে এখনো শ্রদ্ধা করে এবং কৃতজ্ঞচিত্তে উনার অবদান স্বীকার করে। কিন্তু বর্তমানে জনসমর্থনহীন যে সামরিক সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগবে বলেই উনাকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে, একইভাবে চিলির সামরিক সরকারও করেছিলেন তাদের স্বার্থে। আমার মনে হলো সবদেশেরই সামরিক শাসকদের চরিত্রগত ঐক্য রয়েছে। কমিশনের দু’জন সদস্যের ভিসা নামঞ্জুর হলে আমরা একবার ভেবেছিলাম তাদেরকে লন্ডন থেকে সরাসরি ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়ে ঢাকা বিমানবন্দর হতে বাংলাদেশের ভিসার জন্য আবেদনের চেষ্টা করতে বলবো। কিন্তু ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাথে স্যার টমাস উইলিয়ামসের কথার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের দুজন সদস্য অব্রে রোজ এবং জেফ্রি টমাস ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে যাওয়া সমুচিত মনে করলেন না। এইভাবে বিদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচারের মহতী প্রচেষ্টা সামরিক সরকারের ষড়যন্ত্রে সাময়িকভাবে ব্যাহত হলো।

এদিকে তদন্ত কমিশনের ঢাকায় আগমনের কথা শুনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সঞ্চার হয় এবং তারা আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে, এবার হয়তো বঙ্গবন্ধু হত্যা ও এর সাথে যুক্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ডসমূহের সঠিক বিচারের একটা প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু তারা যখন জানতে পেল আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের বিচারকবৃন্দের ভিসার আবেদন জিয়া সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে তখন তারা সকলে একযোগে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় আবদুল মালেক উকিলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৩ জানুয়ারি ’৮১ ঢাকায় এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। আইন বিষয়ক কার্য পরিচালনার জন্য তদন্ত কমিশনের সদস্যদের বাংলাদেশে আসার অনুমতি আদায়ের দাবিতে ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের উদ্যোগে দেশব্যাপী জনসমাবেশ ও প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে বলে সভায় ঘোষণা করা হয়। আমরা যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উদ্যোগে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে। বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং টয়নবী হলে এই কমিশনের সদস্যদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ায় প্রতিবাদ সভার আয়োজন করি। এইভাবে জার্মানিস্থ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও সুইডেন প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণ সেসব দেশের বাংলাদেশ হাইকমিশনে বিক্ষোভ প্রদর্শনের আয়োজন করে। কয়েকদিন পর যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের এক সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, কমিশনের জন্য সংগৃহীত অর্থ এই কমিশনের সলিসিটার অব্রে রোজের কাছে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত গচ্ছিত থাকবে।

...’৮২-র জুন মাসের প্রথম দিকে হাসিনা আপা আবার আমাদের সাথে কিছুদিন কাটানোর জন্য লন্ডনে আসেন।...হাসিনা আপা আসার পর পরই ড. কামাল হোসেন কিছুদিনের জন্য লন্ডনে আসেন। তখন হাসিনা আপা কামাল হোসেন সাহেবের সাথে বঙ্গবন্ধু হত্যা-তদন্ত কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করেন। এই তদন্ত কমিশনের সদস্যদের জিয়া সরকার বাংলাদেশে যেতে দেয়নি। সেজন্য এই তদন্ত কমিশনের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় উনারা ’৮১ সালের শেষের দিকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, কমিশনের এযাবত কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরি করতে কমিশনকে অনুরোধ করবেন। এও ঠিক করা হয়েছিল যে, ভবিষ্যতে যদি কখনো অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয় তখন আবার কমিশনের সদস্যদের ঢাকায় পাঠিয়ে সরজমিনে তদন্ত করে কমিশনের একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করার জন্য এই তদন্ত কমিশনকে অনুরোধ করা হবে। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিশনের সচিব অব্রে রোজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। অব্রে রোজ তদন্ত কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে এই প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং ২০ মার্চ ১৯৮২ সালে তদন্ত কমিশনের একটি প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরি করেন। এই রিপোর্টটি হাসিনা আপা ও ড. কামাল হোসেন লন্ডনে আসার পর পরই অব্রে রোজ উনাদের হাতে তুলে দেন। হাসিনা আপা সিদ্ধান্ত নিলেন যে এই রিপোর্ট পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক আকারে প্রচার করবেন। প্রকাশনার দায়িত্ব পড়ে জনাব আব্দুল মতিনের উপর।

...বঙ্গবন্ধু হত্যা তদন্ত কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্ট যা ২০ মার্চ তৈরি করা হয়েছিল তা নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তায় হাসিনা আপার লিখিত মুখবন্ধ নিয়ে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে লন্ডনস্থ আবদুল মতিন সাহেবের প্রকাশনী সংস্থা ‘রেডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশন্স’। রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর হাসিনা আপা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের নিকট এটি প্রেরণের ব্যবস্থা করেন।