বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাকাঙ্ক্ষী সদস্যের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। এরপর দীর্ঘদিন এ হত্যাকাণ্ডটির কোনো বিচার হয়নি। খুনিদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে তত্কালীন সামরিক শাসকরা হত্যাকারীদের দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুনর্বাসিত করে। শুধু তা-ই নয়, তাদের বিরুদ্ধে কেউ যেন কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারে সেজন্য দি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স নামক একটি আইন জারি করা হয়। ফলে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার বিঘ্নিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর এক অকৃত্রিম ব্রিটিশ বন্ধু বিচার প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে এসে একটি কমিশন গঠন করেন। তার নাম স্যার টমাস উইলিয়ামস।

স্যার টমাস উইলিয়ামস (১৯১৫-১৯৮৬) একজন স্বনামধন্য ব্রিটিশ আইনজীবী ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার অ্যান্ড কো-অপারেটিভ পার্টির একজন রাজনীতিবিদও ছিলেন। বিভিন্ন উপনির্বাচনে জয়লাভ করার মাধ্যমে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তাকে কুইনস কাউন্সিল বা সংক্ষেপে কিউসি হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মামলায় তার এ মহান বন্ধু অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্ধুর পক্ষ নিয়ে মামলাটি পরিচালনা করেন। এছাড়া সপরিবার বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার আহ্বানে তিনি ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়েরি’ বা ‘শেখ মুজিবের হত্যা তদন্ত’ নামে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি পরিচালনা করতে ১৯৬৮ সালের মে মাসে স্যার উইলিয়ামস ঢাকায় পাড়ি জমান। প্রায় ২৫ জন আইনজীবী আসামিদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন। আইনজীবীদের মধ্যে তার উপস্থিতি তাদের বিপুলভাবে উৎসাহিত করে। ঢাকায় পৌঁছেই তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে তার বন্দিশিবিরে মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার অধিক সময় আলোচনা করেন। জুন মাসের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আদালতে উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে নানা অজুহাতে তা বাধাগ্রস্ত করা হয়। গুজব ওঠে যে লন্ডনে বসবাসরত আওয়ামী লীগের সমর্থক বিভিন্ন ছাত্র ও ব্যবসায়ী তাকে মামলা পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান দিচ্ছে। ফলে তাকে গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এদিকে ভারতীয় আইনজীবীরাও শেখ মুজিবের পক্ষে অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দেন।

আমরা জানি, মামলাটি চলাকালে সামরিক জান্তার রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে জনগণ অভিযুক্তদের প্রতি তাদের সমর্থন প্রকাশ্যে জানাতে শুরু করে। দেশে ও দেশের বাইরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সমর্থক মামলাটি পরিচালনার জন্য সুরক্ষা তহবিল গঠন করে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করে। সরকার পক্ষের পরাজয়ের কথা আঁচ করতে পেরে সামরিক শাসক আইয়ুব খান মামলায় টমাস উইলিয়ামসের উপস্থিতি নিয়ে ভীত হয়ে পড়েন। ফলে পুরো সময় ধরে মামলায় তার উপস্থিতির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের প্রধানতম সাক্ষী আমির হোসেনকে টমাস উইলিয়ামসের জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা থাকলেও তাকে তা করতে দেয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই মামলার শুনানি স্বকর্ণে না শুনে ৮ আগস্ট ১৯৬৮ তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। এর আগে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন তিনি। এতে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ট্রাইব্যুনাল গঠনসংক্রান্ত বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

স্বদেশে ফিরে গেলেও কিন্তু বন্ধুর প্রতি তার বন্ধুত্বের অনুরণন সর্বদাই ছিল। বাংলাদেশকে তিনি হূদয়ের মণিকোঠায় ঠিকই জায়গা দিয়ে ফেলেছিলেন। নানা মারফতে তিনি এ দেশের খবরাখবর রাখতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিলেন তিনি। এ দেশটির যেকোনো বিষয়ে তিনি দৃঢ় পদে সামনে এগিয়ে আসতেন। তাই ১৯৮০ সালে বঙ্গবন্ধু পরিষদের ইউরোপীয় শাখার সভাপতিত্বের পদটি অলংকৃত করতে অনুরোধ করা হলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। এ পরিষদের প্রাথমিক কাজ ছিল ইউরোপজুড়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, মৃত্যু দিবস ও জেলহত্যা দিবস বিশেষভাবে পালন করা। তারই ঐকান্তিক সহযোগিতায় সে বছর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন লন্ডনের বিখ্যাত হাউজ অব কমন্সে পালিত হয়। ওই সভায় যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিসভার বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

১৯৮০ সালের ১৭ মার্চ তারিখে সন্ধ্যা ৬টায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় সভাপতির ভাষণে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বেশ মর্যাদার সঙ্গে উপস্থিত সবার কাছে তুলে ধরে বলেন, ‘আমার মতো আপনারাও এটা অনুভব করছেন যে আজকের এ সভার মাধ্যমে একজন মহান ব্যক্তিকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারায় সভাটি বাস্তবিক পক্ষেই সময়োপযোগী ও ফলপ্রসূ হয়েছে। আমাকে আপনাদের এ নতুন সমিতির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে যে সম্মান দেখিয়েছেন তাতে আমি খুবই গর্ববোধ করছি। এ সমিতির সেবা করতে গিয়ে আমাকে যা কিছুই করতে হবে তা আমি অত্যন্ত আনন্দচিত্তে ও গর্বের সঙ্গেই করব।’ বঙ্গবন্ধুর মতো এমন মহান ব্যক্তিত্বের বন্ধু হতে পেরে তিনি নিজেকে কৃতার্থ মনে করে তার আলোচনায় বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি এবং আমি বিশ্বাসও করি যে শেখ মুজিব আমার বন্ধু ছিলেন। আমি তাকে জানতে পেরে, বিশেষ করে তার জন্য এবং তার সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত। আমার এই কথা ভাবতে ভালো লাগে যে আমি যখন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ছিলাম তখন অনেকের সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, যারা সবাই আগরতলা মামলায় আমার সাথি ছিল। শুধু তাই নয় আজকের যে বাংলাদেশ সে বাংলাদেশের শুরু থেকেই তারা আমার সঙ্গে ছিল। আজকের এ সন্ধ্যায় সভার কার্যক্রম শুরু করার সময় আমি আপনাদের বলেছিলাম যে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার যখন প্রথম দেখা হয় তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তার আরাধ্য কাজ অসমাপ্ত রেখে তিনি মারা যাবেন, এ কথা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তার এ বিশ্বাস হয়তো পুরোপুরি পূর্ণ হয়নি, কিন্তু এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে এবং যতদিন বাংলাদেশ বিশ্বের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে, ততদিন তার মৃত্যু নেই।’

বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির জন্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় সভায় করা তার এ মন্তব্য থেকে, ‘আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই, কেননা আজকের এ দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও বাংলাদেশ আবার জেগে উঠবে, জাতিসত্তার পূর্ণতা পাবে, তখন তার আত্মা আমাদের মাঝে ফিরে এসে বলবে, “তোমরা যদি আমার স্মৃতিচিহ্ন চাও তবে তোমাদের চারদিকে তাকাও।” একজন মহান ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। এবং আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি।’

লন্ডনের হাউজ অব কমন্সের কমিটি রুমে এভাবে আবেগঘন ভাষায় বন্ধুকে স্মরণ করেন স্যার উইলিয়ামস। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণ উদঘাটন করতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা কর্তৃক তাকে আহ্বান করলে তিনি তা পবিত্র দায়িত্ব মনে করে সম্মতি প্রদান করেন। এ বিষয়ে তাঁর উক্তি উল্লেখযোগ্য, ‘যাদের হাতে বঙ্গবন্ধু ও তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের রক্তের দাগ রয়েছে, তাদের বিচার করতেই হবে। শুধু বিচার করলেই চলবে না, বিচার করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হতে হবে।’ সে লক্ষ্যেই একই বছর ১৮ সেপ্টেম্বরে তার নেতৃত্বে তদন্ত কমিশনটি গঠিত হয়। তদন্তের স্বার্থেই কমিটির সদস্যরা বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার অব্রে রোজ ও জেফরি টমাসের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করে হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিষয়ে অবস্থান সুস্পষ্ট করে দেয়। অবশ্য এর আগে টমাস উইলিয়ামসকেও বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। ফলে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডটির বিচারের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সরকারকেই দায়ী করা হয়।

এভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ক্রান্তিলগ্নে বিচারপ্রক্রিয়াকে বেগবান করতে সামনে এগিয়ে এসে তিনি বন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারপ্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বিলম্বিত হওয়ার কারণগুলো উদঘাটন করে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপক্ষে একটি বৈশ্বিক জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৮৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

ইসফানদিয়র আরিওন